স্বল্প সঞ্চয়ে সুদের হার বিশাল হারে কমিয়ে দেবার প্রচেষ্টা, পরিকাঠামো শিল্পে সংকট, সরকারি ব্যাঙ্ক-এর স্বাস্থ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে সরকারের ১০, ৯০০ কোটি টাকার ‘উৎসাহ প্রকল্প’ ঘোষণার অর্থনীতি-রাজনীতি নিয়ে লিখলেন শুভেন্দু দাশগুপ্ত।
এক
১ এপ্রিল-এ খবরের কাগজে বেরনো খবর। সরকার স্বল্প সঞ্চয়ে সুদের হার বিশাল হারে কমিয়ে দিল। সাধারণ মানুষ, সাধারণত মধ্যবিত্ত মানুষজন ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখে নানা খাতে। তার থেকে সুদ পায়। সুদ দিয়ে সংসার চালায়।
‘সুদ’ এক ধরনের ‘আয়’। বিশেষত যারা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে। অবসর নেবার সময় যে টাকা পেয়েছে, সেই টাকা ব্যাঙ্কে জমা রাখে নানা খাতে। সেই জমা থেকে সুদ পায়। সেই সুদে চলে বাকি জীবনের বেঁচে থাকা। এছাড়া আরও অনেকের সংসার চালানোর টাকার একটা বড়ো আশ্রয় এই ব্যাঙ্কে জমানো টাকার থেকে পাওয়া ‘সুদ’।
সরকার ‘সুদ’ কমিয়ে দেওয়া মানে এদের ‘আয়’ কমিয়ে দেওয়া। এদের আয় কমে যাওয়া মানে সংসারের দরকারি খরচ কমিয়ে দেওয়া, তার মধ্যে খাবার আছে। ওষুধ আছে।
এখন খাবার কম খাওয়া মানে আগামী দিনের শরীরের সমস্যা তৈরি করা। এখন কম ওষুধ খাওয়া মানে আগামী দিনে শরীরের অসুখ বেড়ে যাওয়া, মানে পরে আরও বেশি ওষুধের দরকার পড়া। আর এখন তো কাজের আকাল। এমন তো নয় যে এখন কোনো কাজ করে বাড়তি আয় করে ঘাটতিটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে।
ব্যাপারটা শুধু সুদ থেকে আয় কমাতেই আটকে থাকবে না। আমার জমানো টাকার সুদ থেকে আয় কমা মানে আমার আয় কমা। আমার আয় কমলে আমি কম খরচ করব। কম জিনিস কিনব। আমার কম জিনিস কেনা মানে যারা জিনিস বানায়, বেচে তাদের আয় কমে যাওয়া। জিনিস বানানো কোম্পানিদের আয় কমলে তারা কর্মীদের ছাঁটাই করবে। তাদের আয় বন্ধ হবে।
জিনিস বানানো কোম্পানিরা যাদের কাছ থেকে কাঁচামাল কম কিনবে, বা কিনবে না, তাদের আয় কমে যাবে।
এমন ভাবে ভাবতে থাকলে কোথায় গিয়ে থামা, তা ভাবা যায় না।
অর্থনীতির সংকট বাড়বে। সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে।
সরকার বুঝতে পেরেছে ভোটের মুখে এমনটি বলা ঠিক হয়নি। তাই তড়িঘড়ি করে বলা হল জুন মাস পর্যন্ত আগের হার থাকবে। বেশ! জুনের পর কী হবে?
কী আর হবে, এই সুদ কমানোর ঘোষণাকে ফিরিয়ে আনা হবে। ঘোষণাটা ভাবা, বানানো, লেখা হয়ে গেছে। সে তো আর ভুল করে নয়। ঘোষণার তারিখটা ভুল হয়েছে শুধু।
খবরের সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ এপ্রিল ২০২১
দুই
খবরের কাগজে লেখা বেরিয়েছে: পরিকাঠামো শিল্পে সংকট। উৎপাদন ভয়ঙ্কর কমে গেছে।
পরিকাঠামো শিল্প বলতে কয়লা, সার, ইস্পাত, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ, অশোধিত তেল, পেট্রোপণ্য, প্রাকৃতিক গ্যাস। গত বছরের এপ্রিল থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারির হিসেব তাই বলছে।
এই সব জিনিসের উৎপাদন কমল তো তোমার আমার কী এসে গেল?
এসে যায় একটু খাতিয়ে দেখলে, দেখে নিয়ে ভাবলে।
এক তো সোজাসুজি হিসেব।
এই সব শিল্পে উৎপাদন কমে যাওয়া মানে শিল্প সংস্থাদের, কারখানাদের, কোম্পানিদের আয় কমে যাওয়া। সংস্থার আয় কমলে প্রথম কোপ পড়ে শ্রমিক কর্মচারীদের ঘাড়ে। তাদের হয় মাইনে কমিয়ে দেওয়া হবে, কিংবা ছাঁটাই করা হবে। অনেক, অনেকের আয় কমে গেল, আয় বন্ধ হয়ে গেল। এ তো হল একটা দিক।
আর একটা দিক আছে। দ্বিতীয় একটা দিক। এই সব পরিকাঠামো পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার মানে কী? এই সব পণ্য যেখানে যেখানে লাগত, যে যে কাজে, যে যে উৎপাদনে লাগত সেখানে লাগছে না। কম লাগছে। তার মানে সেই সেই জিনিসের চাহিদা কমছে।
চাহিদা কমলে যারা বানায় সেই কোম্পানিদের আয় কমে। আয় কমলে কী হয়? যারা সেই সব জিনিস বানানোতে থাকে, শ্রমিক কর্মচারী, তাদের ঘাড়ে কোপ পড়ে। তাদের ছাঁটাই করা হয়।
এর আর একটা দিক, তিন নম্বর দিক আছে। এই সব পরিকাঠামো পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার মানে এই সব শিল্প বা পরিষেবা যে যে কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতি কেনে এখানে উৎপাদন করার জন্য সেই সেই কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতির চাহিদা কমবে। সেখানে যারা যারা কাজ করে তাদের ছাঁটাই করা হবে। যেমন ধরা যাক সিমেন্ট। সিমেন্টের চাহিদা কমে গেছে মানে সিমেন্ট কোম্পানি যে যে কাঁচামাল কিনত তার চাহিদা কমবে। সেই কাঁচামাল যারা তৈরি করত সেখানে উৎপাদন কমবে, সেখানে শ্রমিক কর্মচারী ছাঁটাই হবে।
একই কথা কয়লা, সার, ইস্পাত, বিদ্যুৎ উৎপাদন, অশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোপণ্য শিল্প নিয়ে। এই সব শিল্পের পণ্যের চাহিদা কমা, উৎপাদন কমা মানে শুধু এখানেই সংকট বোঝায় না। যারা এই সব পণ্য ব্যবহার করে সেখানেও সংকট বোঝায়। এবং এখানে যারা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি যোগান দেয় সেখানেও সংকট বোঝায়।
একটার সাথে একটা জড়িয়ে থাকে। খুব বড়ো জায়গা জুড়ে সংকট।
সংবাদ সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ এপ্রিল ২০২১
তিন
চারটি ‘দুর্বল’ ব্যাঙ্ক-এর স্বাস্থ্য ভালো করতে ১৪,৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে কেন্দ্র।
ব্যাঙ্ক চারটি দুর্বল কেন? এরা বড়ো বড়ো কোম্পানিদের টাকা ধার দিয়েছিল। সেই কোম্পানিরা টাকা শোধ করেনি। এই টাকা শোধ না করার পরিমাণটা এত বেশি যে ব্যাঙ্করাই দুর্বল হয়ে গিয়েছে।
চলতি কথা হবে এমনটি — ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার নিল বড়োরা, শোধ করল না। টাকা মেরে দিল, ব্যাঙ্ক খালি করে দিল।
এবার সেই খালি ব্যাঙ্কে টাকা ভরবে কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের তো আর নিজের টাকা হয় না। আমাদের কাছ থেকে নানা খাতে টাকা নিয়েই কেন্দ্রীয় সরকারের টাকা।
তার মানে ধনীরা টাকা নিয়ে শোধ করল না। আমরা গরিবরা, মধ্যবিত্তরা আমাদের টাকা দিয়ে ব্যাঙ্কের ক্ষতি পুষিয়ে দিলাম। মানে আমাদের টাকা বড়োলোকদের দিয়ে দিলাম।
সংবাদ সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ এপ্রিল ২০২১
চার
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ভারত সরকার ১০,৯০০ কোটি টাকার ‘উৎসাহ প্রকল্প’ ঘোষণা করল।
এর মানে কী? চারটে পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কোম্পানিদেরকে এই টাকাটা ভাগ করে দেওয়া হবে।
কী কী পণ্য?
- রান্না করতে লাগে এমন পণ্যকে প্যাকেটে ভরে বিক্রি করা হবে। খাওয়া হয় এমন পণ্যকে প্যাকেটে পুরে বিক্রি করা হবে।
- ফল ও আনাজকে একটু আধটু পাল্টে এটা সেটা যোগ করে প্যাকেটে ভরে বিক্রি করা হবে।
- সমুদ্র থেকে পাওয়া মাছ একটু আধটু পাল্টে নিয়ে, এটা সেটা যোগ করে প্যাকেটে পুরে বিক্রি করা হবে।
- মোজারেলা চিজ বানিয়ে প্যাকেটে ভরে বিক্রি করা হবে।
বেশ!
এবার একটু ভিতরে ঢুকে দুটো একটা প্রশ্ন করা যাক।
এই যে সব খাবারগুলির কথা বলা হল তা তো গরিব, মধ্যবিত্ত মানুষজনের খাবার। প্রতিদিনের খাবার, রান্নার কাজে লাগে, শরীরের পুষ্টির কাজে লাগে এমন সব কম দামের খাবার।
গরিব, মধ্যবিত্ত বিক্রেতা, দোকানদার। সস্তায় বেচে। গরিব, মধ্যবিত্ত ক্রেতা। সস্তায় কেনে।
এতে ঢুকে পড়ল, ঢুকিয়ে দেওয়া হল খাবার বানানো কোম্পানিদের। নানা কায়দায়, নানা প্যাকেটে খাবার ঢুকিয়ে, দাম বসিয়ে দোকানে দোকানে ঢেলে দেওয়া হবে।
হটিয়ে দেওয়া হল কাদের? ছোট বিক্রেতাদের, ছোট ক্রেতাদের। ফসলটা ছোটদের কাছ থেকে বড়োরা ছিনিয়ে নেবে।
নিয়ে নিতে সরকার মদত দিল।
আমাদের দেশের তিনদিকে সমুদ্র। সমুদ্রে যে মাছ পাওয়া যায় তা সমুদ্রতীরে থাকা গরিব দেশবাসীর সস্তার পুষ্টিকর খাবার। এবার সামুদ্রিক পণ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে মদত দেওয়ার নামে সেই গরিব মানুষদের খাবার চলে যাবে খাবার কোম্পানিদের হাতে।
গরিবদের কী হবে?
গ্রামের আনাজ, ফল, সাগরের মাছ গরিবদের বেচাকেনার বাজার থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পয়সা যাদের আছে তাদের বাজারে, শিল্পকারখানা বানিয়ে প্যাকেটে ভরে হাজির করা হবে।
তার জন্য সরকার ৩৩,৪৩৯ কোটি টাকা দিচ্ছে। একদলের খাবার অন্যদলের হাতে দিয়ে দিতে।
সংবাদ সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ এপ্রিল ২০২১
লেখক অর্থনীতির অধ্যাপক ও মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী।
ফীচার ছবি – প্রতীপ।

