সিঙ্ঘু সীমান্ত যেন সংগ্রামের মহাকুম্ভ


  • December 26, 2020
  • (0 Comments)
  • 970 Views

কী বলব একে? ব্যক্তি-সম্পত্তির আরাধনা, নাকি তার অ্যান্টিথিসিস? তার্কিকদের উদ্দেশ্যে তাই বলতে ইচ্ছা জাগে, ‘মহাশয় আন্দোলন দেখেছেন কখনও? আসুন দেখে যান। তারপর না হয় কথা বলা যাবে!’ সিঙ্ঘু সীমান্ত থেকে লিখছেন শংকর

 

সিঙ্ঘু সীমান্ত
২৬.১২.২০২০

 

সিঙ্ঘু সীমান্তে যেন কুম্ভমেলা লেগেছে। ত্রিবেণী সঙ্গমের জলে নয়, সংগ্রামের পবিত্র অগ্নিতে ঝাঁপ দিতে দলে দলে মানুষ এসে জুটেছে এখানে। সারি সারি কয়েক হাজার ট্রাক, ট্রাকটর, ট্রলি, বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে। অস্থায়ী তাঁবুও পড়েছে শ’য়ে শ’য়ে। দিল্লি সীমান্ত থেকে হরিয়ানার সোনিপথের দিকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার জায়গা জুড়ে এই অবস্থা। মানুষ আর মানুষ। কে নেই সেই ভীড়ে! কলকাতার মতো দূরবর্তী শহরে কতই না জল্পনা, তত্ত্বালোচনা। ধনী কৃষক, ব্যক্তি-মালিকানা ইত্যাদি। কিন্তু লড়াইয়ের কেন্দ্রে আসলে দেখবেন, এ এক মহামিলনক্ষেত্র। এখানে সবাই আছেন। ধনী কৃষক, মধ্য কৃষক, ভূমিহীন ক্ষেতমজুর, এমনকি শিল্পপতি, ছোট কারখানার মালিক। গতর খেটে খাওয়া ছাড়া উপায় নেই সেই শ্রমিকের দল, আবার যাদের সাথে আপাতদৃষ্টিতে কৃষিকাজ বা অন্য উৎপাদনক্ষেত্রের কোনোই সম্পর্ক নেই এমন মানুষজনও। এরা সকলেই একজোট! আদানি, আম্বানিদের মতো কর্পোরেট, যাদের পেছনে রয়েছে বিদেশি বহুজাতিকরা — তাদের কোনোমতেই কৃষিক্ষেত্রে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। একটা আমেরিকান সংবাদপত্রের সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে মার্কস একবার বলেছিলেন, বিপ্লব শুধু কোনো একটা পার্টি করে না, বিপ্লব করে একটা জাতি! দিল্লির চলমান কৃষক আন্দোলন চোখের সামনে দেখলে তারই একটা ঝলক আপনার চোখে ভেসে উঠবে। সর্বোপরি বিপ্লব জিনিসটা যে নেহাতই কল্পকথা নয়, তা এক ঘটমান বাস্তবতা সেই বোধও দেখা দিতে পারে অবিশ্বাসীর অন্তরে। সাধে কি আর সংযুক্ত কিষান মোর্চা বলেছে, বর্তমান কৃষক আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক জাতীয় সংগ্রামে পর্যবসিত হয়েছে!

 

যে কূপমণ্ডুক মধ্যবিত্ত তার পছন্দের পার্টির তহবিলে দশটা টাকা দিতেও গররাজি, কিন্তু ব্যক্তিমালিকানার বিরুদ্ধে সদাই খড়্গহস্ত, তারা এখানে এসে শিখতে পারেন, তন-মন-ধন অকাতরে লাগিয়ে দিয়ে কীভাবে লড়াই করতে হয়। কৃষক আন্দোলনে ব্যক্তিমালিকানার পূজারিদের আধিপত্য রয়েছে, এই বলে যারা নাক সিঁটকে নিরাপদ দূরত্ব বেছে  নিয়েছেন, তারা এখানে এসে দেখতে পারেন সেই কৃষকরা কীভাবে তাঁদের সর্বস্ব এখানে এসে উজাড় করে দিয়েছেন এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালানোর লক্ষ্য নিয়ে। প্রায় মাইনাস তাপমাত্রার রাতের এই অঞ্চলে রাত কাটানোর জন্য ট্রাকটর, ট্রলি বা তাঁবুতে গদি, লেপ, কম্বল তোষকের কোনো কমতি নেই। যদিও এর পরেও প্রায় তেত্রিশজন কৃষক শহিদ হয়েছেন খোলা আকাশের তলায় এই ঠান্ডা সহ্য করতে না পেরে। রয়েছেন শিশু আর মহিলারা। এখানে কেউ একা আসেননি। সঙ্গে গোটা পরিবার নিয়ে এসেছেন। গ্রাম-কে-গ্রাম উজাড় করে এসেছেন। কথা হচ্ছিল এরকমই এক গ্রাম পঞ্চায়েতের মুখিয়া সুখদেব সিং-এর সঙ্গে। বললেন, “আমাদের গ্রামের অর্ধেক লোক এখানে আছে। বাকিরা চাষের কাজ সামলাচ্ছে। এরা ফেরত গেলে ওরা আসবে।” গোটা ব্যাপারটাই চলছে অত্যন্ত পরিকল্পনামাফিক। সুশৃঙ্খল ভাবে। প্রায় লক্ষ লোক রোজ খাচ্ছেন, থাকছেন। নিত্য নৈমিত্তিক সকল কাজ চলছে। লঙ্গর চলছে। খাবার তৈরি হচ্ছে। রুটি-মেকারে রুটি তৈরি হচ্ছে ঘণ্টায় সাত-আট হাজার। বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সাফ করা হচ্ছে প্রতিদিন। বিপুল পরিমাণ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। মেন স্টেজে জায়েন্ট স্ক্রিনে বক্তাকে দেখা যাচ্ছে অনেক দূর থেকে। দিনের সারাটা সময় চলছে ভাষণ। সারা দেশ থেকে শ’য়ে শ’য়ে সংগ্রামী সংগঠন এসে সলিডারিটি জানিয়ে যাচ্ছে। মিছিল চলছে বাচ্চা কাঁধে নিয়ে। কুশপুতুল পোড়াচ্ছে কেউ কেউ। অন্য কোথাও বইয়ের স্টল লেগেছে একের পর এক। সেখানে ভিড় করে বই কিনছেন কৃষকরা। লাইব্রেরি তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে বই নিয়ে যাচ্ছেন, আবার সময়মত ফেরত দিয়ে আসছেন কৃষকরা। কোথাও কমলালেবু বিলি করা হচ্ছে। কোথাও-বা চা-পকোড়া বিলি হচ্ছে। আন্দোলনকে সাহায্য করতে কেউ-বা চপ্পল, জুতো নিয়ে এসে বসে পড়েছেন। যার লাগবে সে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ নিয়ে এসেছেন মোজা। প্রথম দেখে মনে হয়েছিল বিক্রি করছে বুঝি। যেমন ব্রিগেডে বা রানি রাসমণিতে হয়। পরে বুঝলাম, না তা নয়। বিলিয়ে দিচ্ছে স্রেফ। যার লাগবে না সে নিচ্ছে না। যার লাগবে সে নিচ্ছে। বলছিলাম না, মহাকুম্ভ লেগেছে দিল্লি সীমান্তে। যার যা আছে উজাড় করে দিচ্ছেন সংগ্রামের পবিত্র অগ্নিতে। ‘বণিক-ধনিকা মুঠি মুঠি রতন-কণিকা’ও যেমন দিচ্ছে, ‘ধনী স্বর্ণ আনছে থালি পূরে পূরে’, আবার ‘ভূতল-শয়ন দীন নারী’ কোনো এক তাঁর গাত্র হতে খুলি দিচ্ছে একমাত্র বসনখানি! অকারণে অশ্রু বিসর্জন করার মতো বালিকারও অভাব নেই!

 

কী বলব একে? ব্যক্তি-সম্পত্তির আরাধনা, নাকি তার অ্যান্টিথিসিস? তার্কিকদের উদ্দেশ্যে তাই বলতে ইচ্ছা জাগে, ‘মহাশয় আন্দোলন দেখেছেন কখনও? আসুন দেখে যান। তারপর না হয় কথা বলা যাবে!’

 

  • লেখক রাজনৈতিক কর্মী।

 

Share this
Leave a Comment