লিঙ্গ রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে মা-রূপকের আড়াল


  • March 7, 2021
  • (2 Comments)
  • 954 Views

“এই যে রূপকীয় লিঙ্গ রাজনীতি, সেখান থেকে ক্রমে হারিয়ে যেতে থাকে কতগুলি বিষয়। এক, বাস্তবিক মাতৃত্ব (বা ভগ্নিত্ব বা প্রিয়াত্ব) কোনো রূপক নয়। সেখানে আছে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি, শারীরিক যন্ত্রনা। কিন্তু, মাতৃত্বের এই যে বাস্তবিক শ্রম, তার যে প্রগাঢ় দৈনন্দিতা, তা হারিয়ে যায় এই রূপক-মা, রূপক-বোন বা রূপক-প্রেমিকার সমস্ত বিবরণ থেকে। আর, যেহেতু এই দৈনন্দিন বাস্তবতা, শ্রমের বাস্তবতার সমস্ত বিবরণ হারিয়ে যায় এই রূপক-নারীদের বয়ান থেকে, তাই হারিয়ে যায় তাঁদের সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়াও। ” আন্তর্জাতিক মহিলা দিবসে মা-রূপকের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানালেন নন্দিনী ধর

 

মে মাস, ২০১৭ সাল। কাশ্মীর উপত্যকা তখন উত্তাল। শয়ে শয়ে মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে এসে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে খণ্ডযুদ্ধে লিপ্ত। সেই লড়াইয়ে অংশ নিতে শুরু করেছেন মেয়েরাও। বিশেষত, স্কুলের মেয়েরা, তরুণীরা। তো, হিজবুল মুজাহিদিনের তৎকালীন কমান্ডার জাকির মুসা ঘোষণা করলেন, “আপনাদের ভাইরা এখনও মরে যায়নি। আমি আমার বোনেদের বলতে চাই, আপনারা যা করছেন, তা শরিয়তি আইন বিরুদ্ধ। হিজাববিহীনভাবে মেয়েদের পাথর ছোঁড়া ইসলামবিরূদ্ধ। ইসলামে এইরকম কোনো প্রতিবাদের কথা নেই। আল্লা তাই আমাদের শাস্তি দিয়েছেন এই অধিকরণের বা দখলদারির (অকিউপেশন) মাধ্যমে।”

 

এর প্রায় তিন বছর বাদে, ২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি, ভারতের প্রধান  বিচারপতি এস এ বোবদে দিল্লির টিকরি ও সিঙ্ঘু সীমান্তে চলমান কৃষক আন্দোলনে মেয়েদের উপস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে মন্তব্য করলেন, “মহিলাদের ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতিবাদস্থলে রাখা হয়েছে কেন?” বোবদে আর মুসার অবস্থান রাজনৈতিকভাবে প্রায় দুই মেরুতে। একজন বলেন ভারত রাষ্ট্রের হয়ে কথা, ভারতের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের মুখ্য বিচারপতি তিনি, অন্যজন ভারত রাষ্ট্রের ঘোরতর বিরোধী অবস্থান থেকে। কিন্তু, দুজনেরই ভাষ্যে, কী অদ্ভুতভাবে, আছে একধরনের মিল। যে মিলকে বলা যেতে পারে একধরনের উচাটনও — মেয়েদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পা দেওয়া নিয়ে। অবশ্য শুধু মুসা বা বোবদেই নন, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিও ১৯৪৮ সালে, তেভাগা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে, মেয়েদের আদেশ দিয়েছিল, ‘গো ব্যাক টু কিচেন।’

 

প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, কী আছে ঠিক এই লিঙ্গ ব্যাপারটিতে, যাতে করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মেয়েদের পদচারণা এত জটিল বিষয় হয়ে ওঠে মতাদর্শ নির্বিশেষে? একদিক থেকে দেখতে গেলে, যে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটিকে ঘিরে, সেখানে এটাই হয়তো কিছু পরিমাণে স্বাভাবিক। কারণ, জাতীয়তাবাদের একটি বড় রাজনৈতিক স্তম্ভ দাঁড়িয়ে থাকে মেয়েদের সম্প্রদায়ের প্রতীক ভাবার মধ্যে দিয়ে। মেয়েরা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে তাই আসে প্রাথমিকভাবে রূপক হয়ে। সে রূপকের হাত ধরেই জাতীয়তাবাদ প্রথমত দেশকে কল্পনা করতে শুরু করে মাতৃরূপে। শুধু মাতৃরূপেই নয়, জাতীয়তাবাদ মাতৃরূপী দেশকে প্রায় সর্বসময়েই কল্পনা করে থাকে রোরুদ্যমানা জননী হিসেবে। শুধু রোরুদ্যমানা জননীর কল্পনাতেই থেমে যায় না জাতীয়তাবাদের রূপকল্প। জাতীয়তাবাদের রোরুদ্যমনা জননীরা সেখানে সবসময়েই পুত্রসন্তানের জননী। পুরুষ ও পৌরুষের যন্ত্রণা ও অবমাননায় চোখের জল ফেলা ছাড়া জাতীয়তাবাদ মেয়েদের যন্ত্রণাকে কল্পনা করতে পারে না। মেয়েদের স্বতন্ত্র যন্ত্রনা তাই জাতীয়তাবাদের রাজনীতির অন্যতম মূল চাবিকাঠি কখনও হয় না। হলেও, তা হয় পুরুষকে রক্ষাকর্তা হিসেবে অধিষ্ঠান দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসাবে। যে বক্তব্যই উঠে এসেছিল জাকির মুসার নিদানে। মেয়েদের স্বতন্ত্র দাবিদাওয়াও তাই জাতীয়তাবাদের আঙিনায় প্রবেশ করে না। বৃহদাংশে পুরুষের মা, কখনও কখনও পুরুষের বোন হয়েই তাঁরা রাজনীতির আঙিনায় থাকেন। তাঁরা কাঁদেন, পুরুষরা তাঁদের চোখের জল মোছান, রক্ষা করেন বিদেশি শত্রুদের হাত থেকে। সেই রক্ষা করার রাজনীতির অপর নামই হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদ।

 

এই রূপকীয় রাজনীতি অবশ্য ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দেখা দেয়। যার প্রাথমিক অভিব্যক্তি ধরা পড়ে ভারতমাতার রূপকল্পের মধ্য দিয়ে। যদিও, একথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট রাজনীতি, আজকে যা ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় রাজনীতিও বটে, সেখানে ভারতমাতা কিন্তু শুধুই রোরুদ্যমানা জননী নন, তিনি সেখানে আগ্রাসী রুদ্ররূপিণী। তাঁর মুকুট স্পর্শ করে আছে কাশ্মীরের হিমালয় চূড়া, তাঁর গোটা দেহটাই ভারতীয় মানচিত্র। তাঁর হাতে ত্রিশূলসহ অন্যান্য অস্ত্রসমূহ। অর্থাৎ, যদিও রূপক, তবুও ভারতমাতা এখানে সক্রিয় রূপক। সেই সক্রিয়তা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের দোসর হয়ে, তথাপি সক্রিয়।

 

এই রূপকী সক্রিয়াটিরই এক গভীর অভিব্যক্তি আমরা দেখতে পাই দুর্গাবাহিনীর রাজনীতিতে। সেখানে মেয়েদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হলো, কিন্তু, তার সাথে সাথে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হলো কার দিকে তাকে করা হবে সেই অস্ত্র। নির্মাণ করা হলো বিশেষ বিশেষ অপর — মুসলিম, কাশ্মীরি মুসলিম, মাওবাদী, আরবান নকশাল, আন্টি-ন্যাশনাল। তাই, একদিকে যেমন আমরা দেখি দুর্গাবাহিনীর মধ্য দিয়ে হিন্দুত্ব-ফ্যাসিবাদের পক্ষে বিশেষভাবে হিন্দু মেয়েদের সক্রিয়তা, তেমনি আমরা দেখি, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার বিবাহ সুপারিশ করছেন। সেখানে অদ্ভুতভাবে নীরব হিন্দু দক্ষিণপন্থী নারী সংগঠনগুলি।

 

কাজেই, একদিকে চাওয়া হয় মেয়েদের চূড়ান্ত সক্রিয়তা। অন্যদিকে তাঁদের ঠেলে দেওয়া হয় চূড়ান্ত এক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে। যেখানে তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় তাঁর সমস্ত স্বাতন্ত্র, স্বাধিকার, স্বাধীনভাবে বাঁচার ইচ্ছে। সম্প্রতি, ভারতবর্ষে, এই কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি চলছে রাষ্ট্রীয় মদতে — যা কিনা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নারীকেন্দ্রিক একটির পর একটি রায়ের মধ্য দিয়ে দেখা যাবে। দেখা যাবে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ বা বর্তমান প্রধান বোবদের একটির পর একটি মন্তব্য ও কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে।

 

তেমনি ভাবুন সুনীতা সিং গৌড়ের কথা। উত্তরপ্রদেশের রামকলের বিজেপি মহিলা মোর্চার নেত্রী। যিনি ফেসবুকে তাঁর “হিন্দু ভাইদের” প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন “মুসলিম মা বোনেদের” খোলা রাস্তায় গণধর্ষণ করতে। একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলে দেখা যাবে, লিঙ্গজনিত অধিকার বা মেয়েদের অধিকারের বিষয়ে বিজেপি-র নারী সংগঠনগুলির কণ্ঠস্বর অদ্ভুতভাবে নীরব। অর্থাৎ, বিষয়টি কী দাঁড়াল?

 

যে সক্রিয়তা এখানে দেওয়া হলো মেয়েদের, তা হলো শর্তসাপেক্ষ। সে ততক্ষণই সক্রিয় হতে পারে, যতক্ষণ সে “অপর” — মুসলিম, কাশ্মীরি বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর হত্যাকারিণী। ঠিক যেন ত্রিশূল হাতে ভারতমাতা, যার কাজ দেশকে “শত্রুমুক্ত” করে “সন্তান”-কে (পড়ুন:হিন্দু সন্তান, পুত্র হলেই শ্রেয়) সুরক্ষিত করে রাখা। একভাবে, দুর্গাবাহিনী জাতীয় সংগঠনগুলির মধ্যে দিয়ে এই রূপক-রাজনীতিকেই বাস্তবিক রূপ দেওয়া হলো। তৈরি করা হলো একধরনের ফ্যাসিস্ট নারীবাদের নীলছক। এবং, আমরা যারা লিঙ্গ রাজনীতি নিয়ে কাজকর্ম করি, ভাবি, তাঁদের কাজটি হয়ে উঠল আরও কঠিন।

 

কিন্তু, ফ্যাসিবাদী দর্শন বা রাজনীতি ভুঁইফোড় নয়। ফ্যাসিবাদ, বহুলাংশেই, নিজেকে গড়ে তোলে একটি বিশেষ সমাজের মাটিতে যে বৈষম্যমূলক বাস্তবতা ও দর্শনের অস্তিত্ব থেকে থাকে, তার ওপর। যে সমস্ত ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব থাকে, তার ওপর। সেই দ্বন্দ্বগুলোকেই একভাবে ফ্যাসিবাদী দর্শন বিবর্ধিত আকারে সমাজে হাজির করে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তাকে দেয় আইনানুগ আকার। কাজেই, কোনও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও সংস্কৃতি গড়ে তুলতে গেলে প্রয়োজন গভীর আত্মনিরীক্ষণ।

 

যেমন ধরুন, বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে সার্বিকভাবে এই দেশমাতৃকা রূপকের একটি বড় প্রভাব রয়েছে। তার মধ্যে একদিকে যেমন আছে বাংলার ইতিহাসের মধ্য থেকেই অধুনা ভারতমাতার ইতিহাসটির গড়ে ওঠার ইতিবৃত্ত, তেমনি আছে বাংলার বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মহলে এই অবয়বটির একধরনের জনপ্রিয়তা, যদিও অনেকটাই পরিবর্তিত রূপে। আজ আমাদের আন্দোলনের ক্ষেত্র থেকে একটি বিস্মৃতপ্রায় স্মৃতি যে প্রথম বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন চলাকালীন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এঁকেছিলেন বঙ্গমাতা বলে একটি ছবি,পরবর্তী সময়ে যার নামকরণ বদলে করা হয় ভারতমাতা। ঐতিহাসিক সুগত বসুর মতে, নিজের কন্যার মুখের আদলে অবনীন্দ্রনাথ এঁকেছিলেন এই বঙ্গমাতা তথা ভারতমাতার মুখমণ্ডলের ছবি। না, সংঘ পরিবারের মারমুখী, আগ্রাসী ভারতমাতা নয় অবনীন্দ্রনাথের বঙ্গমাতা। অবনীন্দ্রনাথের বঙ্গমাতার অঙ্গাবয়বে কোনো জাতীয় মানচিত্র নেই। অবনীন্দ্রনাথের বঙ্গমাতার মুখমণ্ডল চিরায়তরূপে স্নিগ্ধ, চোখের দৃষ্টি দর্শকের দৃষ্টিপথের থেকে ঈষৎ সরানো। এবং, এই যে সরাসরি না তাকানো, এর মধ্যেই নিহিত আছে একধরনের নিষ্ক্রিয় নারীত্বের নন্দনতত্ত্ব। যা কিনা আবার জাতীয়তাবাদের লিঙ্গ -রাজনীতিও বটে। অবনীন্দ্রনাথের বঙ্গমাতা কিন্তু অমোঘভাবেই হিন্দুনারী — মাথায় সিঁদুর ও গেরুয়া পট্টবস্ত্রসহ। কাজেই, আজকে কোথাও একটা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে যে, বাংলার নবজাগরণের ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে যে জাতীয়তাবাদের নীলছক আমাদের সামনে এসেছে, তার মূলগত লিঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক চরিত্র ঠিক কী? সেখানে প্রয়োজন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিকতা নির্মোহভাবে। এই দ্বান্দ্বিকতার ওপর দাঁড়িয়েই একমাত্র গড়ে উঠতে পারে একটি প্রকৃত ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই।

 

এই বঙ্গমাতা জাতীয় ধারণা টিকে রইল বাংলার মূলস্রোতের রাজনীতিতে তো বটেই। যেমন ধরুন “মা মাটি মানুষ” স্লোগানে — যেখানে দাঁড়িয়ে অবশ্যম্ভাবী প্রশ্ন জাগে, মায়েরা কি মানুষ নন নাকি? শুধু তাই নয়, এই মা-রূপক হয়ে উঠল বাংলার বামপন্থী, মায় বিপ্লবী বামপন্থী রাজনীতির অন্যতম রাজনৈতিক -সাংস্কৃতিক প্রতীক। ফলশ্রুতি হিসেবে দেখা গেলো, তা হলো, বাংলার যে বাম রাজনৈতিক আন্দোলনক্ষেত্রের চিত্রজগৎ, সেখানে বিপুলভাবে এই বঙ্গমাতা — বাংলা মা ধারার বয়ান ঘুরতে লাগল। এমনকি, একথা বললেও অত্যুক্তি হবে না যে এই মা-রূপকের মধ্যে দিয়েই মেয়েরা প্রধানত এলো বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। কাজেই, নারী প্রশ্নে মূলস্রোতের জাতীয়তাবাদের সাথে একধরনের গাঁটছড়া বেঁধেই বাংলার বামপন্থার লিঙ্গ মতাদর্শ পথ চলতে শুরু করল।

 

তার জেরে, আমরা পেলাম একধরনের সক্রিয় মা-রূপক। কোলে বাচ্ছা, হাতে রাইফেল। কাঁখে সন্তান, হাতে লাল পতাকা। এই দৃশ্য -সংস্কৃতির সাথে সাথে এল সাহচর্য দিতে আন্দোলনের গান। মানে যে দুটি জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক মাধ্যম যা বৃহত্তর সমাজের কাছে, মানুষের কাছে রাজনীতি বিষয়টিকে পৌঁছে দেয়। এইরকম গানের উদাহরণ ভূরি ভূরি। যেমন ধরা যাক — “জননী গো, কাঁদো,” “মা, মা যেমন তুমি একদিন। ” যেমন ধরা যাক “খোকন দিলো সাগর পাড়ি।” নিঃসন্দেহে, গানগুলি যাঁদের লেখা ও সুরারোপিত — সমীর রায়, সুরেশ বিশ্বাস অথবা প্রতুল মুখোপাধ্যায় — তাঁরা আমাদের অতীব ভালোবাসার মানুষ। বহু বছর ধরে আমরা গানগুলি গেয়েছি আন্দোলনের মঞ্চে। এখনও বহু সময়ে আমরা গানগুলি গাই আবেগ সহকারে, সেই আন্দোলনের মঞ্চেই ।

 

কিন্তু, একথাও একইভাবে ঠিক যে এই গানগুলি গাওয়ার সময়ে ভেতরে আমার মতো বহু মেয়েদের থাকে একধরনের বিচ্ছিন্নতা বোধ। যে বিচ্ছিন্নবোধটি, আমরা আন্দোলনের মধ্যে থাকা মেয়েরা, বহু সময়েই গিলে খেয়ে অংশগ্রহণ করি। কারণ জানি যে, আন্দোলনের ক্ষেত্রে, এখনও পর্যন্ত, এই বিচ্ছিন্নতাবোধের খুব একটা জায়গা নেই। যেমন ধরুন এই গানটি:

 

ধন্যবীর মাতা বীর পুত্র গরবিনী
আমার মা।
সাহসী সন্তানদের শক্তি স্বরূপিণী
আমার মা।
ঘরে ঘরে আমরা মা তোর
আশিস নিয়ে মাথে,
সংগ্রাম করিব হিংস্র দানবের সাথে
আমার মা গো।

 

গানটি আমাদের অতি ভালোবাসার ও শ্রদ্ধার মানুষ প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের লেখা ও সুর দেওয়া। বাংলার গণসংগীতের ইতিহাসে তাঁর অবদানকে ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, এই যে নিষ্ক্রিয়, কিন্তু “শক্তি-স্বরূপিণী” মায়েদের বন্দনা বাম গণসংগীতে, তার সাথে মূলগতভাবে সংঘ পরিবারের যে সক্রিয়-নিষ্ক্রিয় ভারতমাতার রূপক, তার তফাৎ কোথায় ? কেন বাংলা গণসংগীতের যে সমৃদ্ধ ভাণ্ডার, সেখানে মা, এবং বিশেষত রূপকীয়, “পুত্র-গরবিনী” মা- ব্যতীত অন্য কোনও ধরনের মেয়েদের, বিশেষত লড়াকু মেয়েদের, প্রায় কোনোরকমের রূপায়ণ হলো না? কখনও কখনও ওই মায়েদের লেজ ধরে “বোনে” রা এল বটে, যেমন ধরুন, “পঞ্চাশে লাখ প্রাণ দিছি /মা- বোনেদের মান দিছি”, কিন্তু সেও তো সেই নিষ্ক্রিয় রূপক হিসেবেই। কাজেই, জাতীয়তাবাদ যেমন হয়ে ওঠে দুই গোষ্ঠীর পুরুষদের মধ্যেকার লড়াই, শ্রেণিসংগ্রামও হয়ে উঠল দুই শ্রেণির পুরুষদের মধ্যেকার লড়াই, যেখানে মেয়েদের — থুড়ি, মা-বোনেদের — মান দেওয়া-নেওয়া হয়। মেয়েদের “মান” এর মালিকানা সেখানে মেয়েদের হাতে নেই।  তৎসহ, ওই একটি শব্দের মধ্য দিয়ে — “মা-বোন” — ওই একটি লাইনের মধ্যে দিয়ে — “মা-বোনেদের মান দিছি” — গানটির যুথবদ্ধ লিরিকিয়ো বৈষয়িকতা — অর্থাৎ “আমরা” থেকে বাদ পড়ে যায় মেয়েরা। একইসাথে, গানের লিরিকিয়ো বৈষয়িকতার থেকে বাদ পড়ার সাথে সাথে তারা বাদ পড়ে যায় “যার জমি সে লাঙল চালায়”-এর যে জমির মালিকানার বয়ান ও তৎসহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষয়িকতা, তার থেকেও। একইসাথে, বাদ পড়ে যায় কৃষিকাজে মেয়েদের শ্রমের ইতিহাস ও গল্পও।

 

মানে, রূপকদের তো জমির প্রয়োজন নেই। নেই মজুরিরও প্রয়োজন। যেমন প্রয়োজন হয় না তাঁদের শ্রমের খতিয়ানের।

 

কাজেই, এখানে আমাদের আজ গভীরভাবে ভাবতে হবে। আত্মনিরীক্ষণ করতে হবে। বিচারপতি বোবদের যে বক্তব্য, যে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার চলমান কৃষক আন্দোলন, যা আজ ১০৩ দিনে পড়ল, সেখানে তিনটি সীমান্ত জুড়ে মেয়েদের এনে “রাখা” হয়েছে, তার প্রাক-ইতিহাস আছে বাম-আন্দোলনের ভিতরেই। এই “প্রগতিশীল,” “বাম” বাংলাতেও। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও, পরোক্ষভাবে।

 

অবশ্য বাঙালি প্রেমপ্রিয় জাত। কাজেই, আমরা ভারতমাতার ভিতরে যেমন পেলাম সম্পূর্ণ যৌনতাবিহীন একটি মূর্তি, যার কোটি কোটি পুত্র আছে, কিন্তু কোত্থেকে সেইসব সন্তানেরা এলো, তার কোনও হদিশ নেই, বাঙালি বাম ঠিক তেমন নয়। নকশালরা তো নয়ই। তারা প্রেমপ্রিয় জীব। কাজেই, মা-বোনেদের সাথে এই বাংলায় আমরা আরেকটি জিনিস পেলাম — প্রিয়া, প্রেমিকা। তাই, লেখা হলো “চাষনালার খনিতে” বা “আন্ধারে কে গো” -র মতো গান। সেখানে মেয়েরা এলো মা নয়, প্রধানত “মরদ”হারা, “সাথী”হারা প্রিয়া হিসেবে। লড়াই, তা সশস্ত্র শ্রেণিসংগ্রাম হলেও, সেখানে তাদের সংযুক্তি ঘটল প্রথমত প্রিয়া হিসেবে। স্বাধীন রাজনৈতিক একক হিসেবে নয়। স্বাধীন অর্থনৈতিক একক হিসেবে নয়। অর্থাৎ, মা-রূপকের সাথে সাথে এল গিয়ে রাধা-রূপক।

 

তো, এই যে রূপকীয় লিঙ্গ রাজনীতি, সেখান থেকে ক্রমে হারিয়ে যেতে থাকে কতগুলি বিষয়। এক, বাস্তবিক মাতৃত্ব (বা ভগ্নিত্ব বা প্রিয়াত্ব) কোনও রূপক নয়। সেখানে আছে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি, শারীরিক যন্ত্রনা।  কিন্তু, মাতৃত্বের এই যে বাস্তবিক শ্রম, তার যে প্রগাঢ় দৈনন্দিতা, তা হারিয়ে যায় এই রূপক-মা, রূপক-বোন বা রূপক-প্রেমিকার সমস্ত বিবরণ থেকে। আর, যেহেতু এই দৈনন্দিন বাস্তবতা, শ্রমের বাস্তবতার সমস্ত বিবরণ হারিয়ে যায় এই রূপক-নারীদের বয়ান থেকে, তাই হারিয়ে যায় তাঁদের সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়াও।

 

আর একটু খেয়াল করে দেখুন। এই যে রূপক-নারীরা, বিশেষ করে রূপক-মায়েরা তো টিকে থাকেন এক ভয়ঙ্কর পৌরুষের জগতে। তাই, তাঁদের সব সন্তানেরাই, কী অদ্ভুতভাবেই, পুত্রসন্তান। এক্ষেত্রে সব শহিদরাই পুরুষ। আমাদের যে আন্দোলনের সাংস্কৃতিক জগৎ, সেখানে তৈরি হয়েছে, বহু বছর ধরে এক পৌরুষের বংশলতিকা। আমরা গলা ফাটিয়ে গাই, “ওরা ভগৎ সিংয়ের ভাই, ওরা ক্ষুদিরামের ভাই।” আর, তৎক্ষণাৎ বাদ পড়ে যান মেয়েরা লড়াইয়ের ইতিহাস থেকেও, এবং বর্তমান লড়াই থেকেও। কাজেই, মহিলা রাজনৈতিক কর্মীদের রূপায়ণ করার ভাষা আমাদের কাছে এখনও অবধি নেই।

 

আর, মুশকিল হলো, মেয়েরা যখন শহিদ হন, তখনও তাঁরা নিস্তার পান না এই রূপক-মাতৃত্ব থেকে। নিস্তার নেই তাঁদের রোরুদ্যমানতা থেকে। উদাহরণস্বরূপ, ভাবুন, “অহল্যা গো, মা জননী /বুক ভেজা তোর চোখের পানি।” কাজেই, যতদিন মেয়েরা আন্দোলনে থেকে যায় শুধুই রূপক-মা হয়ে, রূপক-বোন বা রূপক-প্রেমিকা/বধূ হয়ে, ততদিনই আন্দোলনের ক্ষেত্রে স্থান পায় না তাদের নিজস্ব দাবিদাওয়া। তা সে অর্থনৈতিকই হোক, কিংবা রাজনৈতিক, কিংবা যৌনতাকেন্দ্রিক।

 

এবং, যে মুহূর্তে আসলে সেইসব স্বতন্ত্র দাবিদাওয়া স্থান পাবে আন্দোলনের ক্ষেত্রে, সেই মুহূর্তেই আর এক ধরনের স্বীকৃতিও উঠে আসতে বাধ্য। তা হলো, মাতৃত্ব ব্যাতিরেকেও মেয়েদের জীবনে আছে বহু বহু দিক। সেই সমস্ত দিককে যে যে মাত্রায় স্বীকৃতি দেওয়া হবে সার্বিক বামপন্থী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতিতে, সেই সেই মাত্রায় পরিবর্তিতও হবে পরিবার ও বিবাহপ্রথাসমূহ। এমনকি, এটাও সম্ভব যে আন্দোলনের প্রয়োজনে, লড়াইয়ের প্রয়োজনে, মেয়েটিকে নাকচ করতে হতে পারে মাতৃত্ব।

 

অবশ্য, এই যে রূপকের রাজনীতি, মা-রূপকের যে রাজনীতি, তাকে বারবার ভেঙেছেন মেয়েরা। ভেঙেছেন তাঁদের বাস্তবিক কাজকর্মের মধ্য দিয়ে। বাংলার চারের দশকে বামপন্থী আন্দোলনের হাত ধরে উঠে আসা সুলেখা স্যান্যাল, সাবিত্রী রায়ের মতো লেখিকারা। দেখিয়েছিলেন কেমনভাবে প্রাত্যহিক মাতৃত্বের রাজনীতি জড়িয়ে আছে শ্রেণির রাজনীতির সাথে, গার্হস্থ্যের রাজনীতির সাথে। সাম্প্রতিক সময়ে, যখন সংযুক্ত কিষান মোর্চার উদ্যোগে পাঞ্জাব-হরিয়ানার কৃষক আন্দোলনের সংহতিতে কলকাতায় আয়োজিত হলো ধর্না মঞ্চ, আর সারা ভারতের কর্মসূচি মেনে ১৮ জানুয়ারি পালিত হলো, কিষানি দিবস, কৃষক মেয়েরা, তা তাঁরা ভাঙড়ের জমি, জীবিকা, বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ রক্ষা কমিটির সদস্যই হন, অথবা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা থেকে আগত ক্ষেতমজুর সমিতির সদস্যই হোন, মঞ্চে উঠে মাতৃত্বের ভাষায় কথা বললেন না। নিজেদের পরিচয় দিলেন না মা বলে। বা বোন বলে। বা বউ বা প্রেমিকা বলে। তাঁরা কথা বললেন জমির মালিকানার ভাষায়। তাঁরা কথা বললেন মজুরির ভাষায়। অর্থাৎ, অর্থনৈতিকতার ভাষায়। কেউ বা বললেন, “মহিলা কৃষকরা যেমন ভোট দিয়ে কাউকে গদিতে তুলতে পারে, তেমনি কাউকে গদি থেকে ফেলতেও পারে।” অর্থাৎ, তাঁরা কথা বললেন রাজনীতির ক্ষমতার ভাষায়। যদিও, ব্যক্তিজীবনে, তাঁরা অনেকেই মা। তাঁদের সন্তানরাও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। কিন্তু, মা-রূপকের ভাষা তাঁদের রাজনীতির ভাষা নয়।

 

কাজেই, আজ ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম লক্ষ্য যদি হয় জাতীয়তাবাদের রাজনীতির চুলচেরা বিচার, জাতীয়তাবাদের হাত ধরে এসেছে যে লিঙ্গ রাজনীতি ও রাজনৈতিক রূপক, তারও প্রয়োজন চুলচেরা বিচার, সমস্যায়ন ও প্রত্যাখ্যান।

 

Feature Image courtesy : https://feminisminindia.com

 

লেখক শিক্ষক ও ছোট পত্রিকা কর্মী। 

 

Share this
Recent Comments
2
Leave a Comment