স্বৈরশাসকের মনোভূমিতেই জন্ম দেশদ্রোহী সাাংবাদিকতার


  • February 2, 2021
  • (0 Comments)
  • 268 Views

রাজ্যে রাজ্যে এত দেশদ্রোহী জন্ম নিল কবে? সন্দেহ নেই কবির মনোভূমিতে যেমন রামচন্দ্রের জন্ম হয়েছে, তেমনি স্বৈরশাসকের মনোভূমিতে জন্ম দেশদ্রোহীদের। আসলে, যে কোনও সরকার বিরোধী সমালোচনা, উষ্মা, মতবিরোধকে চুপ করিয়ে দিতে এই সিডিশন বা দেশদ্রোহিতার মামলাকে অস্ত্র করছে, কেন্দ্র তো বটেই বিভিন্ন রাজ্য সরকার, বিশেষভাবে বিজেপি শাসিত রাজ্য সরকারগুলি। বললেন দেবাশিস আইচ

 

ভারতে সাাংবাদিকতা এক বিপজ্জনক পেশাা। বিপজ্জনক শুধুমাত্র এ দেশের সাংবাদিকদের জন্য নয়। সারা পৃথিবীর নানা দেশের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। এবং দেশে দেশে শাসকদের মধ্যে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা যত বাড়ছে, ততই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বাকস্বাধীনতার — যার সঙ্গে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত — তার উপর আঘাত নামছে। অধ্যাপক অমর্ত্য সেন এই প্রবণতাকে ‘প্যান্ডেমিক অফ অথরিটারিয়ানিজম’ বা কর্তৃত্ববাদের অতিমারি বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, আজ সারা বিশ্বই এই জাতীয় অতিমারির মুখোমুখি। এবং মানবজীবনে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কিন্তু ‘পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত’ উপায়ে তা প্রভাবিত করছে। আরও একটু স্পষ্ট করে তিনি বলছেন, “দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট মনে করতেন ‘জনপরিসরে সমস্ত বিষয়ে লোকের বিচারবুদ্ধি ব্যবহারের স্বাধীনতা’-র চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না। অথচ প্রায়শই সমাজে মতামত প্রকাশের সুযোগগুলোকে চেপে দেওয়া হয়। আজকের পৃথিবীতে এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে, এবং খাস আমেরিকাতে স্বৈরতন্ত্র বলীয়ান হয়ে উঠেছে, এটা একটা প্রকাণ্ড দুশ্চিন্তার কারণ।” এর পর তিনি স্পষ্টভাবে বলছেন, “আমার স্বদেশ ভারতকে এই তালিকা থেকে বাদ রাখতে পারছি না।” এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা কটি এবং এ দেশের কেন্দ্রীয় শাসকদের স্বৈরতান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ বিষয়ে তিনি আরও কিছু মন্তব্য করেছিলেন, ২০২০ সালে। জার্মান বুক ট্রেড কর্তৃপক্ষের দেওয়া আন্তর্জাতিক শান্তিপুরস্কার উপলক্ষে প্রদত্ত বক্তৃতায়। আমরা এখানে আমাদের দেশের কথাই বলব।

 

বাকস্বাধীনতা ও তর্কবিতর্কের স্বাধীনতা — স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও প্রগতির পূর্বশর্ত। এবং তা আমরা কখনোই বিসর্জন দিতে পারি না। আর কেউ এই মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। একই সঙ্গে বলে রাখি এই স্বাধীনতাহীনতা শুধুমাত্র সাংবাদিক, সাংবাদিকতার জন্য বিপজ্জনক নয়, বিপজ্জনক পাঠক, শ্রোতা, দর্শক — অর্থাৎ, নাগরিক ও রাজনৈতিক সমাজের কাছেও। এই প্রেক্ষিত থেকে আমরা আলোচনা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

 

সাংবাদিক খুন, তাঁদের গ্রেপ্তার, মামলা দায়ের, ট্যুইটারে কোনও মন্তব্য করলে বা ক্ষমতাবানের অপচ্ছন্দের কথা রিপোর্ট করলে লাগাতার কুমন্তব্য, খুনের হুমকি, মহিলা হলে ধর্ষণের হুমকি — এখন সাম্প্রতিক পরিভাষায় ‘নিউ নর্মাল’। প্রথমেই কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনা ও তথ্য বলা যাক। সাম্প্রতিকতম নিদর্শন হলো, সাধারণতন্ত্র দিবসে কৃষক গণতান্ত্রিক প্যারেড ঘিরে লালকেল্লা ও অন্যান্য এলাকায় অশান্তির খবর করা এবং ট্যুইটে মন্তব্যের জেরে ছ’জন সাংবাদিক ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে এফআইআর ও দেশদ্রোহের মামলা। মামলা করেছে উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ পুলিশ। দুই বিজেপি শাসিত রাজ্য। কারা এই সাংবাদিক? ইন্ডিয়া টুডের রাজদীপ সরদেশাই। ন্যাশনাল হেরাল্ডের জাফর আগা, ক্যারাভানের অনন্ত নাথ, বিনোদ জোসে ও পরেশ নাথ এবং বর্ষীয়ান সাংবাদিক মৃণাল পাণ্ডে। এমনকি কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরের বিরুদ্ধেও। এফআইআরে বলা হয়েছে ট্যুইটে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে। এবং তা লালকেল্লার অবমাননার জন্য দায়ী। এখানেই শেষ নয়, অভিযোগকারীর দাবি, “প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন দেশের রাজধানী দিল্লিতে যখন কৃষক তাণ্ডব চলছে তখন বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অভিযুক্তরা সরকারি কর্মীদের (পুলিশ) হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন, রাজধানীতে দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা হিংসার উস্কানি দিয়েছেন ক্রমাগত উত্তেজক তথ্য, ভুয়ো সংবাদ সম্প্রচার করে।” অন্তত দশটি জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ঘটনার নিন্দা করেছে এডিটর্স গিল্ড অফ ইন্ডিয়া। তারা সর্বোচ্চ আদালতের কাছেও প্রেস বার্তার মধ্য দিয়ে তাদের উদবেগ তুলে ধরেছে। যদিও এর মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই। এমনটা বিগত কয়েক বছর যাবৎ ধারাবাহিক ভাবে চলে আসছে।

 

সরকারের সমালোচনা করলেই তার গায়ে দেশদ্রোহী, রাষ্ট্রদ্রোহী বা অ্যান্টি ন্যাশনালের ছাপ্পা মেরে দেওয়া এখন জলভাত। সরকারের বিরোধিতা আর দেশের বিরোধিতার মধ্যে যে পার্থক্য তাকে গুলিয়ে দেওয়াটাই স্বৈরশাসকদের, তার এজেন্টদের প্রধান কাজ। রাষ্ট্র ও সরকার কি এক? দেশ ও সরকারও এক নয়? একটি সরকার যদি সমস্ত গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে, সংসদকে অপব্যবহার করে কোনও আইন বলবৎ করতে চায় — সে কৃষি আইন হতে পারে, এনআরসি-সিএএ হতে পারে তার বিরুদ্ধে কেউ যদি প্রতিবাদ করে, আন্দোলন করে, সে কথা কোনও সাংবাদিক যদি লেখেন — তবে তা দেশবিরোধী হতে পারে না। এই মামলা করেছে একজন বা একাধিক ব্যক্তি। কিন্তু, সরকার নিজেই তো ৪০ জন কৃষক নেতার বিরুদ্ধে মামলা করে বসে আছে। এবং তা লালকেল্লার ঘটনার ঢের আগে। ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে। এবং জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ সমনজারি শুরু করতেই তা প্রকাশ্যে আসে। এভাবেই তো দিল্লির শাহিনবাগ আন্দোলনের ছাত্র-ছাত্রীদের, ভীমা কোরেগাঁও মামলায় সুধা ভরদ্বাজ, আনন্দ তেলতুম্বে, সোমা সেনের মতো বিদ্বৎজ্জন, ফাদার স্ট্যান স্বামীর মতো অশীতিপর সমাজকর্মীদের, কবি ভারভারা রাওকে ইউএপিএ আইনে বিনাবিচারে জেলবন্দি করে রাখা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে এই আইনের একটি সংশোধন করা হয়। সেই সংশোধনবলে, এই আইন ব্যবহার করে রাষ্ট্র একতরফা ভাবে যে কোনও ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী বলে ঘোষণা করতে পারে এবং তাঁকে বিনাবিচারে জেলে আটকে রাখতে পারে। আসলে লক্ষ্য একটাই, যে কোনও ভাবে মুখে লাগাম পরাও। হাতে-পায়ে বেড়ি পরাও। ২০১৯ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর রিপোর্ট বলছে ওই সময় বিভিন্ন রাজ্যে ৯৩টা সিডিশন কেস বা দেশদ্রোহিতার মামলা করা হয়েছে। যা পূর্ববর্তী সময় থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। ব্রিটিশ আমলের এই কুখ্যাত আইনটি যা গান্ধীজির বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছিল তা আজও ভারতীয় দণ্ডবিধি বা ইন্ডিয়ান পেনাল কোডে ১২৪এ ধারা হিসেবে বহাল তবিয়তে টিকে আছে। কিন্তু, রাজ্যে রাজ্যে এত দেশদ্রোহী জন্ম নিল কবে? সন্দেহ নেই কবির মনোভূমিতে যেমন রামচন্দ্রের জন্ম হয়েছে। তেমনি স্বৈরশাসকের মনোভূমিতে জন্ম দেশদ্রোহীদের। আসলে, যে কোনও সরকার বিরোধী সমালোচনা, উষ্মা, মতবিরোধকে চুপ করিয়ে দিতে এই সিডিশন বা দেশদ্রোহিতার মামলাকে অস্ত্র করছে। কেন্দ্র তো বটেই বিভিন্ন রাজ্য সরকার, বিশেষভাবে বিজেপি শাসিত রাজ্য সরকারগুলি।

 

এর অন্য একটা চূড়ান্ত ছবি আমরা পাব রাইটস অ্যান্ড রিক্স অ্যানালিসিসের গত বছরের রিপোর্টে। রিপোর্ট বলছে, বিগত বছরে ২৫ মার্চ থেকে ৩১ জুন পর্যন্ত, বিভিন্ন রাজ্যে ৫৫ জন সাংবাদিক নানা ভাবে সরকারের রোষের মুখে পড়েছেন। হয় তারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, না হয় তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে বা পুলিশ থানায় ডেকে পাঠিয়ে ধমকেছে, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কিংবা তাদের বিরুদ্ধে শো-কজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অপরাধ ছিল, অতিমারি পরিস্থিতিতে সরকারের, পুলিশ-প্রশাসনের নানা ব্যর্থতার কথা তাঁরা রিপোর্ট করেছিলেন। হয় হাসপাতালে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা, কিংবা খাদ্যের অভাবে মহাদলিত শিশুদের ঘাসের দানা খাওয়া, পুলিশের অত্যাচার বা বাড়াবাড়ি, ত্রাণের অভাব — এমন নানা ঘটনা রয়েছে। আমাদের রাজ্যে এই সময় কলকাতার এক প্রথম সারির সম্পাদকের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়। একটি চ্যানেলের সাংবাদিককে প্রকাশ্যে নবান্নে ধমকানো হয় এবং আরামবাগ মহকুমার একটি টিভির সম্পাদক ও এক সাংবাদিককে দলীয় ও পুলিশি দুর্নীতির রিপোর্ট করায় মিথ্যা অভিযোগে মধ্যরাতে তুলে নিয়ে গিয়ে জেলে ভরে দেওয়া হয়েছিল।

 

অতিমারি ছিল আমাদের জীবনে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। ইতিহাসের পাতা ছাড়া আমাদের জীবনে তার কোনও অস্তিত্ব ছিল না। আর এই অতিমারি, স্বাস্থ্য বিপর্যয়কালীন এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কীভাবে একটি সাধারণ জরুরি অবস্থা নেমে এসেছিল তা আমরা নানাজনে নানাভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। অমর্ত্য সেনের ভাষা ধার করে বলতে পারি এও এক কর্তৃত্ববাদের অতিমারি। ওই ৫৫ জন সাংবাদিক তার শিকার। আন্তর্জাতিক মিডিয়া ওয়াচডগ রিপোর্টার্স উইদাউট ফ্রন্টিয়ার বা আরএসএফ তার ২০২০ সালের বার্ষিক রিপোর্টে মন্তব্য করেছে, ২০১৯ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি বিপুলভাবে ফিরে আসার পর, ‘হিন্দু ন্যাশনালিস্ট’ সরকারের লাইন মেনে নেওয়ার, অর্থাৎ, নির্দেশ মানতে বাধ্যবাধকতার চাপ বেড়েছে। এটা কোনও নতুন কথা নয়, আরএসএফ এর আগেও একই মন্তব্য করেছে। সে কথায় পড়ে আসছি। তার আগে চোখ বুলিয়ে নিই আরএসএফ প্রদত্ত ‘মিডিয়া ফ্রিডম ইন্ডেক্স’-এ। ২০২০ সালে ভারতের সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সূচক ছিল ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪২। ২০১৯ সালে ছিল ১৪০। অর্থাৎ, ২০১৯ সালের তুলনায় আরও দু’ধাপ নীচে নেমেছে। এই বছরের অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে তারা বলেছে কাশ্মীর পরিস্থিতির কথা। আমরা জানি জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে সারা রাজ্যেই ল্যান্ডলাইন বা ফিক্সড লাইন ও মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ৫ অগস্ট ৩৭০ ধারা বিলোপ করা হয়। সারা কাশ্মীর গৃহবন্দি হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল, ল্যান্ডলাইন, ইন্টারনেটের অভাবে সাংবাদিক, সংবাদপত্রের দপ্তর সম্পূর্ণ ভাবে তথ্যহীনতা, সংবাদহীনতার অন্ধকারে ডুবে যায়।

 

তার বিরুদ্ধে কাশ্মীর টাইমসের সম্পাদক অনুরাধা ভাসিন সুপ্রিম কোর্টে মামলা করার প্রায় তিন-চার মাস বাদে আদালত রায় দেয়, সংবিধানের ১৯(১)(ক) ধারায় এবং ১৯(১)(ছ) ধারায় ইন্টারনেট ব্যবহার করে ব্যবসা ও সংবাদপত্র প্রকাশ সাংবিধানিকভাবেই সুরক্ষিত। আদালত রায় দিল বটে পরিস্থিতি আজও স্বাভাবিক হয়নি। সংবাদপত্র প্রকাশের স্বাধীনতা, সম্প্রচারের স্বাধীনতা, সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা, সংবাদপত্র গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার স্বাধীনতা সাধারণ জরুরি অবস্থাতেও এভাবে কেড়ে নেওয়া হয়নি। হ্যাঁ, ওই সময় তীব্রভাবে সেনসরড হয়েছে সংবাদ। সম্পাদকীয় বা সংবাদ অনুমোদন না পাওয়ায় সেই স্থান সাদা গিয়েছে। তাও একরকম প্রতিবাদ। সাংবাদিকরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। ঝুঁকতে বললে হামাগুড়ি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। এখানে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে লালকৃষ্ণ আদবানির সেই বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে। ‘You were only asked to bend, but you crawled.’ জরুরি অবস্থার সময় ১৯ মাস জেলে কাটিয়েছেন তিনি। দেশ জরুরি অবস্থা মুক্ত হওয়ার পর, স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে। নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী পরাজিত হন। এই সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে এই ছিল তাঁর ওই বিখ্যাত উক্তি। আজ এই বর্ষীয়ান নেতাকে কেউ যদি প্রশ্ন করেন, দেশে জরুরি অবস্থা নেই, তবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে কেন? কী বলতে পারেন তিনি? তা অনুমান করা সম্ভব নয়। দলের কাছেই সম্পূর্ণ উপেক্ষিত, নিঃসঙ্গ এই বৃদ্ধকে বোধহয় এমন প্রশ্ন করাটাও সৌজন্যের পরিচয় হবে না। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজত্বে তাঁর দল বিজেপির আমলে ধারাবাহিক ভাবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা খর্ব হয়ে চলেছে এ কথা সত্যি। আমরা আবার পড়ে দেখতে পারি আরএসএফ-এর পুরনো রিপোর্ট।

 

ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইন্ডেক্স অনুযায়ী ২০১৬ সালে ভারতে অবস্থান ছিল ১৩৩ তম। ২০১৭ সালে তিন ধাপ নেমে গিয়ে তা দাঁড়ায় ১৩৬-এ। ২০১৮-য় ১৩৮, ২০১৯-এ ১৪০। অর্থাৎ, ক্রমঅবনতি। কেন এই ক্রমঅবনতি? তার একটি ব্যাখ্যা পাব ২০১৮-র রিপোর্টে। বলা হচ্ছে, শুধুমাত্র স্বৈরাচারী দেশগুলো নয়, গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরাও আর সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে রাজি হচ্ছেন না। দেখছেন প্রতিপক্ষ হিসেবে। খোলাখুলিভাবেই তারা বিরাগ, বিতৃষ্ণা, প্রকাশ করছে। শুধু তাই নয়, “রাজনৈতিক নেতারা খোলামেলা ভাবে সংবাদমাধ্যম্যের প্রতি এই শত্রুতাকে মদত দিচ্ছে।” তাদের মতে, দেশে দেশে স্বাধীনতা সূচকের এই অবনমন হলো “সাংবাদিকদের প্রতি এই ক্রমবর্ধমান বৈরিতার প্রতিফলন।” আমাদের দেশ সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট মূল্যায়ন হলো, নরেন্দ্র মোদী যবে থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তবে থেকে ‘হিন্দু মৌলবাদীরা’ সাংবাদিকদের প্রতি অত্যন্ত হিংস্র ভাষা ব্যবহার করছে। শাসক দলকে বিচলিত করতে পারে এমন কোনও তদন্তমূলক প্রতিবেদন বা ‘হিন্দুত্ব’-র সমালোচনা প্রকাশিত হলেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়ে যায় তোড়ে গালিগালাজ এমনকী খুনের হুমকি। আর এই হিংস্র প্রলাপকারীদের অধিকাংশই ‘প্রধানমন্ত্রীর ট্রোল সেনা’। তারা আরও বলছে, এই লাগাম ছেঁড়া মৌখিক শাসানি এমন একজনকে মদত দিতে কাজে লাগছে যে নিজেকে ‘শক্তিমান’ বলে জাহির করে। সে এমন একজন নেতা, কোনও সাংবাদিক বা সম্পাদক তার কর্তৃত্বকে ছোট করে দেখাতে চাইলে, সে তা সহ্য করে না।

 

এতো গেল একটা দিক আর একটি দিক হলো তথাকথিত জাতীয় টিভি চ্যানেলগুলো এত বেশি বেশি মোদীপন্থী বা গোদি মিডিয়া বা মোদিয়া হয়ে পড়ল কীভাবে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ভারতের অর্থনৈতিক নীতি অর্থাৎ নিয়ো লিবারালিজমের মধ্যে। এরা একসময় পিভি নরসিমা, মনমোহন সিংহের উদারনীতির অন্ধ সমর্থক ছিল। উদারনৈতিক নীতি বলবৎ-এ কংগ্রেসের দুর্বলতা তাদের বিরূপ করে। অবশেষে তারা এক শক্তিমান নেতা খুঁজে পায়, যিনি ৭২ ঘণ্টায় হাজার দুয়েক মানুষের নির্মম গণহত্যার পরও অবিচলিত থাকতে পারেন এবং একই সঙ্গে ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টদের অবিসংবাদিত অভিন্নহৃদয় বন্ধু। অতঃপর গুজরাত মডেলের ঢক্কানিনাদ। তিলকে তাল করা। শিক্ষা-স্বাস্থ্য, শ্রমিকের অধিকার, মজুরি, শিশু মৃত্যু, প্রসূতি স্বাস্থ্য থেকে যে কোনও সামাজিক ন্যায়, কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে, যে কোনও সূচকে, একটি নিন্ম থেকে মাঝারি মাপের রাজ্যকে রাতারাতি মডেল করে তোলা হলো। পুঁজি তাই চায়। কল্যাণকামী রাষ্ট্র-ট্রাষ্ট্র বহুকাল অতীত। দ্বিতীয় দিকটি হলো টিআরপি। ক্ষমতার কাছের হলে টিআরপি বাড়িয়ে তোলা যায়। রিপাবলিক আর রেটিং এজেন্সি বার্কের প্রধানের ফাঁস হয়ে যাওয়া হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট তো সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এবং মোক্ষম দিকটি হলো, খবরকে ক্রমে বিনোদনে পরিণত করার নীতি। এর শুরু মিডিয়া মুঘল রুপার্ট মার্ডোকের হাত ধরে। দর্শককে স্ক্রিনে আঠার মতো সেঁটে রাখতে গেলে প্রয়োজন অতি নাটকীয়তা। হেডলাইন ও বিষয়ে থাকবে পদে পদে চমক। টিভি নিউজকে মার্ডক গড়লেন ট্যাবলয়েড নিউজ পেপারের আদলে। গল্পের গরুকে গাছে তোলো, কেচ্ছা ও রগরগে চরিত্রচিত্রণে দিনকে রাত আর রাতকে দিন করে দাও — যেমন সব চ্যানেল মিলে, বিশেষ করে রিপাব্লিক — অভিনেত্রী  রিয়া খুনি, মাদক ব্যবসায়ী থেকে সুশান্ত রাজপুতের অ্যাকাউন্ট তছরূপকারী বানিয়েছিল। ডাইনি থেকে কী বিশেষণে বিশেষিত করা হয়নি তাঁকে! কিস্যু প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু, এই মিডিয়া ট্রায়াল এমন একটি সময় চলেছে যখন টেলিভিশনের টিআরপি বাড়ছে বটে, কিন্তু দেশের অর্থনীতির হাল ক্রমে তলানিতে ঠেকে গেছে। বেকারত্ব, কর্মহীনতা ৭০ বছরের সব রেকর্ড ম্লান করে দিয়েছে। অথচ, কোথাও কোনও প্রাইমটাইমে সে বিষয়ে আলোচনা নেই। এ যেন প্রয়াত অর্থনীতিবিদ অশোক রুদ্রের ভাষায় ‘আগ্নেয়গিরির শিখরে পিকনিক।’

 

একদিকে তথ্যহীনতা, সংবাদহীনতা অন্যদিকে বিকৃত রুচির যাত্রাপালা, সাধারণ মানুষকে দেশ- কাল-অর্থনীতি বিষয়ে তার যে তথ্যের অধিকার, জানার অধিকার, সে বিষয়ে মতামত তৈরির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে চলেছে। এবং দেশের নাগরিক সমাজ, বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাজকে ক্রমে বিপন্ন করে তুলছে। ভারতে সাংবাদিকতা এক বিপজ্জনক পেশা বটে — বিপজ্জনক তাদের কাছে যারা মনে করেন, সাংবাদিকতার ধর্ম ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। তেমনই বর্তমান মূল ধারার সাংবাদিকতা সেই পাঠক, শ্রোতা, দর্শকদের কাছে বিপজ্জনক — যাঁরা মনে করেন, তথ্যের অধিকার এক মৌলিক অধিকার। যাঁরা ‘ইনফরমড সিটিজেন’ হতে চান। এবং তথ্যের আলোকে তাঁদের কোনও বিষয়ে অনুমোদন দিতে হলে, তা যেন ‘ইনফরমড কনসেন্ট’ হয়। সে পরিসর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। তথ্য লুকনো হচ্ছে। সংসদে মুখের উপর বলে দেওয়া হচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিক বিষয়ে কোনও তথ্য নেই। রাখা হয়নি। মানে দেব না। আমি সংখ্যাগুরু। অতএব আমার সংখ্যাগুরুবাদ চলবে। এ হলো মেজরিটারিয়ান সরকারের লক্ষণ। এদেশে এর দুটো ফলা এক, সরকার ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টপন্থী সংখ্যাগুরুবাদী। আর অন্য ফলা হলো ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদ।

 

এমনটা যে হতে পেরেছে, তার প্রধান কারণই হলো মোদীয় শাসন পদ্ধতি। কেমন সে শাসন পদ্ধতি? ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ‘মাই প্রেসিডেন্সিয়াল ইয়ার্স’ গ্রন্থে খুব অল্পকথায় তার ছবি তুলে ধরেছেন। এই শাসন পদ্ধতি হলো, যে কোনও প্রধান প্রধান নীতি মোদী নিজে বা প্রাইম মিনিস্টার অফিসের বা পিএমও-র আধিকারিকরা নিয়ে থাকেন। এবং বহু সময় ঘোষণাও করে দেন। মন্ত্রিসভা জানতে পারে পরে। একটু পড়ে শোনাই।

 

“The internal process of decision-making varies from government to government, and PM Modi has brought in a pattern where a major decision is endorsed by the cabinet or other appropriated bodies after the PMO or he himself has announced the decision. However, as per protocol, if it is a matter of policy, it is to be discussed in the cabinet, and naturally the finance minister takes the lead in initiating the discussion as desired by the PM. But in the last six years of this government, we have seen the introduction of the new work procedures where most of the decisions are taken by the PMO in consultation with the departmental heads or secretaries concerned as the case may be.”

 

অতঃপর, দলের মন্ত্রীদেরই যেখানে সরকারের নীতি নির্ধারণে কোনও ভূমিকা নেই সেখানে বিরোধীদল হোক, রাজ্য সরকারগুলি হোক তাদেরও আলাপ-আলোচনা ততর্কবিতর্কের অবকাশ নেই। জানার অবকাশ, জানানোর অবকাশ নেই সাংবাদিকদের। অতএব, রাত আটটায় এক ঘোষণায় চারঘণ্টার নোটিশে দেশকে গৃহবন্দি করে ফেলা যায়। কৃষি আইন নিয়ে জারি করে দেওয়া যায় অধ্যাদেশ।

 

এখন যদি আমাকে এ রাজ্যের স্থানীয় সংবাদ বিষয়ে বলতে হয়, তবে আদৌ কোনও ভাল কথা বলতে পারব না। আমি টেলিভিশন দেখি না। সাংবাদিকতার জীবনে সিংহভাগ সময়ে এ রাজ্যের সমস্ত জেলার টেলিভিশন সাংবাদিকদের সঙ্গে, অল্পসময় সংবাদপত্রের জেলা প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমার সাংবাদিক জীবন কাটিয়েছি। তাও আজকে দাঁড়িয়ে যদি আমাকে তুল্যমূল্য বিচার করতে বসতে হয় — তবে অবশ্যই এতক্ষণ ধরে যা বলে এলাম তার প্রেক্ষিতেই বিচার করতে হবে। সে কাজে আমি যে যথার্থ যোগ্য ব্যক্তি তাও আমি নিজেকে মনে করি না। যোগ্য হয়ে উঠতে হলে আরো অনেক বেশি সমীক্ষা, নিরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ জরুরি। শুধু এটুকু বলতে পারি জেলার সাংবাদিকরাও এই ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার। যা এতক্ষণ ধরে বলে এলাম সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি। যা এক সেদিনের জনপ্রতিনিধিকে জেলা সাংবাদিকদের দু’আনার সাংবাদিক বলার সুযোগ করে দেয়। যাই হোক, জেলা সাংবাদিকতা বিষয়ে এই মুহুর্তে যথাযথ বিচারে অক্ষমতা ও অপারগতার জন্য আমাকে মার্জনা করবেন। ধন্যবাদ।

 

কৃতজ্ঞতা: বাকস্বাধীনতা পথ বন্ধ করে স্বৈরতন্ত্রের পথে চলেছে ভারত। অমর্ত্য সেন। আনন্দবাজার পত্রিকা।

রিপোর্টার উইদাউট বর্ডার্স, ২০১৮, ২০২০।

মোদীর ভারতে সাংবাদিকতা এক বিপজ্জনক পেশা, দেবাশিস আইচ, ২০১৮।

দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল ইয়ার্স ২০১২-২০১৭। প্রণব মুখোপাধ্যায়।

 

[৩১ জানুয়ারি ২০২১, মুর্শিদাবাদ ডিস্ট্রিক্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনর সহযোগিতায় ‘ইমাজিন কমিউনিটি মিডিয়া’ আয়োজিত, সংবাদ স্বকাল পত্রিকা ও রৌরব সাহিত্য পত্রিকার প্রয়াত সম্পাদক শুভ চট্টোপাধ্যায়ের ‘জন্মদিনে শুভ’, স্মরণ অনুষ্ঠানে দেবাশিস আইচ প্রদত্ত ‘ভারতে সাংবাদিকতা এক বিপজ্জনক পেশা’ শীর্ষক বক্তৃতাটি এখানে প্রকাশিত হলো।]

 

Share this
Leave a Comment