স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র ভাষায় ভাস্বর বুদ্ধদেব


  • June 15, 2021
  • (0 Comments)
  • 504 Views

তিনি যেমন সিনেমার ভাষা বুঝতেন তেমনি বুঝতেন তাঁর আশেপাশে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাকে, আর সেই ঘটনাই বারবার উঠে এসেছে তাঁর সিনেমায়, হয়তো অন্য ভাষায় উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর চলচ্চিত্র তাঁর নিজের কথায় ‘‘একটি ফাঁকা গ্লাসে কিছুটা স্বপ্ন, কিছুটা বাস্তব আর কিছুটা ম্যাজিক মিশিয়ে যে শেকটি তৈরি হয় তাই আমার সিনেমা। ’’ লিখেছেন সৌরব চক্রবর্তী

 

“মানুষ বেঁচে থাকে, মানুষ মরে যায়/ কাহার তাহাতে ক্ষতি? কিই বা ক্ষতি হয়? আমার শুধু বুকে গোপনে জ্বর বাড়ে, মানুষ বেঁচে থাকে মানুষ মরে যায়।”

 

বন্ধু ফাল্গুনী রায়ের এই কবিতা বহুবার বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন, মানুষের চলে যাওয়াতে সত্যিই কার ক্ষতি হতে পারে, কিই বা ক্ষতি হতে পারে! কিন্তু চলে গেলেই বোঝা যায় তার করা কাজ কতো গুরুত্বপূর্ণ! আরও কিছুদিন থেকে গেলে হয়তো আরো অনেক কাজ করে যেতেন। একই সাথে কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা, এইভাবেই বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে চিনে এসেছি, দেখে এসেছি। তাঁর চলে যাওয়ার পর তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে চোখের সামনে ভেসে উঠছে, তাঁর ছবি ‘কালপুরুষ’-এ অশ্বিনীর সংলাপ –

আরেকটু আগে আমার আগে আগে যে হাঁটছিল, ওর নাম সুমন্ত। আমার ছেলে। কতদিন হয়ে গেল আমি ওর সঙ্গে ঘুরে বেড়াই। ও বুঝতে পারে না। ওকে আমার অনেক কথা বলার আছে। সুমন্তরও অনেক কথা আছে আমার সঙ্গে।

 

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত জীবিত থাকলে এই কথাই আরেকবার বলতেন, হয়তো। একজন শিল্পী বা লেখক কি সারা জীবনেও সব কথা বলে যেতে পারেন কিংবা লিখে যেতে! তাঁর সিনেমাকে অনেকেই কবিতার সঙ্গে তুলনা করেন কিংবা কবিতাকে সিনেমার সঙ্গে। আমরা তাঁর সিনেমার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনীতি, অর্থনীতি, জীবনদর্শনকে বোঝার প্রয়াস করবো।

 

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘চরাচর’(১৯৯৩)’র বিষয়বস্তু ব্যক্তি লখিন্দরকে ঘিরে আবর্তিত। পাখি ধরে বিক্রি করা তার পৈতৃক পেশা। নেশা করা, ধরা পাখি মাঝে মাঝে ছেড়ে দেওয়া। ঘরে স্ত্রী সারি আছে, কিন্তু গৌরী নামের একটা মেয়ে লখিন্দরকে মনে মনে ভালোবাসে। এইরকম অনেকের মাঝে থেকেও লখিন্দর একা। অভাব তাঁর নিত্যসঙ্গী। স্ত্রী সারি তাই প্রেমিক নটবরের সঙ্গে গৃহত্যাগ করে। লখিন্দর পড়ে থাকে তার পাখি নিয়ে, স্মৃতি আর স্বপ্ন-কল্পনা নিয়ে। মানুষের সম্পর্ক-ব্যবস্থার মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধের ক্রিয়াশীলতা, মানুষের নৈঃসঙ্গ চেতনা, নারীর যৌনতা – আখ্যানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সবাই এবং সবকিছুই যেন তাকে প্রতারিত করেছে – সংসার, পরিজন, সময়, সমাজ। এ বিপন্ন বোধই তাকে সরে যেতে উদ্বুদ্ধ করে। এই সরে যাওয়ার মুহূর্তগুলো চলচ্চিত্রে লখিন্দরের দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রিত হয়েছে – কখনও স্বপ্নে, কখনও কল্পনায়।

 

বিষয়বস্তুই স্বপ্ন ও কল্পনাকে ডেকে এনেছে। লখিন্দরের বাস্তবতা ছেড়ে স্বপ্ন ও কল্পনায় পরিভ্রমণের কারণে চরাচরের দৃশ্য ও শব্দ-সংগঠনরীতি বাস্তবসম্মত থাকেনি। দৃশ্যপুঞ্জগুলোএকটির সঙ্গে আরেকটি এমনভাবে মিশে গেছে যে দর্শকের পক্ষ তা মনোনিবেশ ছাড়া বোঝা মুশকিল। এই চলচ্চিত্রের বেশিরভাগ অংশই সম্পন্ন হয়েছে বিমূর্তন প্রক্রিয়ায়। এই বিমূর্তন বা অ্যাবস্ট্রাকশন শিল্পকর্মের বিশেষ একটি দিক। চলচ্চিত্রশিল্পে এই বিমূর্তন প্রক্রিয়াটি সাঙ্গ করা হয় দৃশ্য, শব্দ ও সম্পাদনাকর্ম দ্বারা।

 

চরাচর-এ বিমূর্তন প্রক্রিয়াটি রিয়েলিটি ও অ্যাবসার্ডিটির মিলন-মিশ্রণ তথা মিউটেশনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। চরাচর-এর শেষ দৃশ্যে লখিন্দর যে দরজা খুলে সমুদ্রের দিকে ওপরে হাত তুলে দৌড় দিল, সেটা তার স্বপ্ন, কিন্তু তার ঘর, ঘরের দরজা এগুলো বাস্তব। পরিচালকের ভাষায় –

সমুদ্র যদিও সে জীবনে দেখেনি, কিন্তু তার স্বপ্ন কল্পনা সে কিন্তু জেগে জেগেই সেসব দেখছে। রিয়েলিটি ছিল লখার ওই দরজা খোলা অবধি। এরপর যেটা শুরু হলো সেটা স্বপ্নের, অজানা, অচেনা, ইচ্ছের যাত্রা। তাই লখাও এমনভাবে এমন ভঙ্গিতে দৌড়োল, মনে হলো যেন ও-ও বুঝি পাখি হয়েই উড়ে যাবে। এইভাবে ন্যারেটিভ ফরম্যাটে নন-ন্যারেটিভ ব্যাপার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

 

অর্থনীতিবিদ হিসেবে বুদ্ধদেব জানেন শিল্পকর্ম নিজে থেকে সমাজ-সংকট নিরসন করতে পারে না। তবে যে কাজটা করে তা হল সংকট থেকে উত্তরণের ইচ্ছা, জোর এবং লড়াইয়ের পথের বার্তা জনমনে জাগিয়ে দেওয়া। উত্তরা-এ এই জাগিয়ে দেওয়ার কাজটি করা হয়েছে বামন গার্ডের সংলাপে, যেখানে তিনি উত্তরাকে বলেন –

“বামন গার্ড : লম্বা মানুষ তো দেখলে এতকাল। কিছু করতে পারল তারা? পৃথিবীটা বদলাল? খালি যুদ্ধ, যুদ্ধ আর যুদ্ধ। জানো, আমাদের গ্রামে আমরা একটা স্বপ্ন দেখি। উত্তরা : কী স্বপ্ন? বামন গার্ড : দেখি আশপাশে সব আমাদের মতো বামনে ভরে গেছে। তারাই চালাচ্ছে সব। মানুষ ভালো আছে।”

 

এই বামন সম্প্রদায় নিশ্চিতভাবেই একটি প্রতীকী সম্প্রদায়। বামন গার্ডের সংলাপের মধ্য দিয়েই বুদ্ধদেব স্বপ্ন ফেরি করেন দর্শক মননে। গার্ড যখন বলেন যে – ‘যারা স্বপ্ন দেখে না, তারা স্বপ্ন দেখার লোকগুলোকে সরিয়ে দিতে চায়’ তখন কী আর বুঝতে বাকি থাকে যে এই অনুভব আসলে পরিচালকের নিজেরই! তিনিই স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছেন বামন সম্প্রদায়ের পেছনে। বুদ্ধদেব রাজনীতি বুঝতেন এবং তাতে যাপনও করতেন। বামন সম্প্রদায়কে প্রতীকরূপে ‘উত্তরা’য় আনা ও তাদেরকে দিয়ে মূল বক্তব্য প্রকাশ করা বুদ্ধদেবের নন্দনভাবনার শৈল্পিক প্রকাশও বটে।

 

‘নিম অন্নপূর্ণা’ (১৯৭৯) উপনিবেশ ও উত্তর-পশ্চিম বাংলার সমাজবাস্তবতার সমষ্টিগত সংকটের চলচ্চিত্র। কমলকুমার মজুমদারের গল্প অবলম্বনে তৈরি এ চলচ্চিত্র সম্পূর্ণভাবেই একটি বাস্তববাদী নির্মাণ। সমষ্টির সংকট বটে কিন্তু তাকে রূপ দেওয়ার জন্য ব্যক্তিকে আনতে হয়েছে চরিত্র করে। ব্রজের পাশের খুপরিতে এক বৃদ্ধ ভিখারি থাকে। সে বস্তায় চাল জমায়, ব্রজের স্ত্রী প্রীতিলতা তা জানে। ক্ষুধার তাড়নায় প্রীতিলতা ভিখারিকে একদিন হত্যা করে চালের বস্তাটি হাতিয়ে নেয়। অনেক দিন পর ভাত রান্না হয় ব্রজর ঘরে। অনেক দিন পর ব্রজ গরম ভাতের গন্ধ পায়। পেট পুরে সবাই খায়। শুধু প্রীতিলতা সবার সঙ্গে সমানতালে খেতে পারে না। একসময় প্রীতিলতা বৃদ্ধের ঘরের জানালার দিকে তাকায়। তার মুখে বমির ভাব। বাইরে এসে বমি করে, ভাত বের হয়ে আসে, প্রথম দৃশ্যের মতন। বস্তুতঃ প্রথম দৃশ্যের পরই আখ্যান ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায় এবং সেখান থেকে ফিরে এসেই শেষ হয়। যদিও এরপর একটি দৃশ্য যোগ করে বুদ্ধদেব অভাব-ক্ষুধা-দারিদ্রের মিছিল যে থেমে নেই তা দেখান। এক ব্রজর গল্প আপাতত শেষ হলেও ব্রজর মতোই আরেকটি পরিবার ট্রেনে চেপে কলকাতা অভিমুখী হতে দেখা যায়।

 

মূল গল্পটি দেশভাগ-পূর্ব পশ্চিম বাংলার সমাজ কাঠামোতে যে মন্বন্তর দেখা দেয় এবং এর ফলে গ্রামীণ সমাজ থেকে ভিক্ষার আশায় কলকাতায় যে জনস্রোত ছুটে আসে, সেই পটভূমিতে রচিত। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত গল্পটিকে দেশভাগোত্তর সমাজ বাস্তবতায় প্রতিস্থাপন করে একটি নির্বিশেষ সময়ের বন্ধনে আবদ্ধ করেন। মূল গল্প থেকে কিছুটা গ্রহণ করেছেন, কিছুটা বর্জন করেছেন এবং প্রয়োজনে কিছু বিষয় সংযোজনও করেছেন। তবে গল্পের মূল বক্তব্যকে মান্য করেই চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষায় নিম অন্নপূর্ণা নির্মাণ করেছেন। এ বিষয়ে তাঁর মতামত হচ্ছে :

সিনেমা সম্পূর্ণ নিজস্ব ভাষায় বেড়ে ওঠা অন্য একটি মাধ্যম। লিখিত ভাষার সঙ্গে যার প্রয়োগগত কোনো মিল নেই। দশ-বারো পাতার গল্পটির একশো পাতার প্রাথমিক খসড়া চিত্রনাট্য যখন দাঁড়িয়েছে তখন লিখিত ভাষায় নিম অন্নপূর্ণার ওপরের আবরণের সঙ্গে তার মিলের চেয়ে হয়তো অমিলই বেশি। আমি যেভাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছি মূল কাহিনি বা গল্পকে, তাই এসেছে চিত্রনাট্যে। ফলে চলচ্চিত্রে বিষয়টিতে এসেছে পরিচালকের সম্পূর্ণ নিজস্ব ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি, সমসময়ের সঙ্গে বিষয়টির যোগাযোগ ঘটিয়ে নতুনভাবে ভাবনার ব্যাপারটি। ফলে সময় বদলেছে, নতুন চরিত্র এসেছে, যূথী লতি হয়ে গেছে, ঘটনা এসেছে, নতুন সংলাপ এসেছে, এমনই হয়।

 

বুদ্ধদেবের ভাষ্য থেকে ‘নিম অন্নপূর্ণা’ সম্পর্কে তাঁর নিজের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি অবগত হওয়া যায়। বুদ্ধদেবের চলচ্চিত্র নিম অন্নপূর্ণা আর কমলকুমার মজুমদারের গল্প ‘নিম অন্নপূর্ণা’ মাধ্যম ও ভাষাগতভাবেই আলাদা। ‘নিম অন্নপূর্ণা’র ভাষা বিষয়বস্তুর কারণেই গদ্যধর্মী, কাব্যিকতা প্রশ্রয় পায়নি। ক্ষুধা আর অভাবের রাজ্যে জীবন যে গদ্যময়! এতে ব্যক্তিপ্রধান বিষয়নির্ভর চলচ্চিত্রের মতন কল্পনা ও স্বপ্নের স্থান হয়নি। বাস্তব যে বড় নির্মম-নিষ্ঠুর। দৃশ্যসমূহের পশ্চাৎপট মনোরম প্রকৃতি-ল্যান্ডস্কেপ নির্ভর নয়, যা ব্যক্তিপ্রধান বিষয়নির্ভর চলচ্চিত্রে দেখা যায়। এর দৃশ্যপট দিনানুদৈনিক ঘটনানির্ভর। নিম অন্নপূর্ণা দারিদ্র্য-দুঃখে লীন মানুষের কাব্য। সম্ভবত এ কারণেই এটি সাদা-কালোয় নির্মিত। চলচ্চিত্রটি ব্যক্তিপ্রধান বিষয়নির্ভর নির্জন একাকিত্বের একস্বরিক পাঁচালী নয়, সমষ্টিপ্রধান বিষয়নির্ভর ক্ষুধা-অভাব-দুর্ভিক্ষের বহুস্বরিক পাঁচালী। বুদ্ধদেব ক্ষুধার নন্দনতত্ত্বের সন্ধান করেছেন নিম অন্নপূর্ণা-এ। এভাবেই তাঁর সমসাময়িক অন্য পরিচালকদের মধ্যে তিনি নিজস্বতা ধরে রেখেছিলেন।

 

‘ফেরা’ (১৯৮৬) শিল্প ও শিল্পীর সংকট নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র। এক অর্থে এটা ব্যক্তি ও সমষ্টির মিলিত সংকট উপস্থাপন করে। যখন শিল্প ও শিল্পী সংকটে পড়ে তখন দুইয়ের মধ্যে অস্থিরতার প্রকাশ ঘটে; একটি সমাজের সাংস্কৃতিক বাতাবরণ সংকটের সম্মুখীন হয়। ফেরা-তে আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি ধারা হিসেবে যাত্রা ও এর শিল্পীদের বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজে যে সংকটের মধ্যে পড়তে হয়েছে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। নরেন্দ্রনাথ মিত্র রচিত ‘সংক্রামক’ গল্পের চলচ্চিত্ররূপ ‘ফেরা’। এ চলচ্চিত্রের জন্যও গ্রহণ-বর্জন-সংযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চিত্রনাট্য রচনা করেছেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত।

 

কেন্দ্রীয় চরিত্র শশাঙ্ক যাত্রাপালা লেখক, অভিনয়শিল্পী। একসময় যাত্রাদলের মালিক ছিলেন তার জমিদার বাবা। দেনার দায়ে শশাঙ্ক যাত্রাদল বেচে দিয়েছিল এক কাঠ ব্যবসায়ীর কাছে। এখন তাঁর গাঁয়ের লোক নীতিবাক্যপ্রধান শিল্পমূল্যে সজ্জিত পালা দেখতে আগ্রহী নয়। তারা চটুল নাচ-গাননির্ভর সস্তা বিনোদন চায়। শশাঙ্ক পুরনো পৈতৃক জমিদারবাড়িতে একা থাকে, তার স্ত্রী যমুনা তাকে ছেড়ে তার এক বন্ধুর সঙ্গে পালিয়ে গেছে। স্ত্রীর পালিয়ে যাওয়ার পেছনে সে নিজেও দায়ী। ইতিমধ্যে যাত্রাদলে ভাঙন ধরে। ফলে সে যাত্রাদল ছেড়ে দেয়, একা জমিদারবাড়িতে বসে তাঁর পছন্দমতো পালা লেখে, মদ্য পান করে আর যাত্রাদলের পুরনো প্রপস সাজিয়ে রাখা ঘরে একা একা ঘুরে বেড়ায়।

 

আখ্যান মোড় নেয় যখন শশাঙ্কের স্ত্রীর বোন সরযূ ও তাঁর ছোট ছেলে কানু এসে পুরনো জমিদারবাড়িতে আশ্রয় নেয়। শশাঙ্ক তার ছেড়ে যাওয়া স্ত্রী যমুনার প্রতি তার ক্ষোভ সরযূর ওপর দেখায়। ওদিকে রাশু মন্দিরে গিয়ে মালাবদল করে কল্যাণীকে বিয়ে করে, কিন্তু গণধর্ষণের শিকার হয়ে কল্যাণী মারা গেলে রাশু গাছে চড়ে আত্মহত্যা করে। এক পর্যায়ে যাত্রাদলের ব্যবহার্য প্রপস ও যাত্রা সম্পর্কে কানুর কৌতূহল শশাঙ্ককে কানুর প্রতি উৎসুক করে তোলে, কানাইয়ের মধ্যে নিজের ছোটবেলাকে আবিষ্কার করে; ভাবে তার মধ্য দিয়েই যাত্রাশিল্পের চর্চাকে অব্যাহত রাখা যাবে; নিজের শিল্পগুণসম্পন্ন যাত্রাপালা লেখার অভ্যাস অব্যাহত রাখা যাবে। এরকম একটি ভাবনা থেকেই শশাঙ্ক যেন নিজের শিল্পীসত্তার কাছেই ফিরে আসে। ফেরা-র আখ্যানের এখানেই ইতি ঘটে।

 

এই আখ্যানের দৃশ্যমাত্রার লয়ও ধীর গতির। কারণ এর দৃশ্যের অধিকাংশই শশাঙ্কের বিক্ষিপ্ত অথচ সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার প্রকাশ। দৃশ্যমাত্রা তৈরিতে ধীর গতির প্যান, ট্র্যাক ইন-আউট, টিল্ট আপ-ডাউন, জুম ইন-আউট, লো অ্যাঙ্গেল-টপ অ্যাঙ্গেল শট ব্যবহৃত হয়েছে। দৃশ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়েছে ডিটেলের ব্যবহারে। কানুর দৃষ্টিতে যাত্রাদলের পুরনো প্রপস যেমন তলোয়ার, মুকুট, রাজা-রানী-সন্ন্যাসীর পোশাক ইত্যাদি দেখানো হয়েছে। কানু আরো দেখে পুরনো মরচে ধরা ট্রাঙ্ক। তাতে লেখা ‘অন্বিকা নাট্য কোম্পানী, প্রোঃ শ্রী শশাঙ্ক নারায়ণ রায়, বন্দিপুর’। সাউন্ড ট্র্যাকে যাত্রার বাজনা বাজে। ছোট্ট দুটি এপিসোড বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে চিত্রায়িত হয়েছে : ঘোড়া চুরির দৃশ্য এবং পরিত্যক্ত বাগান থেকে গাছ কেটে নেওয়ার চেষ্টা ও তাতে শশাঙ্কের বাধা দেওয়া। শশাঙ্কের পরিবারের মৃতজনদের স্মরণে তৈরি স্মৃতিস্তম্ভও দৃশ্যমাত্রায় স্থান পেয়েছে। এগুলো এ চলচ্চিত্রকে একটি বাস্তববাদী নির্মাণ করে তুলেছে। এই প্রসঙ্গে পরিচালকের নিজের অভিমত হচ্ছে :

ভালো সিনেমা অহেতুক বকবক করে না। অপ্রয়োজনীয় শব্দ আর কথোপকথন অতিষ্ঠ করে তোলে না। বরং ইমেজগুলো উপহার দেয় নানা ইঙ্গিত এবং সংকেত। এই ইঙ্গিতময়তাই জন্ম দেয় মিনিমালিজম এবং সেই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে মিসিং লিংকের। ভালো সিনেমা এই ইঙ্গিতের ব্যবহারের মধ্য দিয়েই তার বিষয় উপস্থাপন করে। একজন কবি বা সাহিত্যিক বিভিন্ন শব্দ একসঙ্গে সংস্থাপন করে যে সুন্দর বাক্যটি রচনা করেন সেটি অনেক কিছু বলে দিয়েও কিছু বাকি রাখে, সেটিই ইঙ্গিত।

 

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত কবি। ‘কবির হৃদয়ে’ দুঃখবোধ বারো গুণ বেশি হয়ে বাজে। তাঁর চলচ্চিত্রও ব্যক্তি ও সমষ্টির দুঃখেরই পদাবলি। তাঁর চলচ্চিত্রে কতগুলো বিষয় রিপিটেটিভ মোটিফ হিসেবে ফিরে ফিরে এসেছে : বামন, কুস্তির লড়াই, আশাবাদের প্রতীক হিসেবে শিশুপ্রতিমা, লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান, কালচারাল কোড, মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ প্রভৃতি। সব মিলিয়ে তাঁর কৃত চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্রের ভাষায় লিখিত একেকটি উপন্যাস। এইসব চলচ্চৈত্রিক উপন্যাসে বহুস্বর, বহুস্তরতা, বহুভঙ্গিমা, বহুবচনের উপস্থিতি প্রবল।

 

আলোচিত সিনেমাগুলি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর যে দিকগুলি ইঙ্গিত করে – তাঁর রাজনীতি, সমাজনীতি, মানুষের জীবন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও বিচক্ষণতা। তিনি যেমন সিনেমার ভাষা বুঝতেন তেমনি বুঝতেন তাঁর আশেপাশে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাকে, আর সেই ঘটনাই বারবার উঠে এসেছে তাঁর সিনেমায়, হয়তো অন্য ভাষায় উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একজন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সচেতন মানুষ, তাই তিনি ক্ষুধার জ্বালা বোঝেন কিংবা বোঝেন সম্পর্কের সাথে সমাজও জড়িত। তাঁর চলচ্চিত্র তাঁর নিজের কথায় :

‘‘একটি ফাঁকা গ্লাসে কিছুটা স্বপ্ন, কিছুটা বাস্তব আর কিছুটা ম্যাজিক মিশিয়ে যে শেকটি তৈরি হয় তাই আমার সিনেমা।’’

 

Share this
Leave a Comment