কোভিড ১৯ টীকাকরণ নিয়ে যেসব তথ্য জেনে নেওয়া দরকার


  • January 13, 2021
  • (1 Comments)
  • 758 Views

কোভিড ১৯-এর বিরুদ্ধে টীকাকরণের প্রস্তুতিপর্ব প্রায় শেষ পর্যায়ে। বেশ কয়েক মাস প্রবল মানসিক চাপ, স্বজনবিয়োগ, কর্মহীনতা ইত্যাদিতে জর্জরিত মানুষ টীকার জন্য আগ্রহী হবেন এটাই স্বাভাবিক। সঙ্গত কারণেই স্বাস্থ্যকর্মী থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই এ ব্যাপারে বিশদ জানতে প্রবল উৎসুক। চিকিৎসক সংগঠনের মঞ্চ হিসাবে টীকার বিষয়ে সকলকে সঠিক তথ্য পরিবেশন আমাদের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি। এই বিশাল অতিমারী নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে প্রত্যেকেরই ভ্যাক্সিন নেওয়া উচিত। তবে বেশ কিছু ব্যাপারে আমরা সরকারের তরফে স্বচ্ছতার দাবি রাখছি। জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস, ওয়েস্ট বেঙ্গল-এর পক্ষে ডা হীরালাল কোঙারডা পুণ্যব্রত গুণ

 

 

কোভিশিল্ড বনাম কোভ্যাক্সিন

 

ভারতে এই মুহূর্তে দুটি ভ্যাকসিন সরকারি সম্মতি পেয়েছে। প্রথমটি হলো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপ্রসূত ও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে প্রস্তুত “কোভিশিল্ড”। দ্বিতীয়টি হলো আইসিএমআর-এর গবেষণাপ্রসূত ও ভারত বায়োটেক সংস্থার দ্বারা প্রস্তুত “কোভ্যাক্সিন”।

 

কোভিশিল্ড আসলে হলো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অস্ট্রা-জেনেকা সংস্থার AZD১২২২ ভ্যাকসিনের অনুরূপ জীবন্ত ভাইরাস বাহকে তৈরী একটি ভ্যাকসিন। শিম্পান্জীকে সংক্রমিত করতে পারে এমন এক এডিনোভাইরাস এর ভেতরে করোনা ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের জিন ঢুকিয়ে দিয়ে তৈরী হয়েছে এই ভ্যাকসিন। মানুষের শরীরে এই ভাইরাসটি প্রজনন করতে পারে না। বাহুর উপরের অংশে যেখানে ভ্যাকসিনটির ইঞ্জেকশন দেওয়া হবে, সেখানকার মাংসপেশির কোষগুলির মধ্যে এই ভ্যাক্সিনস্থিত ভাইরাসটি ঢুকে যাবে ও মানুষের পেশীর মধ্যে স্পাইক প্রোটিন তৈরী করবে। সেই স্পাইক প্রোটিনগুলির বিরুদ্ধে শরীরে প্রতিষেধক এন্টিবডি ও স্মৃতি-কোষ তৈরী হয়ে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দেবে। কোভিশিল্ড বিষয়ে সরকারি নথিতে কেবলমাত্র আপৎকালীন পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে চুড়ান্ত সর্তকতার সঙ্গে ব্যবহারের কথা (restricted use in emergency situation in public interest in an abundant precaution..) বলা হয়েছে।

 

ভারত বায়োটেকের “কোভ্যাক্সিন” একটি মৃত সার্স -কোভ ২ভাইরাস এর থেকে তৈরি ভ্যাক্সিন। এই মৃত ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রজনন করতে পারে না। মৃত ভাইরাস এর স্পাইক প্রোটিন এর বিরুদ্ধে প্রতিষেধক এন্টিবডি এবং স্মৃতি-কোষ তৈরি হয়। মনে রাখতে হবে দ্বিতীয় ভ্যাক্সিনটির ক্ষেত্রে সরকার “ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল মোড”-এ ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে।

 

ডোজ ও সময়সূচী 

 

কোভিশিল্ড এর ক্ষেত্রে আপাতত চার সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি ডোজ বাহুর ওপরে মাংস পেশিতে ইনজেকশন এরমাধ্যমে দেওয়া হবে। কোভ্যাক্সিনে এর ক্ষেত্রে দুটি ডোজ চামড়ার তলায় ইনজেকশন এর মাধ্যমে দেওয়ার কথা।

 

ভ্যাক্সিনজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতদিন থাকবে, সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা না থাকায়, হয়তো এক বছর অন্তর এই টীকাগুলি পুনরায় নিতে হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কিছু এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।

 

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

 

যে কোনো রোগের টিকার ক্ষেত্রেই কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকে। সীমিত অভিজ্ঞতায় এখনো অব্দি কোভিশিল্ড ও কোভ্যাক্সিনে টিকা দুটিতে বড়সড় কোনো সমস্যা দেখা যায় নি—এমনটাই সংশ্লিষ্ট ওষুধ কোম্পানীগুলির বক্তব্য। তবু গণ টিকাকরণ এর ক্ষেত্রে সরকারের উচিত অত্যন্ত সুচারু ও দক্ষভাবে প্রতিক্রিয়া নির্ণয় ও নিরাময়ের ব্যবস্থা করা। টিকা নেওয়ারকয়েক সপ্তাহের মধ্যে যদি শরীরে কোনো নতুন বা বিচিত্র অনুভূতি হয় তবে অতি দ্রুত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।

 

কার্যকারিতা

 

রোগ প্রতিরোধে কোভিশিল্ড মোটামুটি ৭০% কার্যকরী বলে প্রস্তুতকারী সংস্থার দাবী। কোভ্যাক্সিনে এর ক্ষেত্রে আমরা এখনও সঠিক কার্যকারিতার প্রামাণ্য তথ্য হাতে পাইনি। উভয় ভ্যাক্সিন এর ক্ষেত্রেই সুরক্ষা কতদিন কার্যকরী থাকবে তা এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে আশা করা যাচ্ছে কমপক্ষে ৯ মাস থেকে ১ বছর কার্যকরী সুরক্ষা বজায় থাকবে। কোনো ভ্যাকসিনই আপনাকে একশো শতাংশ নিরাপত্তা দিতে পারে না। অতএব টিকা নেওয়ার পরেও নিয়মমতো ফেস মাস্ক ব্যবহার করবেন, শারীরিক দূরত্ববিধি মেনে চলবেন, হাত জীবাণুমুক্ত রাখবেন।

 

যাঁদের একবার সংক্রমণ হয়ে গেছে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সংক্রমণ পরবর্তী এই ধরণের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ততটা বিশ্বাসযাগ্য নয়। তাই এই সমস্ত ক্ষেত্রেও একই ডোজে ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত। হাম বা চিকেন পক্স এর মতন প্রাকৃতিক সংক্রমণে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ করোনা ভাইরাস এর ক্ষেত্রে হয় না। অধুনা অন্য কোনো রোগের টীকা নিলে কোভ্যাক্সিন টীকা মৃত ভাইরাস থেকে তৈরী এবং কেভিসিল্ড এর ভাইরাসগুলিও মানুষের শরীরে প্রজননক্ষম নয় তাই অন্যান্য টীকার সাথে এই ভ্যাক্সিনগুলি নেওয়ায় কোনো বাধা নেই।

 

নতুন মিউট্যান্ট ভাইরাস

 

এখনো অব্দি যে দুটি বিশেষ মিউট্যান্ট ভাইরাস এর কথা আমরা জানি তার মধ্যে ইংল্যান্ড এ পাওয়া N ৫০১Y মিউট্যান্ট টি সম্ভবত টিকা র দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে পাওয়া E ৪৮৪ K মিউট্যান্টভাইরাস টিকে কোভিড ১৯ থেকে সেরে ওঠা রোগীর প্লাজমা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করতে পারছে না। সেক্ষেত্রে টীকার কার্যকারিতা কিছুটা কম হতে পারে। কিন্তু এর কোনোটারই  প্রামাণ্য তথ্য বা অভিজ্ঞতা এখনো নেই।

 

প্রেগন্যান্সি ও ল্যাকটেশন

 

ভারতবর্ষে স্বীকৃত ভ্যাক্সিন দুটি নিলে গর্ভাবস্থায় বা ব্রেস্ট ফিডিং মায়েদের ক্ষেত্রে যে অসুবিধা হবে না এরকম বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। প্রথাগত ভ্যাক্সিন বিদ্যা অনুযাযী মৃত ভাইরাস থেকে তৈরি হওয়া ভ্যাক্সিন প্রসূতি মায়েদের ক্ষেত্রে সাধারণত নিরাপদ হয়। সেক্ষেত্রে কোভ্যাক্সিন সম্ভবত কোভিশিল্ড এর থেকে বেশি নিরাপদ হতে পারে। তবে যত দিন না উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে ততদিন এই ভ্যাক্সিনগুলি প্রসূতি এবং ব্রেস্ট ফিডিং মায়েদের উপর ব্যবহার না করাই উচিত।

 

পছন্দ অপছন্দের প্রশ্ন

 

এই মুহূর্তে ভারতে মাত্র দুটি ভ্যাকসিনকেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তার বাইরে কোনো অপশন আপাতত নেই। তবে স্বীকৃত দুটি ভ্যাকসিনের মধ্যে বেছে নেবার অধিকার আপনি পাবেন কিনা আমাদের জানা নেই। ব্যক্তিগত বা অসরকারি উদ্যোগে অধিক সুরক্ষাদায়ী ভ্যাকসিন (যেমন ফাইজার বা মডার্ণা) দেশে আনা যাবে কি নাতাও এখনি বলা যাচ্ছে না।

 

জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস, ওয়েস্ট বেঙ্গল-এর দাবি:

 

১। সকলকে এই বিষয়গুলি নিয়ে জানানো হোক:

 

  •  ভ্যাকসিনটি রোগ প্রতিরোধ করবে না রোগের তীব্রতা কমাবে?
  • যে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে সেটি চিকিৎসা শাস্ত্র অনুযায়ী পরীক্ষার কোন পর্যায়ে আছে?
  • বিভিন্ন বয়ঃগোষ্টী অনুযায়ী ভ্যাকসিনগুলির কার্যক্ষমতা কতটা?

 

২। মানুষের মৌলিক অধিকারকে মর্যাদা দেওয়া হোক:

 

  • স্বীকৃত আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন অনুযায়ী টীকার  বিষয়ে  সহজবোধ্য ভাষায় জানিয়ে লিখিত সম্মতি নিয়ে টীকাদেওয়া হোক।

 

  • এই পর্যায়ে কাউকে কোনভাবেই টীকা নিতে বাধ্য করা যাবে না।

 

  • কেউ প্রথমবারের টীকাকরণ কর্মসূচিতে সামিল না হতে পারলে পরবর্তীতে যেন সূযোগ পান।

 

  • টীকা নেওয়ার পর কারোর কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে রাষ্ট্র তার প্রয়োজনীয় সমস্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করুক।

 

  • টীকাকরণের ফলে গ্ৰহীতার দীর্ঘস্থায়ী কোন ক্ষতি হলে টীকাপ্রাপকের যথাযথ ক্ষতিপূরণের দায় সরকারের।

 

৩। নিরপেক্ষ নজরদারির ব্যবস্থা চাই।

 

এক বা একাধিক স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সংস্থার তদারকিতে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে তাঁদের পর্যবেক্ষণে টীকাকরণ চালানো হোক। তাঁরা নথিভুক্ত করবেন—

 

  • যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী সম্মতি সাপেক্ষে টীকা দেওয়া হচ্ছে কিনা?

 

  • যে জায়গায় টীকা দেওয়া হচ্ছে সেখানে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়ার আপৎকালীন সকল ব্যবস্থা আছে কিনা?

 

  • প্রতিটি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বিশদভাবে নথিভুক্ত করা হচ্ছে কিনা ও সেগুলি কিভাবে সামাল দেওয়া হচ্ছে?

 

  •  উপরোক্ত সকল বিষয়ে তথ্য  সংগ্রহ করার বিষয়ে কোন রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় অনুশাসন থাকবে না। সরকার ইচ্ছা করলে পর্যবেক্ষকদের  ওই সংগৃহীত তথ্য সংগ্ৰহ করতে পারবে তবে পর্যবেক্ষকরা স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছেই সমস্ত তথ্য দাখিল  করবে।

 

  • টীকাকরণ সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য সর্বসাধারণের কাছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে জানাবার (real time on-line) ব্যবস্থা থাকবে।

 

8। সরকারের দায়িত্ব

 

  • কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব দেশের সকল মানুষের জন্য টীকার ব্যবস্থা করা ও সকল খরচ বহন করা। কেন্দ্রীয় সরকার না পারলে রাজ্য সরকারকে এই দায়িত্ব নিতে হবে।

 

  • টীকা নেওয়ার ভয়, জড়তা, অনীহা বা সংশয় কাটানোর জন্য রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী সহ কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়করা নিজ নিজ অঞ্চলে প্রকাশ্যে টীকা নিয়ে মানুষকে উৎসাহিত করুন।

 

 

জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস, ওয়েস্ট বেঙ্গল (ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম, শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ, হেলথ সার্ভিস এসোশিয়েসন, ডক্টরস ফর ডেমোক্রাসি এবং এসোশিয়েসন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টরস)-এর পক্ষে যুগ্ম আহ্বায়ক ডা হীরালাল কোঙার ও ডা পুণ্যব্রত গুণ দ্বারা প্রচারিত। ১৩ই জানুয়ারী, ২০২১।

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: SHAHIDUR RAHMAN on January 13, 2021

    সঠিক তথ্য এবং দাবিগুলি তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ জানাই।

Leave a Comment