সেন্ট্রাল ভিস্টা: মুঙ্গেরিলাল কি হাসিন স্বপ্নেঁ অথবা নিরোর গল্পগাথা


  • June 4, 2021
  • (2 Comments)
  • 797 Views

একদিকে করোনা ও লকডাউনের প্রকোপে দেশ জুড়ে হাহাকার, অর্থাভাবে ও বেকারত্বে মানুষ জর্জরিত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকার খরচ করছে টিপে টিপে – প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে নির্লজ্জ ভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রজেক্টের কাজ, গড়ে উঠছে প্রধানমন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতির জন্য নতুন বিলাসবহুল বাসভবন, গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ন্যাশনাল মিউজিয়াম সহ একাধিক ঐতিহাসিক ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভবন। এই নির্মাণ যেন হিটলারের স্বপ্নের ‘ভকসাল’ স্থাপত্যের মতো বিজেপি-আরএসএস-এর বিজয়ের প্রতীক, যাকে স্থাপত্য জাতীয়তাবাদ নাম দেওয়া হয়েছে। আবার একই সাথে এই প্রজেক্টে কাজ করা শ্রমিকরা ঠিক ভাবে মাইনে পাচ্ছেন না, একাধিক শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। বিজেপি সরকারের এই অমানবিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিটি গণতান্ত্রিক মানুষকে আওয়াজ ওঠাতে ডাক দিলেন সুমন কল্যাণ মৌলিক

 

কিছুদিন আগেও এদেশের রাজধানী ছিল অক্সিজেন, ওষুধ, ভ্যাকসিন, ভেন্টিলেটরের অভাবে মৃতপ্রায়। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে, মৃত মানুষদের শেষকৃত্য করার মত জায়গাও ছিল অপ্রতুল। আর এই বিপন্নতার আরেক পাশে চলছিল, এবং এখনো চলছে, ২০২২ সালে দেশের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তির জন্য সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পের রূপায়ণ। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর সৌন্দর্যায়নের জন্য প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২০,০০০ কোটি টাকা, যা বেড়ে ৩০,০০০ কোটি টাকা হবে বলে ওয়াকিবহাল মহলের আশঙ্কা। রোম যখন পুড়ছিল, তখন সম্রাট নিরোর বীণাবাদনের আখ্যানটি ইতিহাসে বহু পঠিত কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে এক গণতান্ত্রিক সমাজে নতুন নিরো নির্লজ্জতার যে আখ্যান তৈরি করছেন, তাও নিশ্চিতভাবে ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত হবে। বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংগঠন, বিরোধী রাজনৈতিক দল সমূহ, ট্রেড ইউনিয়ন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের প্রতিবাদ ও সমালোচনা সত্বেও অতিমারীর বিপন্নতার দিনগুলোতে সরকার এই প্রকল্পের কাজ স্থগিত করেনি, বাতিল তো দূরের কথা। নয়া উদারবাদী অর্থনীতি ও উগ্র জাতীয়তাবাদের এই আগ্রাসী সময়ে বিচারব্যবস্থার কাছে সুরাহা পাওয়ার আশা দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে, সেন্ট্রাল ভিস্টা সংক্রান্ত আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।

 

একটি নৈতিক প্রশ্ন

সরকারি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও রূপায়ণের প্রশ্নে তার নৈতিকতা, সময়জ্ঞান ও প্রয়োজনীয়তার বিচার খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রকল্পের পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত হয় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যখন কোভিড অতিমারীর প্রথম ঢেউ ও অপরিকল্পিত লকডাউনের কারণে শিরদাঁড়া ভেঙে যাওয়া ভারতীয় অর্থনীতি কোনোক্রমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। প্রকল্পের শিলান্যাস হল ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে, যখন অতিমারীর দ্বিতীয় ঢেউ দেশের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। শুধু দিল্লী নয়, সারা দেশ এখন কোভিড অতিমারীর আঘাতে বিপর্যস্ত। ল্যান্সেট, নেচার প্রভৃতি জার্নাল ও ভারত সরকারের করোনা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কমিটির প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে সরকার এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের সম্ভাবনা সম্বন্ধে আগে থেকেই অবহিত ছিল। ১৪ মাস সময় পাওয়া সত্বেও সরকার স্বাস্থ্য কাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে নিদারুণ শৈথিল্য দেখিয়েছে, তা নাগরিকদের প্রতি প্রতারণা। দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে ইতিমধ্যে ১ লক্ষ লোক মারা গেছেন। বহু অসুস্থ লোক মারা গেছেন অক্সিজেনের অভাবে। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে সংসদের স্বাস্থ্য বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটি নিদারুণ অক্সিজেন সংকটের সম্ভাবনা সম্পর্কে সরকারকে আগাম সতর্ক করেছিল। কিন্তু সরকার একটাও নতুন অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসায় নি। ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল সরকার ৫৫১টি অক্সিজেন প্ল্যান্টের বরাত দিয়েছে। দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠার পর ১ মে ২০২১-এ ৬১,০০০ ভেন্টিলেটরের বরাত দেওয়া হয়েছে। টিকাকরণের ক্ষেত্রে বাজেটে ৩৫,০০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। বাস্তবে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থা সিরাম ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়া ও ভারত বায়োটেককে মাত্র ৪,৫০০ টাকা বরাদ্দ করে। তাই কেরল হাইকোর্টে প্রদত্ত তথ্য থেকে আমরা জানতে পারি যে ভারতে যত ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে তার মাত্র ৫৫% আমরা পাচ্ছি। সরকারের এই চূড়ান্ত অদক্ষতার প্রমাণ টিকাকরণের ১০০ দিন পর মাত্র ২% মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। সরকার বলছে দুবছরের মধ্যে সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্প শেষ করবে, অথচ এক বছরের মধ্যে ৫টা নতুন হাসপাতাল তৈরি করা গেল না। একদিকে সরকারি পরিকাঠামোর অভাব অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে পর্বত প্রমাণ খরচ – বহু মানুষ কোন চিকিৎসা না পেয়েই মরে গেল। এই অবস্থায় ২০,০০০ কোটি টাকার সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প দেশের মানুষের প্রতি চরম নৃশংসতার উদাহরণ।

 

প্রকল্পের ইতিবৃত্ত

১৯১১ সালে কলকাতা থেকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরিত হওয়ার পরে স্থপতি লুটিয়েন্স ও বেকারের পরিকল্পনায় নয়া দিল্লি শহরটি তৈরি হতে থাকে। সেই পর্বে রাজধানীর প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থলটি সেন্ট্রাল ভিস্টা নামে পরিচিত। ভৌগোলিক ভাবে বলতে গেলে এই অঞ্চলটি হল রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ইন্ডিয়া গেট পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এলাকা। এর মধ্যে আছে নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লক, পার্লামেন্ট, রাজপথের৷ পাশে কেন্দ্রীয় সরকারের সেক্রেটারিয়েট সহ অজস্র ভবন, মিউজিয়াম, ন্যাশানাল আর্কাইভ ইত্যাদি। মোদি সরকারের পরিকল্পনার সম্পূর্ণ নকশা এখনো প্রকাশিত হয়নি, তবে যে খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাতে জানা যাচ্ছে, রেড ক্রস ও রাইসিনা রোডের ক্রসিং-এ নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরি হবে। পার্লামেন্ট ভবন তৈরির খরচ ৯৭১ কোটি টাকা ও তা নির্মাণ করবে টাটা প্রজেক্টস লিমিটেড। গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে শাস্ত্রী ভবন, রেল ভবন, ন্যাশনাল মিউজিয়াম, বিদেশ মন্ত্রকের ভবন, উপরাষ্ট্রপতির বাসভবন ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতির জন্য নতুন বিলাসবহুল বাসভবন নির্মান করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও পার্লামেন্টের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ভূগর্ভস্থ টানেল তৈরি হবে। সমস্ত এলাকাটি হবে নিউক্লিয়ার অ্যাটাকরোধী। ন্যাশানাল আর্কাইভ অক্ষুণ্ণ থাকবে। নর্থ ব্লক ও সাউথ ব্লকে মিউজিয়াম হবে। ২,৫০০,০০০ বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে নতুন ভাবে কংক্রিটের কাজ হবে।

 

সরকারের যুক্তিমালা

সেন্ট্রাল ভিস্টার বিরুদ্ধে যে সমস্ত জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছিল, তার শুনানির সময় ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হরদীপ পুরির বিভিন্ন সাংবাদিক সম্মেলনে ও সংসদ ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গৃহীত ভাষণে যে সমস্ত বক্তব্য উঠে এসেছে, তার থেকে প্রকল্পের প্রশ্নে সরকারের দাবিসমূহের একটি ধারণা আমরা পেতে পারি – (১) পার্লামেন্ট ও অন্যান্য ভবনগুলো পুরনো জরাজীর্ণ  হয়ে পড়েছে এবং এগুলো ভূমিকম্প প্রবণ; (২) সংসদ ভবনে সমস্ত সংসদদের স্থান সংকুলান এখনই হচ্ছে না, পরে স্থানের সমস্যা বাড়বে; (৩) স্বাধীনতার পর এখনো আমাদের সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট নেই। অফিসগুলো ছড়ানো ছিটানো বলে তাদের দক্ষতা কম এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে; (৪) আমরা যদি কেন্দ্রীয় ভাবে অফিস তৈরী করতে পারি, তবে তা হয়ে উঠবে একবিংশ শতকের শক্তিশালী ভারতের দক্ষ প্রশাসন, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধ এবং সাম্যের আদর্শের মূর্ত প্রতীক; (৫) সেন্ট্রাল ভিস্টার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ – “The old( parliament) building gave directions to India after independence, the new building will be a testament to a self reliant India.

 

বিরুদ্ধতার কথা

এই মুহূর্তে কোভিড অতিমারীর এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় অনেকে সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পকে আপাতত স্থগিত করার দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু আমার মতে স্থগিত নয়, প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করা উচিত। আলোচনার সুবিধার্থে বিরুদ্ধতার কারণগুলি পয়েন্ট আকারে উপস্থিত করছি –

 

প্রথমত এই পার্লামেন্ট ভবনটি  চালু হয় ১৯২৭ সালে, অর্থাৎ এটা একশো বছরের পুরনো নয়। তথ্যের খাতিরে এটা জানিয়ে রাখা প্রয়োজন যে ফরাসি পার্লামেন্ট ভবন ১৭২২, ইতালি ১৮৭১, ও জার্মান সংসদ ১৮৯৪ সালে চালু হয়। এগুলো এখনো বহাল তবিয়তে আছে, কালের নিয়মে যথাযথ সংস্কার করা হয়েছে, কিন্তু কোনোটাই ভেঙে দেবার প্রয়োজন পড়ে নি।

 

দ্বিতীয়ত এই অঞ্চল ভূমিকম্প প্রবণ – সরকার এমন কোন বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা এখনো পর্যন্ত করেনি। তাছাড়া যদি এলাকা ভূমিকম্প প্রবণ হয় তবে নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লককে অক্ষত রেখে মিউজিয়াম, ন্যাশনাল আর্কাইভকে না ভাঙার সিদ্ধান্ত কোন যুক্তিক্রমকে অনুসরণ করে নেওয়া হচ্ছে? তাহলে কি এটা ধরে নিতে হবে যে আগামীদিনে এই পুরানো বিল্ডিংগুলিতে যে মানুষেরা কাজ করবেন, সরকারের কাছে তাদের জীবনের কোন দাম নেই!

 

তৃতীয়ত সংসদ ভবনে স্থান সংকুলান না হওয়ার দাবি অসঙ্গত। এই মুহূর্তে সাংসদ পিছু যে স্থান রয়েছে তা ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের তুলনায় দেড়গুণ বেশি। যদি আগামীদিনের কথাও ভাবা হয়, তাহলেও হিসাবটা খুব গোলমেলে। লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে এই মুহূর্তে মোট আসন সংখ্যা ৭৯০(৫৪৫+২৪৫)। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬ সাল পর্যন্ত কোনো ডিলিমিটেশন হবে না। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ও আসনসংখ্যা একই থাকবে কারণ নতুন জনগণনা অনুযায়ী ডিলিমিটশন হয়। সেই জনগণনা হবে ২০৩১ সালে। তাহলে সাংসদদের আসন সংখ্যার নব বিন্যাস হবে ২০৩৪ সালে। তাই নতুন সাংসদরা বসার জায়গা পাবেন না বলে যে চিৎকার করা হচ্ছে, তা বাস্তবতার বিপরীত। আর আগামী দিনে স্থান সংকুলানের জন্য বিকল্পের কথা ভাবা যেতেই পারে। আমরা ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে দেখেছি, তাদের সুপ্রাচীন পার্লামেন্ট ভবনকে নবীকরণ করে সেখানে হাউস অব কমন্সের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সেখান থেকে দূরে ইয়র্কে হাউস অব লর্ডসের জন্য আলাদা ভবন তৈরি করা হয়েছে।

 

চতুর্থত প্রশাসনিক ভবনগুলি ছড়িয়ে  ছিটিয়ে থাকার কারণে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধিত হচ্ছে না, এর থেকে হাস্যকর যুক্তি আর কিছু হতে পারে না।একবিংশ শতকে প্রশাসনিক কাজকর্ম সবটাই বাহিত ডিজিটাল প্রযুক্তিতে হয়। তাই অফিসগুলির মধ্যেকার দূরত্ব কোনো সমস্যা হতে পারে না। মোদ্দা কথাটা হল, রেল মন্ত্রক নতুন অফিসে গেলে ট্রেন সময় মেনে নিরাপদে চলবে বা নতুন কৃষি মন্ত্রক হলে রাজধানীর রাজপথে ভুখা কৃষককে অবস্থানে বসতে হবে না, এটা এক নির্বোধ ধারণা। মনে রাখতে হবে গতিশীল, দায়বদ্ধ, স্বচ্ছ প্রশাসন নতুন বিল্ডিং-এর উপর নির্ভর করে না, বিষয়টা প্রশাসকদের দায়বদ্ধতা, সংবেদনশীলতা ও দক্ষতার উপর নির্ভরশীল।

 

পঞ্চমত সরকারের যেকোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে হেরিটেজ, পরিবেশ, পরিচালনা, ট্রাফিক ও পরিবহন সংক্রান্ত প্রশ্নে সমীক্ষা ও গণশুনানি হয়নি।

 

ষষ্ঠত দিল্লি মাস্টার প্ল্যানে বলা হয়েছিল শহরের দূষণ মুক্তি ও গণ পরিবহন ব্যবস্থার উপর চাপ কমানোর জন্য সরকারি অফিসগুলির বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। সেন্ট্রাল ভিস্টার ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো হচ্ছে। দিল্লির মত শহরে এই চার কিলোমিটার এলাকা নগরবাসীদের একটু খোলা শ্বাস নেওয়ার জায়গা। এখানে মানুষ আসেন সপরিবারে, মনোরঞ্জন করেন। কিন্তু প্রকল্পটির নকশা থেকে পরিষ্কার যে, এটাকে এমন এক দুর্গে রূপান্তরিত করা হবে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ। তাই এই প্রকল্প পরিবেশের উপরেও অত্যাচার।

 

সপ্তমত সরকারের টাকা কারো পৈতৃক টাকা নয়, আম আদমির টাকা। তাই যখন কোন পরিকল্পনা তৈরি হয় তখন তার ফিনান্স অডিট জরুরি, ইচ্ছেমত টাকা খরচের অধিকার সংবিধান কাউকে দেয়নি। এর আগে বহু অর্থব্যয়ে ২০০২ সালে ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্টস ও ২০১০ সালে বিদেশ মন্ত্রকের নতুন অফিস তৈরি হল। কদিন আগে লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করে প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান বাসভবন (৭, লোককল্যাণ মার্গ) নবীকরণ হল। আবার এখন বলা হচ্ছে এই সমস্ত বিল্ডিং ভেঙে ফেলা হবে। এই ক্ষতি কে পূরণ করবে?

 

অষ্টমত রাফাল যুদ্ধ বিমান ক্রয়ের মত পিএম কেয়ার্স ফান্ড-এর ক্ষেত্রেও বহু অস্বচ্ছতা রয়েছে, যার উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। আমেদাবাদের ফার্ম এইচসিপি ডিজাইন, প্ল্যানিং ও ডিজাইন প্রকল্পের নকশা তৈরির বরাত পেয়েছে একটা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে নয়। প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো পুরো নকশাটি মানুষের কাছে উপস্থিত করা হয়নি। বলা হচ্ছে চূড়ান্ত নকশা হবে না, কারণ প্রকল্পটি নিয়ত পরিবর্তনশীল (plan-as-you-go-roadmap)। সমগ্র পরিকল্পনাটির পরিবেশগত ছাড়পত্র চাওয়া হয়নি, আলাদা আলাদা অংশের জন্য আলাদা অনুমতি চাওয়া হচ্ছে যা সন্দেহজনক।এক কথায় এই প্রকল্পের কোন স্বচ্ছ রূপরেখা নাগরিকদের কাছে নেই।

 

সেন্ট্রাল ভিস্টা – মতাদর্শের সন্ধান

সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পকে অনেকে নরেন্দ্র মোদির মেগালোম্যানিয়াক মনোভাবের এক প্রতিফলন বলে নিশ্চিন্ত থাকতে চাইছেন, কিন্তু বিষয়টি এতো সহজ নয়। এটা অনস্বীকার্য যে ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী শাসকদের একটা ইচ্ছে থাকে, রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের বাইরে বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে একটা চিরস্থায়ী দাগ রেখে যাবার। আধুনিক যুগে জার্মানির বার্লিন শহরে হিটলার তাঁর প্রিয় স্থপতি অ্যালবার্ট স্পিয়ারকে দিয়ে এক অনন্য স্থাপত্য ‘ভকসাল’ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যা সারা পৃথিবীর কাছে হিটলার ও নাৎসিবাদের অমরত্বের প্রতীক হিসাবে থেকে যাবে। সেন্ট্রাল ভিস্টার মধ্যে মোদির অমরত্বের বাসনা নিশ্চিত ভাবে আছে, কিন্তু তার থেকেও বেশি আছে হিন্দুত্ব ও নয়া উদারবাদের মিশেলে তৈরি এক সাংস্কৃতিক মতাদর্শ। দিল্লির তখতে বসার আগে নরেন্দ্র মোদির শাসনের সবচেয়ে বড়ো প্রতীক গুজরাট মডেল। এই মডেলের পরতে পরতে রয়েছে নয়নাভিরাম বিল্ডিং ও সৌন্দর্যপ্রকল্প, যা এক শক্তিমান আধুনিক শাসকের অভিজ্ঞান। সবরমতী নদীর ধারে ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স টেক সিটি, সুরাটে পৃথিবীর বৃহত্তর হীরা নিলাম কেন্দ্র, স্টেডিয়াম – সবটাই এক গ্র্যান্ড শো, যা নাগরিককে প্রতিমুহূর্তে শাসকের কাছে নতজানু করবে। এই উন্নয়ন মডেল নয়া উদারবাদের বিজয়গাথা। এটা শুধু মোদির ক্ষেত্রে সত্যি নয়।কুয়ালালামপুরের পেট্রোনাস টাওয়ার, দুবাই-এর বুর্জখলিফা, ব্রিটেনের লন্ডন আই আজ সমাজবিজ্ঞানে ‘state sponsored architectural nationalism’ (রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থাপত্য জাতীয়তাবাদ) হিসাবে চর্চিত। অন্যদিকে সেন্ট্রাল ভিস্টা মোদির আদর্শগত ভিত্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কাছেও আদর্শ স্বরূপ। তাদের প্রকল্পিত হিন্দু রাষ্ট্রের রাজধানী হিসাবে আজকের দিল্লি তাদের কাছে কাঙ্খিত নয়। হেরিটেজ শহর দিল্লি মানে মুঘল বাদশাহদের কীর্তিগাথা, নয়া দিল্লি ব্রিটিশদের তৈরি সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি। তাই তারা এক নতুন রাজধানী তৈরি করতে চায় যেটা আধুনিক হিন্দু সংস্কৃতির জয়কেতন ওড়াবে। এই প্রকল্পের নকশাকার বিমল প্যাটেল (নরেন্দ্র মোদির প্রায় সব প্রকল্পের সঙ্গে এই মানুষটি জড়িত) ইতিমধ্যেই এক সেমিনারে বলে ফেলেছেন যে, হিন্দু পুরাণে বর্নিত ‘শ্রীযন্ত্র’ অনুসারে সেন্ট্রাল ভিস্টার নকশা তৈরি হয়েছে। পার্লামেন্ট ভবন ত্রিকোণাকৃতি হওয়ার কারণ ত্রিমূর্তি ব্রহ্মা,বিষ্ণু ও মহেশ্বরের প্রতিনিধিত্ব। এই প্রকল্পের সঙ্গে স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর উদযাপনের প্রশ্নটি জুড়ে দেওয়া এক কৌশলী পদক্ষেপ। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের যেহেতু কোন উপস্থিতি নেই, তাই তারা মোদির নেতৃত্বে শক্তিশালী ভারতকে স্বাধীনতার নতুন আখ্যান হিসাবে প্রচার করবে। আর সেই প্রচারের অনুঘটক হিসাবে কাজ করবে সেন্ট্রাল ভিস্টা।

 

শেষের কথা

সেন্ট্রাল ভিস্টা দিল্লির শাসকদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা প্রমাণ হয়, যখন লকডাউনের সময় এই প্রকল্পকে ‘জরুরি পরিষেবা’ হিসেবে ঘোষণা করে কাজ চালু রাখতে বাধ্য করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রকল্প চালানোর সবুজ সংকেত পাওয়া গেলেও সেই রায়ের ক্ষেত্রে বিচারপতিরা সহমত হননি। তিন সদস্যের বেঞ্চে এম.খানাওয়াতকার ও দিনেশ মহেশ্বর প্রকল্পের পক্ষে মত দিলেও বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এর বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করেন একাধিক যুক্তি দিয়ে। এই প্রকল্পের ডিপিআর (ডিটেল প্রজেক্ট রিপোর্ট) এখনো তৈরি হয়নি। পরিবেশগত সমীক্ষা করা হয়নি, এমনকি কস্ট সার্ভেও হয়নি।এতসব অসঙ্গতি থাকা নিয়ে যখন আদালতে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হচ্ছে তখন মামলাকারীকে এক লক্ষ টাকা জরিমানা করছে হাইকোর্ট। বিচারবিভাগীয় এই অতিসক্রিয়তা বিতর্কের উর্ধে নয়। সেন্ট্রাল ভিস্টা অতিমারীর সময় সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও জনবিরোধী কাজের নমুনা শুধু নয়, তা গণতন্ত্রের উপর এক স্বৈরাচারী আগ্রাসন। এই প্রকল্পের বিরোধিতা করা তাই সমস্ত গণতান্ত্রিক মানুষের দায়।

Share this
Recent Comments
2
  • comments
    By: Jayanta Bhattacharya on June 6, 2021

    খুব ভালো লেখা। আরও অনেক পাঠকের পড়া প্রয়োজন।

  • comments
    By: PADMA SARKAR on June 6, 2021

    Jayse vi ho ye central vista project ko avi bandh karke Indian logoki jaan bachana bahut jaruri hay. Iske liye chahe khud Modiko hi kiyuna hathana pade.

Leave a Comment