লকডাউনের বর্ষপূর্তি এবং বিজেপির সোনার ‘জুমলা’


  • March 24, 2021
  • (1 Comments)
  • 288 Views

এই কর্পোরেটের অর্থে ফুলে ফেঁপে ওঠা একটি আপাদমস্তক স্বৈরাচারী, পরধর্মবিদ্বেষী, বহুভাষা ও বহুসংস্কৃতির বৈচিত্র্য-বিদ্বেষী দলটি এ রাজ্যে একরকম জাঁকিয়ে বসেছে। এই দলটি যতই শক্তিশালী হতে থাকবে ততই দুর্বল হয়ে পড়বে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য তার মূল্যবোধ, তার ভাষা ও সংস্কৃতি। ঘোষিত হবে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-বৌদ্ধিক লকডাউন। কোনও অর্থের বিনিময়ে, ভোট-প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে যা বিকিয়ে দেওয়া যায় না। লিখছেন দেবাশিস আইচ

 

 

২২ মার্চ খবরের কাগজের জন্য আগ্রহটা একটু বেশিই ছিল। কেননা ২১ মার্চ কলকাতায় বিজেপির ইস্তাহার প্রকাশ করেছেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দু’দুটো কাগজ পড়ে ফেললাম, না পরিযায়ী শ্রমিকদের বিষয়ে একটি কথাও নেই কোথাও। এই সেই ২১ মার্চ কুলতলির পূর্ব গুড়গুড়িয়ার বছর একুশের অমলেশ ভুঁইয়া  তেলেঙ্গানা থেকে ট্রেন ধরেছিলেন। অবর্ণনীয় কষ্টের সেই যাত্রার কাহিনি। এই সেই ২১ মার্চ ওই গ্রামেরই মনসাতলার তরুণ বাসুদেব বসন্ত দেড় দিন জল আর শুকনো রুটি চিবোতে চিবোতে মহারাষ্ট্রের আকোলা থেকে বাড়ি ফেরেন। এই সেই ২২ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে যেদিন দেশজুড়ে থালা-বাটি, বাসন-কোসন বাজানোর খুব ধুম পড়েছিল। অমলেশ ফিরে গিয়েছেন ফের। ফেরা হয়নি বাসুদেব, মজিদ আলি মোল্লা, দোস্তগির শেখদের মতো অনেকেরই। জানি না, জিজ্ঞেস করাও হয়নি, ওদের আদৌ ইস্তাহার-টিস্তাহারে আগ্রহ রয়েছে কিনা! থাকলেও এই প্রশ্ন ওঁদের মনে জেগে ছিল কিনা — দু’হাত উপুড় করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অমিতজি, আমাদের কথা মনে পড়ল না?

 

মনে পড়েছি কি অন্য কোনও দলের। আরেকটি কাগজে দেখলাম, তিন দলের ইস্তাহারের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলির সংক্ষেপিত অংশের একটি টেবিল। চোখ বুলিয়ে দেখা গেল, বামফ্রন্টের প্রতিশ্রুতিতেই রয়েছে, “পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য আলাদা দফতর। বিশেষ সুরক্ষা প্রকল্প।” ভাল লাগল এটা ভেবে যে অন্তত কোনও একটা দল আলাদা করে ভেবেছে। কিন্তু, সত্যি কথা বলতে কী — পরিযায়ী শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিকদের বিষয়ে ‘সুরক্ষা প্রকল্প’ কিংবা আইনি রক্ষাকবচ তো কোন যুগ থেকেই রয়েছে — যা না জানেন শ্রমিকেরা, না তাঁদের কেউ কোনওদিন জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে। করোনা এ সত্যটিও উলঙ্গ করে ছেড়েছে যে, নথিভুক্ত নির্মাণ শ্রমিকদের হকের টাকা মেরেছে প্রতিটি রাজ্য সরকার। আর এই নির্মাণ শ্রমিকদের সিংহভাগই কোথাও নথিভুক্তই নয়। ফলে, পাওনাটুকু পাননি। অন্যান্য পেশার পরিযায়ী শ্রমিকদের আবার এটুকুও নেই। আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক আইন, নির্মাণ শ্রমিক বিষয়ক আইন কিংবা অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা আইন — বিগত দু’দশকের বেশি সময় ধরে তৈরি হওয়া এই আইনগুলো তো কারও কাজেই লাগল না।

 

আজ ২৪ মার্চ। এক বছর আগে এমনই এক দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাত আটটায় এক টেলিভিশন ভাষণের মধ্য দিয়ে, মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে সারা দেশকে যেন লৌহ যবনিকায় মুড়ে ফেললেন। বলা হল লকডাউন। লকডাউনের বর্ষপূর্তিতে সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে দেশে ফের কোভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়ছে। আর প্রতিশ্রুতিতে ভরা ২২ মার্চের ‘এই সময়’ সংবাদপত্র একথাও জানাচ্ছে, “কোভিডে আরও ঋণগ্রস্ত দেশের মানুষ, সঞ্চয় অর্ধেক।” সংবাদপত্রটি আরও জানাচ্ছে, “এই স্বাস্থ্য সঙ্কটের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আরও একটি তীব্র আর্থিক সঙ্কটের ছবি ধরা পড়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এক রিপোর্টে। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে দেশের মানুষের সঞ্চয় অর্ধেক কমে গিয়েছে এবং ঋণের বোঝা বেড়েছে ৩৭%।” কারণ কোভিড ও লকডাউন। কারণ দেশের কোটি কোটি মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়া। কিংবা পে-কাট, কম বেতন বা মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হওয়া। সংসার চালাতে হয় সঞ্চয় নিঃশেষ করেছেন তাঁরা অথবা ধার করে আরও ডুবেছেন। ঋণ বাজারের ৫১.৫ শতাংশই গিয়েছে গৃহস্থ পরিবারগুলিতে এমনই জানাচ্ছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। ২০ মার্চ ওই একই সংবাদপত্রের আরও এক খবরের শিরোনামটি একই রকম ‘রোমহর্ষক’, “করোনার পর বিশ্বে চতুর্থ ‘অসুখী’ ভারতে গরিব বেড়েছে ৭.৫ কোটি।” ‘অসুখী’ ভারতের খোঁজ মিলেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট  থেকে আর সাড়ে সাত কোটি গরিব বৃদ্ধির খবরটির উৎস পিউ রিসার্চ সেন্টার। রিপোর্টের এক অংশে বলা হচ্ছে, “…করোনা সংক্রমণের বছরপার হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, দেশের ৩.২ কোটি মানুষ আয়/সম্পত্তি কমে যাওয়ায় কারণে ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণির তকমা হারিয়েছেন। যেখানে চাকরি খুইয়ে বেশ কয়েক লক্ষ মানুষ দারিদ্রের আওতায় তলিয়ে গিয়েছেন। একই ভাবে কোভিড ফলস্বরূপ ‘গরিব’ (দৈনিক আয় ১৪০ টাকা বা তার কম) গোত্রে পড়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৭.৫ কোটি। ” এবং মধ্যবিত্তের (দৈনিক আয় ৭০০-১,৪০০) সংখ্যা ৯.৯ কোটি থেকে কমে নেমে এসেছে ৬.৬ কোটিতে। না করোনা শুধু কোটি কোটি মানুষের সর্বনাশ করেনি, করোনা-কাল নরেন্দ্র মোদীর প্রিয় ক্রোনি-বানিয়াদের কাছে ছিল পৌষ মাস। ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ের ব্লুমবার্গ বিলিওনেয়ার ইন্ডেক্স-এর তথ্য অনুযায়ী দেশের সাত ধনকুবেরের সম্পত্তি বেড়েছে ৪,৭১,২৯৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি বেড়েছে আদানি গোষ্ঠীর — যা ১,৫৫,৩৮০.৪০ কোটি টাকা। ২০১৯-এর তুলনায় যা তিন গুণ। দ্বিতীয়, মুকেশ আম্বানি — ১,৩৩,২৮৮.৪ কোটি টাকা।

 

আজ ২৪ মার্চ। পাতার পর পাতা জোড়া বিজেপির ইস্তাহার থুড়ি ইস্তাহার তো আবার আরবি শব্দ, হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থানের প্রবক্তাদের তো এমন ম্লেচ্ছ শব্দে ঘোর আপত্তি। তা ওদের সংস্কারী ভাষায় ইস্তাহার হলো ‘সংকল্পপত্র’, সে পত্রে ফের চোখ বুলচ্ছি আর ভাবছি — এতো গাছে না উঠতেই এক কাঁদি। অমিত শাহ যেন কল্পতরু। ভাবছি আর মনে পড়ছে অনেক অনেক মুখ। অসহায় নিরন্ন আধপেটা মুখগুলো। ভাবছি। বিগত বছরে এমন দু’হাত উজাড় করে দিলে তো কোটি কোটি মানুষ এমন চরম দুর্দশায় পড়তেন না। বিনে পয়সায় রেশন দিয়েছে তিন মাস। ভাল কাজ। জুলাই থেকে বন্ধ করেছে। আজ একটি রাজ্যের নির্বাচনে ১ টাকা কেজি দরে গম দেবে বলে সংকল্প করতে বসল কেন? এই আট-দশ মাসে তাঁদের কথা বিজেপির মনে পড়েনি। আচ্ছা, দেরিতে হলেও দিতে চাইছে। কিন্তু, সারা দেশের কথা ভাবা হলো না কেন? এই রাজ্য সরকার এখনও বিনামূল্যে রেশন দিচ্ছে। অমিত শাহরা কেন ভাবলেন না, দেশের সবচেয়ে গরিব তিন  রাজ্যের কথা? সামাজিক ন্যায়ের, সামাজিক নিরাপত্তার নিরিখে যারা সবসময়ই সিঁড়ির শেষ ধাপে অবস্থান করে সেই উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশের কথা। সেখানে তো তাঁদেরই সরকার। ডবল ইঞ্জিন। ভাবা হলো না ঝাড়খণ্ড, ছত্তিসগড়, আসামের কথা? বেশ, খাদ্য সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, বাংলার মানুষের খাদ্য সুরক্ষার জন্য ওঁরা স্থির সংকল্প। কিন্তু,অমিত শাহজি ২০২০-‘২১ সালে এই খাতে কেন্দ্রীয় বাজেট ছিল ৩,৪৪,০০০ কোটি টাকা আর ২০২১-‘২২-এর বাজেটে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২,০০,০০০ কোটি টাকা। এখানেই শেষ নয়। একে তো এখনই দেশের প্রায় ১০ কোটি মানুষ রেশন কার্ড পাননি। দীর্ঘকাল তাঁরা রেশনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাঁদের নাম নথিভুক্তই করা হয়নি। তার উপর সারা দেশে আধার কার্ডের চক্করে পড়ে, অর্থাৎ, আধারের সঙ্গে রেশন কার্ডের সংযুক্তিকরণ না হওয়ায় তিন কোটি রেশন কার্ড বাতিল করে দিয়েছেন। ২০১৭ সাল থেকে চলছে এই চক্কর। আপনাদের গুজরাটেও তাঁরা আছে। এঁদের অধিকাংশই হতদরিদ্র প্রান্তিক মানুষ। আপনাদের ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঢের ঢের দূরের গ্রহে তাঁদের বাস। এই রেশনের প্রতিশ্রুতিও তো এক চরম মিথ্যা বললে কি দোষ হবে?

 

মহিলাদের জন্য দরদ উথলে উঠেছে তাও দেখলাম। মহিলাদের স্বাস্থ্য নিয়েও। আচ্ছা, প্রায় এক বছর যদি বন্ধ হয়ে পড়ে থাকে অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্রগুলো তবে দরিদ্র ঘরের অন্তঃসত্ত্বা মায়েরা কোথায় যায় পুষ্টির খোঁজে, কোথায় যায় শিশুরা? একটি বছর পর এই অপুষ্টিতে ভরা দেশে তাদের হাল কোথায় দাঁড়াবে। কত অপুষ্ট মায়ের কোল ভরে উঠবে অপুষ্ট শিশুতে? এও বাহ্য। ক্ষমতায় থাকার প্রায় সাত বছর হলো এখনও সংসদে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করতে পারেনি যে দল — পারেনি বললে ভুল হবে, ২০১৪ সালে প্রতিশ্রুতি দিয়েও বিলই আনতে পারেনি। চাকরিতে সংরক্ষণ করবে কীভাবে? যখন সরকারি চাকরিই দেশে থাকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ গভীর হচ্ছে তখন গল্পের গরুর মতোই প্রতিশ্রুতিকে মগডালে চাপানো হলো। না পারলে হাসতে হাসতে বলা হবে, ওতো ‘জুমলা’। কথার কথা। নির্বাচনের আগে অমন বলতে হয়। যেমন মোদীজির প্রতি নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ‘জুমলা’ বলে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন অমিত শাহ। জুমলার কি শেষ আছে? চার বছর আগেও জ্বালানির গ্যাসে ৫০০ টাকা ভর্তুকি মিলত। তা এখন এসে দাঁড়িয়েছে ১৯ টাকায়। গ্যাসের দাম গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫০ টাকায়। মানুষ বলছে দু’টাকা কেজির চাল সাড়ে আটশো টাকার গ্যাসে ফুটছে। আসলে উজ্জ্বলা যোজনায় গ্যাস পাওয়া বহু রান্নাঘরে কাঠ, কয়লা, ঘুঁটের ধোঁয়া ফিরে এসেছে। যার ফলে ফের মহিলা ও বাচ্চাদের মধ্যে ফুসফুসে ক্যান্সার, হৃদরোগ বৃদ্ধি পাবে। বায়ু দূষণ ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়ের স্টিয়ারিং কমিটি তাদের ২০১০ সালের রিপোর্টে জানিয়েছিল, বাড়ির মধ্যে এই কাঠ, কয়লা, ঘুঁটের মতো জ্বালানি ব্যবহার জনিত দূষণে ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এই বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে মহিলাদের মুক্তি দেওয়ার জন্যই তো পাঁচ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা চালু করা হয়েছিল। সেও তো জুমলাই হয়ে গেল — তাই নয় কি? বর্তমান আর্থিক বছরে রান্নার গ্যাসে ভর্তুকি খাতে গত আর্থিক বছরের তুলনায় বাজেট বরাদ্দ যে অর্ধেক হয়ে গিয়েছে।

 

Also Read২০১৯ ও ২০২১ এক নয়; অতিমারি পর্বের অভিঘাত বদলে দেবে জয়-পরাজয়ের বহু হিসাব-নিকাশ

 

তা, দরাজ গলায় যে সংকল্পপত্র পাঠ করা হলো, এ অর্থনৈতিক ভাবে মধ্যবর্গের এ রাজ্যে অত টাকার সংস্থান হবে কোথা থেকে? অমিতজি নাকি হেসে বলেছেন, “আমি বেনে, আমার উপর ভরসা রাখুন।” আর এখানেই ভয়। উনি শুধু ‘বেনে’ নন। এই সরকারটাই যে বেনেদের দ্বারা, বেনেদের জন্য, বেনেদের সরকার। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী মনে করেন — সরকারের কাজ নয় ব্যবসা করা। অতএব, বেচে দাও ব্যাঙ্ক-রেল-বিএসএনএল-অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি-বিমান বন্দর থেকে যা কিছু সরকারি লাভজনক সংস্থা সবকিছু। যে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, কৃষিতে শেষ কথা বলবে আম্বানি-আদানির মতো কর্পোরেটরা। যে কোনও দরে কিনবে, বেচবে কিংবা যতদিন খুশি গুদামে ভরে রাখবে — সেখানে কৃষকের কিছু বলার থাকতে পারে না, মানুষ কিনে খেতে না পারলেও সরকারের কিছু বলার থাকতে পারে না। যে সরকার মনেই করে, শ্রমিকের অধিকার বলে কিছু হয় না। তাদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার থাকতে পারে না। মনে করে, উন্নয়ন-আর্থিক বিকাশের স্বার্থে জল-জঙ্গল-জমি সব সব বেচে দিতে হবে। আদিবাসীরা চুলোয় যাক, বন-বন্যপ্রাণ চুলোয় যাক, প্রকৃতি-পরিবেশ চুলোয় যাক। আর প্রতিবাদ করলে সন্ত্রাস দমন আইন, জাতীয় নিরাপত্তা আইন, ফৌজদারি দণ্ডবিধির ‘দেশদ্রোহিতা’-র ধারা তো আছেই। এনআইএ, সিবিআই, ইডি কী নেই! তার লাগামহীন অপপ্রয়োগ তো সাত বছরে দেশের মানুষ বিশেষ করে সংখ্যালঘু মানুষ, আদিবাসী-দলিত মানুষ, প্রতিবাদী নাগরিক সমাজ, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, অধ্যাপক, সাংবাদিকরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। তার সহজ শিকার হয়ে উঠেছেন। আইন-আদালত? তার খড়ের পা ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে।

 

সুইডেনের এক গবেষণা সংস্থা ভ্যারাইটিস অব ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট তার সাম্প্রতিক গবেষণায় জানাচ্ছে, ‘ভারত এখন নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’। কেমন তা, কেনই-বা তা? রিপোর্ট বলছে, “গত দশ বছর ধরে ভারতে সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাজগৎ এবং নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা লাগাতার খর্ব করা হয়েছে এবং তা চরমে পৌঁছেছে। দেশদ্রোহ, মানহানি এবং সন্ত্রাস দমন আইন ব্যবহার করে ক্রমাগত সরকারের সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। এফসিআরএ (ফরেন কন্ট্রিবিউশনস রেগুলেটিং অ্যাক্ট) কাজে লাগিয়ে নাগরিক সংগঠনগুলির কাজকর্মে লাগাম পরানো হচ্ছে।” পাশাপাশি তারা একথাও বলছে, ভারতে স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই চলছে। শাসক বিজেপিকে মার্কামারা স্বৈরতান্ত্রিক দলের মতোই লাগছে। (আবাপ, ১২ মার্চ, ২০২১)। লকডাউনের সুযোগে এই স্বৈরাচার আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

 

আসলে এই হলো ‘গুজরাট মডেল’। আমাদের শুধু বলা হয়েছে যে, দেখো ভারতের জনসংখ্যার মাত্র পাঁচ শতাংশ মানুষ গুজরাটে বসবাস করে। অথচ জাতীয় আয়ের আট শতাংশ আসে গুজরাট থেকে। কিন্তু, এ কথা সযত্নে লুকিয়ে রাখা হয়েছে যে, ২০১৮-১৯-এ মানব উন্নয়ন সূচকের নিরিখে গুজরাট দেশের রাজ্যগুলির মধ্যে একদম নীচের সারিতে ২১তম। এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে গুজরাটবাসীকে। কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদের কোনও স্থান নেই সেখানে। স্থান নেই কোনও প্রগতিশীল সামাজিক, বৌদ্ধিক, রাজনৈতিক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের। স্থান নেই কোনও পরিবেশ আইনের। শ্রমিক সংগঠন, শ্রমিকের অধিকার যেখানে ব্রাত্য। বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে উচ্ছেদ হয়েছেন শত শত আদিবাসী ও মৎস্যজীবী। কচ্ছ উপকূলে প্রকৃতি ও মানুষকে সমূলে উচ্ছেদ কাহিনির কোনও লেখাজোখা নেই। দলিত ও সংখ্যালঘু নিপীড়ন, গণহত্যা যেখানে এক সাধারণ ঘটনা। এমনই হয় বণিক-রাষ্ট্র। বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে বদল হলে এমনই হয়। দেশের তাবৎ সম্পদ লুঠ করাই তার এক ও একমাত্র লক্ষ্য। এভাবেই একটি দেশ, দেশের মানুষ পরাধীন হয়ে পড়ে। যেমন হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে। কৃষক নেতাদের বক্তৃতায় শুনেছিলাম এখন নাকি ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেশ দখল করতে চাইছে। যেখানে সবার উপর মানুষ নয়, মুনাফাই শেষ সত্য।

 

আমাদের ভয় এখানেই। এই কর্পোরেটের অর্থে ফুলে ফেঁপে ওঠা একটি আপাদমস্তক স্বৈরাচারী, পরধর্মবিদ্বেষী, বহুভাষা ও  বহুসংস্কৃতির বৈচিত্র্য-বিদ্বেষী দলটি এ রাজ্যে একরকম জাঁকিয়ে বসেছে। এই দলটি যতই শক্তিশালী হতে থাকবে ততই দুর্বল হয়ে পড়বে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য তার মূল্যবোধ, তার ভাষা ও সংস্কৃতি। তর্কপ্রিয় বাঙালি হারাবে তার মতানৈক্যের স্বাধীনতা, প্রতিবাদের অধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা, তার নিজস্ব পূজা-পাঠের রীতিনীতি আর সমন্বয়ী সংস্কৃতি। হারাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, একঘরে হবে বাংলার সংখ্যালঘু সমাজ। এক ধর্ম, এক ভাষার, এক নেতার প্রবক্তারা ধ্বংস করবে বাঙালির বিশ্বজনীনতা। ঘোষিত হবে রাজনৈতিক-সামাজিক-বৌদ্ধিক লকডাউন। কোনও অর্থের বিনিময়ে, ভোট-প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে যা বিকিয়ে দেওয়া যায় না।

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Jogin on March 24, 2021

    Excellent. Brief, lucid, comprehensive.
    Mention of the other side, how understanding, unity, resistance is growing in this era also needed.

Leave a Comment