তথ্যানুসন্ধান রিপোর্ট শীতলকুচি: গণতন্ত্রে গণহত্যা


  • April 25, 2021
  • (0 Comments)
  • 649 Views

গত ১০ এপ্রিল, ২০২১ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার চতুর্থ দফা নির্বাচন চলাকালীন কুচবিহারের শীতলকুচি বিধানসভার জোড়পাটকি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্ভুক্ত আমতলী গ্রামের ১২৬ নং বুথে (আমতলী মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র) সাধারণ ভোটারদের উপর গুলি চালায় সিআইএসএফ (সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স)। গুলিতে মৃত্যু হয় চারজনের। একইদিনে আবার শীতলকুচির পাঠানটুলি গ্রামের ২৮৫ নং বুথে একজনের মৃত্যু হয়। খবরটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশের পর থেকে রাজ্যের অধিকারসচেতন সকল মানুষের মনে নানান প্রশ্ন জাগে। মিডিয়ায় বিভিন্ন ভাবে প্রচারিত খবরের সত্যতা নিয়ে সংশয়ও তৈরি হয়। তার উপর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাদের ক্রমাগত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রচেষ্টা যথেষ্ট আশঙ্কিত করে। ঘটনার প্রাথমিক গুরুত্ব এবং এই অমানবিক অপচেষ্টা ও অনৈতিকতা বিচার করে ঘটনার দ্রুত তথ্যানুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি (এপিডিআর)।

 

১৫ এপ্রিল এবং ১৮ এপ্রিল এপিডিআর এর পক্ষ থেকে গোটা ঘটনার তথ্যানুসন্ধানে ঘটনাস্থলে যাওয়া হয় এবং নিহত-আহতদের পরিবার সহ স্থানীয়দের সাথে এব্যাপারে কথা বলা হয়।

 

তথ্যানুসন্ধান রিপোর্ট

শীতলকুচি: গণতন্ত্রে গণহত্যা

গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি (এপিডিআর)

২৪ শে এপ্রিল, ২০২১

 

১২৬ নং বুথের ঘটনার তথ্যানুসন্ধান:

 

ঘটনাস্থল:

জোড়পাটকি গ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবে শীতলকুচির অন্তর্ভুক্ত হলেও বস্তুত এই স্থানটি মাথাভাঙ্গার অন্তর্গত। থানাটিও মাথাভাঙ্গা। এ গ্রামে বসবাস করে মূলত রাজবংশী এবং নমঃশুদ্র অংশের মানুষেরা। রাজবংশীদের মধ্যে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকই রয়েছে। প্রতিনিধি দল প্রথমে পৌঁছায় আমতলী মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রে। এটাই শীতলকুচির সেই ১২৬ নং বুথ যেখানে গত ১০ এপ্রিল গুলি চলেছিল। বেলা তখন সওয়া বারোটা। গ্রামের রাস্তায় বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকজন দাঁড়িয়ে। চারদিকে একটা থমথমে ভাব। শিক্ষাকেন্দ্রের পাশে এসে গাড়ি থামলে উল্টোদিকের চায়ের দোকানে বসে থাকা দু’তিনজন দেখিয়ে দেয় ঘটনাস্থল। একতলা টিনের ছাউনি দেওয়া স্কুল (ক্লাস এইট পর্যন্ত)। সামনের কিছুটা অংশ পাঁচিল দেওয়া। বাকি তিনদিক খোলা। পেছনের দিকে বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত।

 

এলাকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজের সাথে যুক্ত। কেউ বা মানসাইয়ের জলে মাছ ধরে সংসার চালান। আবার বাইরে ঠিকা শ্রমিকের কাজও করেন কেউ কেউ।

 

পর্যবেক্ষণ বয়ান:

স্কুলের মেইন গেট দিয়ে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ে সদ্যনির্মিত একটি শহীদ বেদী। নিহত চার গ্রামবাসীর স্মৃতিতে। স্কুল চত্বরে সেসময় উপস্থিত ছিলেন দশ বারো জন গ্রামবাসী যাদের মধ্যে অনেকেই সেদিন গুলি চলাকালীন ভোটের লাইনে ছিলেন এবং গোটা ঘটনা সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। উপস্থিত গ্রামবাসীদের মধ্যে আলিজার রহমান, নূর মহম্মদ, রফিকুল, জয়দেব দাসরা জানান, ঘটনার দিন সকাল থেকে ওই বুথে শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট হচ্ছিল। কিন্তু বুথ থেকে প্রায় ২৫০-৩০০ মি দূরে কাজীর মোড়ে জমায়েত হচ্ছে এবং ভোটদানে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে অভিযোগ জানায় ষষ্ঠী বর্মণ, শ্যামল বর্মন সহ কয়েকজন বিজেপি নেতা। অভিযোগের ভিত্তিতে রাস্তায় টহলদারী জওয়ানরা কাজীর মোড় থেকে তখন রাস্তায় লাঠিচার্জ করতে করতে বুথের দিকে এগোয়। বুথ থেকে ২০০ মিটার দূরত্বে চোদ্দ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, জাহিদুল হক (পিতা – মজিদ মিঞা) সেসময় রাস্তায় খেলছিল। তাকেও জওয়ানরা বেধড়ক মারে। অসুস্থ হয়ে সে রাস্তায় পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়,মুখ দিয়ে গ্যাঁজা বেরোয়। এই ঘটনায় এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে লাঠি হাতে বুথের বাইরে ছুটে আসে। তবে তারা উত্তেজিত হলেও জওয়ানদের উপর কোনো আক্রমণ করেননি বলে জানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় বাহিনী তখন রাস্তা ফাঁকা করতে আবার লাঠিচার্জ শুরু করে বুথের মেইন গেটের বাইরে। ফলে এলাকায় একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। কয়েক জন গ্রামবাসী এই ঘটনার ছবি- ভিডিও তুলছিল, জওয়ানরা তাদেরও লাঠিচার্জ করে। এমন সময় স্কুলের সামনের এক কোণ দিয়ে সিআইএসএফ এর ক্যুইক রেসপন্স টিমের (কিউআরটি) একগাড়ি জওয়ান স্কুল চত্বরে প্রবেশ করেই হঠাৎ ফায়ারিং শুরু করে দেয়। কোনোরকম ঘোষণা, লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, উপযুক্ত পদ্ধতিগত সতর্কিকরণ অর্থাৎ কোনোরকম স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এস. ও. পি.) ছাড়াই। আট রাউন্ড গুলি চলে বলে তাঁদের অভিযোগ। তাঁরা জানান, কিউআরটি জওয়ানদের সাথে থাকা সাদা পোশাকের দুজন লোক এগিয়ে এসে আঙুল দিয়ে কয়েকজনকে চিহ্নিত করে দেখায়। সিআইএসএফ তখন বেছে বেছে তাদেরকেই গুলি চালায়। সেসময় কয়েকজন গোটা ঘটনার ভিডিও তুলছিল, যাদের মধ্যে চারজনের ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খুব কাছ থেকে গুলি চালায় সিআইএসএফ। প্রথমবর্ষের কলেজপড়ুয়া সামিউল হক মাটিতে পড়ে গেলে তাকে পায়ে চেপে বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। গুলিতে সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ হারান চারজন। আহত হন আটজন। কয়েকজনের গা ঘেঁষে বেরিয়ে যায় গুলি।

 

মৃতেরা হলেন –

সামিউল হক (বয়স- ১৯,পিতা- আবসার আলি মিঞা),

হামিদুল মিঞা (বয়স- ২৮, পিতা- দিনমহম্মদ হায়দার আলি),

মনিরুজ্জামান (বয়স- ২৮, পিতা- আমজাদ হোসেন) এবং

নূর আলম (বয়স- ১৯, পিতা- মজিদ মিঞা)।

 

গুলি চলার সময়ই ভোটপ্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। বুথে ভোটের লাইনে যাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যে যেদিকে পারে দৌড়ে পালায়। ফায়ারিং এর পর বাইরে থেকে আসা কিউআরটি জওয়ানরা বুথের ভেতরে আগে থেকে কর্তব্যরত জওয়ানদের সাথে নিয়ে ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যায়। পোলিং অফিসাররা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বুথের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলে কয়েকজন উত্তেজিত গ্রামবাসী দরজায় লাথি মারে, ধাক্কাধাক্কি করে।

 

শিক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত ছিল অষ্টম শ্রেণির ছাত্র জাহিদুল। এখনো চোখে মুখে তার ভয় স্পষ্ট। তার সাথে কথা বলা হলে সে পিঠে-হাতে-কোমরে কালশিটে পড়ে যাওয়া দাগ দেখায়। জানায়, তিন দিন সে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। এখনো সারা গায়ে ব্যথা আছে।

 

আহত কওসর মোল্লা সদ্য হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন। তিনি জানান, ওই দিন ঘটনার সময় তিনি ভোটের লাইনে অপেক্ষা করছিলেন। একগাড়ি জওয়ান স্কুল মাঠে ঢুকেই গুলি চালাতে শুরু করে। একটি গুলি তার পিঠের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়‌। একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছেন। জামা তুলে পিঠের সেই দাগও দেখান তিনি।

 

ঘটনার দিন বুথে উপস্থিত এক প্রত্যক্ষদর্শী নূর মহম্মদ জানান, তাঁর চোখের সামনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে বিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে যায় চারজন। তিনি সাহায্যের জন্য তাঁদের দিকে এগিয়ে গেলে বন্দুকের বাঁট দিয়ে সজোরে তাঁর মাথায় মারে সিআইএসএফ। কপালের বাঁ পাশে জমাট বাঁধা রক্তের ঢিপি আঙুল দিয়ে দেখান তিনি।

 

এই ঘটনার সাথে ঐ একই দিনে শীতলকুচির অন্য একটি বুথে (২৮৫ নং) বিজেপি কর্মী আনন্দ বর্মণের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে কিনা সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ঐ বুথটি ১২৬ নং বুথ থেকে প্রায় ২৫ কিমি দূরে। ফলে ওখানে কোনো ঝামেলা হলে তার আঁচ এখানে আসার কথা নয়‌। তাছাড়া তিনি জানান, তাঁদের এই বুথে হিন্দু ও মুসলিম ভোটারের সংখ্যা ৪০%-৬০%। এতদিন তাঁরা একসাথে থেকেছেন গ্রামে, কখনোই কোনোরকম ঝামেলা হয়নি। এমনকি এই ঘটনার সময়ও দুই সম্প্রদায় মিলিয়ে প্রায় ৭০-৭৫ জন গ্রামবাসী ভোটের লাইনে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু সিআইএসএফ জওয়ানরা দূর থেকে সবার উপর গুলি না চালিয়ে বেছে বেছে গুলি চালায়। যদি দূর থেকে ফায়ারিং করতো ভোটারদের লক্ষ করে, তাহলে হতাহতের সংখ্যা যে কি হত তা ভেবেই তিনি শিউরে উঠছেন। এই বেছে বেছে গুলি চালানোর পিছনে উপরমহল থেকে আসা কোনো নির্দেশ ছিল কিনা সে বিষয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এটা কোনো পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রও হতে পারে।

 

গত ১৪ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ১২৬ নং বুথে কর্মরত ভোটকর্মী দিলীপ কুমার মজুমদার জানান যে তিনি বাইরে থেকে প্রথমে গোলমালের আওয়াজ, তারপর গুলির আওয়াজ শুনেছেন। তথ্যানুসন্ধান দলের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক স্তরের মাধ্যমে দিলীপ কুমার মজুমদার সহ বাকি পোলিং অফিসারদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা কর হয়। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

 

উত্তেজিত গ্রামবাসী পোলিং অফিসারদের উপর ওদিন আক্রমণ করেছিল কিনা সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, গুলি যখন চলছিল তখন প্রাণে বাঁচতে অনেকেই বুথের ভেতর আশ্রয় নিতে যায়, হুড়োহুড়িতে পোলিং অফিসারদের কয়েকজন হয়তো আহত হয়েছেন। তবে গ্রামবাসীরা কখনোই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে তাঁদের মারেনি। বরং পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে তাঁরা নিজেরা পোলিং অফিসারদের অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেয় যাতে তাঁরা নিরাপদে ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন।

স্থানীয় আলিজার রহমান জানান, এই ১২৬ নং বুথ কখনোই স্পর্শকাতর বুথ ছিল না। কখনো কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় হিংসার ঘটনা ঘটেনি এই বুথে। এইবার প্রথম এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। এলাকার মানুষ এখনো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু সেদিনের মূল ঘটনাটি সামনে না এনে রাজনৈতিক নেতারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বিভিন্ন রটনা চালাচ্ছে। বুথের মধ্যে সিসিটিভি ছিল, তার ফুটেজ দেখালে সবটা পরিস্কার হয়ে যাবে যে গ্রামবাসীরা সেদিন পোলিং অফিসারদের মারধর করেছিল কিনা।

 

অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী রফিকুল জানান, ওইসময় তিনিও ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর আগে ছিলেন আরো সাতজন। ওই বুথে আগে থেকে কর্তব্যরত সিআইএসএফ জওয়ানরা ছিলেন। কিন্তু তারা গুলি চালান নি। স্কুলের কোণ দিয়ে ঢোকা অন্য একদল জওয়ান গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর ভাই যখন মাটিতে পড়ে ছিল তখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশ বা জওয়ান কেউ এগিয়ে আসেনি। রক্তাক্ত ভাই এবং আরেক গুলিবিদ্ধ সামিউলকে টোটোতে চাপিয়ে সে ও আরেক যুবক যখন পেছনে বাইক নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিল, মাঝরাস্তায় তাদের দুজনকে পুলিশ মাথাভাঙ্গা থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং পাঁচঘন্টা আটক করে রাখে।

 

স্থানীয় মৎসজীবী জয়দেব দাস বলেন, এই গ্রামে হিন্দু মুসলিম একসাথে এতদিন থেকেছে। আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। বাচ্চাটিকে কেন্দ্রীয় বাহিনী মারার ফলে গ্রামবাসীরা সাময়িক উত্তেজিত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু গুলি চালানোর মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

 

বুথের সামনে চায়ের দোকানি রতন দাস জানান, তিনি অন্য বুথের ভোটার। ভোট দিতে যাওয়ার জন্য সেদিন দোকান বন্ধ রেখেছিলেন। তবে সামিউলরা তাঁর দোকানে বসে চা খেত। এভাবে তাঁদের মৃত্যু কিছুতেই মানতে পারছেন না তিনি। বলেন, যা ঘটেছে তাতে তাঁরা ভীষণ আতঙ্কিত।

 

স্থানীয় এক মহিলা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, তাঁদের গ্রামে যা ঘটেছে তাতে আর তাঁরা ভোট দেবেন না কোনোদিন। বা দিলেও ওই বুথে কখনোই না। তাঁর মতে, ভোট দিতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারানোর চেয়ে ভোট না দেওয়াই ভালো।

 

গ্রামের পশ্চিম ও দক্ষিণ পশ্চিম দিকে অবস্থিত মূলত রাজবংশী ও নমঃশূদ্র অধ্যুষিত এলাকা দাসপাড়া। সেখানকার বাসিন্দা জঞ্জালু দাস, ফুলো দাস, সঞ্জিত দাস সহ কয়েকজন নিজেদের কেউ কেউ বিজেপি কর্মী হিসেবে কেউবা সাধারণ ভোটার হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করে, সেদিন বুথচত্বরে মারপিটের ঘটনা সত্যি। মারপিটের ফলে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও জানান। যদিও তার স্বপক্ষে তারা কোনোরকম প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি।

 

স্থানীয় আরো কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এরপর নিহতদের বাড়ির দিকে যাওয়া হয়। দুদিকে ধানখেত, মাঝের সরু আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে প্রথমেই পড়ে মনিরুজ্জামানের বাড়ি। স্কুল থেকে দূরত্ব খুব বেশি নয়। টিনের চাল দেওয়া ইঁটের বাড়ি। সামনে মাটির উঠোনে দুটো গোরু বাঁধা। বাড়ির ভেতরে তখন ছেলের মৃত্যুর পাঁচদিনের কাজ চলছিল। মা সেদিনের পর থেকে শোকে পাথর হয়ে গেছেন। কথা বলছেন না। বাবা আমজাদ হোসেনের সাথে কথা বলা হয়। তিনি জানান, তাঁর তিন ছেলের মধ্যে মনিরুজ্জামান ছিল বড়ো। তার আয়েই চলতো সংসার। আগে সে মহারাষ্ট্রে কাজ করতো। দেড় বছর হল বিয়ে করেছে। তারপর থেকে শিলিগুড়িতে থেকে ওখানেই কাজ করছিল। মাস খানেক হল এক সন্তান হয়েছে। এবার ভোট দিতে এসেই সে প্রথম তার সদ্যজাত সন্তানকে দেখে। বৃদ্ধ আমজাদ বলেন, তাঁর ছেলে যদি কিছু অন্যায় করতো, ওরা লাঠি দিয়ে পেটাতে পারত, হাতে কিংবা পায়ে গুলি করতে পারতো কিন্তু এভাবে ছেলেটাকে মেরে ফেলল কেন!! বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। পরিবারের এখন একটাই দাবি, দোষীরা যেন উপযুক্ত শাস্তি পায়। মাথাভাঙ্গা থানায় একটি এফআইআর করেছেন তাঁরা।

 

মনিরুজ্জামানের বাড়ি ছাড়িয়ে ধানখেতের পাশ দিয়ে আরো কিছুদুর গেলে পাশাপাশি দুই বাড়ি সামিউল আর হামিদুলের। বাড়ির উঠোনে ঢোকার খানিক আগে বাঁ পাশে সদ্য মাটি দেওয়া চারজনের কবর। বেড়া দিয়ে ঘেরা। বেড়ার গায়ে কঞ্চি দিয়ে চারটে কালো পতাকা লাগানো। এক বৃদ্ধ একমনে দোয়া করছেন সেখানে। রমজানের মাসে গোটা পাড়া জুড়ে শোকের ছায়া।

 

উঠোনে বসেছিলেন হামিদুল মিঞার বাবা দিনমহম্মদ হায়দার আলি। অশীতিপর বৃদ্ধ। ফ্যালফ্যাল করে চেয়েছিলেন ছেলের কবরের দিকে। হামিদুলের বউ ভেতরে ছিলেন। কথা বলার মত অবস্থায় ছিলেন না। প্রতিবেশী মহিলারা বলছিলেন, কটাদিন আগে হামিদুলের ভাই মারা গেছে হার্ট অ্যাটাকে। এক ছেলের মৃত্যুশোক কাটতে না কাটতে আরেক ছেলে চলে গেল বৃদ্ধ বাবাকে ফেলে। ঘরে তার আড়াই বছরের সন্তান আর সন্তানসম্ভবা স্ত্রী। অভাবের সংসারে একমাত্র রোজগেরে ছিল সে। এমনকি সামিউলদের পরিবারও দেখতো সে।

 

পাশেই সামিউলদের এক কামরার টিনের ছাউনি দেওয়া ইটের ঘর। সামিউলের দিদি আঞ্জুপা খাতুন জানায়, ভোটের দিন সকালে সে তার দুই ভাই সামিউল আর সইদুলের সাথে বুথে গেছিল ভোট দিতে। হঠাৎ একদল জওয়ান ঢুকে গুলি চালাতে শুরু করে, ছোটো ভাই সইদুলকে জওয়ানরা যখন মারছিল সামিউল তাকে বাঁচাতে যায়, তখনই তাকে গুলি করে ওরা। চোখের সামনে দুই ভাইকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পাগলের মতো সাহায্যের জন্য ছুটছিল সে। বলতে বলতে গলা বুজে আসে তার। ছোটভাই সইদুল হাসপাতালে ভর্তি। আঞ্জুপা জানায়, সামিউল এবছর সবে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। পড়াশোনায় ভালো ছিল, তিনটে কলেজে চান্সও পেয়েছিল। নতুন ভোটার হয়েছে, প্রথমবার ভোট দিতে গিয়েছিল সেদিন। কিন্তু ভোট দিতে গিয়ে এভাবে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে ভাবতেই পারেনি। অন্যদিকে সদ্য হাসপাতাল ফেরত দশম শ্রেণির ছাত্র সইদুল এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। মাথায় কানের পাশে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। চোখে মুখে ভয়ানক আতঙ্ক।

 

সামিউলের দিদি আঞ্জুপা সদ্য কলেজ শেষ করে এম. এ. তে ভর্তি হয়েছে। গরীব ঘরে পড়াশোনা শেষ করে সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন দেখতো তিন ভাইবোন। সে আরো জানায়, ঘটনার দিন সিআইএসএফ জওয়ানদের ঘিরে ধরে তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, সেসব পুরোপুরি মিথ্যে। ঘটনাস্থলে সে ছিল, সবটা নিজের চোখে দেখেছে। দোষীরা যেন কেউ ছাড়া না পায় সেটাই তার একমাত্র আর্তি।

 

নূর আলমের বাড়ি আমতলী মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র থেকে বেশ খানিকটা দূরে। ১২৫ নং বুথের বাসিন্দা সে। স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, নূরই ছিল বাড়ির একমাত্র রোজগেরে সদস্য। তার আয়েই চলতো সংসার। বাড়িতে তার বৃদ্ধ বাবা মা আছেন। ঘটনার দিন সে বুথের পাশে ক্ষেতে কাজ করতে যাচ্ছিল। রাস্তায় লাঠিচার্জ শুরু হলে সে ফোনে তখন ভিডিও করছিল।

 

গুলি চালনার ঘটনায় গ্রামবাসীদের পক্ষে একটি এজহার দায়ের করা হয়েছে মাথাভাঙ্গা থানায় (তাং – ১২/৪/২১)। এজহারকারী আব্দুল গণি (পিতা – মৃত ফজলে রহমান) এখানকার গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য। এবং তৃণমূল কংগ্রেসের পোলিং এজেন্ট হিসেবে গুলি চালনার সময় বুথের ভেতরেই ছিলেন। (এজহারের নকল সঙ্গে থাকলো)

 

ফেরার পথে চায়ের দোকানে দেখা হয় আমতলী মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাপস দত্তের সাথে। ২০০৩ সাল থেকে এই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন তিনি। আগের প্রধান শিক্ষক অবসর নেওয়ার পর সম্প্রতি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। তিনি জানালেন, এতদিন এখানে আছেন, কিন্তু হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনোরকম ঝামেলা তিনি দেখেননি। বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বহু নজির এই গ্রামে বর্তমান। প্রতিবছর দুই সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্কুলের সরস্বতী পুজোয় অংশগ্রহণ করে।

 

কথাবার্তা শেষে আমতলী ছেড়ে যখন বেরোনো হয়, বেলা তখন তিনটে। হাতে সময় বেশি না থাকায় প্রতিনিধি দলের এগারো জনের মধ্যে ছ’জন রওনা দেয় শীতলকুচির আরেক গ্রাম পাঠানটুলির উদ্দেশ্যে। বাকি পাঁচজন যায় কুচবিহারের ডিএম এবং এসপির সাথে দেখা করতে।

 

২৮৫ নং বুথের ঘটনার তথ্যানুসন্ধান:

 

ঘটনাস্থল, পর্যবেক্ষণ বয়ান:

শীতলকুচির পাঠানটুলি গ্রামে ঢুকে প্রথমেই প্রতিনিধি দলকে নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এলাকায় যে দীর্ঘদিন একটা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বীজ বোনার কাজ চলেছে এবং সাম্প্রতিক ঘটনাকে হাতিয়ার করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল সেই বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতিকে আরো পোক্ত করছে, তা আনন্দ বর্মণের পরিবার সহ স্থানীয়দের কথা থেকে স্পষ্ট। তাদের কথায় উঠে আসে, এ পাড়ায় মূলত রাজবংশীদের বাস। বেশিরভাগই বিজেপি সমর্থক।

 

মৃত আনন্দ বর্মণের দাদা গোবিন্দ বর্মনের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, ঘটনার দিন সকালে তিনি এবং তাঁর ভাই আনন্দ দুজনে একসাথে ভোট দিতে গিয়েছিলেন পাঠানটুলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাঁর ভাই ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছিল। আর তিনি ভাইয়ের পাশে সামান্য দূরে ছিলেন। সকাল তখন পৌনে আটটা। তৃণমূলের একদল বাইকবাহিনী হঠাৎ বুথের দিকে দূর থেকে বোমা ছুঁড়তে শুরু করে। তাদের হাতে পিস্তলও ছিল। ভয়ে লাইনে দাঁড়ানো সাধারণ ভোটাররা প্রাণে বাঁচতে লাইন থেকে বেরিয়ে দৌড়তে শুরু করে। গোবিন্দ বর্মণ জানান, তিনি এবং তাঁর ভাইও ওইসময় দৌড়চ্ছিলেন, কিন্তু ভাই একটু পিছিয়ে পড়ে। সেসময় দোকানে দাঁড়িয়েছিল তৃণমূল কর্মী নিত্যানন্দ বর্মণ। সে আনন্দ বর্মণের ঘাড়ে বাঁশ দিয়ে মারে। মার খেয়ে সে তখন ওখানে পড়ে যায়। এমনসময় পঞ্চায়েত সদস্য হাকিম মিঞা এবং তার চারভাই মিলে বাইকে করে এসে বোম ছুড়তে থাকে। সাথে গুলিও চালায়। আনন্দ বর্মণ সেসময় উঠে পালাতে গেলে হাকিম মিঞা তার দিকে গুলি চালায়। গুলি লেগে সে রাস্তায় পড়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় ওখানেই পড়ে ছিল কিছুক্ষণ। এরপর পুলিশ আসলে তৃণমূলের বাইকবাহিনী পালিয়ে যায়। তিনি এবং আরেক ভাই ধরাধরি করে আনন্দকে পাশের বাড়িতে নিয়ে যায়। অনেক্ষণ পর পুলিশ গাড়ি এসে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করে।

 

ইন্দ্র বর্মণ বলেন, ওদিন সকালে তিনি ভোট দিয়ে ফিরছিলেন। রাস্তায় হাকিম মিঞার দলবল তাঁর মাথায় বাঁশ দিয়ে মারে।

 

আহত গ্রামবাসী অমল বর্মণ জানান, ঘটনার সময় ভোটার লাইনে ছিলেন। চারটে বাইকে করে দশ বারো জন তৃণমূলের লোক এসে বোমা ছুঁড়তে শুরু করে। তিনি বাকিদের মতো পালাচ্ছিলেন যখন, তখন মাথায় বাঁশ দিয়ে জোরে মারে বাইকবাহিনী, কপালে জমাট বাঁধা রক্তের দাগ দেখান তিনি।

 

আহত দীনেয় বর্মণ বলেন, ওইদিন সবে ভোট দিতে বেরিয়েছিলেন, এমনসময় পাঠানটুলি থেকে চারটে বাইক এসে তাঁকে বাড়ি ফিরে যেতে বলে। বলে, তাঁর ভোট হয়ে গেছে। এরপর বোমাবাজি শুরু হলে যখন তিনি দৌড়ে পালাচ্ছিলেন তখন পায়ে গুলি লাগে। সেই অবস্থায় কোনোমতে দৌড়ে ঘরের সামনে এসে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।

 

গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, এই ঘটনায় সরাসরি তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্যরা জড়িত। তাঁরা বারো জনের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন। ইতিমধ্যে দুজন গ্রেফতারও হয়েছে।

 

পাঠানটুলির ঘটনার সাথে শীতলকুচির ১২৬ নং বুথের ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তাঁরা কোনো মন্তব্য করেননি। শুধু বলেন, আমতলীর ঘটনা তাঁরা শুনেছেন।

 

প্রতিনিধি দলের আরেক অংশ কুচবিহারের জেলাশাসকের সাথে দেখা করতে যায়। তবে তাঁর সাথে দেখা না হলেও ডেপুটেশন জমা দেওয়া হয়। পরদিন (১৬/৪/২১) সকালে এসপি অফিসে যাওয়া হয়। এসপি ছিলেন না। কুচবিহারের ডিএসপি (ক্রাইম) তাপস মৌলিকের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, শীতলকুচির ১২৬ নং বুথের ঘটনায় ইতিমধ্যে দুটি এফআইআর হয়েছে। একটি সিআইএসএফ জওয়ানরা করেছে আমতলী গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে মাথাভাঙ্গা থানায়। অন্যটি করেছে রাজ্যপুলিশ, সিআইএসএফ জওয়ানদের বিরুদ্ধে। পাবলিক ডোমেইনে দুটো এফআইআর এর ডিটেইলস পাওয়া যাবে। ওঁনারা দুটো এফআইআরই ১৫ এপ্রিল সিআইডিকে ফরওয়ার্ড করেছেন।

 

শীতলকুচির ঘটনায় এপিডিআরের তথ্যানুসন্ধানের পর ১৬ এপ্রিল, ২০২১ সকালে কুচবিহার প্রেস ক্লাবে একটি সাংবাদিক বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেখানে মূলত তথ্যানুসন্ধান থেকে উঠে আসা প্রাথমিক বিষয়গুলি উল্লেখ করে একটি প্রেস বিবৃতি দেওয়া হয়।

 

সিদ্ধান্ত:

 

গোটা তথ্যানুসন্ধানে স্থানীয়দের বক্তব্য থেকে উঠে আসা তথ্য থেকে এটা পরিস্কার,

 

১) অষ্টম শ্রেণির ছাত্র জাহিদুলের উপর সিআইএসএফ জওয়ানদের নির্মম মারধরের ফলে স্থানীয় গ্রামবাসীরা সাময়িক বিক্ষুব্ধ হয়েছিল, তবে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘিরে কোনোরকম জমায়েত করেনি।

 

২) নির্বাচন কমিশনের যে দাবি, ৩০০-৩৫০ জন মহিলা জমায়েত করে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘিরে ধরে তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, এমন ঘটনা আদৌ ঘটেনি। অর্থাৎ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর রটনা পুরোপুরি মিথ্যে। কোনোরকম প্ররোচনা ছাড়াই সিআইএসএফ এর কিউআরটি জওয়ানরা সেদিন গুলি চালায়।

 

৩) নির্বাচনের আগের দিন থেকে ঐ শিক্ষাকেন্দ্রে কর্তব্যরত কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকা স্বত্ত্বেও সিআইএসএফ এর কিউআরটি জওয়ানরা এই গুলি চালায়।

 

৪) গুলি চালানোর আগে কোনোরকম স্ট্যান্ডার্ড ওপারেটিং প্রসিডিওর (এস. ও. পি.) মানা হয়নি।

 

৫) গুলি চালানোর প্রশাসনিক পদ্ধতিগত কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে জানা যায়নি।

৬) খুব কাছ থেকে বেছে বেছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে গুলি চালায় জওয়ানরা। তাতে নিহত হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চার যুবক। তাহলে কি নিহতরা উপরমহল থেকে আসা কোনো পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার?

 

৭) সাংবিধানিক সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে তছনছ করে, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কেন্দ্রীয় শাসকদলের অঙ্গুলিহেলনে নির্বাচন কমিশানের অতিসক্রিয়তা ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, দেখা মাত্র গুলি চালাবার নির্দেশ, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে এই নির্মম রাষ্ট্রীয় হত্যায় ইন্ধন জুগিয়েছে।

 

৮) অন্যদিকে শীতলকুচির ২৮৫ নং বুথে ভোট চলাকালীন দলীয় হিংসার বলি হয় আনন্দ বর্মণ। আহত হয় বেশ কয়েকজন। এই ঘটনাটিকে হাতিয়ার করে পাঠানটুলিতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রঙ চড়াচ্ছে একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দল।

 

এমতাবস্থায় আমাদের দাবী

 

১) ১২৬ নং বুথের ঘটনার সার্বিক বিচারবিভাগীয় তদন্ত করে অবিলম্বে দোষী সিআইএসএফ জওয়ানদের শাস্তি দিতে হবে।

 

২) বুথের ভেতরে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরায় গত ১০ এপ্রিলের ফুটেজ নির্বাচন কমিশনকে সাধারণ মানুষের সামনে আনতে হবে।

 

৩) ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন গোটা ঘটনার তদন্ত করুক এবং দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করুক।

 

৪) যেসব জওয়ান গুলি চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় মামলা রুজু করতে হবে। এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে।

 

৫) সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বাইরে থেকে আনা কেন্দ্রীয় বাহিনীর এবং একইসঙ্গে রাজ্য পুলিশের বন্দুকের নলের মুখে ভোট করানো বন্ধ করতে হবে। অবিলম্বে বাংলা থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে।

 

৬) ২৮৫ নং বুথে দলীয় হিংসার ঘটনায় দোষীদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

 

৭) নিহত পাঁচজনের পরিবারকে ন্যূনতম কুড়ি লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ও পরিবারের একজনকে চাকরি দিতে হবে। এবং আহতদের ন্যূনতম পাঁচ লক্ষ টাকা করে দিতে হবে।

 

তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্যরা হলেন

প্রভাত সিংহ রায়, সোমনাথ মৈত্র, শঙ্কর দাস, আলতাফ আমেদ, রাহুল চক্রবর্তী, সঞ্চিতা আলী, প্রদীপ ঘোষ, বিমান সরকার, খালেদা বেগম, মন্মথ রায়, গৌরব দাস, রবি রায়, সুমন গোস্বামী, মানবেন্দ্র ধর এবং উত্তম দাস।

(তারিখ: ১৫/৪/২১-১৬/৪/২১ ও ১৮/৪/২১)

আলতাফ আমেদ

সুমন গোস্বামী

গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি (এপিডিআর)

তাং: ২৪/০৪/২০২১

 

Share this
Leave a Comment