খালি পেটে ‘আত্মশাসন’ হয় না। সরকার খোলসা করুক রাজ্যের কোভিড পরিস্থিতি কী


  • June 17, 2021
  • (0 Comments)
  • 816 Views

সন্দেহ হয় বাংলার জেলাগুলিতে, গ্রামাঞ্চলে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেই। সরকার চাইছে না গণপরিবহন চালু করতে। তা হলে কলকাতায় দেশের অন্য বৃহৎ শহরগুলির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সরকার ইতিমধ্যেই জেলায় কন্টেইনমেন্ট জোন তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু, প্রকৃত তথ্য উন্মোচিত না হলে এই অতিমারির বিরুদ্ধে রণকৌশল বা রণনীতি কীভাবে তৈরি হবে? প্রযুক্তিগত বা অন্যান্য সাহায্য বা সহায়তার মান নিরূপিত হবে কীভাবে? প্রশ্ন তুললেন দেবাশিস আইচ

 

এক শেয়াল একবার তার বন্ধু সারসকে নিমন্ত্রণ করল। সারস শেয়ালের বাড়ি পৌঁছলে দুটো থালার ঝোল ঢেলে শেয়াল সারসকে খেতে ডাকল। যথারীতি সারসকে খালি পেটেই ফিরতে হয়েছিল আর শেয়াল চেটেপুটে খেয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী আর তাঁর আমলাদের কাণ্ডকারখানা দেখে গল্পটা মনে পড়ল। তৃতীয় দফায় লকডাউনের বিধিনিষেধ আলগা করে জানানো হল, অফিস-কাছারি, মল, বার, রেস্তোরাঁ খোলা থাকবে। নাগরিকরা স্বস্তির শ্বাস নিতে-না-নিতেই জানতে পারলেন গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। তো এই ধূর্ত নীতির কী প্রয়োজন ছিল? বণিকসভার চাপে যখন সিদ্ধান্ত নিতেই হল তখন পরিবহনের ব্যবস্থা করা হল না কেন? এমন শিথিলতার অর্থ কী? সন্দেহ হয়, সংক্রমণ নিয়ে সরকার যে তথ্য দিচ্ছে তা পুরোপুরি সত্যি নয়। আর জনপ্রিয়তাবাদী সরকার সত্যি কথা বলেও না। সেটুকু তথ্যই তারা ঢাকঢোল পিটিয়ে বাজিয়ে থাকে যেটুকুতে তার জনপ্রিয়তা বাড়ে। সেখানে আধা সত্য, কিংবা সত্যের মোড়কে ঢাহা মিথ্যা পাবলিককে গিলিয়ে দিতে সরকারগুলির জুড়ি নেই। মমতা-সরকারকেও এ ক্ষেত্রে ধোয়া তুলসিপাতা মনে করার কোনও কারণ নেই।

 

এ রাজ্যে কৃষক আছে। তাদের ঋণের জ্বালা আছে। আত্মহত্যার উচ্চহার আছে কিন্তু কৃষক আত্মহত্যার কোনও তথ্য নেই। বাম আমলে তবু কৃষকেরা মদের ঘোরে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কিংবা বউয়ের উপর রাগ করে বিষ খেত। ঋণের দায়ে কিংবা ফসল নষ্ট হলে কেউ আত্মঘাতী হত না। এ আমলেও তেমনিই চলছিল। বিগত কয়েকবছর রাজ্যে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা না কমলেও তাদের মধ্যে কৃষকদের সংখ্যা শূন্য। এই তো ২০১৭ সালের কথা, কলকাতা হাইকোর্ট ডেঙ্গিতে মৃত্যুর পরিসংখ্যানকে দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। রাজ্যের হলফনামাকে ‘অস্বচ্ছ’ বলেও মন্তব্য করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য ও বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেঞ্চ মৃতের তালিকা ‘আপডেট’ করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি, বেসরকারি হাসপাতালের তথ্যও যোগ করতে বলেন। পাঠকের স্মরণ রয়েছে নিশ্চয় যে, এই সময় ডেঙ্গি বা ম্যালেরিয়া নয় ‘অজানা জ্বর’ -এর প্রকোপে মৃত্যু বেশ বেড়ে গিয়েছিল। হাইকোর্টে দেওয়া হিসেব অনুযায়ী ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত ১৮ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ১৯ জনের। এ তথ্য সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের।

 

আইন-আদালত ছাড়াও এ নিয়ে হাসিঠাট্টা কিছু কম হয়নি। ফেসবুকে হাসপাতালের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে পোস্ট লেখার দায়ে চিকিৎসক অরুণাচল দত্তচৌধুরীকে রাজ্য সরকার সাসপেন্ডও করে। চিকিৎসকরা মৃত্যুর কারণ লিখতে তখন রীতিমতো শঙ্কিত। সরকারি হাসপাতালেরই এই অবস্থা তো বেসরকারি হাসপাতাল, মফস্বল, আধা শহরের নার্সিংহোমের তথ্য যে আরও-ই অধরা থাকবে সে আর অবাক করার বিষয় কী!

 

যে সরকারের এমন রেকর্ড তাদের কাছ থেকে অতিমারির প্রকৃত ও স্বচ্ছচিত্র মিলবে তা আশা করা বৃথা। গুজরাত, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি, বিহার-সহ দেশে কোভিডে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সরকারগুলি তার বিরোধিতা করলেও সাধারণ মানুষ সরকারকে বিশ্বাস করছে না। ২৯ মে দ্য হিন্দু কলকাতায় কোভিডে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে এক রিপোর্ট প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের নিবন্ধিত মোট মৃত্যুর তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে, ১ এপ্রিল থেকে ২৭ মে-র মধ্যে কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়কালীন সরকারি ভাবে স্বীকৃত ১,১৯৮টি কোভিডে মৃত্যুর হিসেবের তুলনায় ‘অতিরিক্ত মৃত্যু’-র হার হচ্ছে ৬.৮৭ গুণ বেশি। এই সময় ‘অতিরিক্ত’ মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৮,২৩৪। কোভিড পূর্ববর্তী ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালে ওই একই সময় কলকাতা পুরসভার নিবন্ধিত গড় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৯,৩৫৩। অন্যদিকে, ২০২১ সালে ওই একই সময়ে, অর্থাৎ ১ এপ্রিল থেকে ২৭ মে পর্যন্ত মোট নিবন্ধিত মৃত্যুর সংখ্যা হল ১৭,৫৮৭।

 

‘অতিরিক্ত’ এই মৃত্যুর কারণ কোভিড এমন কোনও দাবি প্রতিবেদনে করা হয়নি। আবার এত ‘অতিরিক্ত’ মৃত্যু অ-কোভিড জনিত স্বাভাবিক মৃত্যু এ কথাও বলা যায় না। সরকারি হিসেব মোতাবেক যদি কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর সংখ্যা সঠিক হয়, তবে বলতে হবে, কোভিডকালে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থার গুরুতর ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কিন্তু, একটি বিষয় পরিষ্কার যে, মৃত্যুর সংখ্যা তো বটেই, কোভিড-১৯ বিষয়ক যে কোনও প্রশ্নে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। কী কেন্দ্রীয় সরকার, কী রাজ্যগুলির তথ্য গোপন করা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। দেশের রাজধানী এবং প্রধান প্রধান শহরগুলিতেই যদি পরিস্থিতি এতটা সঙ্গীন হয়, তবে গ্রামীণ ভারতের প্রকৃত রূপটি কতটা ভয়াবহ তা গঙ্গায় ভেসে যাওয়া কিংবা চরে কবর দেওয়া লাশ থেকেই প্রমাণিত।

 

সন্দেহ হয় বাংলার জেলাগুলিতে, গ্রামাঞ্চলে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেই। সরকার চাইছে না গণপরিবহন চালু করতে। তা হলে কলকাতায় দেশের অন্য বৃহৎ শহরগুলির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সরকার ইতিমধ্যেই জেলায় কন্টেইনমেন্ট জোন তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু, প্রকৃত তথ্য উন্মোচিত না হলে এই অতিমারির বিরুদ্ধে রণকৌশল বা রণনীতি কীভাবে তৈরি হবে? প্রযুক্তিগত বা অন্যান্য সাহায্য বা সহায়তার মান নিরূপিত হবে কীভাবে? এত বিজ্ঞানীদের কাজ, অতিমারি বিশেষজ্ঞদের কাজ। তাঁদের কাছে যথাযথ তথ্য না থাকলে অতিমারির এই মহাভারের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার হদিশ মিলবে কীভাবে? সবচেয়ে বড় কথা সরকার যদি অধিকাংশ নাগরিকের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন না করতে পারে, তবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা দুষ্কর হবে। ‘আত্মশাসন’ হোক কিংবা বিধিনিষেধ, উপর থেকে দফায় দফায় চাপিয়ে দিতে থাকলে সবদিক থেকেই হিতে বিপরীত হবে। খালি পেটে আত্মশাসন পওহারি বাবাদের পক্ষেই সম্ভব। সমস্যা হল, কোভিড-কাল এক অদ্ভুত সার্কুলার এবং ‘মন কি বাত’ শাসিত শাসনবিধির জন্ম দিয়েছে। যেখানে শুধু গোছাগোছা সার্কুলার ও ভার্চুয়াল প্রেস কনফারেন্স। প্রশ্ন নেই, আলোচনা নেই, মত দেওয়া-নেওয়ার বালাই নেই। আইনসভা নেই, বিরোধী নেই। আবার নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়লেই সব ‘আত্মশাসন’, বিধিনিষেধ, লকডাউন শিকেয় তুলে দিয়ে সকলেই তখন ‘আমি তোমাদেরই লোক’। কত আলোচনা, কত কথার ফুলঝুরি। নীতি-নৈতিকতা নিয়ে কত বিতর্ক! কত তর্কপ্রিয়তা! গদিতে বসলে অন্যরূপ। তখন আর নাগরিকদের কাছে খোলসা করে কিছু বলা মানা। তখন কেবলই হুকুম। সুতরাং, এই প্রশ্নহীন আনুগত্য আর স্বেচ্ছাচারিতার মজা শাসকেরা বেশ রসিয়ে রসিয়েই উপভোগ করে চলেছে বলেই মনে করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অবশ্য মনে রাখতে হবে গল্পের সারসটিও শেয়ালকে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিল। অতি বুদ্ধিমান শেয়াল নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসে দেখে ঝোল ভর্তি দুটো কুঁজো। সারস লম্বা ঠোঁট ডুবিয়ে খেল আর শেয়ালকে কুঁজোর গা চেটেই সন্তুষ্ট থাকতে হল। গল্পের সারার্থটি তো আমাদের বালক বয়সেই জানা।

 

১। “April and May 2021 (till May 27) of the second wave alone, excess deaths were as high as 6.87 times the officially recorded figure of 1,198 deaths. During this period when the second wave raged in Kolkata, there were 8,234 “excess deaths” compared to 1,198 reported COVID19 deaths. These “excess deaths” were calculated as the difference between the 17,587 certified deaths in April and May 2021 and the average number of certified deaths in the same period in the pre-pandemic years between 2015-2019 (9, 353).” The Hindu.com, May 29, 2021.

 

Share this
Leave a Comment