প্রতিস্পর্ধী শত দিন


  • March 5, 2021
  • (0 Comments)
  • 520 Views

সন্দেহ নেই দেশটা তলিয়ে যাবার আগে যদি না ‘বেণীর সঙ্গে মাথা’ দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফের জেগে উঠত পঞ্জাব, যদি না দিল্লি ঘিরত জাঠেরা, যদি না মরাঠাওয়ারা ছেয়ে যেত ক্ষুদ্র ও ভূমিহীন চাষার লাল পতাকায়, যদি না রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশের কৃষকরা রুখে দাঁড়াতেন আদিবাসী ভূমিহীন কৃষকদের সঙ্গে, যদি না অন্ধ্র-তামিলনাড়-কেরলের কৃষকরাও আছড়ে পড়তেন রাজপথে — তবে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এই কলমের মৃত্যু পরোয়ানা এতদিনে লেখা হয়ে গিয়েছিল। তাকে পুনর্জীবন দিয়েছে লাঙলের ফলা। লিখছেন দেবাশিস আইচ

 

৫ মার্চ শততম দিন। আজও রুদ্ধ রাজধানী দিল্লির পাঁচ সীমান্ত। শীতের মরণ কামড়, দুশোরও বেশি কৃষকের মৃত্যু, হাজারো প্ররোচনা, ভক্ত মিডিয়ার বিরুদ্ধ প্রচার, স্থানীয় সাজা সঙ্ঘীদের আক্রমণ — না তিন কৃষি আইন বাতিলের দাবি থেকে একচুলও নড়ানো গেল না কৃষকদের। মুসলমানের প্রতিস্পর্ধাকে দাঙ্গা বাঁধিয়ে সাফ করে দেওয়া যায়। যেমন, শাহিনবাগ ও দিল্লি নির্বাচন পরবর্তী দাঙ্গা। বছর পার হয়ে গেল বিচারই শুরু হলো না। যেমন হয়নি আরও অজস্র মুসলমান বিরোধী দাঙ্গায়। যে হত্যাকাণ্ডে মদত দেয় শাসক দল, পুলিশ-প্রশাসন, আধা সামরিক বাহিনী, আবার তদন্ত, গ্রেপ্তার ও চার্জশিট দেওয়ার দায়িত্ব বর্তায় সেই ঘাতকবাহিনীরই হাতে — সেখানে সুবিচার মরীচিকা মাত্র।

 

কৃষক আন্দোলনকে ঘিরে প্রজাতন্ত্র দিবসে একটা চেষ্টা হয়েছিল বটে, পরিকল্পনামাফিক লালকেল্লা অঞ্চলে হিংসা ছড়ানোও গিয়েছিল। কিন্তু ফল হলো উল্টো। যে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশকে সঙ্ঘী প্ররোচনায় লাভ জিহাদ আর দাঙ্গার সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং তছনছ করে দিয়েছিল এক সময়। সেই সামাজিক ও ধর্মীয় কারিগরির প্রধান কারিগর ছিলেন দেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। না, এই মহাপঞ্চায়েতগুলির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া দূরে থাক একটু কটু বাক্য উচ্চারণের সাহস হয়নি শাহ-মোদী-যোগীর। আর এই যোগী উত্তরপ্রদেশে সিএএ বিরোধী আন্দোলনের অপরাধে নির্বিচারে গুলি করে মেরেছে মুসলমানদের, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে, দেশদ্রোহিতার অপরাধে জেলে ভরেছে, লুটপাট করে ধ্বংস করেছে ঘরবাড়ি। যা ঘটেছে তার সূচগ্র সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। স্বাধীন তদন্তকারীরাও পারেননি স্বৈরশাসক যোগীর লৌহ যবনিকা ভেদ করতে।

 

আজ রাকেশ টিকায়েত লজ্জিত। প্রকাশ্যে ক্ষমাপ্রার্থী। আজ সেই মহাপঞ্চায়েতে দাঁড়িয়ে মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন অতীতের অপরাধের কথা। সেই সভার অতল নৈঃশব্দ্য যেন আধা সামরিক বাহিনীর মুজফফরনগর গণহত্যার বলি মুসলমান পুরুষদের আর্তনাদকেও ম্লান করে মরমে মরমে গর্জে উঠেছে। আর নয় ভুল হয়েছে, বলছেন তাঁরা। না, যে যোগী হাতে মুসলমানের মাথা কাটেন, তাঁর হিম্মত হয়নি এই মহাপঞ্চায়েতে শামিল হওয়া মুসলমান নেতৃত্বকে স্পর্শ করার।

 

হ্যাঁ, এই হলো প্রতিস্পর্ধা। এই হলো শততম দিনের অহঙ্কার। এই স্পর্ধা উদযাপনীয়। এই স্পর্ধা গণতন্ত্রের অক্সিজেন। যে গণতন্ত্র বিলীন হতে হতে মোদীতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচারেও ভারতে গণতন্ত্র এক ক্ষয়িষ্ণু মতবাদ। ভারত আর মুক্ত গণতন্ত্রের দেশ নয়। বিশ্বের মুক্তমনা দেশের বিচারে ১০০ এর মধ্যে ভারত পেয়েছে ৬৭। আগে প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৭১। ফ্রিডম হাউসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, “মোদীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার মানবাধিকার সংস্থাগুলির উপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে। শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকদের ভয় দেখানো হচ্ছে। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই পতন আরও জোরদার হয়েছে। করোনা ভাইরাস অতিমারীর সময়ে সরকারের প্রতিক্রিয়া বেশ কিছু মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে।” (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)

 

এই অবনমনের জন্য সঙ্ঘ পরিবার এবং গুজরাত গণহত্যার অন্যতম অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদীকেই দায়ী করলে চলবে না। দায় নিতে হবে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে। এই ইতরের অভিযানের বিরুদ্ধে কোথাও তারা ন্যূনতম সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি। কোথাও না। কেউ না। স্পর্ধা যদি দেখাতে পারে কেউ তবে ভীমা কোরেগাঁও, স্পর্ধা যদি দেখাতে পারে কেউ তবে কাশ্মীর, স্পর্ধা যদি দেখাতে পারে কেউ তবে শাহিনবাগের মায়েরা, স্পর্ধা যদি দেখাতে পারে কেউ তবে দিল্লির ছাত্র-ছাত্রী-অধ্যাপকরা — এ সবই রাষ্ট্রের ঝটিকাবাহিনীর বিরুদ্ধে অসম কিন্তু অপূর্ব প্রতিরোধ। পরাজয় নয়। একটি রাজনৈতিক দলও তাদের সর্বস্ব চুলোয় দিয়ে — যেভাবে এই আন্দোলনকারীরা দিয়েছেন — ক্ষমতার আশা-আকাঙ্ক্ষা বরবাদ করে — যেভাবে এই আন্দোলনকারীরা বরবাদ করেছেন — এগিয়ে আসেননি। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের উদ্দাম উত্তালতায় একসময় খড়কুটোটুকু তাঁদের নাগালে ছিল না। বামদলগুলি কিংবা কংগ্রেস, কিংবা তৃণমূল থেকে সমাজবাদী কিংবা দক্ষিণী আঞ্চলিক দলগুলি কেউ কখনও তাঁদের দিকে ঘুরেও তাকায়নি। স্ব স্ব নকল বুঁদিগড় সামাল দিতেই তারা ছিল ব্যস্ত। তাদের সাধের কেরালা, তাদের সাধের পশ্চিমবঙ্গ, তাদের সাধের ছত্তিশগড়। এবং আজও।

 

সন্দেহ নেই দেশটা তলিয়ে যাবার আগে যদি না ‘বেণীর সঙ্গে মাথা’ দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফের জেগে উঠত পঞ্জাব, যদি না দিল্লি ঘিরত জাঠেরা, যদি না মরাঠাওয়ারা ছেয়ে যেত ক্ষুদ্র ও ভূমিহীন চাষার লাল পতাকায়, যদি না রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশের কৃষকরা রুখে দাঁড়াতেন আদিবাসী ভূমিহীন কৃষকদের সঙ্গে, যদি না অন্ধ্র-তামিলনাড়-কেরলের কৃষকরাও আছড়ে পড়তেন রাজপথে — তবে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এই কলমের মৃত্যু পরোয়ানা এতদিনে লেখা হয়ে গিয়েছিল। তাকে পুনর্জীবন দিয়েছে লাঙলের ফলা।

 

মোদী-শাহ-আদানি-আম্বানি বিরোধী, ক্রোনি ক্যাপিটাল বিরোধী, দেশবেচা বেসরকারিকরণ বিরোধী আন্দোলনকে জাগিয়ে তুলেছে। আজ শ্রমিক-কর্মচারীরা কৃষকের পথে অবরোধের শপথ নিচ্ছে। কী জানি, শ্রেণি সচেতন বামবন্ধুরা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন এই নয়া রসায়নকে — যেখানে শ্রমিকেরা নয়, কৃষকেরা কর্পোরেটতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ জিহাদ ঘোষণা করছেন এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের উদ্বুদ্ধ করছেন প্রত্যক্ষ সংগ্রামে শামিল হতে।

 

এও একশো দিনের জয়। কৃষাণ একতার জয়। ৫ মার্চ থেকে যে আন্দোলনের উদযাপনের শুরু কর্নাটক থেকে। যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে নির্বাচনমুখী পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরালা সহ পাঁচ রাজ্যে। নো পাসারন। ফ্যাসিস্ট বিজেপিকে একটিও ভোট নয়।

 

  • মতামত লেখকের নিজস্ব।

 

  • Feature Image courtesy : BloombergQuint

 

Share this
Leave a Comment