রাস্তাই একমাত্র রাস্তা


  • December 20, 2020
  • (0 Comments)
  • 420 Views

 ১৮ ডিসেম্বর ভিডিওর পর্দায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দেখা গেল করজোড়ে। এই  ‘বিনম্রতা’ সংসদে প্রাইভেট কৃষি বিল পেশের সময় কোথায় ছিল?কোথায় ছিল ছ’মাস আগে?যখন লকডাউন পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশ আনা হয়েছিল? কোথায় ছিল এই ‘বিনম্রতা”, ‘কথা বলার ইচ্ছা ‘যখন রাজ্যসভায় অন্যায় ভাবে বিল পাশ করানো হয়। প্রশ্ন তুললেন দেবাশিস আইচ

 

পথে নামলেই পথের হদিশ মেলে। তার যতই প্রাকপ্রস্তুতি থাক, চুল চেরা বিশ্লেষণ, হাজার আঁক কষা থাক — পথ খুঁজতে গেলে শেষ পর্যন্ত পথে নামতেই হয়। না হলে সবই নিরর্থক। কৃষকদের দিল্লি অভিযান সেই উদ্দেশ্যেই। এ শুধু তাঁদের কাছে নয়, দেশের খেটে-খাওয়া সমস্ত মানুষের কাছেই এক জীবন-মরণ প্রশ্ন। দুর্ঘটনা, শীতের প্রকোপে ইতিমধ্যেই অন্তত ২২জন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। ধরনাস্থলে আত্মঘাতী হয়েছেন একজন। পাঁচ-পাঁচবার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার পর কৃষক নেতৃত্ব বুঝে গিয়েছেন, তাঁদের কোনও মূল্য নেই এই বণিক-রাজের কাছে। আলাপ-আলোচনার প্রকৃতই কোনও মূল্য নেই। কেননা বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে পরিণত হয়েছে। যদি থাকত, তবে কৃষি যখন রাজ্যেরও বিষয় তখন কেন্দ্রীয় সরকার কেন এই অতিমারির মধ্যে প্রথমে  অধ্যাদেশ জারি করে কৃষি বিল প্রণয়ন করতে চাইবেন আবার সংসদে একরকম গা-জোয়ারি করেই পাশ করিয়ে নেবে বিতর্কিত আইন? এর সঙ্গে রয়েছে তুমুল মিথ্যাচার।

 

অন্যদিকে, কৃষকরা হঠাৎ একদিন মনে করলেন, তাঁদের প্রতি গভীর অন্যায় করা হয়েছে অতএব চলো দিল্লি — তাতো নয়। ২০১৫-১৬ থেকেই কৃষক সংগঠনগুলি ঐক্যবদ্ধ ভাবে তাঁদের দাবিদাওয়া নিয়ে বার বার রাজপথে নেমে এসেছেন। একাধিক বার দিল্লি অভিযানেও সামিল হয়েছেন। কৃষকদের প্রথম সাফল্য আসে ২০১৫ জানুয়ারি মাসে। ২০১৩ সালে মনমোহন সিংহ সরকার কৃষকদের দাবি মেনে জমি অধিগ্রহণ (সংশোধনী) আইন এনেছিল। মোদী ক্ষমতায় এসে অধ্যাদেশ জারি করে কৃষকদের অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ওই আইনে পূর্ববর্তী কেন্দ্রীয় সরকার কৃষকদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার স্বীকার করেছিল। তার মধ্যে ছিল, সম্মতি ছাড়া জমি অধিকার করা যাবে না; নিতে হলে সামাজিক সমীক্ষা করতে হবে; জমির জন্য বাজার-দামের চার গুণ দাম দিতে হবে। এই অধ্যাদেশ জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষক সভার নেতৃত্বে গড়ে উঠল এক যৌথ আন্দোলন। এর পর তিন বার চেষ্টা করেও সেই বিল পাশ করানো যায়নি। রাজ্যসভায় বিরোধীরাও এককাট্টাই ছিল।

 

এর সঙ্গে অবশ্যই মনে করিয়ে দিতে হবে, এই কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছিল, এক, ফসলের দেড় গুণ দাম; দুই, ঋণমকুব বিষয়ক দুটি বিল। ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর দিল্লিতে সারা ভারত কৃষক সংঘর্ষ কোঅর্ডিনেশন কমিটির নেতৃত্বে ‘কৃষক পার্লামেন্ট’-এ এই বিল প্রস্তুত হয়। এর পর দেশজোড়া ৫০টি সেমিনার, সভার মধ্য দিয়ে আসা ৪০০’র বেশি পরামর্শের মাধ্যমে বিল দুটিকে সমৃদ্ধ করা হয়। পরবর্তী পদক্ষেপে ২১টি রাজনৈতিক দল এই বিলদুটিকে সমর্থন জানায়। ২০১৮ সালের ৩ অগস্ট সংসদের উভয় কক্ষে প্রাইভেট বিল হিসেবে তা পেশ করা হয়। নরেন্দ্র মোদী সরকার তা পাশ করতে দেয়নি।

 

১৮ ডিসেম্বর ভিডিও পর্দায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দেখা গেল করজোড়ে। সংবাদমাধ্যমের বিবরণ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “আমার কথার পরেও, সরকারের যাবতীয় প্রয়াসের পরেও, যদি কারও কোনও আশঙ্কা থাকে, আমরা মাথা হেঁট করে, খুবই বিনম্রতার সঙ্গে, দেশের কৃষকদের স্বার্থে, তাঁদের দুশ্চিন্তা দূর করতে, সমস্ত বিষয়ে কথা বলতে চাই।” এই ‘বিনম্রতা’ সংসদে প্রাইভেট কৃষি বিল পেশের সময় কোথায় ছিল? কোথায় ছিল ছ’মাস আগে? যখন লকডাউন পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশ আনা হয়েছিল? কোথায় ছিল এই ‘বিনম্রতা’, ‘কথা বলার ইচ্ছা’ যখন রাজ্যসভায় অন্যায় ভাবে বিল পাশ করানো হয়। কতবার তিনি কৃষি আইনের পক্ষে সওয়াল করেছেন? একটি হিসেব বলছে ২৬ বার। ১৮ ডিসেম্বর তিনি আবারও মধ্যপ্রদেশের কৃষকদের কাছে তিন আইনের গুণকীর্তনই করেছেন। এই সেই মধ্যপ্রদেশ যেখানে আইন জারির পর ২৬৯টি মান্ডির ৪৭টি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ১৭ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার, যে রাজ্যে কৃষকরা ১২০০ টাকা কুইন্টাল দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। গত মরশুমেও তাঁরা কুইন্টাল প্রতি ২২০০ টাকা পেয়েছেন।

 

এই সেই মধ্যপ্রদেশ যেখানে ২০১৭ সালের জুন মাসে সয়াবিনের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে আন্দোলনরত মান্দসৌরের কৃষকদের উপর গুলি চালিয়ে ছ’জন কৃষককে হত্যা করে তৎকালীন বিজেপি সরকার। ২০১৬ সালে যেখানে সয়াবিনের দাম ছিল কুইন্টাল প্রতি ৬০০০ টাকা, ২০১৭ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ২৫০০ টাকায়। মান্দসৌর কৃষক আন্দোলনের পরই ১২০টি কৃষক সংগঠন নিয়ে গড়ে ওঠে সারা ভারত কৃষক সংঘর্ষ কোঅর্ডিনেশন কমিটি। যার সদস্য সংগঠনের সংখ্যা বর্তমানে ৫১৩। ১৮ তারিখের ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী ফের স্বামীনাথন কমিশনের প্রসঙ্গ তুলেছেন। এবং দাবি করেছেন তিনি এই কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করেছেন। কৃষক নেতারা এই দাবিকে ডাহা মিথ্যা বলেছেন। প্রধানত কৃষক আন্দোলন ও বামপন্থী সাংসদদের চাপে স্বামীনাথন কমিশন হয়েছিল। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ কার্যকরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোদী। মোদী এখনও বলে যান কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক কৃষকদের উৎপাদন খরচের দেড় গুণ দাম দেওয়া হচ্ছে।

 

গত বছর এমনই সময় সর্বভারতীয় কৃষক নেতা হান্নান মোল্লা এক সাক্ষাৎকারে এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। হান্নান জানিয়েছিলেন, “স্বামীনাথন কমিশন বলেছিল, সি২ প্লাস ৫০ শতাংশ। সি২ মানে ১) চাষের উপকরণের খরচ, ২) জমির খাজনা, ৩) (পারিবারিক শ্রম) শ্রমের খরচ — এইগুলি যোগ করে যা হবে তাই হবে মোট উৎপাদনের খরচ। প্লাস ৫০ শতাংশ। বিজেপি সরকার স্বামীনাথন কমিশনের ফরমুলা মানল না। তারা দিল এ২— উপকরণের খরচ ও পারিবারিক শ্রম — জমির খাজনা তারা ধরল না যা উৎপাদনের খরচের ৩০ শতাংশ। যার মানে ১০০ শতাংশের দেড় গুণ নয়। তারা দিল ৭০ শতাংশের দেড় গুণ।” মোদীর প্রচারে ‘দেড় গুণ’ রয়েছে। কিন্তু, অশ্বত্থামা হত ইতি গজের মতোই, সে যে ১০০ শতাংশের দেড় গুণ নয় তা এড়িয়ে চলেছেন। এ এক প্রতারণা বলেই মনে করেন কৃষকরা।

 

একই সাক্ষাৎকারে হান্নান মোল্লা পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, “প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা আর একটি প্রতারণা।” এই যোজনা ছ’টি প্রাইভেট কোম্পানির মুনাফার লক্ষ্যে নিয়োজিত। তাঁর ব্যাখ্যা, “প্রতি ফসল ভিত্তিক প্রিমিয়াম দিতে হয়। ২০১৬ সালে খরিফ ফসলের সময়ে কৃষকরা প্রিমিয়াম দিয়েছে প্রায় ২৪,০০০ কোটি টাকা। কিন্তু, বছরের শেষে কৃষকরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছে মাত্র ৮০০০ কোটি টাকা। ১৬,০০০ কোটি টাকা কোম্পানির লাভ। সেই জন্য এটি কৃষক বীমা নয়, কর্পোরেট বীমা — বহুজাতিক কোম্পানির বীমা।”

 

ইতিমধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গিয়েছে। তা হল সুপ্রিম কোর্টের রায়। কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে দু’জাতীয় স্বার্থগোষ্ঠী সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল। একদল শাহিনবাগ মামলার রায়ের উল্লেখ করে আবেদন করেছিল, কৃষক সমাবেশের উপর একই জাতীয় নিষেধাজ্ঞা জারি হোক। আরেক দল আবেদন জানায়, এই তিন কৃষি আইন রদ করুক আদালত। সওয়াল জবাবের সময় প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, “কত মানুষ ওইখানে (শাহিনবাগ) রাস্তা অবরোধ করেছিলেন? মানুষের সংখ্যা কি বিচার্য নয়? কে দায়িত্ব নেবে? আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতিতে এর কোনও অতীত উদাহরণ নেই।”

 

আরেক আন্দোলন বিরোধী আবেদনকারীর আইনজীবী রাস্তা অবরোধের ফলে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার খর্বিত হচ্ছে বলে সওয়াল করেন। এর পর প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, “মনে হচ্ছে আবেদনকারী অবিবেচক। আদালতের কাছে কোনও আইনি বিচার্য বিষয় নেই। আমাদের সামনে একটিই দল আছে, যারা রাস্তা অবরোধ করেছে, সেটা আপনারা (সরকার)। এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহেতা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন যে ‘কর্তৃপক্ষ রাস্তা আটকায়নি’, কৃষকরা আন্দোলন করছে বলে দিল্লি পুলিশকে মোতায়েন করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি আবারও মন্তব্য করেন, “সুতরাং, একমাত্র একটি দলই প্রকৃতপক্ষে রাস্তায় আছে সেটা আপনারা।”

 

এই সওয়াল-জবাব অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। যদি শাহিনবাগ রায়ের প্রেক্ষিতে দেখি, যদি অযোধ্যার প্রেক্ষিতে দেখি, যদি কাশ্মীর কিংবা ভীমা কোরেগাঁও মামলার প্রেক্ষিতেও দেখি — একটাই প্রশ্ন মনে জাগবে, আর তা হল, এত ‘বিবেকবোধ’, এত ‘বিবেচনা’ কোথায় ছিল? এই যে ‘আলাপ-আলোচনা’, কমিটি তৈরির প্রস্তাব এত দিন কোথায় ছিল? এর কোনও সহজ ব্যাখ্যা নেই। এটুকু অন্তত বলা যায়, ‘শক্তিশালী’ সরকারের এই যে ‘নতজানু’ হয়ে পড়া, ‘জোড় হাত’ করা তা ‘শক্তের ভক্ত’-দেরও ‘বিবেচক’ হয়ে উঠতে বাধ্য করেছে। সংঘবদ্ধ কৃষক আন্দোলনের এও আরেক জয় বটে। কৃষক সভার নেতা হান্নান মোল্লা অবশ্য পরিষ্কার সুপ্রিম কোর্টের মধ্যস্থতার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের কিছু করার নেই। তাঁরা আদালতের কাছে কোনও ‘আর্জি’ নিয়ে যাবেন না। যা করার সরকারকেই করতে হবে। তার অর্থ আমরা ধরে নিতেই পারি, হয় এসপার নয় ওসপার। আসলে রাস্তাই একমাত্র রাস্তা।

 

তথ্যসূত্র:

আনন্দবাজার পত্রিকা, শনিবার ১৯ ডিসেম্বর ২০২০
শ্রমজীবী ভাষা, ১ নভেম্বর, ২০১৯

 

Share this
Leave a Comment