অতি দর্পে হতা লঙ্কা


  • January 20, 2021
  • (0 Comments)
  • 506 Views

প্রাথমিক হলেও এই জয়, হ্যাঁ জয় বলছি, কৃষি ভারতের অস্মিতার জয়। প্রতিটি মুখে খাদ্যের নিশ্চয়তা কোন পথে কোন আইনে আসবে তার জন্য এই আন্দোলনে আন্দোলনে পুড়ে সোনা হয়ে ওঠা কৃষক সমাজ, শ্রমজীবী সমাজ আপামর আমভারতের ভরসা। লিখছেন দেবাশিস আইচ

 

৫৬ দিনের কৃষক সত্যাগ্রহের কাছে মাথা নোয়াল ৫৬” বলে কথিত অতি ‘পরাক্রম’। ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজধানীর অনতিদূরে চরম মূল্য দিয়েছেন অন্তত ৭০ জন কৃষক। কেন্দ্রীয় সরকারের দশদফা আলোচনার দিনে অবশেষে অনেকটাই নতিস্বীকার করল কেন্দ্রীয় সরকার। এই আলোচনার মধ্যে, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাব — (এক) এক থেকে দেড় বছরের জন্য তিন আইন মুলতুবি রাখা হবে, (দুই) কৃষক নেতৃত্ব যদি রাজি হয়, তবে সেই পারস্পরিক সম্মতিতে স্থিরীকৃত সিদ্ধান্ত কেন্দ্র শীর্ষ আদালতে হলফনামা দিয়ে জানাবে। (তিন) এমএসপি ও তিন আইন নিয়ে কৃষক-প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠন করবে।

 

বিজ্ঞানভবনে বুধবারের এই সভায় প্রাথমিক ভাবে কেন্দ্রের প্রস্তাবে না বললেও, কৃষক নেতৃত্ব সর্বসম্মত ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে, কেন্দ্রের প্রস্তাব নিয়ে তারা আলোচনা করার পর সিদ্ধান্ত নেবে। এবং আগামী ২২ জানুয়ারি তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে। নানা ছলাকলা, অন্যায় পথে জারি করা একটি ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টপন্থী আইন বিষয়ে বার বার প্রধানমন্ত্রী-সহ মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অপপ্রচারের পরও কৃষকদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে যুদ্ধে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা আপাতত ব্যর্থ। এর আগে শীর্ষ আদালত দিল্লির রাস্তায় কৃষকদের জমায়েতকে বেআইনি ঘোষণা করতে অস্বীকার করেছে। গত ১২ জানুয়ারি শীর্ষ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তিন কৃষি আইনকে সাময়িক ভাবে রদ করে কমিটি গঠন করে। এই আদালত গঠিত কমিটির সদস্যরা যে কৃষি আইনের পক্ষে এই নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কৃষক কমিটি তাদের মধ্যস্থতা অস্বীকার করে। এমনকি আদালতের একই বেঞ্চ ২৬ জানুয়ারি কৃষকদের ট্র‍্যাক্টর র‍্যালির বিরুদ্ধে কোনও রায় দিতেও অস্বীকার করেছে। এর পর পিছু হটা, মাথা নত করে মুখরক্ষার চেষ্টা করা ছাড়া নরেন্দ্র মোদী সরকারের কাছে আর কোনও পথ ছিল না।

 

দিল্লির উপান্তে একাধিক রাজপথে প্রবল শীত উপেক্ষা করে লক্ষ্যে অবিচল আবালবৃদ্ধবনিতার এই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অহিংস আন্দোলন স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে ইতিমধ্যেই এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর কোনও সমান্তরাল উদাহরণ নেই। একটিই দাবি ছিল তাঁদের — তিন কৃষি আইন বাতিল করতে হবে। সহযোগী দাবি ন্যূনতম সহায়ক মূল্যকে আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে। অ্যাগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেট কমিটি বা এপিএমসি বাতিল করা যাবে না। প্রধানত পঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের সর্বশ্রেণির কৃষকেরা বেশি বেশি সংখ্যায় উপস্থিত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু পরবর্তীতে মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানের কৃষকরাও উপস্থিত হয়েছেন। অনেককে উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা সরকার মাঝপথে বলপূর্বক আটকে দিয়েছে। আন্দোলনরত কৃষকদের সমর্থন জানাতে বাংলা, বিহার, গুজরাট এবং দক্ষিণ ভারতের কৃষকদের প্রতিনিধিরাও ছিলেন হাজির। সামগ্রিক চিত্রটি খোলামনে দেখতে পারলে দেখা যাবে এই আন্দোলনের সমর্থন এসেছে ভারতীয় কৃষক সমাজের সর্ব অংশ থেকেই। আন্দোলন পেয়েছে শ্রমজীবী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন।

 

এই আন্দোলন দেখিয়েছে বহু ভাষাভাষী, বহু ধর্মের এই ভারতের এক সংঘবদ্ধ রূপ। ভারতের শাশ্বত রূপ বৈচিত্র্য। বাতিল করেছে সেই এক দেশ, এক ভাষা, এক দল, এক নেতার বিকারগ্রস্ত অহংমন্যতাকে। ৫৬ দিন হাজারো সঙ্ঘী কুৎসা, দেশদ্রোহীর তকমা দেওয়ার অপচেষ্টা, সারা দেশেই প্রায় পূর্ণ মিডিয়া ব্ল্যাকআউট বা বিরুদ্ধ অপপ্রচার, অবশেষে এনআইএ-র ‘উইচহান্ট’ — না, কিছুই তাঁদের পাখির চোখ থেকে নজর ঘোরাতে পারেনি। আরও বহু শিক্ষাই দিয়েছে এই কৃষি আন্দোলন। দেখিয়েছে কীভাবে ক্ষুদ্রতা উপেক্ষা করে, স্বাতন্ত্রতা বজায় রেখেও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। দেখিয়েছে, কীভাবে রাজনৈতিক দলের নেতাদের মঞ্চ দখল করা থেকে দূরে রাখা যায়। দেখিয়েছে একটি কুবাক্য, ইতরমার্কা শ্লোগান ব্যবহার না করেও জনচেতনাকে উদ্ধুদ্ধ করা যায়। দেখিয়েছে, মিডিয়া অস্বীকার করলে মিডিয়াকে অস্বীকার করাই শ্রেষ্ঠ পথ। পথ পাল্টা মিডিয়ার প্রতিষ্ঠা এবং তা সমবায় মিডিয়ার নামে আত্মপ্রতিষ্ঠা নয় কিংবা কাঁদুনে গাওয়া, শাপশাপান্তও নয়। দেখিয়েছে আলোচনার জন্য এসেছি, তোমার ফিসফ্রাই খেতে নয়। লঙ্গর সঙ্গে বেঁধে এনেছি। আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতার এই চূড়ান্ত নিদর্শন মহাবামেরা কবে দেখিয়েছেন জানতে ইচ্ছে করে। দেখিয়েছে নারী কৃষকের মর্যাদা রক্ষায় কীভাবে গর্জে উঠতে হয়। দেখিয়েছে, বর্ণবিভাজনকে, দূরে রেখে দলিতকে পাশে পাওয়া। দেখিয়েছে, হিন্দু-মুসলিম-শিখ-ইশাহির ঐক্যবদ্ধ ভারতকে। দেখিয়েছে, ভগৎ সিং থেকে রবীন্দ্রনাথ — দুই সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষকে বুকে নিয়ে রাজপথে রাত কাটানো যায়। এক জায়গায় তাঁদের গভীর  মিল ছিল। দু’জনেই ছিলেন জাতীয়তাবাদের চরম বিরোধী। ধর্মীয় ভেদাভেদের বিরোধী। এই আন্দোলন শিখিয়েছে, মৃতকে সম্মান করতে হয়, মৃতেরও মর্যাদা রয়েছে। আন্দোলনের শহিদের কাছে — যাঁরা বেণীর সঙ্গে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন — তাঁদের সামনে মাথা নিচু করে শপথ গ্রহণ করতে হয়। লাশের রাজনীতি শহিদের অবমাননা। এক চিৎকৃত ইতরের অভিযান। দলীয় রাজনীতির ভারত কি এর থেকে শিক্ষা নেবে? জানা নেই। তবে, রাজনৈতিক আন্দোলনের বহু সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন কৃষকরা। আজ নয়, বিগত ২০১৫-১৬ সাল থেকেই বদলাতে শুরু করেছেন। রাজনীতির নগরনটরা যে তা বোঝেননি এও এই আন্দোলনের শিক্ষা।

 

প্রাথমিক হলেও এই জয়, হ্যাঁ জয় বলছি, কৃষি ভারতের অস্মিতার জয়।৷ প্রতিটি মুখে খাদ্যের নিশ্চয়তা কোন পথে কোন আইনে আসবে তার জন্য এই আন্দোলনে আন্দোলনে পুড়ে সোনা হয়ে ওঠা কৃষক সমাজ, শ্রমজীবী সমাজ আপামর আমভারতের ভরসা। সেই চিরন্তন চাণক্যশ্লোক থেকেই উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে হচ্ছে —

 

অতিদর্পে হতা লঙ্কা অতিমানে চ কৌরবাঃ।
অতিদানে বলির্বদ্ধঃ সর্বমত্যন্তম গর্হিতম।।

 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারছেন। যেমন পেরেছেন তাঁর বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প। জো বাইডেনের শপথ গ্রহণের দিন যিনি প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ থেকে পালিয়ে গেলেন।

 

  • লেখক সাংবাদিক এবং সামাজিক কর্মী। 

 

Share this
Leave a Comment