এবারও নির্বাচনে প্রতিবন্ধীরা অদৃশ্য সংখ্যালঘু


  • March 29, 2021
  • (1 Comments)
  • 329 Views

নির্বাচন আসে যায়, অনেক বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি ইস্তাহারে প্রতিশ্রুতি দেন। নির্বাচনের প্রাককালে নির্বাচন কমিশনও নানা রকম উদ্যোগ নেয় সকল নাগরিকের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝখানে প্রতিবন্ধী মানুষদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে বাস্তব সমস্যাগুলি থাকে বা তাদের মৌলিক অধিকারের যে দাবিগুলি রাজনৈতিক দলগুলির কার্যক্রমে গুরুত্ব পাওয়ার কথা – তা যেন বরাবরা আড়ালেই রয়ে যায়। প্রতিবন্ধী মানুষদের ভোটের অধিকারও গুরুত্ব পায় না। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের দীর্ঘদিনের কর্মী শম্পা সেনগুপ্ত-র বিশ্লেষন।

 

বারো মাসে তেরো পার্বণের বাংলায় সবথেকে বড় পার্বণ উপস্থিত হয়েছে মহাসমারোহে। দুর্গা পুজো বা দোলযাত্রা কোভিড কালে অনলাইন হলেও হতে পারে কিন্তু ভোটপুজোয় কোভিডের নিয়ম কে মানবে? লক্ষ লোকের সমাগম, মিটিং-মিছিল সবই চলছে ও চলবেও। এর মধ্যে যে প্রান্তিক মানুষেরা সারা জীবনই ‘লকড ইন’ হয়ে বাঁচে, তাদের কথা আলাদা করে কে আর ভাববে? অথচ গনতন্ত্র তো সবার জন্য, সকলে যোগ না দিলে ভোটপর্ব কী সম্পূর্ণ হয়?

 

সেই ২০০৪ সালে জাভেদ আবিদি নামে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী এক ভদ্রলোক সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। ‘বিশেষ’ কিছু চাহিদা ছিল না। দাবি করেছিলেন ‘নিজের ভোট নিজে দেব’ এবং ‘আমার ভোট গোপন থাকবে’ – ১৮ বছরের উর্দ্ধে ভারতের সব মানুষেরই এই অধিকার আছে এবং একে ‘বিশেষ’ চিহ্নিত করা উচিত নয়। এমন তো নয় প্রতিবন্ধী মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। অথচ নির্বাচন কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তা সহজগম্য নয়। নির্বাচন আধিকারীকেরা জানেন না কীভাবে একজন বধির ব্যক্তি ভোট দিতে এলে তার সঙ্গে কথোপকথন করবেন। কাজেই প্রতিবন্ধী মানুষেরা প্রায়ই অন্যের সহায়তা নিয়ে ভোট দিতে বাধ্য হন – কাজেই গোপন ব্যালট আর গোপন থাকে না।

 

সুপ্রিম কোর্টের ২০০৪ সালের রায়ের পর পেরিয়ে গেছে বহু বছর। এখন ভোট এলে নির্বাচন কমিশনের দপ্তর থেকে প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং তাদের সাহায্য নেওয়া – দুই’ই করে থাকেন। কিন্তু এই খবরগুলি যেন লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। সংবাদপত্র হয়তো একটি বা দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে কিন্তু ধারাবাহিকতা না থাকায় এইসব খবর অচিরেই হারিয়ে যায়। মূল সমস্যা হল প্রতিবন্ধী মানুষেরা নিজেরা সব সময়ে জানতে পারেন না যে তাদের জন্য নির্বাচন কমিশনে কি কি ব্যবস্থা রয়েছে। কলকাতার মতো বড় শহরগুলিতে কিছুটা প্রচার হলেও, গ্রামে এইসব খবর পৌঁছায় না। নির্বাচন কেন্দ্রে র‍্যাম্প থাকা, ইভিএমএ-এ ব্রেইল চিহ্ন থাকা এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্বাচন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থার নিয়মগুলি খাতায় কলমে থাকলেও তা কতটা বাস্তবায়িত হয় তা প্রশ্নযোগ্য। যে সকল এনজিও-দের সাহায্য নির্বাচন কমিশন নিয়ে থাকেন, তারাও নিজেদের অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ, গোটা রাজ্যে প্রচারের কাজ করার ক্ষমতা তাদের নেই। এ বছরের ভোটে নতুন যোগ হয়েছে বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে প্রতিবন্ধীরাও চাইলে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন করলেন কি – বাড়ি বাড়ি ঘুরে ৮৫’র উপর ভোটারদের কারা বাড়ি বসে ভোট দিতে চান তার খবর নিলেন। আর প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য তৈরি করলেন একটি অ্যাপ। সেই অ্যাপে নাম তোলা থাকলে প্রতিবন্ধী ভোটাররা সবরকম সুযোগ পাবেন। যে দেশে ৮০% প্রতিবন্ধী মানুষ থাকেন গ্রামাঞ্চলে, তাদের শিক্ষার হার খুব কম এবং দারিদ্র্যও জীবনের সঙ্গী – সেই দেশে নির্বাচন কমিশনের অ্যাপের দ্বারা প্রতিবন্ধী ভোটার চিহ্নিতকরণ এক প্রহসন হয়ে দাঁড়ায়। ভোট প্রচারের তুঙ্গে দাঁড়িয়েও টেলিভিশন বা রেডিওতে বাংলার প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ভোটার সম্বন্ধে কোনও প্রচার চোখে পড়েনি এখনও। কাজেই ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনেও তারা যে অনেকটাই বঞ্চিত থাকবেন এ নিয়ে কিছুটা সংশয় দেখা দিয়েছে।

 

ভোট নিয়ে কথা বললে যাদের কথা বলতেই হয় তারা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী। এ কথা বাংলার প্রতিবন্ধী মানুষেরা বলতে বাধ্য হবেন যে একমাত্র বাম দলগুলির ইস্তাহারে প্রতিবন্ধকতা ধারাবাহিকভাবে স্থান পেয়েছে। ২০২১-এর ইস্তাহারও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিবন্ধী অধিকার আইন ও মানসিক স্বাস্থ্য আইন উল্লেখ করেই তারা কিছু অঙ্গীকার করেছে। ভারতীয় জনতা পার্টির ইস্তাহারেও স্থান পেয়েছে প্রতিবন্ধকতা বিষয়টি। ইউডিআইডি কার্ড, প্রতিবন্ধী ভাতা ইত্যাদি নিয়ে তারা কিছু বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে সারা রাজ্য জুড়ে মেন্টাল হেলথ হেল্প লাইন চালানোর অঙ্গীকার করেছে ইস্তাহারে। খুবই আশ্চর্যজনকভাবে এই বিষয়টি নিয়ে একটি শব্দও উল্লেখ হয়নি তৃণমূল কংগ্রেসের ইস্তাহারে। আরও আশ্চর্যের কারণ এই ইস্তাহার প্রকাশের সময় তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী হুইলচেয়ার ব্যবহার করছেন। তাঁর পায়ের চোট সাময়িক, কিছুদিন পরেই তাঁর এই হুইলচেয়ার, সভামঞ্চের র‍্যাম্প-এর প্রয়োজন পড়বে না। ভারতীয় জনতা পার্টি শহরের পাঁচ তারা হোটেলে কলকাতার প্রতিবন্ধী মানুষদের ডেকে ‘নমো দিব্যাঙ্গ’ বলে প্রচার করে ফেলল, কিন্তু ভাবতে একটু অবাক লাগে হুইলচেয়ারে বসেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মানুষগুলোর কথা মনে পড়ল না।

 

আসলে প্রতিবন্ধকতা একই রকমের হয় না। তাছাড়া প্রতিবন্ধী মানুষেরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকেন। কাজেই তাদের ঠিক ‘ভোট-ব্যাঙ্ক’ বলে কেউই মনে করে না। তাই এতবড় নির্বাচন পার্বনেও তারা ‘ইনভিজিবেল মাইনরিটি’ বা অদৃশ্য সংখ্যালঘু-ই থেকে যান।

 

  • Feature Image Courtesy : The Hindu

 

Share this
Recent Comments
1
  • অদৃশ্য সংখ্যালঘু শব্দ চয়নটি যথাযথ।আমি লেখিকার সঙ্গে একমত যে,শুধু আর একটা কথা যোগ করতে চাই, সেটা হচ্ছে, যে কোনও সামাজিক উদ্যোগ ও কর্মকান্ডতেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহন সুগম্য ও স্বস্তস্ফুর্ত নয়।

Leave a Comment