ব্রিজের তলার শহর: উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন


  • July 16, 2021
  • (3 Comments)
  • 921 Views

উত্তর কলকাতার টালা ব্রিজ ভাঙার সময় উচ্ছেদ করা হয় ব্রিজের তলার ও আশেপাশের বস্তির প্রায় ১৫০টি পরিবারকে। রাস্তায় নেমে এবং আইনি লড়াই লড়ে তাঁরা সাময়িক সুরাহা আদায় করেন। কিন্তু উপযুক্ত পুনর্বাসনের দাবি এখনো পূরণ হয়নি। মানুষের থাকার কষ্ট উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। টালাতে আন্দোলনের শুরুতে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘বস্তিবাসী শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা কমিটি’-র টালা শাখা। এই সংগঠনের উদ্যোগে দাবি আদায়ের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, বৃহত্তর নাগরিক সমাজকে আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন টালার বস্তিবাসী মানুষেরা। সেই কথা তুলে ধরলেন আন্দোলনের কর্মী সৌম্য চট্টোপাধ্যায়

 

“পুরোনো বাসন দিতে হবে” — ভর দুপুরে খালপাড়ের প্লাস্টিকের সারি দেওয়া ঘরগুলোর সামনে হেঁকে যেতো সদ্য বুলি ফোটা মেয়েটা। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির আলোড়ন তাকে যে শব্দটা শুনিয়েছিল, সেটাকে এভাবেই চেনা দুটো শব্দ দিয়ে বুঝেছিল সে। “পুনর্বাসন”। তার মা, বাবা সহ আশেপাশের সবাই তখন এই একটাই কথা বলছিল। সে হয়তো বুঝেছিল যে এটা পেতে গেলে বারবার বলে যেতে হবে কথাগুলো, রাস্তায় নেমে, দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ঘুরে। আন্দোলন মানুষকে নতুন ভাষা দেয়, সেই ভাষায় আওয়াজ তুলতে শেখায়। শিশুরাও এর ব্যতিক্রম নয়।

 

তখন সদ্য সদ্য পুরোনো বাড়িঘর, পুরোনো যা কিছু ভেঙে ফেলার পর তাদের ঠাঁই হয়েছে টালা ব্রিজের তলা থেকে “কালো প্লাস্টিকে”র ঘরে। এক ফালি রেলের জমিতে খোলা নর্দমার সামনে আর ব্যস্ত ধুলোমাখা সড়কের পাশে খালধারের সেই কালো প্লাস্টিকের ঘরগুলো। উপযুক্ত পুনর্বাসন কীরকম হওয়া উচিত, তার সংজ্ঞা আইনের অভিধানে নির্দিষ্ট করে বলা নেই। তাই টালা ব্রিজের দু’প্রান্তে, মধ্যিখানের এলাকায় থাকা প্রায় ১৫০টি পরিবার কোথায় যাবেন, কীভাবে থাকবেন, তার কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই পড়ে গেছিল উচ্ছেদের নোটিশ।

 

এই শহরে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর শ্রম দেওয়া মানুষগুলো এক লহমায় হয়ে গেলেন “বেআইনি জবরদখলকারী”। কারণ টালা ব্রিজ ভেঙে ফেলে নতুন করে গড়ে তোলা হবে। কারা ভাঙবেন, গড়বেন? আর কারা, এই শহরের যাবতীয় ভাঙাগড়ার কারিগর যে “বিশ্বকর্মারা”, তাঁরাই। এই ব্রিজের তলার মানুষগুলোর মতোই। কেন তাহলে ব্রিজ মেরামতের সামগ্রিক পরিকল্পনা থেকে বাদ যায় এই মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ বাসস্থানের পরিকল্পনা? কেন তাঁদের শ্রম দিয়ে সৃষ্ট এই শহরের ইট-কাঠ-পাথরের ইমারত থেকে রোজকার পরিষেবা পণ্যগুলো বাজারে কেনাবেচা হয় আইনিভাবে, অথচ শ্রমদাত্রীরা হয়ে যান “বেআইনি জবরদখলকারী”? এই প্রশ্নগুলোই তুলেছিলেন টালা ব্রিজের তলা থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলো। সংগঠন গড়ে তুলে রাস্তায় নামা হয়, পৌর প্রতিনিধি আর সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের দরজায় দরজায় ঘোরা হয়। তারপর মেলে এই ১০ফুট বাই ১০ফুটের কালো প্লাস্টিকের ঘর।

 

কিন্তু শুধু একটা থাকার আস্তানা পেলেই তো মানুষ থাকতে পারেন না। আমরা দেখেছিলাম আমফান ঝড়ে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংযোগ বিঘ্নিত হওয়ায় শহরের একের পর এক এলাকার মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। সেখানে সেই শহরেরই এই কালো প্লাস্টিকের ঘরের মানুষগুলো দিনের পর দিন — শুধু রাতের সময়টুকুর জন্য ১২ ঘন্টার বিদ্যুৎ সংযোগ  নিয়ে দিন কাটিয়েছেন। বেশিরভাগ মানুষ এখনো কাটাচ্ছেন। একটার পর একটা গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত পেরিয়ে গিয়েছে প্লাস্টিকের চালের ফুটোগুলোর বাড়তে থাকা আর নড়বড়ে বাঁশের কাঠামোগুলো হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে। গরমের দুপুরে কালো প্লাস্টিকের ঘরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায়, শীতের রাতে প্লাস্টিকের ছাদে জমা হওয়া হিমের ফোঁটা থেকে বাঁচতে বারবার বিছানা বদল, বর্ষায় এক হাঁটু জলে বা ছাদের ফুটো দিয়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটায় ভেজা ঘরদোর নিয়েই মানুষগুলোর দিন কাটছে প্রায় দু’বছর ধরে। বাঁশের কাঠামোর ওপর প্লাস্টিকের ছাউনি দেওয়া ঘর।

 

প্রতি বছর একাধিক বস্তি পুড়ে যেতে দেখি আমরা শহরে। পুড়ে যাওয়ার পর নেতামন্ত্রীদের দেখা মেলে, ক্ষতিপূরণ ঘোষণা হয়। অথচ প্লাস্টিক আর বাঁশের তৈরি চরম দাহ্য ঘরগুলোয় দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকার বন্দোবস্ত করা হল এই টালার মানুষগুলোর ক্ষেত্রে। প্রতি রাতে জীবন হাতে করেই শুতে যান এখানকার ১৫০টি পরিবারের প্রায় ৮০০ মানুষ। এক ফালি ঘরে এক একটি পরিবার। কোথাও সেই পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬-৭ জনও। শুধু গোপনীয়তা নয়, এই করোনাকালে শারীরিক দূরত্ব, আইসোলেশন ইত্যাদি সব অলীক স্বপ্ন এই দশ ফুট বাই দশ ফুটের ঠিকানায়।

 

সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত “জীবনের অধিকার”-এর মধ্যে ন্যূনতম যে শৌচালয়টুকু পড়ে, সেটাও সরকারকে হাইকোর্ট না বলে দিলে তারা বোঝে না। সেই শুরুর দিন থেকে টালা ব্রিজের তলা থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলোকে শুধু শুকনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসা হয়েছে উপযুক্ত বাসস্থান এবং অন্যান্য নাগরিক পরিষেবার ব্যবস্থা করে দেওয়ার। এখানকার ভুক্তভোগী মানুষের করা মামলার ভিত্তিতে হাইকোর্ট এই ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতি যে “আশা ও ভরসা”-র কথা উল্লেখ করেছিল তা এই মানুষগুলোর মন থেকে ফিকে হয়ে যেতে যেতে প্রায় মুছতে বসেছে। যদিও তাদের দাবি খুব অল্প — মানুষের মতো বাঁচতে চাওয়ার দাবি, নাগরিক হিসাবে প্রাপ্য অধিকারের দাবি আর শ্রমিকের প্রাপ্য মর্যাদার দাবি।

 

বস্তিবাসী মানুষের স্বাস্থ্যকর উপযুক্ত  বাসস্থান ও নাগরিক পরিষেবার পরিকল্পনা যে শহরের সামগ্রিক পরিকল্পনা থেকে এড়িয়ে রাখা যাবে না, এই কথা রাষ্ট্রপুঞ্জের ইউএন হ্যাবিটাট ৩-সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশনে বারবার আলোচিত হয়েছে। উঠে এসেছে “সকলের জন্য বাসস্থান”-এর সংকল্প। সেই সংকল্পে সই করেছে আমাদের দেশও। তবুও বস্তির মানুষেরা প্রায় সব শহরে অস্বীকৃতই রয়ে গেছেন। আমাদের দেশের সংবিধানে বলা “জীবনের অধিকার” প্রত্যেক দেশবাসীর সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার যে মৌলিক  অধিকারের কথা ব্যক্ত করে তা দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রামে অধরাই থেকে গেছে। সভ্যতার জীয়নকাঠি যে শ্রমজীবী মানুষদের হাতে তাঁদেরকে রেখে দেওয়া হয়েছে শহরের “অদৃশ্য” নাগরিক করে। “সকলের জন্য বাসস্থান” আদপে ঠান্ডা ঘরের সেমিনারের বাইরে বেড়িয়ে বাস্তবের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া থেকে অনেক দূরে।

 

ভেবে দেখলে দেখা যাবে এই সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। ইউএন হ্যাবিটাটও তার এক রিপোর্টে উল্লেখ করছে যে বিশ্বজোড়া পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত  রদবদলের (যার কেতাবি নাম “নয়া-উদারবাদ”) ফসল অনিয়ন্ত্রিত শোষণ এবং তার ফলে বাড়তে থাকা অসাম্য। পুরোপুরি বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এত সংখ্যক মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। অথচ সেখানে তাদের দরকষাকষি করার বাস্তবিক কোনও ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। এই অবস্থা দুটো বিষয়কে সুনিশ্চিত করে। এক, পুঁজির মালিকদের বাড়তে থাকা (অতি-)মুনাফার পাহাড়। দুই, শ্রমজীবী মানুষের বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা, দুরবস্থা।

 

আমাদের চারপাশটাকে, এই শহরকে দেখার চোখও এই দুই ভিন্ন বাস্তবতার টানাপোড়েন দিয়েই তৈরি হয়। টালা ব্রিজের নস্টালজিয়া নিয়ে খবর হয় শহরের এক দিক থেকে — ওপর থেকে দেখা মানুষগুলোর চোখ দিয়ে। আর যারা নীচ থেকে দেখলেন এতকাল, ঘর করলেন ব্রিজটার সাথে সেটার জন্মলগ্ন থেকেই, তাদের অনুভূতিগুলো চাপা পড়ে যায়। গুমরে মরা সেই হাহাকারগুলোকে, মেহনতের স্বীকৃতি আর মানুষের মতো বাঁচতে চাওয়ার দাবিতে চিৎকারগুলোকে উহ্য রেখেই কি এগিয়ে চলবে এই সভ্যতা? টালা ব্রিজের কাজ তো শেষ হতে চলল, তার তলার মানুষগুলোর উপযুক্ত পুনর্বাসনের কাজ কতদূর? এই প্রশ্ন না তুললে তো নড়বড়েই রয়ে যাবে আমাদের শহরের ভিতটা!

 

টালার মানুষ প্রস্তুত হচ্ছেন এই প্রশ্নটাই তোলার জন্য। সহনাগরিকদের সাথে নিয়ে শহরটাকে নতুন করে ভাবা, ভাবানোর প্রয়োজন আজ। তার “উন্নয়ন” প্রকল্প, অগ্রাধিকারগুলো ব্রিজের তলা, খালের ধার, অট্টালিকার পাশের “অন্য শহর”-টাকে বাদ দিয়ে ভাবলে চলবে না। এই কথাটাই সাধারণভাবে হাজির হওয়া দরকার নাগরিক চর্চার পরিসরে। টালার বস্তিতে থাকা খেটে-খাওয়া মানুষগুলোর আন্দোলনের মূল সুর এটাই। এর অনুরণন ছড়িয়ে পড়ুক আমাদের মস্তিষ্কে, ভাষায় আর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে। ব্রিজের পুনর্নিমাণের সঙ্গে ব্রিজের তলার মানুষগুলোর বাসস্থানও পাকাপোক্ত করার দাবিতে টালার মানুষের আন্দোলনের পাশে দাঁড়াক  গণ-আন্দোলনের শক্তি, সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা-সহ বৃহত্তর নাগরিক সমাজ।

 

Share this
Recent Comments
3
  • অবশ‍্যই টালা বস্তির সুস্থ পুনর্বাসন নিয়ে বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলন হওয়া দরকার।

  • comments
    By: Siddhartha Basu on July 19, 2021

    নয়া উদারবাদী অর্থনীতি প্রান্তিক মানুষের জীবনকে খাদের কিনারে এনে ফেলেছে। উন্নয়ন মডেলের পুনঃনির্মাণ ছাড়া কিছু করা যাবে কি ?

  • শুধুমাত্র টালা নয়, কলকাতায় বহু এলাকায় এই বীভৎস দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। সংগ্রাম শুরু হোক টালা বস্তিবাসীদের নিয়ে। শিক্ষিত সচেতন নাগরিকদের সামিল করা হোক এই আন্দোলনে।

Leave a Comment