মানুষ মরুক অক্সিজেনের অভাবে; বিজেপি অক্সিজেন জুগিয়ে চলেছে করোনাভাইরাসকেই


  • April 29, 2021
  • (0 Comments)
  • 756 Views

হাসপাতালে বেডের অভাবে, ওষুধের অভাবে এবং অক্সিজেনের অভাবে করোনা রোগীদের প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু এখনো ঘটে চলেছে। শ্রমজীবী, চাকুরিজীবী, দোকানদার, উকিল, সাংবাদিক, সরকারের পক্ষধারী বা বিপক্ষধারী, ক্যাডার বা ছোটমাপের নেতা, উঁচু জাত বা নীচু জাত, মুসলমান, হিন্দু, শিখ, ক্রিশ্চান প্রত্যেকে এই দ্বিতীয় করোনা সংকটের শিকার। এর জন্য ভাইরাস যত না দায়ী, দেশের সরকারের ব্যবসায়ী তোষণ আর  স্বাস্থ্য পরিষেবার বেসরকারিকরণ অনেক বেশি দায়ী। স্পষ্টই, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর শোষণ ও দুর্নীতি ছাড়া দেশের মানুষকে দেওয়ার আর কিছু নেই। বিজেপির হিন্দুপ্রেম যে শুধু মুসলমানদের দোষারোপ করাতেই সীমিত, গত বছর এবং এবছরের করোনা সংকট-কে ঘিরে সরকারের ভূমিকা তা-ই প্রমাণ করছে। লিখেছেন গুরুপদ ধর

 

পরম্পরা বাঁচাতে অক্সিজেন লাগে না

 

গতকাল খবরে জানা গেল, উত্তরপ্রদেশের এক যুবক ট্যুইটারে তাঁর দাদুর জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডারের খোঁজ করায় রাজ্যের পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে। যুবকের আক্কেলের অভাব দেশে অক্সিজেনের অভাবের মতোই সমস্যাজনক। এই আনরুলি এলিমেন্টগুলোর ব্যাপারেই তো আরএসএস জেনারেল সেক্রেটারি দত্তাত্রেয়া কিছুদিন আগে দেশকে সাবধান করেছেন; বলেছেন, এসবই ‘ওয়ান ইন্ডিয়া’-এ ‘মেনি’ করে দেবার অ্যান্টি ভারত ষড়যন্ত্র। তারপরেই বিজেপির অ্যাংরি ইয়াং হিন্দু নেতা – উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ চনমনে ভঙ্গিতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাজ্যের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের মোটেও কমতি নেই! অতএব তা সত্ত্বেও যে লোক অক্সিজেন নেই বলে কাঁদুনি গাইতে সাহস করবে, তার নামে এনএসএ ঠুকে দেওয়া হবে। মানে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন, তারপর দরকার মতো বাটাম, বেড়ি, নন বেলেবল, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ইত্যাদি। এমনিতেও এখন কোভিড এসে কাস্টডি কিলিং-এর ঝামেলা আদ্ধেক করে দিয়েছে। খাদের ধার – পিঠে টোকাটুকু দিলেই যথেষ্ট। তাও এ যুবকের এমন দুঃসাহস।

 

 

আচ্ছা এইজন্য কি যোগীরা বাঙালিদের পছন্দ করেন না? ওই যে বাঙালিরা নেকা নেকা মেয়েলি গলায় বলে, দাদা, আমি বাঁচতে চাই! রামচন্দ্র! য়ে ক্যায়সা বেহুদা বাত! কুম্ভমেলা নিয়ে হিঁদুধর্মের পরাকাষ্ঠা জুনা আখড়ার নারায়ণগিরি মোহান্ত মহারাজ কি সোজা কথা সোজা ভাষায় বলে দেননি? তিনি কি বলেননি যে, “মরণ নিশ্চিত, কিন্তু পরম্পরাকে বাঁচিয়ে রাখা চাই-ই চাই?” অতএব রই রই করে কুম্ভমেলা, ৩২ লাখের সমবেত পুণ্যস্নান, মকরসংক্রান্তি।

 

একইভাবে, মরণ নিশ্চিত, তবু বাংলা জয়ের লক্ষ্য বাঁচিয়ে রাখতে ভোটের মিছিল হওয়া চাই-ই চাই। অতএব অমিত শাহের বাণী – ভোট ক্যাম্পেনের সাথে ভাইরাস ছড়াবার কোনো সম্পর্ক নেই! এসবই, আবারও, দেশদ্রোহীদের মিথ্যে রটনা। অতএব সাঁ করে হরলিক্স খাওয়া বাড়ন্ত বাচ্চার মতো লাফ দিয়েছে বেড়ে চলেছে করোনা পজিটিভ কেস; সেইসঙ্গে আবারও শুরু হয়েছে নন-করোনা রোগীদের ভোগান্তি। কুম্ভমেলার লাগোয়া রাজ্যগুলোতে বড় বড় শহরে ‘বডি’ পোড়াবার ঠাঁই মিলছে না, দিল্লি-হরিয়ানায় অক্সিজেনের জন্য হাহাকার – নিশ্চিত মরণকে আরো চটপট নিশ্চিত করে তোলার খেলা – অল ফল ডাউন!

 

ভাইরাসের ভোটাধিকার থাকলে বছর বছর মোদী সরকারের বিপুল ভোটে জয় কে আটকাতে পারত!

 

 

কেন্দ্রীয় সরকার – সে যে পার্টির সরকারই হোক – দেশবাসীর জমি কেড়ে নেয়, জল, চাকরি, নানান অধিকার কেড়ে নেয় – এমনটা শোনাই যায়। কিন্তু শ্বাস নেবার অক্সিজেনটুকু অবধি সে যে একলপ্তে কেড়ে নিতে পারে – এমনটাই দেখা গেল এ বছর করোনা আক্রমণকালে। উপর-উপর এ সমস্ত দেখে আমাদের মনে হতে পারে, যে রাজ্য সরকারদের বদমাইশিই আমাদের প্রিয়জনদের যন্ত্রণা বা মৃত্যুর কারণ। রাজ্য সরকারগুলি কিছু জনদরদী ধোয়া তুলসীপাতা না, কিন্তু তারা গুছিয়ে বদমাইশি করার সুযোগ পেলে তো? কেন্দ্রীয় সরকার তো আর কাউকে স্টেজই দিচ্ছে না। এই গত জানুয়ারির শেষে বলল, বিজেপি-অধ্যুষিত ইন্ডিয়াই গোটা পৃথিবীকে করোনা-বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাবে, আবার এপ্রিল মাসে এসে বলছে যাঃ, সরি। ভ্যাক্সিন ফুরিয়ে গেছে, বিদেশ থেকে আনতে গেলুম… গেল বছর ডিসেম্বরে বলছে এক্ষুনি এএসইউ-কন্সেনট্রেটর বসিয়ে লিকুইড অক্সিজেনের বন্যা বইয়ে দেব, আবার এপ্রিলে এসে বলছে যাঃ! অক্সিজেন তো ফুরিয়ে গেছে, এক্ষুনি বিদেশে প্লেন পাঠালুম…

 

তবে অক্সিজেনের ব্যাপারে রাজ্য সরকারেরাও কমবেশি দায়ী বৈকি। কেরালা-তামিলনাড়ু বছরভর প্রস্তুতি নিয়ে অক্সিজেন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে, তাই এ দুটি রাজ্যে সংকট কম। কেরালা তো হু-এর এস্টিমেটর ফলো করে এখন যে শুধু নিজের রাজ্যে অক্সিজেন যোগান দিচ্ছে তা না, প্রতিবেশী রাজ্যে অব্দি পাঠাচ্ছে। তামিলনাড়ু সে ব্যাপারে তত উপুড়হাত নয়। পশ্চিমবঙ্গে বেড এবং ওষুধ নিয়ে সমস্যা হলেও অক্সিজেনের উল্লেখযোগ্য কমতির কথা শোনা যায়নি; সরকারি তরফে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অক্সিজেনের উৎপাদন কমিয়ে মেডিক্যাল অক্সিজেন উৎপাদনের কিছু প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু এর উল্টোদিকেই আবার আছে মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি, যেসব জায়গায় স্বাস্থ্য পরিষেবার, বিশেষ করে অক্সিজেন সাপ্লাই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রস্তুতির মান একেবারে তলানিতে।

 

 

সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা ধ্বসে পড়েছে, বেসরকারি ব্যবস্থার মুখে ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ ছাড়া কথা নেই। অথচ ধ্বসে পড়ছে না আমাদের অজেয় অমর বিশ্বাস, যে এখনো আমাদের মুশকিল আসান করতে পারে ভোট, ধর্ম, ব্যবসাদারের পুঁজি। বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার দক্ষতার বানানো গল্পে এখনো আমরা আশা রাখি, তার পিছনে রক্ত জল করা পয়সা খরচা করি।

 

গত বছর এ সময় ভিনরাজ্যে কর্মরত শ্রমিকরা যেমন সরকার-বেসরকার সব্বার উপর আশা হারিয়ে হাজারো মাইল হাঁটা লাগিয়েছিলেন, আমাদের এইসমস্ত অমূলক বিশ্বাস থেকে বেরোতে তেমন কোনো হাঁটাপথের সন্ধান কি পাওয়া যাবে? না গেলে, করোনা নয়, গুটিকতক বড় ব্যবসাদারের দালালী করা এই সরকারই পাকে-পাকে জড়িয়ে, আস্তে জোরে আমাদের প্রাণবায়ুটুকু শুষে নিতে থাকবে।

 

 

আপাতত আয়ুষ্মান ভারতের প্রাণবায়ুর গ্রাফ কোন দিকে যাচ্ছে সেটা এই লিংক থেকে আন্দাজি দেখে নেওয়া যেতে পারে।

 

মানুষকে বাঁচাতে অক্সিজেন লাগে 

 

কোভিড আসার আগে ভারতে দিনে ৭০০-৮০০ টন মেডিকাল অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ত। উৎপাদন হত দিনে ৬৯০০-এর কাছাকাছি। তার মধ্যে ৬০০০ টন ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহার হত। তবু মানুষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যেত। সাপের কামড়ে, অ্যাক্সিডেন্টে, এনসেফ্যালাইটিসে, টিবিতে। মারা যেত, কারণ মেডিকাল অক্সিজেন উদ্বৃত্ত হতে পারে। কিন্তু দেশের সরকারের কাছে দেশের মানুষও তো উদ্বৃত্ত। যোগীর রাজ্যর কথাই মনে করা যাক। গোরক্ষপুর জেলায় ২০১৭ সালের অগাস্টে বাবা রাঘব দাস হাসপাতাল বিল না ভরায় অক্সিজেন লাইন কেটে দেওয়া হয়। তাতে এনসেফ্যালাইটিস ওয়ার্ডে ৬৩টি শিশু প্রাণ হারায়। বয়স্কদের, অন্তঃসত্ত্বা মায়েদেরও ক্ষতি হয়। ইউপি সরকার চট করে তখন ওয়ার্ডের মুসলমান ডাক্তার কাফিল খানকে গ্রেপ্তার করে মুশকিল আসান করে। সংকট ছাড়াই যখন অবস্থা এই, তখন সংকটকালে মানুষের মৃত্যুমিছিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

 

হিন্দুস্থানের হিন্দুজাতির প্রতি যোগীদের এইরকম ভালবাসা। এবারের অক্সিজেন কাণ্ডেও সেকথা বারবার প্রমাণ হয়ে গেছে।

 

 

২০২১, এপ্রিলের ১৫ তারিখ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ভারতে এখন দিনে ৭১২৭ টন লিকুইড অক্সিজেন তৈরি হচ্ছে এবং তার মধ্যে ৩৮৪২ টন মেডিকাল অক্সিজেন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে কি এখনো অক্সিজেন উদ্বৃত্ত? না। তার কারণ পরের সাতদিনে ২২ এপ্রিল নাগাদ কেসের সংখ্যা প্রায় ৭০% বেড়ে গেছে। ডিপিআইআইটির এক অফিসার ২১ এপ্রিল জানিয়েছেন, দেশে এখন দিনে প্রায় ৮০০০ টন অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, যা কিনা মোট উৎপাদনের চাইতেও বেশি। ফলে, যদিও সরকার এখন দেশ জুড়ে জলের বিশুদ্ধিকরণ, ওষুধ তৈরি ইত্যাদি অতিপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্র ছাড়া অন্য ইন্ডাস্ট্রিতে অক্সিজেনের সাপ্লাই বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে, এবং বিপন্ন রাজ্যগুলিতে অক্সিজেনের কোটা বাড়াচ্ছে, তবু কিছু মানুষ এই লপ্তে অক্সিজেনের অভাবে যন্ত্রণা পাবেনই, মারা যাবেনই।

 

এই ৮০০০ টনের হিসেবটা পরিষ্কার নয়। ওই ২২ এপ্রিলেই আবার সরকার ঘোষণা করে, দেশের ২০টা রাজ্যে দিনে ৬৭৮৫ টন মেডিকাল অক্সিজেন ব্যবহার হচ্ছে, এবং দেশবাসীকে বোনাস দিয়ে সরকার দিনে ৬৮২২ টন অক্সিজেন সরবরাহ করার ব্যবস্থা করেছে (বাকি ৮টা রাজ্য আর ইউনিয়ন টেরিটরিগুলো কি বানের জলে ভেসে গেল?)। ৮০০০, ৬৭৮৫ – সাধারণ মানুষের কাছে এসব সংখ্যা – সংখ্যা মাত্র। তবে এসব দিয়েই তো ভোট ক্যাম্পেনের পোস্টার তৈরি হয়: লে, যা দরকার, তার থেকেও একশো টন বেশি দিলুম। তোরা আমায় ভোট দে, আমি তোদের অক্সিজেন দেব।

 

 

যাই হোক, কেন্দ্র বিদেশ থেকে ৫০,০০০ টন মেডিক্যাল অক্সিজেন আনার কথাও ঘোষণা করেছে, যা দিয়ে বর্তমান হারে মাস দুয়েক ঠেকা দেওয়া সম্ভব হবে। সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব থেকে এসেছে অক্সিজেন, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, রাশিয়া থেকেও আসবে বলে প্রতিশ্রুতি এসেছে। সাহায্যের প্রস্তাব এসেছে পাকিস্তান থেকে, পাঞ্জাব-পাকিস্তানের ভিতর যাতায়াতের করিডর খুলে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। জার্মানি থেকে ভ্যাক্সিন ছাড়াও ২৩টি অক্সিজেন জেনারেশন প্ল্যান্ট উড়িয়ে আনার কথা হয়েছে।

 

অক্সিজেন প্ল্যান্টের হালহকিকত

 

গন্ধমাদনের মতো গোটা গোটা প্ল্যান্ট উড়িয়ে আনা – এই তো রামভক্ত সরকারের উচিত কাজ। কিন্তু এদেশেও যে জেলায় জেলায় হাসপাতালে প্ল্যান্ট বসবে বলে শোনা গেছিল, তার কী হল?

 

গেল বছর শরৎকালে পিএম মোদী বাতাস থেকে অক্সিজেন তৈরির আইডিয়া দিয়ে রাহুল গান্ধীর রঙ্গরসিকতার লক্ষ্য হয়েছিলেন। তা বাতাস থেকে অক্সিজেন তৈরি করা যাক ছাই না যাক,  আমরা এটুকু জানি যে, ২০২০-র এপ্রিলে সরকারি তরফে ১১ জন অফিসারের একটি এমপাওয়ার্ড গ্রুপ তৈরি করা হয়েছিল। আর সেই অফিসাররা দেশিবিদেশি প্রাইভেট কোম্পানি, এনজিও ইত্যাদিদের সাথে কথাবার্তা বলে নাকি এও বুঝতে পেরেছিলেন যে, দেশে অক্সিজেনের অভাব আসতে চলেছে। তাঁরা তখন দেড়শোটা প্রেশার সুইং অ্যাডজর্পশন (পিএসএ) অক্সিজেন জেনারেশন প্ল্যান্ট তৈরি করতে উপদেশ দেন। সেগুলো তৈরি করে ফেলবার মতো পরিকাঠামো বলুন টাকা বলুন, দুয়েরই কোনো অভাব দেশের সরকারের ছিল না। এই ১৫০-টা পিএসএ প্ল্যান্ট, পরে বাড়িয়ে যে সংখ্যাটা ১৬২ করা হয়, বানাতে সরকারের খরচা পড়ত ২০০ কোটি (সঠিক মান ২০১.৫৮ কোটি) টাকার কাছাকাছি, মানে গড়ে এক-একটা প্ল্যান্ট বানাতে ১.২৫ কোটি টাকা।

 

 

২০০ কোটি টাকা মহান ভারত রাষ্ট্রের কাছে কতখানি? আপনার-আমার দু’দশ টাকার মতোই তো? এর চাইতে কত বেশি ধন যায় রাজমহিষীর এক প্রহরের প্রমোদে! ওই যে মোদী-শা’য়ের বেনেভাইরা, যারা সুযোগ পেলেই ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’-এ ব্যাঙ্কের টাকা আর গরিব লোকের ভাত মেরে করোনাকালেও হুলিয়ে লাভ করে, তেমন দশ-বিশটা কোম্পানিরই তো শোনা যায় ব্যাঙ্কের কাছে কয়েক লাখ কোটি টাকা অদেয় ধার – যে ধার আদায়ে সরকারের গা-ই নেই। তারপর ধরা যাক সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রজেক্ট, মানে কেন্দ্রীয় সরকারের জমিদারবাড়ি ভেঙ্গেচুরে আবার করে বানাবার কর্মকাণ্ড, জানুয়ারিতে যার কাজ শুরু হয়েছে ১৩৪৫০ কোটি টাকা বাজেট করে। মোদ্দা কথা, এসব দেখে চোখকান বুজে এটুকু বলা যেতেই পারে, যে অক্সিজেন প্ল্যান্ট বানাবার মতো টাকা ভারত সরকারের আছে। ২০০ কেন, স্ক্রোলে যেমন লিখেছে, ২০০-টা বাড়িয়ে ২০০০ কোটি বের করে ফেলাও সরকারের পক্ষে কঠিন না। অক্সিজেনের জন্য যে পিএমকেয়ার থেকে টাকা দেওয়ার কথা হয়েছে, তাতেও তো গতবছর নাহোক ৩০০০ কোটি টাকা জমা পড়েছে – জনতারই টাকা। ১৬২টা প্ল্যান্ট থেকে দিনে ১৫৪ মেট্রিক টন লিকুইড অক্সিজেন পাওয়া যাবে বলে জানানো হচ্ছে, যদিও দরকারটা তার চাইতে অনেক, অনেক বেশি, তবু তো কিছু মানুষের প্রাণ বাঁচবে। আর ২০০-টাকে সত্যি ২০০০ করা গেলে তো আর কথাই ছিল না।

 

 

খবর নিয়ে দেখা গেল, ১৪টা রাজ্যের ৬০টা হাসপাতালে ১৬২টা প্ল্যান্টের মধ্যে বসেছে ১১টা, তারও মধ্যে মোটে ৫টা কাজ করতে শুরু করেছে। এই খবর বেরোতে না বেরোতে স্বাস্থ্য দপ্তর ট্যুইট করে উঠল – মোটেই ১১টা নয়! পুরো ৩৩টা প্ল্যান্ট বসেছে – ৫টা এমপি-তে, ৪টে হিমাচলে, গুজরাত, উত্তরাখণ্ড, বিহারে দুটো করে…ইত্যাদি।

 

এখন নাকি ৩৩
এপ্রিলের শেষের নাকি ৫৯
মে-র শেষের মধ্যে নাকি ৮০…

 

স্ক্রোলের রিপোর্টার কিন্তু ঠিক ধরেছেন! তাহলে কি মে-র শেষের মধ্যে মোট ৮০ খানা প্ল্যান্ট তৈরি হবে? সে তো ১৬২-র অর্ধেকেরও কম? দিনে মোটে ৭০-৮০ টন অক্সিজেন তৈরি করেই কি সরকার খালাস? কারণ তা যদি না হয়, তাহলে, ৩৩+৫৯+৮০=১৭২ – এই সংখ্যাটা তো আবার ১৬২-র চেয়ে ১০ বেশি! তাহলে কি ওই ১০ খানা প্ল্যান্ট বোনাস? পরাজিত করোনা-ওয়ারিয়রদের প্রতি সরকারের উচ্ছুগ্গ?

 

 

একে তো যোগবিয়োগ করতে গিয়ে ছড়ায়, তার উপর কেন্দ্র আবার বলে কিনা, ওই ১৬২খানা প্ল্যান্টকে “ক্লোজলি রিভিউ” করা হচ্ছে। শুধু তাই না, দিন তিনেক আগে আবার বলে শিগগিরই মোট ৫৫১টা প্ল্যান্ট তৈরি হয়ে যাবে। ওরে এতই যদি ক্ষমতা ছিল, এতদিন নাকে তেল দিয়ে ঘুমনো কেন? যাক, আপাতত এই ১৬২টা প্ল্যান্টের গল্পটা আরেকটু বুঝে নেওয়া যাক।

 

দেশের মধ্যে অক্সিজেন সব রাজ্যে তৈরি হয় না, বা হলেও যথেষ্ট হয় না। খনিজপ্রধান ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিসগড়ে হয়। পশ্চিমবঙ্গে হয়। তাছাড়া কেরালা, তামিলনাড়ু, কর্নাটকে হয়। মহারাষ্ট্র-গুজরাত-অন্ধ্র-রাজস্থানে খানিক খানিক। কিন্তু মূল উৎপাদন দেশের পুব ও দক্ষিণ দিকটাতেই বেশি। ফলে হঠাৎ দরকার পড়লে, বিশেষ করে পশ্চিমদিকের রাজ্যগুলোতে সংকট উপস্থিত হতেই পারে, যেমন এখন হয়েছে। অক্সিজেন পরিবহনেরও নাজেহাল দশা। সিলিন্ডারের অভাব। তার উপর বিস্ফোরণের ভয় রয়েছে বলে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটারের বেশি স্পিডে ট্রাক চালানো যায় না। নেতারা যদিও ক্যামেরার সামনে আঙ্গুল তুলে শাসিয়ে চলেছেন যে সিলিন্ডারের গাড়িকে সবার আগে যেতে দিতে হবে, তাতে কী!

 

যেমন, কিছুদিন আগে মধ্যপ্রদেশের একটি হাসপাতালে ৭-৮ জন করোনা রোগীর অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু ঘটল বলে রোগীর পরিবারগুলি দাবি করেন। সেদিন একটি ট্রাক ৯০০ কিলোমিটার দূর থেকে সিলিন্ডার নিয়ে ওই হাসপাতালে আসছিল, কিন্তু ড্রাইভার ক্লান্ত হয়ে পড়ায় রাতে গাড়ি চালাতে পারেননি, তার উপর রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা নাকি পথে ট্রাক থামিয়ে পুজো দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ফলে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড়দিন পরে ট্রাকটি পৌঁছতে পারে। দীর্ঘ যাত্রাপথে এমন প্রতিটি ছোটবড় বাধা কি উদ্ধত আঙ্গুলের শাসানি মেনে চলবে? অথচ এই মুহূর্তে এমন প্রতিটি বাধারই মূল্য দিতে হতে পারে প্রাণের বিনিময়ে। তবে এখন, দেরি করে হলেও, বিশাখাপত্তনম, রৌরকেল্লা, জামশেদপুর আর বোকারো স্টিল প্ল্যান্ট থেকে ট্রেনে করে একাধিক ১৫০০০ লিটারের (১৭ টন) অক্সিজেন ট্যাংকার পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়েছে। তাতে অবস্থার কিছু উন্নতি হবে আশা করা যায়।

 

তাই লোকাল পিএসএ অক্সিজেন প্ল্যান্ট এত জরুরি। এতে হাসপাতালগুলি তার সংলগ্ন অক্সিজেন প্ল্যান্ট থেকে সোজাসুজি পাইপলাইনের মাধ্যমে অক্সিজেন পাবে, দূরপাল্লার পরিবহনেরও দরকার হবে না, খরচাও অনেক কমে যাবে। তাতে অক্সিজেন সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। কিন্তু, একজন সাধারণ করোনা রোগীর অক্সিজেনের প্রয়োজন মিনিটে ৬-১০ লিটার; অতএব একটি পিএসএ প্ল্যান্ট, যা মিনিটে ৬১৮ লিটার অক্সিজেন উৎপাদন করতে পারে বলে জানানো হচ্ছে, তার সাহায্যে হাসপাতালটি ৬০-১০০ জন রোগীর দেখাশোনা করতে পারবে। ইমার্জেন্সি হলে দ্রুত ঠেকা দিতে পারবে। ফ্লো নেজাল থেরাপির মতো চিকিৎসা পদ্ধতি, যাতে বেশি অক্সিজেন প্রয়োজন, দরকার হলে তারও ব্যবহার করার কথা ভাবতে পারবে।

 

 

মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। কী হল সেই ১৬২টা প্ল্যান্টের? এমপাওয়ার্ড গ্রুপের অফিসাররা ইন্ডিয়ান গ্যাস অ্যাসোসিয়েশন-এর সাথে মিটিং ডাকলেন, তাতে নীতি আয়োগের কর্তারা থেকে শুরু করে কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি অব্দি কারো আসতে বাকি রইল না। অতএব “আগে জানতুম না, তাই দেরি করে ফেলেছি” বলার কোনো জায়গাও রইল না। একপ্রস্থ কাজ শুরু হল।

 

বাকি গল্পটা থালা বাজানো কেন্দ্রী সরকারের গড়িমসির। অক্সিজেন উৎপাদনের টেন্ডার ফ্লো করাতে লেগে গেল ৭ মাস। ২১ অক্টোবর নানান জেলা হাসপাতালে ১৫০টা পিএসএ প্ল্যান্ট বসাবার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রকের অটোনমাস প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল মেডিকাল সার্ভিসেস সোসাইটি থেকে অনলাইন টেন্ডার দেওয়া হল। টেন্ডার জিতে নিল তিনটে কোম্পানি – উত্তম এয়ার প্রোডাক্টস, এয়ারক্স টেকনোলজিস আর অ্যাবস্টেম টেকনোলজিস। এক-একটা প্ল্যান্ট ইনস্টল করতে সময় লাগার কথা মোটে ৪-৬ সপ্তাহ। তবু বসল না অধিকাংশ প্ল্যান্ট।

 

হাসপাতালদের আঙ্গুল কোম্পানিগুলোর দিকে। হয় তারা সাইট দেখতে হাসপাতালে এসেই ওঠেনি, নয় প্ল্যান্ট বসিয়েও চালু না করে হাওয়া হয়ে গেছে। আবার কোম্পানিরা দায়ী করছে হাসপাতালগুলোকে। উত্তম এয়ার তাদের মধ্যে এক কাঠি উপরে। তাদের টেন্ডার জেতা ক্লায়েন্ট গান্ধীনগর জিএমইআরএস মেডিকাল কলেজ জানতেই পারেনি যে সেন্ট্রাল মেডিকাল সার্ভিসেস সোসাইটি উত্তমকে ব্ল্যাকলিস্ট করেছে। কারণ তারা নাকি চুক্তিপত্রে সইও করেনি, সিকিউরিটি ডিপোজিটও দেয়নি। স্বাভাবিক ভাবেই উত্তম এয়ার এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি নয়। তার ক্লায়েন্টদের অক্সিজেনের প্ল্যান্ট অথই জলে।

 

জাল ফেলে আন্দোলনজীবী ধরতে ব্যস্ত সরকার বা বিচারব্যবস্থার অবশ্য এসব নিয়ে হেলদোল নেই। হাসপাতালে-অ্যাম্বুল্যান্সে-ঘরে-ঘরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন মানুষ। সিলিন্ডার সাপ্লায়ারদের ফোন বেজে যাচ্ছে। ঠেলাগাড়িতে-হাসপাতালের বাথরুমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকছে শবদেহ। এই সময়টা যখন পেরিয়ে যাবে, তখনো আমরা ভুলতে পারব না অক্সিজেনের জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যাকুল এসওএস। ভোলা যাবে না হাসপাতালের বেডে শোয়া রোগীকে গোরুর হিসি খাওয়ানোর চেষ্টা, অ্যাম্বুলেন্সের ভিতর জীবনসঙ্গীর মুখে মুখ দিয়ে অক্সিজেনের যোগানোর চেষ্টা। ভোলা যাবে না দিনে ৫০ বা ৮০ বা ১৫০ বা ৪০০ জনের দেহ পোড়াতে পোড়াতে  ইলেকট্রিক চুল্লির চিমনি গলে যাওয়া – সুরাতে, মোদীর খাস রাজ্যে।

 

খাস তালুকে অক্সিজেন

 

এ প্রসঙ্গে মোদী-যোগীর খাস তালুক গুজরাত আর উত্তরপ্রদেশের হাল বিস্তারিত দেখে নেওয়া যাক।

 

এনএসএ ঠুকে বা সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েও লখনউ-এর বিনয় শ্রীবাস্তবদের মতো মানুষদের আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। ৬৫ বছরের এই সাংবাদিকের অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমতে কমতে ৫২, তারপর ৩১ হয়। তবু তাঁকে হাসপাতালেই ভরতি করা যায়নি। কারণ সে রাজ্যের নিয়ম, সিএমও-র চিঠি ও আরটি-পিসিআর রিপোর্ট নিয়ে তারপর আবার ইন্টিগ্রেটেড কম্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারের কাছে গিয়ে পারমিশন করালে তবেই হাসপাতালে যাবার সুযোগ মিলতে পারে। মরণাপন্ন রোগী নিয়ে ক’জনের পক্ষে এতখানি করা সম্ভব? তার উপর না সে রিপোর্ট সময়ে আসে, না সিএমও-কে ফোনে ধরা যায়। বিনয়ের মতোই মারা গেছেন রাজ্যের প্রথম মহিলা রাজনৈতিক সাংবাদিক, সত্তরোর্ধ তভিশি শ্রীবাস্তব। নানা স্তরে চেনাশুনো থাকা সত্ত্বেও অন্তত ১০ জন সাংবাদিক মারা গেছেন ইউপি-তে। ফলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কল্পনা করতে অসুবিধা হয় না – যদিও সরকার তথ্য লুকিয়েই চলেছে। কানপুরে, গাজিয়াবাদে, লখনউতে – প্রতিটি শহরে দিনে ৫০ থেকে ৯০টি দাহ হচ্ছে, কখনো আবার কয়েকশ’। সরকারের বক্তব্য নানাবিধ। কখনো বলা হচ্ছে, কেউ মরেনি, কখনো বলা হচ্ছে অল্প কিছু লোক মারা গেছে, কখনো আবার বলা হচ্ছে, না, মারা গেছে বটে, কিন্তু তার মধ্যে আশেপাশের জেলার, রাজ্যের লোক আছে। নিশ্চয়ই আশেপাশের জেলার, রাজ্যের কিছু কিছু মানুষ এই মৃতের ভিড়ে রয়েছেন। তাতে অবস্থার ভয়াবহতা কমে যায় কি? আলিগড়ে অক্সিজেনের অভাবে ৫জন মারা গেছেন বলে দাবি উঠেছে, যদিও হাসপাতাল তা অস্বীকার করেছে। কানপুর, সুলতানপুর, আগ্রা, বেরিলিতে হাসপাতালে অক্সিজেনের অভাবের কথা শোনা গেছে। গোরক্ষপুরে একটি নন-কোভিড হাসপাতালেও অক্সিজেনের কমতির ফলে সমস্যার কথা শোনা গেছে। যদিও রাজ্যের মেডিকাল এডুকেশন মিনিস্টার সুরেশ খান্না জানিয়েছেন, সব ঝুট হ্যায়!

 

 

গুজরাতের কথায় আসা যাক। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মতামত জানিয়েছেন, “গুজরাত মডেল বোগাস।” মমতাকে ভালবাসুন বা না বাসুন, এক্ষেত্রে তাঁর সাথে একমত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। পশ্চিমবঙ্গের মতো ব্যাপক ভাবে না হলেও এ রাজ্যেও বিজেপি করোনাকালে তার ভোট ক্যাম্পেনের ছাপ রেখে গেছে। একদিকে যখন গুজরাতের মানুষকে মাস্ক না পরার অপরাধে ১০০০ টাকা ফাইন করা হচ্ছে, অন্যদিকে তখন সপ্তাহ দুয়েক আগে বাই-ইলেকশন ক্যাম্পেনে এক বিরাট বাইক র‍্যালিতে বহু বিজেপি ক্যাডারই বিনা মাস্কে প্রচার চালিয়েছেন। আমেদাবাদে বা রাজকোট সিভিল হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুল্যান্সের প্রকাণ্ড লাইন, ৮-৯ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীদের ভিড়, শ্মশানে ১২ ঘণ্টার লাইন – এসব এখন জাতীয় খবর। গুজরাতের মানুষ অভিযোগ জানাচ্ছেন, ৫০-৬০টা হাসপাতালে ফোন করেও তাঁরা বেড পাচ্ছেন না, অথচ অ্যাডভোকেট জেনারেল কমল ত্রিবেদী গুজরাত হাইকোর্টকে সোনামুখ করে জানিয়েছেন, কোভিডের ফলে রাজ্যের মাত্র ৫৩% বেড ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধু যে কোর্ট তাতে সন্দেহ প্রকাশ করেছে তা-ই নয়, আমেদাবাদ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তাদের হিসেবও রাজ্য সরকারের সাথে একেবারেই মেলে না। কংগ্রেসের প্রাক্তন এমএলএ, আমেদাবাদের ডাক্তার জিতুভাই প্যাটেল প্রশ্ন তুলেছেন, এত বেড থাকলে আমেদাবাদে তড়িঘড়ি ডিআরডিও হাসপাতাল খোলার আবেদন কেন? আবার যদি আবেদনই করা হল, তবে অমিত শাহ এসে উদ্বোধন করা অবধি তাকে চালুই বা করা হল না কেন?

 

এছাড়া কর্তাব্যক্তিদের আরেক খাস তালুক হলো দিল্লি। আগে ছিল কেজরিওয়ালের। এখন লেফটেন্যান্ট জেনারেলের হাত দিয়ে কেন্দ্র তাকে বাগিয়ে নেবার তাল করছে। তবে অবস্থা দেখে মনে হয় দিল্লিতে অতিমারীর কামড় সামলাবার ভার কেজরিওয়ালের হাত থেকে বাগিয়ে নিতে বিজেপির হয়তো তেমন তাড়া নেই, যদিও দিল্লি হাইকোর্ট ল্যাজেগোবরে কেজরিওয়ালকে তেমনই ওয়ার্নিং দিয়েছে। অক্সিজেনের অভাবে দিল্লির জয়পুর গোল্ডেন হাসপাতালে ২৫ জনের মৃত্যু এবং স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালে ২৫ জনের মৃত্যু ছাড়াও বেশিরভাগ বড় বড় হাসপাতাল – ম্যাক্স হেলথকেয়ার, হোলি ফ্যামিলি, গুরু তেগবাহাদুর, ধর্মবীর সোলাঙ্কি – সকলেরই অক্সিজেনের অভাবে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। অথচ এই সংকটকালে দিল্লির প্রাপ্য অক্সিজেনের পরিমাণ দিনে ৩৭৮ থেকে ৪৮০ টন বাড়াবার কথা তুললে কেন্দ্র সরকার কী বলেছিল? না, পরের সপ্তাহের আগে এ নিয়ে নাকি কিচ্ছু বলা যাবে না। শেষে দিল্লি হাইকোর্ট মানবতার দোহাই দিলে তবে গিয়ে অ্যালটমেন্ট হলো – যদিও অ্যালটমেন্ট আর অক্সিজেন হাতে পাওয়ার মাঝে বহু জল বয়ে যেতে পারে।

 

ভারতে মানুষের ‘মিডিয়ান এজ’ ২৬.৮ বছর। অথচ বড় মুখ করে ভ্যাক্সিন সাপ্লাই দিয়ে পৃথিবী বাঁচাতে গেছিল যে ভারত সরকার, সে এখনো ৪৫ বছরের নীচে ভ্যাক্সিন চালু করে উঠতে পারেনি, ৪৫-এর উপরেও সাফল্য কহতব্য নয়। ফলে এদেশে মোটে ১১% মানুষ ভ্যাক্সিনের প্রথম ডোজ এবং ৮% দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন। অথচ ভ্যাক্সিন দিয়ে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি করে করোনাভাইরাসকে রুখতে গেলে অন্তত ৭০% মানুষকে ভ্যাক্সিন নিতে হবে। অতএব সংকটমুক্তির এখনো অনেক দেরি।

 

 

ধর্ম বনাম অক্সিজেন

 

‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি করার আরেকটা ‘বেত মারা পদ্ধতি’ হল, যত বেশি লোকের পারা যায় অসুখ বাধিয়ে দেওয়া। ভাইরাসজনিত অসুখ একবার হলে কয়েক মাস বা বছরের জন্য রোগী আর আক্রান্ত হন না। অতএব অনেকের অসুখ হলে ক্রমে ক্রমে অসুখ ছড়ানো বন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা – হার্ড ইমিউনিটির মানেই এই। কিন্তু হু থেকেও জানানো হয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীরাও জানিয়েছেন, এই পদ্ধতিতে গোটা দেশের অসুখ সারানোর চেষ্টা করা বিপজ্জনক, তাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটতে পারে। অবশ্য টিকা-বাণিজ্যের নিষ্ঠুর নিয়মে পৃথিবীতে এমন গরিব দেশও রয়েছে, যেখানে ২০২৩-২৪-এর আগে করোনা ভ্যাক্সিন পৌঁছবেই না, সে দেশগুলিতে ‘বেত মারা পদ্ধতি’ কাজে লাগানোটা দেশের মানুষের বা সরকারের ইচ্ছের উপর নির্ভর করবে না।

 

অক্সিজেন সংকটের গল্পকে ২০২১-এর কুম্ভমেলা ছুঁয়ে যেতেই হবে। কুম্ভমেলা যেন অজান্তে বেত মেরে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির চেষ্টা। মেলায় যাওয়া ভক্তদের মধ্যে ১৬০০ কোভিড পজিটিভ কেস তো হিসেবেই উঠে এসেছে, হিসেবের বাইরে আরো কত তা কে জানে। সূর্য মেষরাশিতে নাকি বৃহস্পতি কুম্ভরাশিতে প্রবেশ করার ফলেই হোক, আর মেলার হর্তাকর্তা অখিল ভারতীয় আখড়া পরিষদের চাপে পড়েই হোক, কুম্ভমেলাকে তার ২০২২-এর ক্যালেন্ডার থেকে এক বছর এগিয়ে আনার বিপদের কথা যে বিজেপির অজানা ছিল না, তার একাধিক প্রমাণ রয়েছে

 

অজানা হবেই বা কেন? গত বছরের তবলিঘি জামাত সমাবেশে ভাগ নেওয়া মুসলমানদের বন্দি করা, বা মুসলমান সমাজের ঘাড়ে করোনার দায় চাপিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে পথেঘাটে সাধারণ মানুষকে করোনা থেকে বাঁচাবার নামে কথায় কথায় ফাইন করা, এমনকি ঠেঙ্গিয়ে হত্যা বা অর্ধহত্যা করা – এ তো সেই একই বিজেপি।

 

 

এমনকি এবছরও, কুম্ভমেলা চলাকালীন, দিল্লিতে নিজামুদ্দিন মার্কাজ মসজিদে ধর্মীয় জমায়েত আটকাতে গেছিল যে, সেও তো সেই একই বিজেপি। তাই উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী ত্রিবেন্দ্র সিং রাওয়াতকে লজ্জার মাথা খেয়ে বলতে হয়, গঙ্গায় পুণ্যস্নানে করোনা ফরোনা হয় না। লেকিন! “কুম্ভ আর মার্কাজের তুলনা করতে যেও না!” কথাটা ভুল না। মার্কাজের ৫০ জনের জমায়েত আর কুম্ভের লাখো লাখো মানুষের জমায়েতের মধ্যে করোনা ছড়াবার দায়িত্ব কার বেশি, তা বোঝার জন্য হিসেব কষার দরকার পড়ে না।

 

 

আবার এর পাশাপাশি আছে গাজিয়াবাদে গুরুদ্বারা থেকে ‘অক্সিজেন লঙ্গর’ খোলা; গুজরাতের ভদোদরায় জাহাঙ্গিরপুরা মসজিদকে ৫০ বেডের কোভিড ফেসিলিটিতে পরিণত করা… দিল্লি হাইকোর্ট ক’দিন আগে মন্তব্য করেছে, “যা অবস্থা, এদেশের হাল আসলে ধরা ভগবানের হাতে।” সরকার আর বিচারব্যবস্থা যখন তাদের ভগবান খুঁজে পেয়েছে কোটিপতি বেনেভাইদের জুতোর নীচে, তখন দেশকে নতুন ভগবানের খোঁজে বেরোতে হবে, তাতে আশ্চর্য কী!

 

বিচারব্যবস্থা কেন্দ্র সরকারকে কুকর্মের অক্সিজেন যোগায়

 

বিজেপি সরকারের কুকর্মে রামের ভাই লক্ষ্মণের মতো যথাসম্ভব সঙ্গ দিয়ে চলেছে দেশের উচ্চতম বিচারব্যবস্থা – সুপ্রিম কোর্ট। কোভিড তথা অক্সিজেনের ব্যাপারেও তার অন্যথা হয়নি। দ্বিতীয় করোনা আক্রমণের পর গুজরাত, দিল্লি, এলাহাবাদ, বম্বে, পাটনা – সমস্ত হাইকোর্ট নিজ নিজ রাজ্য সরকারদের সমালোচনা করেছে, অক্সিজেনের অভাব নিয়ে অসন্তোষ দেখিয়েছে। বম্বে আর দিল্লি সরাসরি কেন্দ্র সরকারেরও সমালোচনা করেছে। ম্যাড্রাস হাইকোর্টও ভোটের প্রচারে করোনা ছড়াবার সম্ভাবনার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে ইলেকশন কমিশনকে (বকলমে কেন্দ্রকে) ক্রিমিনাল বলে গাল দিয়েছে।

 

ঠেলা সামলাতে, চওড়া বুক নেতারা সুপ্রিম কোর্টকে ব্যবহার করে হাইকোর্টগুলির হাত থেকে কোভিডের ব্যাপারে সমস্ত ক্ষমতা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভাগ্য ভালো, এতে বাধ সেধেছেন উকিলরা – বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। ফলে ২৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টকে মানে মানে বলতে হয়েছে, কই না তো? “আমরা তো গোড়ার থেকেই বলে আসছি যে স্থানীয় সিদ্ধান্তগুলো শুধুমাত্র হাইকোর্টই নিতে পারে!”

 

কে বলতে পারে বার অ্যাসোসিয়েশনের তরফে এত জোরালো প্রতিবাদ উঠে না এলে কী হত? হয়তো অক্সিজেনের উপর সরকারের বসানো ১২% জিএসটি রদ হবার বদলে বেড়ে ১৮% হয়ে যেত, ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’-এ!

 

 

নেতারা ব্যবসায়ীদের কুকর্মের অক্সিজেন যোগায়

 

করোনাভাইরাস মানে, দেশের এক শ্রেণির কাছে মৃত্যুঘণ্টা, শরীরপাত, অবসাদ, জীবিকাহানি। আবার আরেক শ্রেণির কাছে, যেমন ব্যবসায়ী অনিল আগরওয়ালের কাছে করোনাভাইরাস মানে লাভ, শেয়ার, ব্যবসা-বিস্তার।

 

২০১৩-র মার্চে তুতিকোরিনে হাজার হাজার মানুষকে ঘায়েল করা সালফার ডাই অক্সাইড লিক হয়েছিল বেদান্ত স্টারলাইট প্ল্যান্ট থেকে। এই প্ল্যান্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলাকালীন পুলিশের গুলিতে ১৩ জন মানুষ মারা যান এবং বহু মানুষ অকথ্য অত্যাচারের মুখোমুখি হন (এখনো হয়ে চলেছেন)। গণস্বাস্থ্য ও পরিবেশের কথা মাথায় রেখে ২০১৮-য় প্ল্যান্টটির নামে পাকাপাকি ক্লোজডাউনের অর্ডার আসে। অক্সিজেনের অভাবের অজুহাত দেখিয়ে সেই একই প্ল্যান্ট খোলার অনুমতি আদায় করে নিলেন আগরওয়াল। তাঁর এই একই আবেদন গত বছর সুপ্রিম কোর্টই বাতিল করেছিল। এ বছর, শুধুমাত্র ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’-এর কুমীরছানা দেখিয়ে সেই একই আবেদনপত্র এককথায় পাশ করিয়ে নেওয়া হল ম্যাড্রাস হাইকোর্টের মাধ্যমে – বিজেপির হাতের আরেক পুতুল এখন রিটায়ার্ড চিফ জাস্টিস বোবদের হাত দিয়ে

 

কেন উঠছে না স্টারলাইটের মতো প্ল্যান্টের সরকারিকরণের দাবি? সিস্টেম আমাদের মাথার ভিতর পাকাপাকি ভাবে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে, যে সরকারি সংস্থা হল দুর্নীতি, আলস্য আর অদক্ষতার আরেক নাম। অথচ যে নীতি শ্রমজীবী, চাকুরিজীবী মানুষকে আরো আর্থিক-শারীরিক-মানসিক দুর্দশার দিকে ঠেলে দেয়, তা-ই তো দুর্নীতি। তাহলে?

 

 

শুধু অনিল আগরওয়াল নয়, করোনাকালে অন্য দেশের ব্যবসায়ীদের একাংশের মতো (বিশেষত অ্যামাজন, জুম, মাইক্রোসফট ইত্যাদি) ভারতীয় ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশও লাভবান হয়েছে। মুকেশ আম্বানির নেট ওয়র্থ বেড়ে পৌঁছে গেছে ৭.৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আম্বানিকে পৃথিবীর চতুর্থ ধনীতম ব্যবসাদারে পরিণত করেছে। বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি বড় অঙ্কের লাভ করেছে। মিত্তল ও আদানিরও বিত্ত বেড়েছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক লেবার অর্গ্যানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ভারতীয় শ্রমজীবী মানুষ আরো গরিব, আরো অসহায় হয়ে পড়েছেন।

 

টিকা-বাণিজ্যে ব্যবসায়ীদের খাতায় নতুন লাভের হিসেব ছকেছে। অক্সিজেন ব্ল্যাক মার্কেটের রবরবা, গুরুগ্রামে ৯০,০০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রির খবর শুনে আমরা চমকে উঠতে পারি, কিন্তু বড় বা মাঝারি পুঁজিবাদী দেশগুলোতে টিকা বাণিজ্যের নামে বেসরকারি কোম্পানিদের লাভের তুলনায় এসব ছিঁচকে চুরির চাইতেও অধম। শুধুমাত্র ভ্যাক্সিনের দামের কারণেই বহু গরিব দেশ মানুষকে টিকা দিয়ে উঠতে পারবে না। এর মধ্যে রয়েছে আফ্রিকার নানা দেশ, যাদের ভ্যাক্সিন পাবার আশা ক্ষীণ, ভারতে করোনা সংকটের বাড়াবাড়ির ফলে আরোই অথৈ জলে। অর্থাৎ, তথাকথিত ভ্যাক্সিন চ্যাম্পিয়ন ভারত সরকার শুধু নিজের দেশেই মানুষ মারছে না।

 

তার উপর রয়েছে বড়লোক দেশগুলোর ভ্যাক্সিন হোর্ডিং, বা ভ্যাক্সিন জাতীয়তাবাদ। মানে, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ভ্যাক্সিন জমিয়ে রাখা, ফলে একদিনে ভ্যাক্সিনের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে পৃথিবীর বহু দেশে ভ্যাক্সিন না পৌঁছে ওঠার সম্ভাবনা আরো বেড়ে যাচ্ছে – ঔপনিবেশিকতার এই-ই তো আধুনিক চরিত্র।

 

ভারতে, সেরাম ইন্সটিটিউট ও ভারত বায়োটেক-এর তরফে কেন্দ্র ও রাজ্যের কাছে আলাদা দামে (ডোজ প্রতি যথাক্রমে ১৫০ ও ৩০০ টাকা – সেরাম এবং ৬০০ ও ১৫০ টাকা – ভারত বায়োটেক) ভ্যাক্সিন বিক্রির মধ্যে দিয়ে কেন্দ্র সরকার এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছে: কেন্দ্রের তুলনায় রাজ্যগুলোর অকর্মণ্যতা প্রমাণ করা এবং ভ্যাক্সিন নির্মাতা প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর লাভ নিশ্চিত করা। অথচ কেন্দ্র থেকে এই কোম্পানিগুলোকে যে ৩০০০ কোটি ও ১৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল, তা ভারতীয় জনতারই টাকা।

 

স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেসরকারিকরণ ও একচেটিয়া ব্যবসার প্রতিবাদ, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির দাবি, ওষুধ-ভ্যাক্সিন-ডাক্তারি যন্ত্রপাতির পরিবহন ব্যবস্থার দাবি, সরকারি তরফে গণস্বাস্থ্যের নিয়মিত মনিটরিং বা নজরদারির দাবি, তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা ও সাধারণ মানুষের সামনে তার ফলপ্রকাশের দাবি, স্বাস্থ্যকে জনশিক্ষার অঙ্গ করে তোলার দাবি – এসব কি আমাদের দেশের গণ-আন্দোলনের মানচিত্রে আরো বেশি করে জায়গা নেবে না? নাকি আমরা মেনে নিতে রাজি আছি – রাষ্ট্রও যেমন চায় – সংকট জারি থাকুক, আর আন্দোলন ক্রমে ক্রমে রেশন বিলি, ওষুধ বিলি আর ফ্রি টুইশনির সাথে সমার্থক হয়ে উঠুক? আগামী কয়েক সপ্তাহে ধীরে ধীরে অক্সিজেন সংকটের সমাধান হবে। কিন্তু প্রতিবাদের, খতিয়ে দেখবার, মেনে না নেওয়ার সংস্কৃতিকে অক্সিজেনের ফ্রেশ সাপ্লাই দেবে কে?

 

Share this
Leave a Comment