ধ্বংসকামী উন্নয়ন


  • February 8, 2021
  • (0 Comments)
  • 499 Views

যুদ্ধ-লড়াই-উন্নয়নের এই নাগপাশ আর কত প্রাণ নেবে তা আমাদের জানা নেই ! লিখলেন তাপস দাস

 

বাংলা শব্দের ব্যবহার নিয়ে বাংলার বাজার এখন বেশ সরগরম। এই সময় নদীর “বর্তমান” ও “ভবিষ্যৎ” শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে “উন্নয়ন” ও “বিপর্যয়” যদি বলি আশাকরি তেমন ভাবে কেউ রাগ করবেন না। কোনো গবেষণা বা তথ্য বিশ্লেষণ নয় প্রত্যক্ষদর্শীর কথায় শুনছিলাম এই শীতে হিমালয় জুড়ে বরফ কম পড়েছে। গতকাল বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ-এর কোনো খবর ছিল না। তবুও প্রথমে ডিজিটাল মাধ্যমে পরে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খবর আসতে শুরু করে ধৌলি গঙ্গা নদীর উপর নির্মিত জল-বিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ ভেঙ্গেছে। ঋষি গঙ্গা নদীতে হিমবাহ ভেঙ্গে পরার ফলে ধৌলি গঙ্গাতে জলোচ্ছ্বাস। এই সময় হিমবাহের এই ভাবে নেমে আসার কারণ বিশ্ব উষ্ণায়ণ কি না তা গবেষকরা বলবেন। যদিও ধৌলি গঙ্গার এই জলোচ্ছ্বাস শ্রীনগরের অলকানন্দা নদীতে এক ইঞ্চি জলস্তর বাড়াইনি। অথচ প্রায় দুশো, অসমর্থিত সূত্রে ৪০০ প্রাণ শেষ হয়ে গেল। (সরকারি সূত্র অনুযায়ী, রবিবার পর্যন্ত ৭টি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১৭ জনকে। নিঁখোজ ১৭০)। একজন সাধারণ নদীকর্মী হিসেবে আমার মনে হয়, এই সময় অন্য কিছু প্রশ্ন করা প্রয়োজন।

 

হিমের-আলয়, বরফের বাড়িতে বরফ একধার থেকে অন্য ধারে যাবে। বরফ থেকে জল হবে তা ধেয়ে আসবে সমভূমিতে এতো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা। এই ঘটনাকে বিপদ নাম দিয়েছে উন্নয়নের ভ্রান্ত ধারণা। একটি করে এমন বিপদ আসে, সরকার তৎপর হয়ে ওঠে, রেড এলার্ট জারি, মৃত ব্যক্তির সংখ্যা, তালিকা তৈরি, মৃতদেহের দাম ঘোষণা, নতুন নির্মাণ, বিপর্যয় মোকাবিলায় অর্থ বরাদ্দ ‘ক্রোনলজি বুঝুন’।

 

কিন্তু এই সময় আমার মনে পরছে স্বামী জ্ঞান স্বরূপ সানন্দজিকে। ১১০দিন অনশন করার পর ৮৬ বছরের প্রাক্তন আইআইটি-র অধ্যাপককে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে আশ্রম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল। পরের দিন অর্থাৎ ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর দেরাদুন এইমস-এ প্রাণ ত্যাগ করলেন। তিনি তার তথ্য নির্ভর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভারতীয় আধ্যাত্মিক জ্ঞান, যুক্তি দিয়ে বার বার বোঝাতে চেয়েছিলেন। হিমালয়ের নদীগুলিকে গঙ্গাসহ ভাগীরথী, অলকানন্দা, মন্দাকিনী, ধৌলি গঙ্গা, পিন্ডার নদীর বাঁধের শৃঙ্খল মুক্ত করতেই হবে। নতুবা ভারতের সামনে বিপদ নিশ্চিত। সেই ধৌলি গঙ্গাতেই এই বিপদ।

 

অল্প কয়েকদিন আগে উত্তরাখণ্ডের নরেন্দ্র প্রসাদ পোখরিয়াল দায়ের করা একটি মামলায় উত্তরাখণ্ড হাইকোর্ট সরকারকে নোটিস পাঠিয়েছে। গতকালের ঘটনাস্থল থেকে মাত্র তিরিশ কিমির মত দূরে পিপিলকোটিতে যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চলছে তার জন্য জঙ্গলের জমি নেওয়া হয়েছে অথচ নিয়ম মেনে গ্রামসভার অনুমতি নেওয়া হয়নি। জঙ্গল সাফ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। উষ্ণ অঞ্চল বেড়ে চলেছে বিশ্ব জুড়ে। এর সঙ্গে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প “রান অফ রিভার হাইড্রোপাওয়ার”। যা জলবিদ্যুৎ তৈরির এমন এক ভাঁওতা যেখানে বলা হয়, নদীকে স্টোরেজ ঝিলে না আটকে নদীর বহমানতা অক্ষুণ্ণ রাখা। আসলে নদীকে তার প্রবাহ পথ থেকে সরিয়ে সুড়ঙ্গে চালান দেওয়া। হিমালয় জুড়ে চলছে ডিনামাইট ফাটিয়ে, গাছ কেটে ধ্বংসকামী এই উন্নয়ন।

 

এর সঙ্গে হিমালয় জুড়ে চলছে সব ঋতুর জন্য রাস্তা তৈরির নামে যথেচ্ছাচার। সরকারের নথি বলছে ৫.৫মিটার চওড়া রাস্তা তৈরির করার কথা। কোর্ট গত সেপ্টেম্বরে রায় দিয়েছে যেখানে তার বেশি চওড়া রাস্তা হয়েছে সেখানে গাছ পুঁতে প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে হবে। অথচ সরকার চাইছে ১০ মিটার চওড়া রাস্তা, সামরিক বিভাগ একটি এফিডেবিট জমা করেছে তার পক্ষে। যুদ্ধ-লড়াই-উন্নয়নের এই নাগপাশ আর কত প্রাণ নেবে তা আমাদের জানা নেই।

 

লেখক একজন নদীকর্মী।

 

ছবি: thehindubusinessline.com

 

Share this
Leave a Comment