চলমান কৃষক আন্দোলনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রদীপ সিং ঠাকুরের সঙ্গে এক দীর্ঘ আলাপচারীতা


  • June 5, 2021
  • (0 Comments)
  • 440 Views

৫ জুন দিল্লিতে কেন্দ্রের কৃষকবিরোধী কৃষিবিল প্রত্যাহারের দাবিতে ছমাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলনরত কৃষকদের উদ্যোগে কৃষিবিলের এক বছর পূর্ণ হওয়ার বিরোধীতায় পালিত হল সম্পূর্ণ ক্রান্তি দিবস। এই আন্দোলনের বর্তমান অবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল, পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয় বার সরকার গঠন করা তৃণমূল কংগ্রেসের কৃষক আন্দোলনে অবস্থান নিয়ে কৃষক আন্দোলনের দীর্ঘদিনের নেতা প্রদীপ সিং ঠাকুরের সঙ্গে এক দীর্ঘ আলাপচারীতায় সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

 

এই আন্দোলন কোনও নির্দিষ্ট প্রধানমন্ত্রী, সরকারের বিরুদ্ধে নয়। আমাদের আন্দোলন প্রথমত কতগুলো নীতির বিরুদ্ধে গ্লোবালাইজেশনের যে নীতি, নিও-লিবারাল ইকোনমির যে নীতি, কর্পোরেটিকরণের যে নীতি সেটা যেই করুক না কেন আমরা বিরোধীতা করব, বলছিলেন কৃষক আন্দোলনের দীর্ঘদিনের নেতা প্রদীপ সিং ঠাকুর।

 

 

 প্র: দিল্লিতে কৃষক আন্দোলনের ছ’মাস পেরিয়ে গেছে। ৫ জুন কৃষক বিরোধী কৃষি বিলের এক বছর সম্পূর্ণ হল। কেন্দ্র সরকার এই বিল প্রত্যাহার করেনি। অন্যদিকে কৃষকেরাও আন্দোলন থেকে সরে আসেননি। এই অবস্থায় কৃষক আন্দোলনের অভিমুখ, তার পরিকল্পনা নিয়ে একটু বলুন।

 

উঃ কৃষক আন্দোলন একেবারেই থমকে নেই। ৫ জুন পালিত হল সম্পূর্ণ ক্রান্তি দিবস। ১৯৭৪ সালের ৫ জুন জয়প্রকাশ নারায়ণ সম্পূর্ণ ক্রান্তির ডাক দিয়েছিলেন। আর এক বছর আগে নরেন্দ্র মোদি ৫ জুন অর্ডিন্যান্সগুলো নিয়ে এসেছিলেন। তাই এবারের ৫ জুন সারা দেশ জুড়ে এই আইনগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দিবস পালিত হল। গত ছ’মাসে, জানুয়ারি মাসের পর থেকে তো আর সেরকম কোনও আলোচনাও হয়নি। সরকার এক তরফা আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও ওরা বাইরে বলেছে একটা ফোন কলের অপেক্ষায় বসে আছি। এ পক্ষ থেকে বারেবারেই বলা হয়েছে আমরা আলোচনায় রাজি আছি, কিন্তু ওরা কোনও উদ্যোগ দেখায়নি। আর একটা কথা, কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব জানিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা কোনও কমিটিতে যাবেন না। ২৬ জানুয়ারি ওদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটল। ওরা পরিকল্পনা করেছিল, এই ঘটনাটিকে অজুহাত করে আন্দোলনকারীদের তুলে দেবে ও সেই চেষ্টা করেওছিল। ভয়ঙ্কর চেহারা গাজিপুরে নিয়েছিল, গাজিপুরে তো প্রায় তুলে দেয় এমন একটা অবস্থা। সে সময় টিকাইত বললেন, “না, আমি তো এখান থেকে যাব না।” ওরা সমস্ত রকম জলের লাইন, বিদ্যুতের লাইন কেটে দিল। উনি বললেন, “আমি উঠব না এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার গ্রামের লোক জল নিয়ে আসছেন, আমি এই জল খাবও না।” তারপর তো ঘটনা ঘটল, দলে দলে মানুষ সেই রাত্রে বেরিয়ে পড়লেন। সেই যে চেষ্টাটা ওরা করছিল ২৬ তারিখ থেকে, তাতে ওরা ব্যর্থ হল, কিন্তু আন্দোলনের জায়গাগুলোর চারপাশে পেরেক পুঁতে দেওয়ার মতো বিধিনিষেধের নানা ঘটনা ঘটতে থাকল, যাতে চলাচলের, অবস্থানের অসুবিধা সৃষ্টি করা যায় আর সঙ্গে ক্যাম্পেন করতে লাগল যে ২৬ জানুয়ারি কৃষকরাই যাবতীয় সমস্যা সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু সেটার আন্দোলনকারীরা দু’এক দিনের মধ্যেই ভালো জবাব দিলেন। এভাবেই জানুয়ারি মাসটা কাটার পর, কেন্দ্র সরকার ও হরিয়াণা সরকার নানা রকমভাবে চেষ্টা করছে। মাঝে যেমন ওরা একটা আওয়াজ তুলেছিল যে এদের জন্যই দিল্লিতে করোনার এত সংক্রমণ, কাজেই এদের এখান থেকে তুলে দিতে হবে। ‘অপারেশন ক্লিন’ বলে একটা কর্মসূচী ওরা চালু করল, যে আমরা তুলে দেব। তখন সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা ‘অপারেশন শক্তি’ বলে একটা বিকল্প কর্মসূচী উপস্থিত করল যে – “করোনা সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ সজাগ আছি, সতর্ক আছি, প্রস্তুত আছি, কিন্তু আমরা কোনওভাবেই আমাদের দাবি না মেটা পর্যন্ত এখান থেকে উঠব না।” সেটা এমন সময় ছিল যখন কৃষকেরা তাদের ফসল কাটার সময়ে গ্রামে ফিরে গেছিলেন, আন্দোলনের স্থলগুলিতে লোকসংখ্যা একটু কমে গেছিল, লঙ্গরগুলো বন্ধ হয়ে গেছিল। তখনও অনেক মানুষ ছিলেন, কিন্তু এই যে লোকসংখ্যা একটু কমে গেছিল, তার সুযোগ নিয়ে ওরা তুলে দেওয়ার এই চেষ্টাটা করল, তখন আবার সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা ডাক দিল – “তোমরা ফিরে এসো, আবার দিল্লি চলো,” স্বভাবতই দলে দলে লোক ফিরতে শুরু করলেন। সেই পর্বটা দিন সাতেক আগে শেষ হয়েছে। এখন আবার সম্মেলনের জায়গাগুলো লোকে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।

 

প্র: তার মাঝেই বৃষ্টিতে তাঁবু, থাকার জায়গা বিপর্যস্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে গেল …

 

উঃ হ্যাঁ, সে তো হয়েছেই। ওরা যখন বসতে শুরু করলেন, তখন বলেছিলেন যে, “যতদিন পর্যন্ত না আমাদের দাবি মিটছে আমরা উঠব না, আমরা দিল্লিতে বেড়াতে আসিনি, আমরা এখানে ছ’মাসের রেশন নিয়ে উপস্থিত হয়েছি,” তখনও একটা ধারণা মোটামুটি ছিল যে, একটা সরকার কতটা বেদরদী হতে পারে? তাই সে সময়কার ঘরদোর/তাঁবু তৈরি করা হয়েছিল মোটামুটি শীতটা আটকানোর জন্য, ছোট ছোট তাঁবু ছিল। কিন্তু তারপর যখন দেখা গেল, এটা লম্বা সময় চলবে, তখন আবার তাঁবুগুলো গ্রীষ্মের মতো উপযুক্ত করে তৈরি করা শুরু হয়ে গেল, এখন তাঁবুগুলো সেভাবেই তৈরি করা হচ্ছে, যাতে বর্ষা মোকাবিলাও করতে পারে। কারণ এখন সবাই ধরে নিয়েছে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত এরকমই চলবে। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে এরা পরাজিত হবে, নতুন সরকার আসবে ও নতুন সরকার এসে এই তিনটি আইন বাতিল করবে, মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস দেবে, সেই হিসাবে আন্দোলনরত মানুষদের প্রস্তুতিটা ২০২৪ পর্যন্ত।

 

প্র: মানে বর্তমান কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে তিনটি কৃষিবিল বাতিল যে আর করা হবে না, তা আন্দোলনকারীরা মোটামুটি ধরে নিয়েছেন?

 

উঃ হ্যাঁ। এই সরকার এটা প্রত্যাহার করবে না। সরকারের একটা প্রত্যাশা ছিল যে, বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে যদি আমরা জিততে পারি তার উপর দাঁড়িয়ে আন্দোলনরত কৃষকদের দিল্লি থেকে উচ্ছেদ করে দেব। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল তো মূলত ওদের বিরুদ্ধেই গেল। শুধু আসামে ওরা জিতেছে, কিন্তু আসামে গত বারের চাইতে ওদের আসন সংখ্যা, ভোট সংখ্যা কমেছে এবং কংগ্রেসের জোট হেরে গেলেও তাদের ভোট বেড়েছে। বাদ বাকিগুলোতে তো হেরে গেছে। ফলে ওরা যে পরিকল্পনাটা করেছিল যে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের উপর দাঁড়িয়ে কৃষকদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হল। দিল্লিতে কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব যেখানে যেখানে ভোট হয়েছে সেই সব জায়গায় গিয়েছেন, প্রচার করেছেন যে বিজেপি-কে কোনওভাবেই একটাও ভোট দেবেন না। তার ফলাফলও দেখা যাচ্ছে। স্বভাবতই ওরা আরও পিছিয়ে গেল। পিছিয়ে যাওয়ার পরেও ওরা এই সিদ্ধান্ত নিল না যে, এই তিনটি বিল আমরা প্রত্যাহার করে নিলাম। এটা মানুষ বুঝেছে যে সরকারের উপর কর্পোরেটগুলোর নিয়ন্ত্রণ এত প্রবল হয়ে গেছে যে তাকে এরা অস্বীকার করতে পারছে না। তারপর আরও ভয়ানক ঘটনা ঘটল যে, উত্তরপ্রদেশের পঞ্চায়েত ভোটে হেরে গেল। এর আগে পাঞ্জাবে যে পৌরসভা নির্বাচন হয়েছিল, তাতে বিজেপি-র খুব খারাপ পজিশন হয়েছিল। এগুলো দেখাচ্ছে যে আসলে কৃষকদের বিরোধিতা করে যদি তুমি ভাবো যে তুমি দীর্ঘকাল টিঁকে থাকতে পারবে, তাহলে সেটা হবে না। এখন সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার নেতৃত্ব ‘উত্তরপ্রদেশ-উত্তরাখন্ড মিশন’ বলে একটি কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন। তাঁরা উত্তরপ্রদেশের গ্রামে গ্রামে যাবেন ও সেখানে বলবেন – “বিজেপি-কে একটা ভোটও দেবেন না। বিজেপি-কে ভোট দেওয়া মানে শুধু আমাদের সর্বনাশ না। শুধু আমরা ধ্বংস হব তা নয়, আপনারাও ধ্বংস হয়ে যাবেন। এই নীতি যদি কার্যকর হয়, তাহলে এই যে এখন যা চলছে – করোনা হয়েছে, অক্সিজেন নেই, বেড নেই, চিকিৎসা নেই – এটা হচ্ছে কেন? নয়া উদারবাদী অর্থনীতি ও বেসরকারিকরণ নীতি কার্যকর করার জন্য। আজকে করোনা আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে যা হচ্ছে, আগামীকাল তা আপনার সঙ্গে হবে। আপনি আর পিডিএস পাবেন না, আর রেশন পাবেন না, তখন আপনাকেও এক মুঠো খাবারের জন্য দোরে দোরে ঘুরতে হবে। আজকে যেমন একটা অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য মানুষকে ঘুরতে হচ্ছে।”

 

প্র: মানে ওরা বিষয়টাকে কৃষিক্ষেত্র থেকে বের করে আরও বৃহত্তর পরিসর নিয়ে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন?

 

উঃ হ্যাঁ। অর্থাৎ, আপনার ফসল হয় না, আপনার জমি নেই, কিন্তু আপনার সঙ্গে এই আন্দোলনটা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে আছে। আপনি ছাত্র হতে পারেন, আপনি যুবক হতে পারেন, আপনি শ্রমিক হতে পারেন, আপনি মহিলা হতে পারেন, আপনি সাধারণ নাগরিক হতে পারেন, আপনি যেহেতু ভোক্তা, কাজেই আপনার সাথে এটার সম্পর্ক রয়েছে। এটা একটা শুধু কৃষকদের আন্দোলন নয়, এটা জনগনের সমস্ত অংশের স্বার্থবাহী একটা আন্দোলন। কাজেই এখন সরকার যে অবস্থানটা নিয়েছে, বর্তমানে কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব উত্তরোত্তর চাপ তার উপরে বাড়াচ্ছেন। কাজেই ওরা যেটা প্রচার করছিল, এটা কয়েকটা গ্রামের আন্দোলন, মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষের আন্দোলন, কয়েক দিনের আন্দোলন, সেগুলো ইতিমধ্যেই মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়ে গেছে। কাজেই এখন এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসাবে দাঁড়িয়েছে, যত দিন পর্যন্ত এই তিনটে আইন ওরা না বাতিল করবে, বিদ্যুৎ সংশোধনী অর্ডিন্যান্স প্রত্যাহার না করবে, পিডিএস বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে ততদন এই আন্দোলন চলবে। আন্দোলন সতেজে চলছে। কমে যাওয়া, হ্রাস পাওয়ার কোনও কারণ বা সম্ভাবনাই নেই।

 

প্র: পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে জিতে তৃতীয় বারের জন্য সরকার গঠন করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। নির্বাচনের আগে কৃষক আন্দোলনে তারা শুধুমাত্র নৈতিক সমর্থন জানিয়েই দায় মিটিয়েছিলেন। সরকার গড়ার পর এখনও পর্যন্ত এই আন্দোলন নিয়ে তারা কোনও বক্তব্য রাখেননি বা এই রাজ্যেও কৃষিনীতি কি হতে চলেছে সে বিষয়ে কোনও স্পষ্ট চিত্র এখনও নেই। কী বলবেন?

 

উঃ আমি নির্বাচনের আগেও বলেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল দল, তারা কখনও কখনও লোক দেখানো কিছু প্রতিবাদ কর্মসূচী নিয়েছে। আন্দোলনের শুরু থেকেই তারা নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন। কয়েকজন এমপি গেছেন, ফোনেও কথাবার্তা হয়েছিল। কথা হল তৃণমূল তো সরকারে ছিল ও আবার এসেছে। আমরা দেখেছি অ-বিজেপি রাজ্য সরকারগুলি এই আন্দোলনে একটা ভিন্নতর ভূমিকা পালন করছে। এখনও পর্যন্ত কংগ্রেস বা সিপিএম শাষিত রাজ্যগুলিতে রাজ্য সরকার যা করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা করেনি। কিছুদিন আগে বিভিন্ন দল মিলে একটা যৌথ বিবৃতি দিয়েছে তাতে তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা ব্যানার্জীর সই আছে। কিন্তু এগুলো এতই মৌখিক ও এতই প্রতীকি যে এগুলোর আসলে কোনও মূল্য নেই। এক্ষেত্রে তৃণমূল দল বা সরকার ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের প্রতি যে সত্যি সত্যিই আন্তরিক এইটা প্রমাণ করার জন্য প্রথম তাকে যেটা করতে হবে সেটা হল নিজে যেগুলো ২০১৪-২০১৭ সালে করেছে সেগুলোকে প্রত্যাহার করতে হবে। ২০১৪তে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্পোরেটিকরণের একটা আইন তৈরি করে। যুক্তির দিক থেকে এখন কেন্দ্রের কৃষিবিলের বিরোধীতা করলে রাজ্য সরকারকে তার নিজের নীতিরও বিরোধীতা করতে হবে। তাঁকে বলতে হবে – “আমি এখন কেন্দ্রের কৃষি আইনের বিরুদ্ধে রেজোলিউশন নিলাম ও (অটলবিহারী বাজপেয়ীর কথা শুনে) আমি যে আইন এনেছিলাম রাজ্যে তা প্রত্যাহার করে নিলাম।” আমি যখন ওখানে বলছি সিলেক্ট কমিটিতে যাওয়া উচিত ছিল, তাহলে স্বীকার করতে হবে এখানেও সিলেক্ট কমিটিতে না যাওয়া ভুল ছিল। সেগুলোকে অটুট রেখে আমি এই আন্দোলনকে সমর্থন করছি এটা একেবারেই দেউলিয়াপনা, দ্বিচারিতা। এটাই রুলিং ক্লাস পার্টিগুলোর চরিত্র। ওরা বিরোধী দলে থাকলে একটা কথা বলে, সরকারে থাকলে একটা কথা বলে, যদি রাজ্য সরকারে থাকে কেন্দ্র সরকারের বিরোধীতা করে। মানে আমি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো বজায় রাখতে চাই, এর মানে এই নয় যে কেন্দ্র সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের বিরোধীতা করলেই হয়ে যাবে। তোমাকে তো নিজের দিকটা, তুমি কি করছ সেটাও দেখতে হবে, না?

মমতা বন্দোপাধ্যায় ডবল ইঞ্জিন সরকারের বিরোধীতা করবেন, আমরাও করব। কিন্তু উনি যখন জেলায় জেলায় একই ধরনের পঞ্চায়েত চান, একই ধরনের জেলা পরিষদ চান, একই ধরনের পৌরসভা চান তখন তো একই ডবল ইঞ্জিনের থিওরি ফিরে আসে। বাস্তব আন্দোলনে তৃণমূল কংগ্রেসের কী ভূমিকা আছে? কারণ এই যে তিনটি আইনের বিরুদ্ধে যে লড়াইটা হচ্ছে সেই লড়াইটার যে মূল দাবি সেই মূল দাবির বিরুদ্ধে তো রয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। উনি তো এই আইন তৈরি করেছেন। ফলে সে সময়েও যে সমালোচনাটা আমাদের ছিল রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সম্পর্কে এই কৃষক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে, ছ’মাস পরেও আমরা সেই সমালোচনার জায়গাতেই আছি। আমাদের কৃষকেরা যে কষ্ট পাচ্ছেন…এখানে তো পিডিএস-এর কোনও মা-বাপই নেই, এখানে কৃষকেরা তো ফসলের দামই পাচ্ছেন না, কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা তো পশ্চিমবঙ্গে ঘটেই চলেছে এবং সেগুলো রিপোর্ট হওয়ার সুযোগও নেই। আর যাই হোক না কেন কৃষকদের বিষয়ে রাজ্যের তৃণমূল সরকারের মনোভাবটা বৈরি মনোভাবই। আমরা বলেছিলাম সরকার যাতে দুয়ারে দুয়ারে প্রকল্পে, কৃষকদের দুয়ারে গিয়ে ন্যায্য দাম দিয়ে (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস দিয়ে) ফসল কেনে। দুয়ারে দুয়ারে কর্মসূচীতে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। আপনি তো সেটা করছেন না।

দিল্লিতে আন্দোলন ভরপুর চলছে, নতুন নতুন শক্তি অর্জন করছে ও চলবেও। এটা অবশ্য রাজ্য সরকারগুলির অসুবিধা যে রাজ্যে সরকারে থেকে কীভাবে এর বিরোধীতা করব, এই যে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি তার ক্ষেত্রে অবস্থান কী হবে – এই সমস্যা অন্য রাজ্য সরকারগুলির আছে, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আরও বড়ভাবে রয়েছে, কৃষক আম্দোলনে নৈতিক সমর্থন করছেন, এদিকে রাজ্যে রিলায়েন্সকে দিয়ে শিল্পায়ন করতে চাইছেন, প্রচুর পরিমাণ জঙ্গলের জমি ইতিমধ্যেই রিলায়েন্সকে দিয়ে দিয়েছেন।

 

প্র: একটু পিছিয়ে গেলে দেখা যাবে এ দেশের বিচারব্যবস্থা, যা গত কয়েক বছরে দেশের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রশক্তির সহায়ক হয়ে কাজ করছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে, সেই বিচারব্যবস্থাও এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে সুর নরম করতে বাধ্য হয়েছিল। আপনার কী মনে হয় কৃষক আন্দোলনের যে ব্যাপকতাই তা সুপ্রীম কোর্টকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল?

 

উঃ নিঃসন্দেহে। সুপ্রীম কোর্টের উপর সরকারের যে চাপ, যে প্রভাব, যে নিয়ন্ত্রণ আছে সেটা তো ভারতবর্ষের বর্তমান সময়ের একটা বৈশিষ্ট্য। যতগুলো অটোনমাস বডি ছিল, স্বাধীনতা ভোগ করত, সবগুলোকেই ওরা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে এসেছে এবং তার নানা ছাপ, ফলাফল আমরা বিভিন্ন রায়ের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি – যেমন বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির রায়। আবার এখনও পর্যন্ত এমন নয় যে মোদি যা বলবেন, সুপ্রীম কোর্ট সেটাই করবে। তাই সুপ্রীম কোর্টের এক্ষেত্রে যে পর্যবেক্ষণ তা মোদীর পক্ষে অস্বস্তিকর। যদিও এমনটাও অনেকের মত যে সুপ্রীম কোর্ট আসলে সরকারের মুখ রক্ষা করতে চেয়েছিল। অর্থাৎ, সরকার যেন বলতে চেয়েছিল আমাদের পক্ষে এটা প্রত্যাহার করা সম্ভব নয় তাই তুমি ইন্টারভেন করো। তাই এটা দু’জনের মধ্যে পরিকল্পিত কমিউনিকেশন-এর ফসলও হতে পারে। কিন্তু তাও আমরা তখন বলেছি যাই হোক না কেন এই পর্যবেক্ষণ কৃষক আন্দোলনের পক্ষে ও কেন্দ্র সরকারের বিপক্ষে যাচ্ছে।

 

প্র: প্রথম থেকে এখনও পর্যন্ত আন্দোলনরত কৃষকেরা এই বিষয়ে স্থিরপ্রতিজ্ঞ যে কৃষিবিল প্রত্যাহার না হলে তাঁরা আন্দোলন থেকে উঠবেন না ও তারপরেও কৃষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন চলবে। এর ভবিষ্যত আপনি কী দেখতে পাচ্ছেন?

 

উঃ এই আন্দোলনের কতগুলো সুদূরপ্রসারী ফলাফল ইতিমধ্যেই ঘটেছে। আন্দোলনটা যদি জিতে যায়, তার আশু ফল হিসাবে আমরা যেগুলো দেখতে পাব –

(১) সরকারের তরফ থেকে কর্পোরেটিকরণের যে উদ্যোগটা চলত সেটা প্রতিহত হবে। ভারতবর্ষের রুলিং ক্লাস এক্ষেত্রে স্পষ্টতই বিভাজিত। চিদাম্বরম এমন কথা বলেছিলেন, “আপনারা ৫০০ জনের কথা না ভেবে ৫ জনের কথা কেন ভাবছেন? আপনারা ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টদের কথা ভাবছেন কেন?” মানে ক্রোনি ও ট্যাডিশনাল ক্যাপিটালিস্টদের মধ্যে একটা কন্ট্রাডিকশন উঠছে এবং চিদাম্বরম-রা ট্র্যাডিশনাল ক্যাপিটালিস্টদের পক্ষে বলছেন। এরা ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টদের পক্ষে বলছে। ফলে সরকার যদি পরাজিত হয়, তাহলে এই যে তাদের মানসিকতা শুধু ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টদের দেখবে আর কাউকে দেখব না – এই সংঘাতটা আমার ধারণা একটা নতুন মাত্রা পাবে।

 

(২) হরিয়াণায় পিতৃতান্ত্রিকতা, খাপ পঞ্চায়েত, মহিলাদের নিয়ন্ত্রণের যে বিষয়গুলি ছিল সেক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। অর্থাৎ আন্দোলনটা পিতৃতান্ত্রিকতা, সামন্ততান্ত্রিকতার বেড়াজালগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।

 

(৩) অন্যদিকে, পাঞ্জাবে জমির মালিকানাটা কেমন? যারা জাঠ, মোট জনসংখ্যাতে যারা সামান্যই হয়তো ৫.২%, জমির মালিকানা তাদের অর্ধেকেরও বেশি, প্রায় ৫২%। যারা দলিত, যারা কৃষিশ্রমিক, মোট জনসংখ্যার যারা ৩২%, কিন্তু তাদের মালিকানা আছে ২.৩%। পাঞ্জাবে জাঠ ও কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে প্রবল শ্রেণীদ্বন্দ্ব রয়েছে। বহু বছর ধরে তাদের মধ্যে সেখানে যে লড়াই হয়েছে তার একটা মূল বিষয় সেখানে অনেকগুলো কমিউনাল ল্যান্ড আছে, যাদের বলে পঞ্চায়েতী জমি, যার এক তৃতীয়াংশ দলিতদের প্রাপ্য অথচ সেখান থেকে জাঠরা বঞ্চিত করে রেখে দিয়েছে। কিছুকাল আগেও তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক-আন্দোলন-মারপিট হয়েছে। তারপরেও এই কৃষক আন্দোলনের সময় দেখেছি পাঞ্জাব ক্ষেত মজুর ইউনিয়ন নামে সংগঠনটি তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্দোলনের পাশে রয়েছে। অর্থাৎ সোশ্যাল ও ক্লাস কন্ট্রাডিকশন যেগুলি আছে সেগুলো এখন ওভারঅল ন্যাশনাল কন্ট্রাডিকশনের কারণে পেছনে চলে যাচ্ছে। এটা একটা বড় পরিবর্তন। কারণ আগে এই লড়াইটা লড়ে এটাকে আটকাতে হবে, তাহলে এই যে ড্রাইভটা চলছে কর্পোরেটিকরণের তাকে প্রতিহত করা যাবে। কর্পোরেটিকরণের মানেই কমার্শিয়ালাইজেশন, মেকানিইজেশন, তাতে কৃষিশ্রমিকদের কাজের জায়গা কমে যাবে।

 

(৪) অনেকেই বলছেন এটা আসলে ধনী কৃষকদের আন্দোলন। এটা বলে কেউ কেউ এর দৃঢ় বিরোধীতা করছেন। এখানে যেমন নরেন্দ্র মোদী-আরএসএস-এর একটা আক্রমণ আছে, তেমনি আমাদের মহলেও এর বিরুদ্ধে একটা কাউন্টার ক্যাম্পেইন চলছে। তারা বলছে, ফসলের দাম বেড়ে গেলে তো গরীব মানুষের অসুবিধা হবে, কাজেই আন্দোলনটায় আমরা যাব কেন? আমরা যেমন বলছি এমএসপি দাও, তেমনি বলছি পিডিএস-কে শক্তিশালী করো। বিনা পয়সায় পিডিএস-এ খাবার দাও। তাতে ফসলের দাম বেড়ে গেলে ভোক্তাদের কোনও অসুবিধা হবে না। এরকম বহু ক্যাম্পেইন আছে। সবচেয়ে বড় কথা এই আন্দোলনটা পোলারাইজেশনের যে উদ্যোগগুলো, বিভক্ত করার যে উদ্যোগগুলো, সেগুলোকে যেভাবে প্রতিহত করেছে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর তাতে কৃষকেরা সফল হলে সেটা বৃহত্তরভাবে নরেন্দ্র মোদীদের অ্যাজেন্ডার বিরুদ্ধে যাবে। এটা একটা মডেল হচ্ছে। মন্দাসোরে যখন কৃষককে গুলি করে মারল, তার ভিত্তিতে ২৫০টা সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে তৈরি হল অল ইন্ডিয়া কিষাণ সমন্বয় সমিতি, যারা লাগাতার এটা নিয়ে আন্দোলন কর‍ছে। এর বাইরেও বহু সংগঠন ছিল যারা এটা নিয়ে মুভমেন্ট করছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী এই সর্ববৃহৎ কৃষক আন্দোলনের স্বার্থে ৫০০টা সংগঠনকে নিয়ে একটা সংগ্রামী কৃষক মোর্চা তৈরি হল। এই ৫০০টা সংগঠনের মধ্যে বহু তফাৎ, মতানৈক্য আছে, প্রোগ্রাম-অ্যাটিটিউড-দৃষ্টিভঙ্গিতে-গুরুত্ব দেওয়ার প্রশ্নে। একটা বিষয়ে সকলে একমত যে, নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ভুলে কিছু পয়েন্টে আমরা জোটবদ্ধ হয়ে যেতে পারার বিষয়টা শুধু কৃষক নয়, শ্রমিক-ছাত্র-যুব-নারী সকলের ক্ষেত্রেই সম্ভব এবং সেটা পারলে শেষ বিশ্লেষণে তা মোদীকে গিয়ে আক্রমণ করবে। এই পরিবর্তনটা মোদীদের বিরুদ্ধে, হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করবে।

 

প্র: আপনি যে বৈষম্যগুলো দূরে সরে যাওয়ার কথা বলছেন এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে, ধরুন আইনগুলি কোনও সময়ে প্রত্যাহার হল, আন্দোলনও উঠে গেল – সেক্ষেত্রে কোনও দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন কি এই আন্দোলন সমাজে ঘটিয়ে দিয়ে যাবে?

 

উঃ আমি এ প্রসঙ্গে একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাইব। ধরুন – ভাঙড় আন্দোলনে আমরা যখন যাই, ২০১৬-এর ৬ নভেম্বর। তার আগে খবর পেয়েছিলাম ওখানে একটা মুভমেন্ট চলছে ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আমরা গিয়ে দেখলাম আরাবুল বাহিনীর দাপট চলছে। ৬ জন গ্রামবাসী গ্রেপ্তার হয়েছেন, তিন জন পুরুষ, তিন জন মহিলা, আমরা গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম। তারা আমাদের চিনতেন না, জানতেন না, কিন্তু আমাদের কথা শুনে কোনওভাবে আশ্বস্ত হয়েছিল। আমাদের তারা অনুরোধ করেছিলেন পুলিশের কাছে যেতে। আমরা গেলাম। পুলিশের যে অত্যাচারটা ছিল – দিনেরাতে আসছিল, যাকে-তাকে ধরছিল, সেটা বন্ধ হয়ে গেল। যে সংগঠন আন্দোলন করল – জমি-জীবিকা-পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র রক্ষা কমিটি – তা গঠনের সময় আমরা বলেছিলাম, যেহেতু রাষ্ট্রশক্তি নারী-পুরুষ উভয়কে সমানভাবে আক্রমণ করেছে, কাজেই এই আন্দোলনে নারী-পুরুষকে সমান সংখ্যায় আসতে হবে। ফলে আমরা যে ৬১ জনের কমিটি গঠন করেছিলাম, তাতে ৩২ জন পুরুষ, ২৯ জন মহিলা ছিলেন। এই এলাকা একটা-দুটো গ্রাম বাদে সংখ্যালঘু অধ্যূষিত এলাকা। সেখানে আমাদের লাগাতার প্রচারের ফলে সংখ্যালঘু পরিবারের মহিলারা এগিয়ে এসেছেন। এই আন্দোলন করতে করতে তাঁরা যে স্বাধীনতা, অধিকার ভোগ করতে শুরু করলেন, তা এখনও সমানভাবে বজায় রয়েছে। সেটা পুরনো জায়গায় ফিরে যায়নি। তার একটা বড় কারণ আমরা সেখানে শক্তিশালীভাবে রয়েছি। যদি না থাকতাম তাহলে আবার পুরনো অবস্থাতেই ফিরে যেতে পারত, কারণ তৃণমূল স্তরে বাস্তব ছবিটা বদলায়নি। খাপ পঞ্চায়েত আছে, জমির উপর কিছু লোকের মালিকানা আছে, কিছু লোকের ভূমিহীন অবস্থা আছে। ফলে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার মতো সমস্ত উপাদানগুলো রয়েছে। এই কৃষক আন্দোলনও দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন সমাজে আনতে পারছে কি না তা আন্দোলন যাঁরা করছেন অনেকটাই তাঁদের উপরে নির্ভর করছে। এই যে ক্ষেত মজুরদের আন্দোলনে শামিল করা, মহিলাদের শামিল করা এই কাজটা করছে কতগুলো বাম সংগঠন, কতগুলো প্রগতিশীল সংগঠন। এরা যদি নিজের কাজটা এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে, তাহলে কিন্তু অবস্থা আগের জায়গায় ফিরবে না, সেটা মুশকিল। আমরা যাকে ডায়লেক্টিক্স বলি সেই অনুযায়ী তা সম্ভব নয়। একটা নেতিকরণ হবেই, সেটা কত পরিমাণে হবে, গুণগত হবে না পরিমাণগত হবে সেটা অন্য প্রশ্ন, কিন্তু আগের জায়গায় ফিরে যাবে না। যে নারীরা একবার স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছেন, তাঁরা আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবেন এটা হতে পারে না।

 

Share this
Leave a Comment