কোভিড প্রকৃতপক্ষে একটি বায়ুবাহিত রোগ আর তার প্রতিরোধও তেমনভাবেই হতে হবে


  • April 18, 2021
  • (0 Comments)
  • 800 Views

কোভিড থেকে বাঁচতে গেলে ঘরের সব জানালা খুলে, যতটা পারা যায় ভেন্টিলেশন বাড়াতে হবে, এসি কম চালাতে হবে, কারণ অধিকাংশ এসির ফিল্টার এরোসলে ভাসমান কোভিড জীবানু আটকাতে পারে না, আর এর ফলে বায়ু চলাচল আরও দূষিত হয়ে যায়। এই একই কারণে কোভিড সংক্রমণের সম্ভাবনা মাঠেঘাটে খোলা রাস্তায় কম। লিখছেন অমিতাভ আইচ

 

 

গত ১৫ এপ্রিল, এই বাংলার নববর্ষের দিন ল্যানসেট পত্রিকায় অবশেষে বহুদিন ধরে সন্দেহ করে আসা একটি বিষয়ের উপর যুক্তিপূর্ণ আলোকপাত করে পৃথিবীর বিশিষ্ট কয়েকজন বিজ্ঞানী পরিষ্কার ১০টি প্রমাণ দেখিয়েছেন যে কোভিড আসলে মূলতো বায়ুবাহিত রোগ, যা কোনও বাহক তার সাধারণ কথাবার্তা, হাসি, চিৎকার, কাশি, হাঁচির মারফত কোনও ঘরে বা অপেক্ষাকৃত বেশি লোকজন থাকা জায়গায় যেখানে হাওয়া চলাচল কম করছে সেখানকার বাতাসে ছড়িয়ে দিতে পারে। এবং যা বহুক্ষণ সেই বাতাসে প্রবাহমান থাকে যদি না ভেন্টিলেশন বাড়িয়ে সেই জীবানুযুক্ত বাতাসকে ডাইলুট বা পাতলা করা যায়। আর এই বাতাস শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমেই রোগ ছড়াচ্ছে। কাজেই শুধু  দিনরাত হাত ধুয়ে, সর্বাঙ্গ পরিষ্কার করে, টেবিল, দরজা, জানালা, প্লাস্টিকের প্যাকেট ফচফচ করে স্যানিটাইজ করে কোভিডের হাত থেকে বাঁচা যাবে না। কারণ এগুলো ড্রপলেট ইনফেকশন থেকে বাঁচাবে ঠিকই (যেটা এতো দিন মূল ও একমাত্র  বাহক মনে করা হতো), কিন্তু বাতাসে ভাসমান জীবানু থেকে বাঁচাবে না। বাতাসে ভাসমান কোভিড জীবানু বরঞ্চ বেশি সক্রিয় হতে পারে ( যদি কেউ ক্যারি করে আনে) বদ্ধ ঘরের ভিতর সাধারণ কথাবার্তা বললেও, এরোসলের মাধ্যমে। লেখকরা হু-এর যথেষ্ট সমালোচনা করেছেন, কারণ এই সঠিক তথ্য সামনে না আনলে সব কিছু ভুল হয়ে যাচ্ছে। বরঞ্চ তারা এই প্রশ্ন তুলেছেন যে, কোভিড যে আসলে বায়ুবাহিত (ছোট জায়গায়) এটা নিয়ে প্রশ্ন করাটাই আসলে বাতুলতা মাত্র।

 

নীচে মূল গবেষণাপত্রের লিঙ্ক:

(https://www.thelancet.com/journals/lancet/article/PIIS0140-6736(21)00869-2/fulltext)

 

তাই কোভিড থেকে বাঁচতে গেলে ঘরের সব জানালা খুলে, যতটা পারা যায় ভেন্টিলেশন বাড়াতে হবে, এসি কম চালাতে হবে, কারণ অধিকাংশ এসির ফিল্টার এরোসলে ভাসমান কোভিড জীবানু আটকাতে পারে না, আর এর ফলে বায়ু চলাচল আরও দূষিত হয়ে যায়। এই একই কারণে কোভিড সংক্রমণের সম্ভাবনা মাঠেঘাটে খোলা রাস্তায় কম। কিন্তু বদ্ধ ঘরে, ভিড় ঠাসা জায়গায় অনেক বেশি। এমনকি অফিসেও এসি কম চালানো, জানালা খুলে রাখা আর সঠিক মাস্ক পরা সবচেয়ে জরুরি।

 

হ্যাঁ, দ্বিতীয়  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফেসমাস্ক। এরোসল আটকানোর জন্য সবচেয়ে ভাল অবশ্য এন ৯৫ মাস্ক, যদিও সাধারণ রেসপিরেটার লাগানো এন ৯৫ রোগীর থেকে রোগ ছড়ায় বেশি, সেই কারণে ভাল ফিল্টার লাগানো রেসপিরেটার ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়। এন ৯৫ ব্যবহার করলেও কমপক্ষে মাথা পিছু তিন থেকে চারটে লাগবে, বদলে বদলে পড়তে হবে। মানে ব্যবহার করে এনে ভাল করে কোনও হাওয়াদার জায়গায়  মেলে দেবেন, রোদে শুকিয়ে নিতে পারেন। পরের দিন নতুন পড়বেন। দামে না পোষাতে পারলে সার্জিকাল মাস্ক পড়ুন। এটাও বদলে বদলে পড়তে হবে, ভিজে গেলে পড়বেন না। তবে যেখানে সেখানে ফেলবেন না, এক জায়গায় জমান ও পরে সঠিক জায়গায় ডিসপোজ করুন। আর যদি কাপড়ের মাস্ক পড়েন তো নানা রকম কাপড়ে তিন চার লেয়ারের মাস্ক বাড়িতে তৈরি করতে হবে, মানে সুতি, সিল্ক, সুতি, সিফন, সুতি এমন ভাবে লেয়ার করলে দেখা গেছে এর এরোসল ফিল্টার করার ক্ষমতা বেশ ভালো (https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC7185834/)।

 

ল্যান্সেটের তথ্য পরিষ্কার ভাবে প্রমাণ করছে কেন শহরে এবং এসি ঘরে বসে থাকা, বা বড় হোটেলে সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে থাকা বা ঘর থেকে না বের নো লোকেদের, হাসপাতাল বা ভিড়ে ঘোরা লোকেদের কোভিড এতো বেশি হয়েছে। গ্রামে বা সাধারণ ফাঁকা রাস্তাঘাটে অবিরাম ঘুরে বেড়ানো লোকেদের ততটা নয়। এর একটা কারণ পরিবেশগত অভিযোজন বা শারীরিক সক্ষমতার পার্থক্য বলে আমরা এত দিন ভাবছিলাম। কিন্তু তা শুধু নয়, এখন এই তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি আরও জলের মতো পরিষ্কার হয়েছে। এ কারণেই ঘরে বসে আপনার কোভিড হয়েছে, অথচ রাস্তার ধারে রোজ ফল নিয়ে বসে থাকা লোকটার হয়নি, কারণ তুলনামূলক ভাবে ফলওয়ালা কোভিডের নিরিখে হয়তো অপেক্ষাকৃত কম বিপজ্জনক বাতাস চলাচলের মধ্যে আছে। আর এই তথ্য সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে লকডাউন আরও বেশি অর্থহীন বিষয় হয়ে গেল। আমাদের মূল কাজ হবে ভিড় না হতে দেওয়া, সঠিক ধরনের ও সঠিককভাবে মাস্ক পরা এবং ঘরদোর খোলামেলা রাখা। গাড়ি বা ট্যাক্সিতে জানালা খোলা রাখা। মনে রাখবেন, এসি পাব্লিক ট্রান্সপোর্টে বেশি যাতায়াত কোভিড সংক্রমণ বাড়াতে পারে।

 

একটা কথা মনে রাখা এবং বুঝে নেওয়া খুব জরুরি। আর সেটা হলো কোভিডকে সামনে রেখে বৃহৎ পুঁজি এবং অনেক সরকার অনেক অন্যায় কাজ করেছে ও করছে। ভারতবর্ষ তার একটা বড় উদাহরণ। ওষুধ, স্যানিটাইজার, ভ্যাকসিন বাণিজ্য, টেস্টের খরচা, নার্সিংহোমের ব্যবসা সব আছে। কিন্তু তারা কোভিড কে ব্যবহার করছে মাত্র। আর তার থেকে প্রস্তুত হয়েছে যে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তার কিন্তু কোনও বৈজ্ঞানিক সত্যতা নেই। কোভিড যদি সঠিক ভাবে কামড় বসাতে পারে, তবে তা নিশ্চিত ভাবেই মারাত্মক ঘাতক। তাই সতর্কতাগুলি সঠিক ভাবে নিতে হবে। আর এই সতর্কতার অনেকটাই টিবি রোগ থেকে বাঁচার জন্য বা টিবি রোগীদেরকে যেমন পরিবেশে রাখা হয়, তেমন পরিবেশ সৃষ্টি করলে আমরা এর থেকে সহজে মুক্তি পাব। আর হ্যাঁ, ভ্যাকসিন নিয়ে নিন। সরকারি জায়গাতেই নিন। আর বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন, চিকিৎসা, মাস্কের জন্য আওয়াজ তুলুন।

 

নীচে খবরের লিঙ্ক। মূল গবেষণাপত্রের লিঙ্ক উপরে আছে। 

https://indianexpress.com/article/explained/explained-ten-key-reasons-why-coronavirus-transmission-is-primarily-airborne-7277076/

 

https://www.livemint.com/science/health/10-reasons-why-the-coronavirus-is-airborne-study-11618546969499.html

 

https://www.indiatoday.in/coronavirus-outbreak/story/lancet-report-covid19-primarily-airborne-safety-protocol-should-change-urgently-1791793-2021-04-16

 

https://www.thehindu.com/sci-tech/health/strong-evidence-covid-19-predominantly-spreads-through-air-says-lancet-study/article34337527.ece

 

https://www.business-standard.com/article/current-affairs/study-sheds-light-on-ten-reasons-why-the-coronavirus-is-airborne-lancet-121041600200_1.html

 

  • লেখক পরিবেষ বিশেষজ্ঞ।

 

Share this
Leave a Comment