আয়লা থেকে আমফান সুন্দরবনে কি বদলায় নি আর কি বদলানো দরকারঃ ইয়াসের পরে ফিরে দেখা


  • May 31, 2021
  • (2 Comments)
  • 807 Views

আমপানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ইয়াসের আগমন। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা ঠিক যেমন বলেছেন তেমনি ঘটে চলেছে ঘটনা পরম্পরা। তথ্য বলছে এই ঝড়গুলির আগমন অন্তত পক্ষে আরও ২৬ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে এবং ক্রমশ কমে আসছে এই আগমনের মাঝের দিনগুলির প্রভেদ। বঙ্গোপসাগর — যা ‘টেক্সট বুক’ ঘূর্ণিঝড় প্রবণ অঞ্চল — এখন বছরে দুটো করে সিভিয়ার সাইক্লোন তৈরি হওয়ার অবস্থায়। পরিস্থিতি খুবই বিপদসংকুল। গত বছর আমপানের পরে অমিতাভ আইচ-এর এই লেখাটি  গ্রাউন্ডজিরো-তে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটির বেশ কিছু অংশ পরিমার্জনা করে আরও নতুন ও সাম্প্রতিকতম তথ্য জুড়ে দেওয়া হলো।

 

আগের কথা

 

আমপানের ঝাপট এই বঙ্গে বেশি লেগেছিল। আর ইয়াস ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের তটরেখা ছুঁয়ে ঝাড়খণ্ডে চলে গেছে। ওড়িশার বালেশ্বর, চাঁদবালি, এই রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর, সাগর, মৌসুনিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করলেও এবার এই রাজ্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে জলোচ্ছ্বাস সংক্রান্ত প্লাবনে। সাইক্লোন শেল্টার বাংলায় এখন বেশ কিছু হলেও, এখনও মূলত পাকা আশ্রয়স্থল বলতে স্কুল বাড়ি, যেখানে বেশ কিছু মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত, মানুষ জলবন্দি এবং পানীয় জল এবং জীবিকার ক্ষতির জন্য হাহাকার সর্বত্র।

 

এই পরিস্থিতি পার্শ্ববর্তী ওড়িশা রাজ্য থেকে অনেকটাই আলাদা। যেখানে আর কিছু না হোক, উপকূলবর্তী অঞ্চলে ২-৩ কিমি অন্তর আছে একেকটি সাইক্লোন শেল্টার, সেগুলো আসলে প্রধানত বড় বড় পিলারের উপর তৈরি বিশেষ ধরনের বাড়ি যেখানে সাধারণ সময় প্রাইমারি স্কুল চলে, তবে ঝড়ের পূর্বাভাস থাকলেই সেখানে উঠে আসে পুরো গ্রাম আর শুরু হয়ে যায় রান্নাবান্না, খাওয়াদাওয়া; পুরোটাই সরকারি খরচে আর ব্যবস্থাপনায় থাকে পঞ্চায়েত। অথচ বাম আমলের আয়লা থেকে তৃণমূল আমলের আমপান হয়ে ইয়াসের সুন্দরবন মোটামুটি একই জায়গায় আছে। ওড়িশায় বিশ্বব্যাঙ্কের প্রকল্পের (আইসিজেডএম) টাকায় এসব হয়েছে, সেই প্রকল্প বাম আমলে এ রাজ্যেও শুরু হয়েছিল। তবে সরকারি পয়সায় এলাহি খাওয়া-দাওয়া আর বেরানো ছাড়া বিশেষ কিছু হয়নি। ইন্ট্রিগ্রেটেড কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট (আইসিজেডএমপি) — এর এই অধ্যায়ে এই রাজ্যের ফলাফল যে সবচেয়ে খারাপ ছিল তা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বলে গেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী ও মেরিন সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক অমলেশ চৌধুরী।

 

এটা আপাতত ভালোরকম ভাবেই জানা হয়ে গেছে উত্তর বঙ্গোপসাগর, যা ট্রপিকাল সাইক্লোনের একেবারে ‘টেক্সট বুক’ অঞ্চল বলে বিবেচিত হয়, তার উষ্ণতা এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে যে এমন ঘূর্ণিঝড় দুর্লভ তো নই-ই, বরং বছরে দুটো করে হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। তার অর্থ হলো, এই ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে না-সামলাতেই আরেকটা প্রবল ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে ফের সুন্দরবনের মানুষ বিপদগ্রস্ত হতে পারেন। এমনকি সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে যাবতীয় কর্মকাণ্ড। না, এসব কর্তারা, সাধারণ মানুষ কেউ জানেন না এমন নয়। প্রকৃতপক্ষে এই বাঁধের নির্মাণ, তার নিয়মিত ভাঙন, ত্রাণ এসবই হলো সুন্দরবনের এক আশ্চর্য সমান্তরাল অর্থনীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার একটা সুযোগ মাত্র, যা গত ৫০ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে। আর একথা সব সুন্দরবন বিশেষজ্ঞই মনে করেন।

 

৩৫০০ কিমি লম্বা বাঁধ আর জঙ্গল কেটে তৈরি করা বসত

 

আমরা অনেকেই খেয়াল করি না বা অনেক সময় চর্চায় আসে না যে, ব্রিটিশরা হঠাৎ সুন্দরবনে মানুষের বসতি স্থাপন করার জন্য উঁচু মাটির বাঁধ তৈরি করতে গেলো কেনো। টিলম্যান হেনকেল (যার নামে হিঙ্গলগঞ্জ) ১৭৯০ সালে কোম্পানির প্রথম নিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটদের একজন ছিলেন। তার বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী এই কাজ করা হয়েছে সুন্দরবনকে চালের উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য।১২ তার আগে এই অঞ্চলে মিষ্টি জলের ধান চাষ হতো না। কিন্তু দ্বীপের উত্তর অঞ্চলের বাসিন্দারা নৌকা করে এখানে এসে গভীর জলের নোনা ধানের বীজ ছিটিয়ে বুনে ফিরে যেত, আবার ৮-৯ মাস পড়ে এসে সেই পাকা ধান কাটা হতো। পুরনো ব্রিটিশ গেজেটে এসব ধান খেতে বুনোমহিষ ও বন্য শুকরের আক্রমণের কাহিনি লিপিবদ্ধ আছে। সেই বুনোমহিষ সুন্দরবন থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে, গভীর নোনা জলের অধিকাংশ ধানও। তথ্য বলছে ১৭৯০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ব্রিটিশরা মানুষের বসতি স্থাপন করার জন্য সুন্দরবনের মূল বাদাবনের ৫০ শতাংশ সাফ করে দেয়।

 

অর্থাৎ, প্রায় ২৩০ বছর আগে ইংরেজরা সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ইজারা দেয় আর মেদিনীপুর ও অধুনা বাংলাদেশের যশোর, খুলনা থেকে শয়ে শয়ে ভূমিহীন মানুষ সুন্দরবনে বসত গড়ে তুলতে আসেন। প্রথমেই তাঁরা  যেটা করেন সেটা হলো, ম্যানগ্রোভ জঙ্গল সাফ করে যাবতীয় বন্য প্রাণীদের বিতারণ করা এবং তারপর ভরা জোয়ার আর কোটালের জল যাতে দ্বীপে দিনে দু’বার ঢুকে পড়ে চাষবাস আর বসবাসের জমি ভাসিয়ে না দেয় তাই নদীর তীর বরাবর বাঁধ তৈরি করা হয়। এটার কারণ যেখানে তাঁরা বসত গড়েছিলেন সেই জায়গাগুলো কোনোদিনই মাটি ফেলে এত উঁচু করা হয়নি বা যায়নি যাতে জোয়ারের জল ঢোকা আটকানো যায়। আর নদীর নোনা জল ঢুকলে তো চাষাবাদ কিছু করা যাবে না, পানীয় জল না পাওয়া গেলে জীবন কাটানোই মুশকিল হবে। তাই যত দ্বীপে মানুষ বসবাস করতে শুরু করল, ১০২টি দ্বীপের মধ্যে ৫৪ খানা দ্বীপে এরকমই মাটির দেওয়াল বা বাঁধ দেওয়া হলো। এবং সেটা করতে গিয়ে আর মানুষের বসতি ও জীবনধারণের বন্দোবস্ত করতে গিয়ে প্রায় পুরোটাই সরিয়ে দেওয়া হলো ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। ফল হয়েছে এই স্বাভাবিক জোয়ার ভাটায় পলি আসা যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী জঙ্গল এলাকার তুলনায় এই মানুষের বসবাসকারী দ্বীপগুলো হয়ে গেল আরও নিচু, এবং স্বাভাবিক জোয়ার ভাটা বাধা পাওয়ায় নদীখাতেও নানান বদল দেখা দিলো। কোথাও তা পাশের দিকে চওড়া হয়, কোথাও হয় সরু। কিন্তু বছরে ২০ মিলিয়ন টন পলি বহন করে নিয়ে আসছে যে গঙ্গা নদী সেটা এই হুগলি-মাতলা মোহনা অঞ্চলে এই ভাবে বাধা প্রাপ্ত হয়ে আঁকাবাকা পথে নদীখাতের নানান অংশে জমতে থাকে, পাশাপাশি তার উল্টোদিকেই জলের তোড়ে বাঁধের মাটি তলা থেকে সরে গিয়ে ভাঙতে থাকে পাড়। এমন করেই গড়ে উঠেছে ৩৫০০ কিমি ব্যাপী এক নদী বাঁধ যা সুন্দরবনের মানুষের জীবন, জীবিকা, রাজনীতি আর অর্থনীতির এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

 

প্রতি বছর নিয়ম করে নদী বাঁধ মেরামত বাবদ একটা বাজেট ধরা থাকে সরকারের, তা সেচ দপ্তর ও পঞ্চায়েতের মাধ্যমে বণ্টন করা হয়। গ্রামের লোকেরও কিছু রোজগার হয়, বহু জায়গায় একশো দিনের কাজের সাথেও এটাকে এখন জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টা অত সহজ নয়, কারণ নদী ও প্রকৃতি কারুর কথা শুনে চলে না। যে বিপুল ম্যানগ্রোভ অরণ্য এই দ্বীপগুলির পাশে পাশে ছিল, জলের কাছ পর্যন্ত, অধিকাংশ জায়গায় তা আর নেই অনেক বছর ধরে। ভাঙ্গনের হারও সব জায়গায় সমান নয় যে, কোনোরকমে তাপ্পি মেরে চলে যাবে৷ বহু জায়গায় নদী বাঁধ সাঙ্ঘাতিক ভঙ্গুর অবস্থায় বছরের পর বছর থাকে,বিশেষ করে নদী যেখানে বাঁক নেয় এবং ভাঙন প্রবণ অভিমুখে পড়ে যায় ভূ-তট। ঠিক তার পাশেই চরম অনিশ্চিত জীবন কাটাতে থাকেন সুন্দরবনের মানুষ। প্রতি বর্ষা ও ঝড়ের ঋতুতে বাঁধে মাটি ফেলা হয়। কোনোরকমে চলে যায়। যতক্ষণ না একটা আয়লা, আমপান বা ইয়াস আসছে।

 

আয়লা আর ৫০০০ কোটি টাকার নদী বাঁধের প্রকল্প

 

গত পঞ্চাশ বছরে সুন্দরবনে যত বড় বড় ঝড় হয়েছে তার বেশির ভাগটাই গেছে বাংলাদেশে। তবে তার মধ্যে সুপার সাইক্লোন সিডর আর আয়লা ছিল ভয়াবহ। সিডর মূলত বাংলাদেশের উপকূল ভাগ আর কক্সবাজার অঞ্চলের ভয়ানক ক্ষতি করে, কিন্তু আয়লা ছিল বহু বছরের মধ্যে এমন একটা ঝড় যা ভারতের সুন্দরবনকে মাত্রাহীন বিপর্যয়ে ফেলে। নদীতে জোয়ার থাকায় আয়লায় ভারতীয় সুন্দরবনের ৭৭৮ কিমি নদী বাঁধ ভেঙ্গে যায়। হু হু করে জোয়ারের জল ঢুকে সব চাষের জমি ও মিষ্টি জলের পুকুর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কৃষিযোগ্য জমি নষ্ট হয়, মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম সঙ্কট। ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ শেষ হতে না হতে দাবি ওঠে, এইভাবে চলবে না, নদী বাঁধের পাকাপাকি একটা বন্দোবস্ত করতে হবে। এখন সেই বন্দোবস্ত, সেই বিধান রায়ের আমল থেকেই হচ্ছে। হল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন, পথও বাতলেছিলেন কিছু, কিন্তু খরচের বহর ও ফিসিবিলিটি বা অন্য যে কারনই হোক সরকার সে কাজ করেনি।

 

একটা ঝড় এলেই কংক্রিট বাঁধের গল্প শুরু হয়ে যায়। সুন্দরবনের এই কংক্রিটের বাঁধের পরিকল্পনা সবচেয়ে বেশি করে সামনে আসে আয়লার পর তবে তা সাধারণ মানুষের স্বার্থে কোনদিনও ছিল না। নীচে মাটি ফেলে, ৩০-৩৫ মিটার চওড়া করে ৫ মিটার উঁচু, এই বাঁধ তৈরি করার কথা ছিল। ইরিগেশন ও আয়লা স্টিয়ারিং কমিটির কর্তাদের কথায় নির্বাচিত কিছু জায়গায় বিপুল জমি অধিগ্রহণ করে (৫০০০ হেক্টরের বেশি, যা শেষ পর্যন্ত করা যায়নি), তার উপর পলিপ্রপিলিনের চাদর বিছিয়ে, নদীর দিকে ব্রিক সিমেন্ট পিচিং করা হবে। যা এক সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও অপরীক্ষিত কারিগরি। সেবারে কেন্দ্রীয় সরকার আয়লা টাস্কফোর্স গঠন করে সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের বড় বড় আমলা ছিলেন, তাঁদের মদতে এবং পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন বিষয়ক ও সেচ দপ্তরের কর্তাদের বুদ্ধিতে একটা ৫০৩২ কোটি টাকার প্রকল্প গঠিত হয়। টাকাটা ছিল বিশ্ব ব্যাঙ্কের অনুদান। কেন্দ্রীয় সরকারের মিনিস্ট্রি অব ওয়াটার রিসোর্সের মাধ্যমে এই টাকাটা রাজ্য সরকার ৭৫:২৫ হিসাবে কয়েকটি খেপে কাজের অগ্রগতি হিসাবে পাওয়ার কথা ছিল।  সুন্দরবন বিষয়ক সমস্ত বিশেষজ্ঞ এর প্রতিবাদ করেন, বিশেষ করে টেগোর সোসাইটির কর্ণধার তুষার কাঞ্জিলাল, যিনি এই রিকনস্ট্রাকশন কমিটির একজন ইনডিপেনডেন্ট মেম্বার ছিলেন। তাঁদের সকলেরই বক্তব্য ছিল, সুন্দরবনের মতো সদাই গতিশীল মোহনায় এইরকম ইটের বাঁধ বেশিদিন স্থায়ী হবে না, আর সুন্দরবনের মতো জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলে পলিপ্রপিলিন সিট দিয়ে বাঁধ বানানো চরম ভুল ও অন্যায় কাজ। এছাড়া নবীন এই পলিময় ভূখণ্ড এখনও আসতে আসতে বসে যাচ্ছে, সেখানে এমন মাথা ভারী বাঁধ কোনোমতেই থাকবে না, উল্টে জলের গতিধারা রুদ্ধ করে অচিরেই বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

 

বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরে স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য পূর্ণ ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্যের প্রাচীর ও প্রাকৃতিক পদার্থ দিয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ বানানো সম্ভব সুন্দরবনে এমনটা বলে আসছেন। কিন্তু সে সব কথা কেউ কানে তোলেনি। বেশ কিছু নামকরা কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে কাজের বরাত দেওয়া হয়, যারা কোনোদিন সুন্দরবনের মতো অঞ্চলে এমন কোনও নদী বাঁধ তৈরি করেনি।

 

আয়লা বাঁধ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়কারী সিধান্ত শুধু এটা নয় যে তার বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনায় গলদ ছিল। সঙ্গে এটাও যে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে বড় ঠিকাদার কোম্পানি  লাগে, লাগে বড় বড় আর্থ মুভিং মেশিন, যা কোনওভাবেই গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে তো প্রাধান্য দেয়ই না, উল্টে কৃষক ও দরিদ্র  মানুষের জমি কম দামে কেড়ে নিয়ে তাকে উদ্বাস্তু করে। একই সঙ্গে এই বাঁধ কোনওভাবেই সাধারণ মানুষ দেখভাল করতে পারবে না ফলত অতি উচ্চমূল্যে ঠিকাদার সংস্থাকেই দায়িত্ব দিতে হবে। অথচ উল্টোদিকে মানুষ জমি না দিয়ে উপযুক্ত পুনর্বাসন ও অর্থ চাইলে রাজনীতির দোষ হয়। এই মারাত্মক অবৈজ্ঞানিক ও বাস্তুতন্ত্রের পক্ষে  ক্ষতিকারক বাঁধ  তৈরি করতে প্রতি কিমি পিছু ৫-১৮ কোটি টাকা ঠিকাদারের পকেটে যাওয়া এককথায় নিশ্চিত ছিল। এ বিষয়ে অনেক নিরপেক্ষ তদন্ত রিপোর্ট আছেকিন্তু শেষ পর্যন্ত চরম ব্যর্থতার মুখে পড়ে এই প্রকল্প। প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় জমি। গ্রামের মানুষ কোনোমতেই চাকরি বা বাজার মূল্যে যথেষ্ট মোটা টাকা ছাড়া বাঁধের জন্য জমি দিতে রাজি নয়, সরকার বহু জায়গায় জমির অধিগ্রহণ করতে গিয়ে দেখে জমির সঠিক কোনও মালিক নেই, এই সব নানান বিবাদে সিকি ভাগ কাজ এগোয় না।

 

তথ্য বলছে ঠিকাদার কোম্পানি ও সরকার জমি জটে আটকে মাত্র ৫০ হেক্টর জমি জোগাড় করতে পেরেছিল, বহু জমির মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি, সেটা স্বাভাবিক। প্রজেক্ট কিন্তু আটকেছে কাজের অগ্রগতি না হওয়ার কারণে।

 

সুন্দরবনের নদীর ধারে নিম্নবর্গের এবং সবচেয়ে গরিব মানুষরা থাকেন। সরকারি কর্তা ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের এটা বোধগম্যতায় আসে না যে  তাঁদেরকে  নদীর ধার থেকে ভিতরের পাড়ায় সরাতে গেলে, যেখানে শিক্ষক, কেষ্টবিষ্টু, মুরুব্বিরা থাকেন এবং জমির দাম অনেক বেশি, সেই উচ্চমূল্যের ও মানের জমির সমতুল পুনর্বাসন  দিতে হবে। সেটা না দিলে মানুষ ভিটে মাটি ছেড়ে নড়বে না। কাজটি কঠিন, ধৈর্য তার সঙ্গে মানবিক অধিকার ছাড়াও বহু সংবেদনশীল  বিষয় জড়িত।

 

২০১২ সালে ডাউন টু আর্থ পত্রিকা রিপোর্ট করেছে যে আয়লার পর চলে গেছে তিনটি বর্ষা অথচ এক কিমি বাঁধ তৈরি হয়েছে। বাম আমল থেকে তৃণমূল আমল, জমি জটে কাজ আটকে চলে আসে ২০১৪। ইউপিএ-২ আমলের প্রকল্প তায় আবার অগ্রগতি খুবই খারাপ, মোটামুটি মৃত্যু ঘণ্টা বেজে যায়, আয়লা বাঁধ তৈরি প্রকল্পের। যদিও আমপানের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সুন্দরবন বিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, তারা নাকি এখনও এই টাকা পাওয়ার আসা রাখেন।

 

 কর্দমাক্ত মোহনা অঞ্চলে বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো নবীনতম ভূখণ্ড যেখানে নদীতে বয়ে আসা পলিসঞ্চয় মাত্রা প্রতিমূহুর্তে জোয়ার ভাটা ও জলের স্বাভাবিক  প্রবাহমানতা কতটা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে সেখানে কংক্রিটের বাঁধের তো প্রশ্নই ওঠে না, সাধারণ বেড়ি বাঁধ, যাকে আমরা ইংরেজিতে রিং-বাঁধ বলি সেটাও উপকূলবর্তী অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সময় বিশেষ করে, কোনও একমাত্র  সমাধান নয়। কারণ এই বাঁধগুলো, তা যা দিয়েই তৈরি হোক ঢেউকে রিফ্লেক্ট বা প্রতিহত করিয়ে তার উচ্চতা বাড়ায়, এবং বাঁধের তলায় স্কারিং বা ক্ষয় করে (scouring) ফলে সদাই পরিবর্তনশীল সেডিমেন্টেশন ও হাইড্রোলজির উপর ঋণাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় যা পুনরায় ভাঙন তরান্বিত করে।, , ১০

 

বাদাবনের বিপদ

 

সুন্দরবনের ১০০০০ বর্গ কিমির বেশির ভাগটা (৬০ শতাংশ) পরে বাংলাদেশে। কিন্তু সেখানকার জনসংখ্যা মাত্র ২০ লক্ষ, আর ভারতের ৪০ শতাংশ ভাগে সুন্দরবনের জনসংখ্যা ৪৫ লক্ষ। বাংলাদেশের সুন্দরবনের একটা বড় সমস্যা হল ট্রপিকাল সাইক্লোনের মুহুর্মুহু আক্রমণ। তার মধ্যে সিডর ২০০৭ সালে যে ধ্বংসলীলা চালায়, তেমনটা আয়লা, আমপান, বুলবুল, ফণি চাক্ষুষ-করা পশ্চিমবঙ্গ দেখেনি। বাংলাদেশের সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের জৈববৈচিত্র্য অনেক বেশি, সেটার কারণ ক্রমাগত মিষ্টি জলের প্রবাহ, যেটা ভারতের পূর্ব সুন্দরবন, যেখানে আছে প্রজেক্ট টাইগার, সেখানেও (হয়তো ঘনত্ব বেশি) অনেক কম। প্রকৃতপক্ষে ভারতের সুন্দরবনের সপ্তমুখীর পর থেকে মাতলা, বিদ্যাধরী, ঠাকুরান, হরিণভাঙ্গা নদীগুলো পুরোপুরি সমুদ্রের জলে পুষ্ট এবং এদের উপরিভাগের মিষ্টি জলের প্রবাহ মনুষ্যকৃত কারণে বুজে গিয়েছে বহুদিন। বহুদিন ধরে এর উপর অনেক গবেষণা হয়েছে এবং উপগ্রহ চিত্র ও অন্যান্য পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে যে ভারতীয় সুন্দরবনের একটা বড় অংশ জুড়ে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের এক ভীষণ ক্ষয় হচ্ছে, তার গঠন ও বৃদ্ধি হৃাস পাচ্ছে, তার সবুজের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং গাছগুলো দুর্বল হয়ে গিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে লড়ার শক্তি হারিয়ে চলেছে।

 

প্রজেক্ট টাইগারের ভিতর বহু এলাকা অপেক্ষাকৃত উঁচু হয়ে তাতে নুনের ভাগ বেড়ে গিয়ে টাকের মতন হয়েছে, যাকে সল্ট ব্ল্যাল্ক বলে, সেখানে কখনও সোয়েডা নামক এক প্রকার নোনা টক শাক ছাড়া কিছুই গজায় না। সুন্দরবনে প্রায় ৭০ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ ও বাদাবনের প্রজাতির গাছ দেখতে পাওয়া যায় আর তার ৩৫টি হল প্রকৃত ম্যানগ্রোভ। এর মধ্যে অন্তত দুটো প্রজাতি এই লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এ দেশের সুন্দরবন থেকে প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে, আর সে দুটি হলো সুন্দরী (হেরিটিয়েরা ফোমিস) ও গোলপাতা (নিপা ফ্রুটিকানস)। অত্যাধিক ভাবে কমে গেছে সবচেয়ে ক্ষয়রোধী গর্জন (রাইজোফোরা), যা মূলত খাড়ির ধারে দেখা যায়। ধুঁধুল, পশুর (জাইলোকারপাস), এমনকি কাঁকড়া (ব্রুগয়রা), গরিয়া (ক্যানডেলিয়া ক্যানডেল)- এর মতো গাছ যথেষ্ট সংখ্যায় আর নেই। গোটা সুন্দরবন জুরে এখন বানি (মূলত এভিসিনিয়া অফিসিনালিস বা সাদা বাইন), গেওয়া (এক্সোকেরিয়া আগালোচা), কিছুটা খর্বকায় গরান (সেরিওপস ডেকানড্রা) আর উঁচু জমিতে হেতাল (ফেলিক্স পেলুডোসা) এর মনোকালচারের মতো পরিস্থিতি প্রায়। আর কেওড়ার (সোনারেসিয়া এপিটালা) প্রজাতিগুলি রয়েছে বিচ্ছিন্ন ভাবে, এর আরেকটি প্রজাতি, ওড়া বা ম্যানগ্রোভ আপেল (সোনেরেসিয়া ক্যাসিওলারিস) পূর্ব সুন্দরবনে খুব কমে গেছে, এবং অপেক্ষাকৃত কম লবণাক্ত অংশ ও পশ্চিম সুন্দরবনেই কিছু আছে।

 

ম্যানগ্রোভের ক্ষয়ের সাথে সাথে ক্ষয় হয়ে চলেছে সুন্দরবনের আশ্চর্য জৈববৈচিত্র্য, যা বাদাবনের মাটিতে, কাদায় আর জলে থাকে। প্রায় হাজারের উপর অমেরুদণ্ডী প্রাণীর প্রজাতি (এরাই সুন্দরবনের জৈবরাসায়নিক চক্রকে সক্রিয় রাখে, তাই এদের ক্ষয় ম্যানগ্রোভের ক্ষয়ের মতোই চিন্তার বিষয়) এবং ৫০০ প্রকারের মেরুদণ্ডী প্রাণীর বসবাস এই সুন্দরবনে। আর তার মাথা হয়ে আছে বাঘ। শেষ সুমারি অনুযায়ী ভারতীয় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৯৬। বাঘের সংখ্যা কমলেও বাঘের মানুষকে আক্রমণ করার ঘটনা কমেনি। আর তার কারণ পরিবর্তিত পরিবেশে (যত জলতল বাড়ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে আর এদের শিকার শাকাশি প্রাণীর সংখ্যা কমছে) বাঘের বিচরণ এখন সেই সব দ্বীপেই, যেখানে মাছ, কাঁকড়া আর মধু আহরণে মানুষের আনাগোনা। জঙ্গলের নদীর ধার বরাবর জাল ফেলে গ্রামের দিকে যাওয়া বন্ধ করা গেছে বটে কিন্তু এর ফলে জঙ্গলের ধার ঘেঁষে মাছ কাঁকড়া ধরার সময় আক্রমণ উল্টে বেড়েছে এমনটাই প্রত্যক্ষদর্শীদের মত। যেটা অবশ্যই বন দপ্তরের কর্তারা মানতে চান না। অবশ্য সে কর্তারা তো জঙ্গলের অধিকার আইনটাই মানতে চান না।

 

যাই হোক, এই বিচিত্রতার কথা মাথায় রেখেই, আমাদের সুন্দরবনকে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ঘোষণা করা হয়েছিল। যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে মানুষ থাকবে মিলেমিশে। কোর এলাকায় কারোর প্রবেশ নিষেধ, ওখানে প্রজেক্ট টাইগার, যার জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা। তার বাইরে বাফার এলাকায় আছে অভয়ারণ্য, সেখানে মাছ, কাঁকড়া ধরা, মধু আহরণ চলতে পারে। এরও বাইরে থাকবে মানুষের বসবাসের উপযোগী ম্যানিপুলেশন জোন, যেখানে চাষবাস, মৎসচাষ, উদ্যান ও পশুপালন, কুটিরশিল্প চলতে পারে, থাকতে পারে স্কুল, কলেজ, অফিস কাছারি। কোনোভাবেই এই বায়োস্ফিয়ার অঞ্চলে কোনো ভারি শিল্প, রাসায়নিক শিল্প, সিমেন্ট, কয়লাচালিত বিদ্যুৎ বা কোনো বিপজ্জনক শিল্প হতে পারবে না। কারণ সেটা হলে দূষণ এত বৃদ্ধি পেতে পারে, যে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য একেবারে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। একই সাথে ভারতের সুন্দরবনের আরও দুটি মর্যাদা রয়েছে যেমন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ও রামসার সাইট বা আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত জলাভূমি।

 

বাংলাদেশের সুন্দরবনে দুটো রিজার্ভ এলাকা আছে, ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট তকমাও আছে, কিন্তু ভারতের সুন্দরবনের মতো এত সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা কড়া আইন নেই। আর সে কারণেই বাংলাদেশের সুন্দরবনের গা ঘেঁষে নানারকম ছোটবড় শিল্প গজিয়ে উঠেছে, যার প্রভাব বনের উপর পড়ছে। এর সর্বোত্তম সংযোজন হল, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র যা ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠছে। খুবই স্বাভাবিক যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র ওই দেশের ও পৃথিবীর যাবতীয় পরিবেশবিদদের চক্ষুশূল হবে। হয়েছেও তাই, আর তার কারণ সুন্দরবন কোনও দেশের সীমানা বা বেড়া মানে না। বাংলাদেশের রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো তাই সুন্দরবনের কফিনে শেষ পেরেক হয়ে দেখা দিতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে নয়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়। অবশ্য এ বিষয়ে আগে লিখেছি। পাঠক সেই লেখা এখানে পড়তে পারেন

ম্যানগ্রোভ বনাম রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র: উন্নয়ন কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন

 

তবে বাঁচার পথ কী

 

বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হওয়ার দরুন সুন্দরবনে কোন ভারি শিল্প হওয়া সম্ভব নয় ওদিকে প্রতি বছর বাঁধ ভেঙে ভেঙে নদীর নোনা জল ঢুকে চাষ আবাদের অবস্থাও তথৈবচ। এমত অবস্থায় সুন্দরবন ও উপকুলবর্তী অঞ্চল গুলো থেকে আমপান ও ইয়াস পরবর্তী অবস্থায় বিপুল মানুষের কাজের সন্ধানে বাইরে যাওয়া ক্রমাগত বেড়ে চলাই স্বাভাবিক। বছর বছর এই বিপদ থেকে বাঁচতে আমাদের নীতি নির্ধারকদের একটু আলাদা করে ভাবতে হবে। এই সব সমাধানের জন্য আমাদের একটু মানুষের ইতিহাসকে জানতে হবে, জানতে হবে কীভাবে প্রাকৃতিক পদ্ধতিকে বা নেচার বেসড সলিউশন (এনবিএস)-কে কেন্দ্র করে এমন জলবায়ু সংকটাকীর্ণ অঞ্চল গুলিতে বাস্তুতন্ত্রের নিয়মকে ব্যবহার  করে বা ইকোসিস্টেম বেসড অ্যাপ্রোচ   (ইবিএ) দ্বারা মানুষের জীবন, জীবিকা ও প্রকৃতি দুটোকেই রক্ষা করতে পারি।

 

পারমিয়েবল ড্যাম বা ভেদ্য বাঁধ

 

আমপান, আয়লার তুলনায় অনেক শক্তিশালী ঝড়, আর তার স্থায়ীত্ব ছিল অনেক বেশি সময় জুড়ে। সমস্ত তথ্য পর্যালোচনা করে যেটা বোঝা যাচ্ছে যে, হয়তো জোয়ার না থাকায় কম বাঁধ ভেঙেছে, তাও আমপানের ক্ষতির ব্যাপকতা কম নয়। আবার ইয়াসে ঝড়ের দাপট কম থাকলেও ভরা কোটাল ও চন্দ্রগ্রহণের ফলে মোটের উপর আয়লার চেয়ে কম হলেও কোনও কোনও অংশে ভাল পরিমান জমিই স্যালিনাইজড হয়েছে। আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম, ইভ্যাকুয়েশন প্রাণ বাঁচিয়ে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যতে সুন্দরবনের মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা ইউরোপীয় সভ্যতার দিকে। এই কথা বললেই আমাদের নেদারল্যান্ডসের সি-ওয়াল আর তার ফুটো হাত দিয়ে বন্ধ করে কী করে অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে ছিল রূপকথার এক নায়ক সে সব গল্প মনে পড়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণা প্রমাণ করেছে যে ইয়োরোপের জনপদকে এমন কর্দমাক্ত মোহনার জলরাশি থেকে শুধুমাত্র কোনও বড় বাঁধ বা সি-ওয়াল একা রক্ষা করছে না বা করতে পারত না। এই বাঁধগুলি বা ডাইকের সামনে আছে রাশি রাশি এমন ছোট বাঁধের নেটওয়ার্ক যাকে বলা হয় ভেদ্য বাঁধ বা পারমিয়েবল ড্যাম। জল এই ছোট ছোট ভেদ্য বাঁধের চৌখুপিতে বাধাপ্রাপ্ত হয় আর তার সাথে বয়ে আসা পলির অধঃক্ষেপণের মাত্রা বেড়ে গিয়ে ডাইকের সামনে তৈরি হয় সুবিশাল সল্টমার্শ, কাল ক্রমে সেখানে তৈরি হয় ম্যানগ্রোভ প্রাচীর। আর এই সল্ট মার্শই প্রকৃতপক্ষে রক্ষা করে জনপদকে১১   এবং তা করে চলেছে ১০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। হ্যাঁ ইয়োরোপের এমনধারা প্রাকৃতিক অঞ্চলে মানুষের নগর ও সভ্যতা গড়ে তোলার ইতিহাস এতটাই প্রাচীন। আমাদের সুন্দরবনের জনবসতি সেই তুলনায় এই সেদিনের। অথচ তা গড়ে উঠেছে ইতিহাস ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের এই সব শিক্ষাকে অস্বীকার করেই।

 

কিন্তু এমনটা করতে গেলে তো নদী বা জলকে বাধাহীন খেলতে দেওয়ার একটা জায়গা চাই। সেটা এখানে কোথায়? একদম নদীর ধার ঘেঁষেই তো বাঁধ আর তার পিছনেই মানুষের জনবসতি, ধানক্ষেত, মিষ্টি জলের পুকুর। সে কারণেই স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট বা কৌশলগত পিছিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। নদীর তীর ধরে মানুষকে ভিতর দিকে সরিয়ে আনা ছাড়া কোনও পথ নেই। এতে মানুষের চাষের জমি, পুকুর অধিগ্রহণ করতে হলে তাদের অবশ্যই ভিতর দিকে সরিয়ে এনে জীবন যাপনের মতো উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কতটা সরানো হবে জনপদ সেটা নির্ভর করবে পরিস্থিতি আর এলাকার উপর, তবে ক্ষেত্র বিশেষে ৫০০-১০০০ মিটার পর্যন্ত সরাতে হতে পারে জনপদকে। এর উদ্দেশ্য হবে, প্রধান নদী বাঁধ বা ডাইকের সামনে একটি বড় সল্ট মার্শ ও ম্যানগ্রোভের অরণ্য তৈরি করা। এই সল্ট মার্শের পিছনের ভূমিখণ্ডকে রক্ষাকারী ডাইক তৈরি হবে মাটি কম্প্যাক্ট লেভেলিং করে ১:২ স্লোপে এবং তার উপর জিও জুট লেয়ারিং করে ভেটিভার বুনতে হবে। এমন ভূপ্রাকৃতিক পরিবেশে কীভাবে ভেটিবার ও জিওজুট কাজে লাগানো যায় (ছবি ৯) তা নিয়ে বাংলাদেশে চমৎকার কাজ হয়েছে।১৩

 

এই বাঁধের সামনের অংশে থাকবে  জলের স্রোত ও জলরাশিকে প্রশমিত করার উপযোগী একপ্রকার অবকাঠামোর চৌখুপি নেটওয়ার্কের সারি বা পারমিয়েবল বা ভেদ্য বাঁধ, যা বাঁশ, ডাল পালা দিয়ে তৈরি হয়। এই ভেদ্য বাঁধের নেটওয়ার্ক গুলো জোয়ারের জলের ক্রমাগত সেডিমেন্টেশন রেট বা পলির থিতিয়ে পড়ার হার বাড়িয়ে একটা সল্ট মার্শ গড়ে তুলবে, যেখানে আগে ছিল হয়তো ধান খেত। নীচের ছবিতে এমন ভেদ্য বাঁধ কেমন করে তৈরি হয় দেখানো হয়েছে (ছবি ৩,৪,৫,৬,৭,৮) । ডাইকের সামনে পলি পড়ে আসা সল্ট মার্শে যেখানে আগে ছিল ধানখেত সেই জমিতে  জলের লেভেল (মিন হাই ওয়াটার থেকে মিন সি লেভেলে সাকসেশন মেইনটেইন করে) ম্যানগ্রোভও লাগাতে হবে, এর সামনেও এমন পারমিয়েবল ড্যাম ও চ্যানেল, যা দিয়ে জোয়ারের জল আশা যাওয়া করে এই সল্ট মার্শ ও ম্যানগ্রোভকে ৪-৫ বছরে এমন পুষ্ট করবে যে একটা দারুণ জলবায়ু নিরোধী, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসরোধী অবকাঠামো তৈরি হয়ে যাবে যা পিছনের জনপদকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করবে।

 

ম্যানগ্রোভ সাকসেশনঃ

 

মোহনা অঞ্চলে জোয়ার ও ভাটায় জলের ওঠা ও নামার উপর ভিত্তি করে, ভাটার সর্বনিম্ন জলতল থেকে পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় সর্বোচ্চ যেখানে জল ওঠে সেই পর্যন্ত নানান ধরনের ম্যানগ্রোভের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে বলা হয় সাকসেশন। অর্থাৎ ধানিঘাস>বানি>খলসে<>গোলপাতা<>কেওড়া>গর্জন>গরিয়া>কাঁকড়া>ধুঁধুল<>পশুর>সুন্দরী> গেওয়া (নীচে এমন দুটো সাকশেসনের ছবি দেওয়া হল, পরিস্থিতি বিশেষে এরা একটু আলাদা রকম হবে)। এটা পরীক্ষিত যে সুসংগঠিত ম্যানগ্রোভ অরণ্যের গাছের গুঁড়িগুলো যেমন তীরের দিকে ধাবমান জলের স্রোতের গতিবেগ দারুণ ভাবে কমাতে পারে, তেমন তীব্র ঝড়ের সময় বা ভরা জোয়ারে তার জলের বাইরে বেড়িয়ে থাকা বড় ক্যানোপিগুলি উঁচু উঁচু ঢেউগুলিকে আটকে দেয়। ভিয়েতনাম ও নেদারল্যান্ডসে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন এমন কোস্টাল ডাইক, যার পিছনে আছে জনপদ, তার সামনে ২০০-৫০০ মিটার এমন লম্বা ম্যানগ্রোভ বন তৈরি করার ফলে ডাইকগুলো অনেক ছোট করলেও চলে, তার উপর বালি, বোল্ডার বা অন্যকিছুর আস্তরণ দেওয়ারও দরকার পরে না ফলে খরচও কম হয়।   

 

ছবি ১: ভিয়েতনামের তটরেখায় ম্যানগ্রোভের দুটি সাকসেশন, প্রায় একই রকম, একটু প্রকার ভেদ এখানেও দেখা যায় (ক) টুশিনকি ও ভারহ্যাগেন, ২০১৪ ও ভারহেগেন ২০১২

 

ছবি ১: ভিয়েতনামের তটরেখায় ম্যানগ্রোভের দুটি সাকসেশন, প্রায় একই রকম, একটু প্রকার ভেদ এখানেও দেখা যায় (খ) নাগুয়েন ২০০৮ অনুসারে

 

ম্যানগ্রোভের ন্যাচারাল সাকসেশন, সেই অঞ্চলের মাটির বৈশিষ্ট্য, ভূপ্রকৃতি, জলের স্রোত, উচ্চতা ও লবণাক্ততার উপর নির্ভর করে প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে। এই পদ্ধতিতে পিছনের বড় ডাইক করার খরচও অনেক কম হবে, কারণ ম্যানগ্রোভের এই অরণ্য ও পারমিয়েবল বাঁধই পিছনের মূল ভূভাগকে রক্ষা করবে, ডাইক প্রধানত জল আটকাবে।

 

আর এ সবই হবে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের আওতায় কমিউনিটি প্রজেক্ট হিসাবে। এই ভেদ্য বাঁধ বানানো, লাগানো, সারাই করা, ম্যানগ্রোভের চারা তৈরি করা, একবছরের চারা লাগানো, দেখভাল, ভেটিভার ঘাসের নার্সারি করা, লাগানো, দেখাশুনো ও মেরামতির কাজে বিপুল কর্মদিবস সৃষ্টি হবে এবং এসবই হবে স্থানীয় ভাবে পাওয়া যায় এমন সব জিনিস দিয়ে, তাই এক কথায় এ হবে লোকাল বেসড সলুশনও যা নিশ্চিত ভাবে একটি বড় ক্লাইমেট অ্যাকশন।

 

গাছ জ্বলে যাওয়া

 

আমপানের পর সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমে অনেকেই গাছের পাতার জ্বলে যাওয়ার মতো ছবি দেখেছেন। উপকূলবর্তী অঞ্চলে ট্রপিকাল সাইক্লোনের বিপুল হাওয়ার বেগ শুধু সরাসরি ক্ষতি করে বা প্লাবন আনে তাই নয়, বিপুল পরিমাণ সল্ট-স্প্রে আর নুন বহনকারী এরোসল তৈরি করে যা ভূতল থেকে বহু কিমি উপরে উঠে যায় এবং ভূভাগের বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পার। এই প্রকার সল্ট স্প্রে ও ড্রাই এরোসল ভূভাগের ভিতরে গাছের পাতায় অধঃক্ষেপণ হয় ও গাছের পাতা ও মুকুলে নেক্রোসিস তৈরি করে পাতা হলুদ করে দেয়। এরোসল মাটিতে পড়ে এবং গাছের মূলতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে অসমোটিক ইমব্যালেন্স ও ক্লোরাইড টক্সিসিটি তৈরি করার ফলে গাছ শুকিয়ে যেতে থাকে এবং মাটি থেকে নুন অপসারিত না হলে গাছগুলির মৃত্যু ঘটে।

যে কোনও তটবর্তী অঞ্চলের মতো সুন্দরবনেরও এই তীব্র নোনা হাওয়ার অভিঘাত থেকে বাঁচার জন্য ম্যানগ্রোভ অঞ্চল ছাড়াও স্থানে স্থানে তিন স্তরীয় (নিচু থেকে উঁচু) গাছের সারি করা দরকার। চেন্নাইয়ের স্বামীনাথন ইন্সটিটিউট এই বিষয়ে একটা খুব জরুরি কাজ করেছে। তারা ভারতের কোস্টাল এলাকার জন্য তীব্র হাওয়া ও সল্ট স্প্রের অভিঘাত সহ্যকারী গাছের একটা সারণি বানিয়েছে, যার মধ্যে নারকেল, ঝাউ সহ অনেকে বৃক্ষ ও স্রাব জাতীয় গাছ আছে। আমাদের সুন্দরবন অঞ্চলে এই ধরনের গাছের প্ল্যান্টেশন তৈরি করা খুব দরকার। তার বদলে সমাজভিত্তিক বনসৃজনের নামে ভুল গাছ লাগিয়ে যাওয়া হয়। এমন একটি গাছের সারির গ্রাফিকাল ছবি নীচে দেওয়া হল ও গাছের নাম দেওয়া হল।

ছবি ২: হাওয়া ও সল্ট স্প্রে নিরোধক গাছের সারি

 

হাওয়া  সল্ট স্প্রে রোধী গাছ

 

পরীক্ষায় দেখা গেছে সুন্দরবনের মতো তটবর্তী অঞ্চলে বনসৃজনের সময় ম্যানগ্রোভ ছাড়াও ভুভাগে কিছু বিশেষ ধরনের গাছ লাগানো উচিত, যেমন কাজু গাছ, নিম গাছ, লিপ্সটিক গাছ বা দইগোটা, কাঁটা বাঁশ বা থর্নি ব্যাম্বু, তাল, নারকেল, অমলতাস, ঝাউ, ক্লেরোডেনড্রাম বা ব্লিডিং হার্ট বা ভারাঙ্গি, দেশি তুলা বা সমুদ্রজবা (হিবিসকাস টিলিয়াসিয়াস), ইন্ডিয়ান বিচ ট্রি বা করচ বা করঞ্জ, মিসওয়াক বা পিলু বা টুথব্রাশ ট্রি (সালভাডোরা পারসিকা), রিঠা বা সোপ নাট, পর্শিয়া বা ইন্ডিয়ান টিউলিপ ট্রি, নিশিন্দা। এই সব গাছ নোনা হাওয়া আটকাতে সাহায্য করে এবং ঝড়ের সঙ্গে ভাল ঝুঝতে পারে। ঝাউ ও নারকেলের বনও এই ব্যাপারে খুবই উপযোগী।

 

বন্যা  ঝড় নিরোধী চাষ

 

বিষয়টি নতুন নয়। যেখানে বছর বছর নোনা জল ঢুকে যায় সেখানে আমরা নোনা সহ্যকারী ল্যান্ডরেসগুলো সরিয়ে, উচ্চফলনশীল ধান সুন্দরবন প্রবেশ করিয়েছি, সঙ্গে রাসায়নিক সার ও ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার। এটা একটা অপরাধ, কারণ এতে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এখনই সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এই সব নোনা সহনশীল ধানের চাষ ও বীজের সংরক্ষণ শুরু করা দরকার। আমফানে আর একটা ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিলো হয়তো ইয়াসেও হয়েছে আর তা হলো, বোরোধান তুলে মাঠে ও গোলায় রাখা ছিল। তার অনেকাংশই ভিজে কল বেড়িয়ে গেছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে কমিউনিটি সাইক্লোন শেল্টার শুধু নয় কমিউনিটি বীজ ও শস্য ভান্ডার চাই, যা উঁচু ও পাকা বাড়িতে না হলেও শক্ত পোক্ত টং ঘরের উপর হওয়া দরকার। যেটা প্লাবন ও ঝড়রোধী।

 

পৃথিবীর নানান জায়গায় ভাসমান ভেলায় সব্জি, নোনা জায়গায় সারা বছরের জন্য বৃষ্টির জল ধরে রেখে তার থেকে বিন্দু বিন্দু মিষ্টি জলের সেচের জল বানানোর সহজ ও কম খরচের পদ্ধতি, সোলার মাইক্রোইরিগেশন নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে। আসামের মাজুলি দ্বীপ যা বছরে ছয় মাস জলের তলায় থাকে সেখান এমন ভাসমান সব্জি বাগান সাফল্যের সাথে বানানো হয়েছে। উত্তর বিহারের বন্যা সঙ্কুল সাহারসা জেলায় এমন ভাসমান ভ্যালায় সবজি চাষ হই চই ফেলে দিয়েছে।৪(ক,খ,গ) ক্যারিবিয়ানে তো একজন কৃষিবিজ্ঞানী ঝড় নিরোধী চাষ ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা করেছেন, যেখানে চাষের জায়গাগুলো ঝড় এলে লুকিয়ে পড়ে, আর তা যদি দিনের বেলায় হয় তবে এলইডি আলো দিয়ে তার সালোকসংশ্লেষ চলে। পাঠক ভাবছেন এসব তো খুব দামি, আমাদের মতো গরিব দেশে তো সম্ভবই নয় ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে যে কোটি কোটি সরকারি ও বেসরকারি অনুদান গোটা সুন্দরবনের জোয়ারের জলে ধুয়ে চলে যায় প্রতিবছর নিয়ম করে, তার কিছুটা পেলেই এরকম শত শত জলবায়ু পরিবর্তন নিরোধী চাষবাসের প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব। যে বিপুল ত্রাণ, উদ্ধার ও নবনির্মাণের অর্থ আমপানের পরে প্রবাহিত হচ্ছে, তার ১০% দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে এগুলো তৈরি করা সম্ভব। বাকিটা মানুষের উদ্যোগ ও পরিশ্রম।

 

পুকুর পুনরুদ্ধার  মৎস্য চাষ

 

সুন্দরবনের নানান অঞ্চলে নোনা ও মিষ্টি জলের মাছের চাষ একটা বড় রোজগারের পথ। তবে নোনাজলে মাছ চাষ মূলত বসিরহাট, ন্যাজাট, ভাঙর, হাসনাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জে বেশি, কিছুটা কাকদ্বীপ, পাথরপ্রতিমা  ও নামখানা অঞ্চলেও, আর তা মূলত ভেনামি চিংড়ির (আগে ছিল বাগদা) চাষ, সাথে অন্যান্য নোনা জলের মাছ, যেমন পারশে, ভাঙন, ভেটকি যা নদীর জলের সাথে চলে আসে তার ভেড়ি। জায়গায় জায়গায় মিষ্টি জলের রুই, কাতলা, পাবদা, গলদা চিংড়ির চাষ করা হয়। আয়লার মতো আমপানেও নদীর নোনা জল ঢুকে যাওয়ায় মিষ্টি জলের মাছ মারা গেছে। নোনাজলের মাছ জলে ভেসে গেছে। এই সব ভেড়ি বা পুকুরের পাড় খুব নিচু হওয়ায় এবং পাড়ের চারদিকে জাল না থাকায় বা ঝড়ে উড়ে গিয়ে মাছ ভেসে যাওয়া স্বাভাবিক। মাছ ভেসে যাওয়া বা পুকুরে বাইরের জল ঢোকা আটকাতে গেলে পাড় খুব উঁচু করতে হয়, আর তার ধারে জালের বেড়া দিতে হয়, যা জোরালো ঝড়ে না ছিঁড়তে পারে, তাই হালকা করে বেঁধে ভারি বাঁশের ওজন দিয়ে জায়গায় রাখতে হয়। তবে ম্যানগ্রোভ বনের ক্ষতি করে যদি ভেরি বানানো হয় তার ফল বিষময় ও একপ্রকার আত্মহত্যার সামিল। ম্যানগ্রোভ কাম ফিসারি এক নতুন ধরনের জলবায়ু নিরোধী পদ্ধতি যেখানে ম্যানগ্রোভ অরণ্য রক্ষা করে ও তাকে ব্যবহার করে মাছের উৎপাদন বাড়ানো হয়। এমন কাজ ভিয়েতনাম করে দেখিয়েছে, আমাদের না পারার কোনও কারণ নেই।

 

এখন প্রশ্ন হল আপাতত কী করা যাবে। প্রথমে আসা যাক নোনাজলের মাছ চাষে। ভেনামি চিংড়ি একটি বৈদেশিক প্রজাতি এবং এর চাষের সাথে পরিবেশের সমস্যা, যেমন দূষণ, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস ইত্যাদি ও চিংড়ির বড় ব্যবসায়ীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটা কার্টেল তৈরি হয়ে অর্থনৈতিক শোষণের এমন অবস্থা হয়েছে যে আন্তর্জাতিক পরিবেশ নজরদারি সংস্থা গ্রিনপিস একে লাল তালিকাভুক্ত করে দেশে দেশে সুপারমার্কেটে প্রচার চালায়। বাগদা চাষও একই রকম ক্ষতিকারক। এই চাষের জন্যই আরও ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হয়েছে। ভারতের নানান রাজ্যে, রাজ্য সরকারগুলো এই চাষ বন্ধ করতে বহুদিন ধরে চেষ্টা করছে। কিন্তু নীতিপঙ্গুতার জন্য পারছে না। এর থেকে বেড়িয়ে আসার একটা ভালো পথ হল, ভাসমান খাঁচায় নোনা কাঁকড়া চাষে বাহবা দেওয়া। কাঁকড়া  চাষ সম্পূর্ন প্রাকৃতিক ও সহজ। এই পদ্ধতিতে গ্রামের নোনা খাল ও গ্রামের পাশেই বাদাবনের ধারে নদী থেকে ধরা ৭০-৮০ গ্রাম সাইজের কাঁকড়া দুইমাসে শুধু মাত্র কমদামি মাছ বা পুকুরে ছেড়ে রাখা লেঠা, তেলাপিয়া খাইয়ে ১৬০-২০০ গ্রাম করে ফেলা যায়। এই কাঁকড়া  আন্তর্জাতিক বাজারে খুব ভালো দামে বিক্রি হয়। এই কাঁকড়া চাষ পদ্ধতি নোনা হয়ে যাওয়া পুকুরকে কাজে লাগিয়ে একদম দেশি মুরগি পালনের মতো নিখরচার এক চাষ ব্যবস্থা যা মানুষকে যথেষ্ট টেকসই জীবিকা দিতে পারে এবং প্রতিবছর অসংখ্য মানুষকে কাঁকড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের পেটে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

 

নোনা হয়ে যাওয়া জলে সি উইড বা নোনা শ্যাওলার চাষ খুব লাভজনক হতে পারে। নতুন করে নোনা জল ঢোকানোর দরকার নেই। ম্যানগ্রোভের নিউম্যাটোফোরের গায়ে হয়ে থাকা বেশ কিছু শ্যাওলা যেমন এন্টারোমরফা, উলভা প্রভৃতিকে নোনা পুকুরে দিব্যি চাষ করা যায়। এই শ্যাওলার খাদ্যগুণ বিপুল এবমগ তা উত্তম পশু খাদ্যও বটে। এছাড়া নানান ধরনের শিল্প যেমন কনফেকশনারি, বায়োটেকনলজি শিল্পে এর প্রচুর চাহিদা। সুন্দরবনে এমন চাষ সফল ভাবে করে দেখানো হয়েছে। এখন খালি বৃহৎ উদ্যোগের দরকার।

 

সুন্দরবনের আপাতত অল্প লবণাক্ত হয়ে যাওয়া পুকুরগুলিতে গুলশে ট্যাংরা, কই, গলদা চিংড়ি, মনোসেক্স তেলাপিয়ার চাষ করা যায়। এতে পুকুরে নোনা জল ঢুকে গেলেও কোনও ক্ষতি হবে না। যে নোনা পুকুরে কাঁকড়া হচ্ছে সেখানেই এই মাছের চাষ করা যাবে। এসব মাছের চাষ তিন থেকে ছয় মাসে শেষ হয় ও লাভজনক। মিষ্টিজলের মাছ চাষ করতে গেলে পুকুরের নোনাজল ও তলার নোনা কাদা মাটি পাম্প ও স্লাজ পাম্প দিয়ে বার করে, পুকুরে ক্ষারত্ব ও অম্লত্বের প্রকারভেদে পোড়া চুন দিয়ে ট্রিট করে বর্ষার জল ভরতে হবে। পুকুর শুকিয়ে নিলে আরো ভাল হয়। সবক্ষেত্রেই পুকুরের পাড় উঁচু করতে হবে এবং এবিষয়ে মৎস্য বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে নিলে ভাল হবে। তবে বাঁধের আশেপাশে কোনও মতেই মিষ্টি জলের মাছ চাষ করা যাবে না।

 

মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা

 

ঝড়ে যে বাড়ি ভাঙে তা ভাঙার মতোই। সুন্দরবনে গ্রামীণ গৃহ প্রকল্পের কাজের প্রগতি মোটেই ভালো নয়। সাইক্লোন শেল্টারও কম। তার ফল মানুষ ভুগছে। এই দাবিগুলোও সঠিকভাবে কোনও রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন করছেন না। গৃহনির্মাণের ক্ষেত্রে এখন অনেক কম খরচের পোক্ত ঘর নির্মাণের প্রযুক্তি এসেছে। তার মধ্যে জিপসাম বোর্ড দিয়ে বাঁশকে রিইনফোর্সমেন্টে ব্যবহার করে, তার মধ্যে পরিবেশ বান্ধব সিমেন্ট ঢেলে বা প্রিফেব্রিকেটেড বিল্ডিং ব্লক দিয়ে গৃহনির্মাণ প্রকল্প করা যায়। মোট কথা যা ঝড়ে জলে উঁচু জায়গায়, শক্ত পিলারের উপরে দাঁড়িয়ে থাকবে, যেমন বন্যা প্রবন অঞ্চলে হয় ও যার খরচ কম, পরিবেশ বান্ধব এবং চটপট বানানো যাবে। তবে দ্বীপের মধ্যে রাস্তাঘাট তৈরির  সময় জলের ড্রেনেজ ফ্লো মাথায় রেখে করতে হবে,নইলে জল একবার ঢুকে গেলে আর বেরবে না।  আসামের মাজুলি দ্বীপে মানুষ গত ৭০০ বছর ধরে এমন টং ঘরে বসবাস করে, আর প্রতিটি ঘরে বন্যায় ব্যবহারের জন্য থাকে উঁচু জায়গায় রাখা শস্যাগার, মুরগি ও পশুর ঘর ও নৌকা। এসবই প্রকৃতির সাথে (প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে নয়)  বাঁচার উদাহরণ।

 

পরিশেষে

 

বিশ্ব-উষ্ণায়নের প্রভাবে সুন্দরবন ও ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চল গভীর সঙ্কটে। এই সব অঞ্চলে প্রচুর গরিব মানুষ থাকেন। প্রতি বছর প্রাকৃতিক বিপর্যয় হবে আর আমরা তাদের ত্রাণ দিতে বেরবো সে তো হতেই পারে। কিন্তু শুধু ত্রাণেই কি কাজ ফুরোবে? আমরা আবার যে যার কাজ করব আর সুন্দরবন পড়ে থাকবে সুন্দরবনেই? এটা কখনও চলতে পারে না। পরিবেশ, সমাজকর্মী, রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সুন্দরবনের মানুষকে এটা বুঝতে হবে। চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আর সেই পরিকল্পনার মূল সুর হল জলবায়ু পরিবর্তন নিরোধক ব্যবস্থার পরিকল্পনা বা ক্লাইমেট রিজিলিয়ান্ট প্ল্যানিং। আর তা যদি না হয় তবে সর্বনাশের হাত থেকে সুন্দরবনকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। সিদ্ধান্তের দায় এখন আমাদেরই।

 

লেখক পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিষয়ক পরামর্শদাতা, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

 

রেফারেন্সঃ

 

১. https://india.mongabay.com/2020/01/satellite-data-uncovers-health-decline-in-25-percent-of-sundarbans-mangroves/

২.Tusinski, Andrzej & Verhagen, Henk. (2014). THE USE OF MANGROVES IN COASTAL PROTECTION. Coastal Engineering Proceedings. 1. 45. 10.9753/icce.v34.management.45.

৩) Verhagen, Henk. (2012). The use of mangroves in coastal protection. COPEDEC 2012: Proceedings of the 8th International Conference on Coastal and Port Engineering in Developing Countries, Chennai, India, 20-24 February 2012.

৪[ক]) https://m.telegraphindia.com/states/north-east/bangla-model-to-keep-majuli-crops-afloat/cid/1422898৪)

৪খ) https://www.livehindustan.com/bihar/story-achievement-saharsa-of-bihar-became-first-district-where-organic-vegetables-are-being-cultivated-on-boat-with-fish-production-in-pond-3889947.html

৪গ) https://www.abplive.com/states/bihar/peasants-of-bihar-have-adopted-unique-farming-techniques-said-income-will-double-by-doing-this-ann-1805005

৫) https://www.dw.com/en/seaweed-cultivation-ushers-waves-of-change-in-the-sundarbans/a-18861596

৬) https://www.downtoearth.org.in/coverage/fancy-wall-for-sundarbans-38166

৭) https://india.mongabay.com/2020/05/embankment-politics-livelihood-loss-pandemic-and-other-issues-mount-in-sundarbans/

৮) J.C. Winterwerp, P.L.A. Erftemeijer, N. Suryadiputra, P. Van Eijk, L.-Q. Zhang

Defining eco-morphodynamic requirements for rehabilitating eroding mangrove-mud coasts

Wetlands, 33 (3) (2013), pp. 515-526, 10.1007/s13157-013-0409-x

৯) E.J. Anthony, N. Gratiot.Coastal engineering and large-scale mangrove destruction in Guyana, South America: Averting an environmental catastrophe in the making. Ecol. Eng., 47 (2012), pp. 268-273, 10.1016/j.ecoleng.2012.07.005

১০) J.C. Winterwerp, W.G. Borst, M.B. De Vries. Pilot study on the erosion and rehabilitation of a mangrove mud coast. J. Coast. Res., 21 (2) (2005), pp. 223-231

১১) Johan C. Winterwerp, Thorsten Albers, Edward J. Anthony, Daniel A. Friess, Alejandra Gijón Mancheño, Kene Moseley, Abdul Muhari, Sieuwnath Naipal, Joost Noordermeer, Albert Oost, Cherdvong Saengsupavanich, Silke A.J. Tas, Femke H. Tonneijck, Tom Wilms, Celine Van Bijsterveldt, Pieter Van Eijk, Els Van Lavieren, Bregje K. Van Wesenbeeck, Managing erosion of mangrove-mud coasts with permeable dams – lessons learned,Ecological Engineering,Volume 158,2020,106078,https://doi.org/10.1016/j.ecoleng.2020.106078.(https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0925857420303669)

১২) https://thebastion.co.in/politics-and/creating-resilient-livelihoods-in-the-sundarbans-sans-embankments/

13) B A M Shahriar. Development of Climate Resilient Slope Protection for Dykes in Saline Zones of Bsngladesh. PhD Thesis. Department of Civil Engineering. Bangladesh University of Engineering and Technology.

(https://www.researchgate.net/publication/344597345_DEVELOPMENT_OF_CLIMATE_RESILIENT_SLOPE_PROTECTION_FOR_DYKES_IN_SALINE_ZONES_OF_BANGLADESH)

 

ছবি ১ : ভিয়েতনামের তটরেখায় ম্যানগ্রোভের দুটি সাকসেশন  টুশিনকি ও ভারহ্যাগেন, ২০১৪ ও ভারহেগেন ২০১২  ও  নাগুয়েন ২০০৮ অনুসারে)

 

ছবি ২ : হাওয়া ও সল্ট স্প্রে নিরোধক গাছের সারি (Coastal protection in the aftermath of the Indian Ocean tsunami: What role for forests and trees? Proceedings of the Regional Technical Workshop, Khao Lak, Thailand, 28–31 August 2006 অনুসারে)

 

ছবি ৩ :

ছবি ৩: ইয়োরোপের উপকুলের ভেদ্য বাঁধ, সল্ট মার্শ ও ডাইক (Winterwerp et al, 2020)

 

ছবি ৪ :

ছবি ৪: ভেদ্য বাঁধ, জোয়ারের অভিমুখ ও ভূমির অবস্থানের লেখচিত্র (Winterwerp et al, 2020)

 

ছবি ৫:

ছবি ৫: ইন্দোনেশিয়ায় এমন ভেদ্য বাঁধ, সল্ট মার্শ, মাড ফ্ল্যাট ও ম্যানগ্রোভ (Winterwerp et al, 2020)

 

ছবি : ৬

ছবি ৬ : ভেদ্য বাঁধের গঠন (Winterwerp et al, 2020)

 

ছবি : ৭

ছবি ৭: ভেদ্য বাদ কিভাবে জলোচ্ছ্বাসকে প্রতিরোধ করে (Winterwerp et al, 2020)

 

ছবি : ৮

ছবি ৮ : ভেদ্য বাঁধের গঠনপ্রণালী (Winterwerp et al, 2020)

 

ছবি : ৯

ছবি ৯ : সুন্দরবনের মতো কর্দমাক্ত মোহনায় মাটির ডাইক রাখার জন্য কেমন করে লাগানো উচিত ভেটিভার। উপরে বামদিকে জিওজুটের লেয়ারের মধ্যে দিয়ে ড্রিল করে বসানো হচ্ছে, উপরে ডানদিকে জিওজুট ইউপিন দিয়ে আটকানো হচ্ছে, নীচে ভেটিবার গুচ্ছের এই ধরনের ভুপ্রাকৃতিক স্থানে রো থেকে রো ও পাশাপাশি কতটা গ্যাপে লাগানো উচিত (২০০ মিমি) (Shahriar, 2015)

 

Share this
Recent Comments
2
  • We are inhabitants of Sundarban area
    try to educate, organise, agitate the people for life and livelihood and flora
    and fauna of Sundarban.

  • comments
    By: Aditya Thakur on June 5, 2021

    অত্যন্ত তথ্য পূর্ণ লেখা। সামগ্রিক ভাবে সুন্দরবনের সমস্যা কে তুলে ধরা হয়েছে এবং সমস্যার সমাধান কীভাবে হতে পারে তার একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে।
    প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা লেখাটি পড়ে সমস্যা সমাধানের বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে সবাই উপকৃত হবেন।

Leave a Comment