স্রোতের টানে ভাসে যে জীবন…


  • December 19, 2020
  • (1 Comments)
  • 847 Views

কাকদ্বীপের ১৭ জন মৎসজীবী বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলে আটক। এই খবরটা এক বহুল প্রচারিত দৈনিকে দেখে, APDR ডায়মন্ডহারবার শাখার পক্ষ থেকে ৩ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে তথ্যানুসন্ধানের উদ্দেশ্যে গত ১৪ ডিসেম্বর কাকদ্বীপে যাওয়া হয়। তার প্রাথমিক রিপোর্ট পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হল — গ্রাউন্ডজিরো সম্পাদকমণ্ডলী।

 

 

এলাকা পরিচিতি :

জমি, জঙ্গল ও প্রকৃতির অপার্থিব সৌন্দর্য এবং অন্যদিকে প্রকৃতির প্রতিকূলতা এই দুয়ের অদ্ভুত সমাহারে গড়ে উঠেছে সুন্দরবনের বিস্তৃত জনবসতি। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি স্বভাবিকভাবেই আমাদের এই জনপদের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে, সে নিয়ে কারো মনে দ্বিধা থাকার কথা নয়।সব থেকে মজার বিষয়, আন্তর্জাতিক স্তরে সুন্দরবনের মহিমা সর্বজন বিদিত হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবে সুন্দরবনে বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকা, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার ইতিহাসে  সেরকম লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন ঘটেনি! একদমই ঠিক শুনছেন, সুন্দরবনকে নিয়ে গালভরা কথা বলা হলেও বাস্তবে সুন্দরবন এখনও সেই তিমিরে আছে!

 

এর পেছনে রয়েছে প্রশাসনের ঔদাসীন্য ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ! আসল সত্যটি হল খুবই ভয়ঙ্কর, সুন্দরবনকে কুমীরছানার মতো দেখিয়ে যে আর্থিক সাহায্য পাওয়া যায়, তার নামমাত্র খরচ করা হয় এখানকার মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রার উন্নয়নে!

 

আমরা যারা অল্পবিস্তর খবরাখবর রাখি, তারা সকলেই জানি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য হল সুন্দরবন। পশ্চিমবঙ্গের মূলত উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনাতে রয়েছে সুন্দরবনের ৪০%। বাকিটা বাংলাদেশে অবস্থিত। বিশেষত উত্তর ২৪ পরগনার, হিঙ্গলগঞ্জ, হাসনাবাদ, সন্দেশখালি-১, সন্দেশখালি ২, মিনাখা, হাড়োয়া এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং-১,ক্যানিং-২,জয়নগর -২, মথুরাপুর-১, মথুরাপুর-২, কাকদ্বীপ, নামখানা, সাগর, পাথরপ্রতিমা, বাসন্তী, কুলতলি গোসাবা প্রভৃতি অঞ্চলেই সুন্দরবনের ভৌগোলিক অবস্থান। এই ব্লকগুলিতে বসবাসকারী মানুষের অধিকাংশই ব-দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকার বাদাবন কেটে নিজেদের বসতি স্থাপন করে, প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে রয়েছেন।

 

মানুষের অবস্থা:

আমরা যে দুটো এলাকায় দুর্দশাগ্রস্ত ৯ টি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলি তার একটা হল পূর্ব স্টিমার ঘাট আর একটা হল মাইতির চক। এই এলাকার বেশিরভাগ (৯৫%) মানুষ জেলে এবং সবাই প্রায় সমুদ্রে মাছ ধরতে যান এবং এটা তাঁদের বংশপরম্পরায় চলে আসছে। ওই সকল পরিবারের ঘরে ঢুকতে মাথা হেঁট হয়ে ঢুকতে হয়, প্রায় সব ঘরগুলো দর্মা বা কালো প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক হাল বেশ শোচনীয়! এই বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয় রাজু দাসের দিদিমা সুমিত্রা দাসের প্রত্যক্ষ বয়ান থেকে (মাইতির চক)। তবে এলাকা ঘুরে আমাদের তিনজনের প্রতিনিধি দলের মূল্যায়ন হল: কী প্রশাসন কী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী সবার কাছেই এঁরা গুরুত্বহীন!

 

আমাদের জানা দরকার ব্যাপক প্রাকৃতিক, জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সম্পদ, ম্যানগ্রোভ ইত্যাদির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবন, বহুভাবে এর চার পাশে অবস্থিত শহর ও আধাশহরগুলি নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন — সামুদ্রিক মাছ (ইলিশ, ভোলা, শঙ্কর, পমফ্লেট, আড়, ও অন্যান্য শুকনো মাছ প্রভৃতি), কাঁকড়া, চিংড়ি, শাক-সব্জির ও অন্যান্য বহু নিত্যপ্রয়োজনীয় জীবন যাপনের সামগ্রী খাদ্যের/পুষ্টির যোগান দিয়ে থাকে। সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী বহু জেলে পরিবারের অক্লান্ত পরিশ্রম পশ্চিমবঙ্গে সামুদ্রিক মৎস্যের একটি বড় উৎস। কারণ উপরোক্ত ব্লকগুলির বহু পরিবার নিজেদের পরিবার প্রতিপালন ও জীবন ধারণের উদ্দেশ্যে জীবনকে বাজি রেখে গভীর সমুদ্রে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে নিযুক্ত। যোগাযোগের অপ্রতুলতা, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা, বাঘ, কুমিরের ভয় ইত্যাদিকে জীবনের পাথেয় করে এই সকল জেলে পরিবার আমাদের সমাজের নিরন্তর সেবা প্রদান করে চলেছেন এবং সামুদ্রিক মাছের যোগানকে সাবলীল রেখেছে।

 

সুমিত্রা দেবির কথায়:

গত বছর ৭ জনকে সমুদ্র নিয়েছে, ফি বছর আমাদের ঘরের ৮/১০ জন লোক এইভাবে যায়। আর তারপর তার পুরো পরিবারটাই ভেসে যায়!

 

গত ২৯ নভেম্বর, ২০২০( রবিবার) কাকদ্বীপ মৎস্যবন্দর থেকে একটি ট্রলারট্রলি (এফ.বি.মাশিবানী,  IND-WB-DS-MO-3318) বঙ্গোপসাগরে মাছধরার জন্য রওনা দেয়। ট্রলারটি ২০০০ লিটার জল ও ১৮০০ লিটার তেল বহনে সক্ষম। এই মাছ ধরা ট্রলারটি মাঝি ও মৎস্যজীবী সহযোগে মোট ১৭ জনের একটি দল ছিল। এরা হলেন:

 

সুজন দাস (পিতা-শ্রীবাস দাস, হরিপুর, হারউড পয়েন্ট কোস্টাল),

কাঁকন দাস (পিতা-রাখাল দাস, হরিপুর),

অমল বিশ্বাস (পিতা-অমূল্য বিশ্বাস, পূর্ব স্টিমার ঘাট, কাকদ্বীপ),

রাজু দাস (পিতা-যতীন্দ্র দাস, পূর্ব স্টিমার ঘাট),

পরীক্ষিৎ দাস (পিতা-অনিল দাস),

তপন দাস (পিতা-হরিকমল দাস),

সঞ্জয় দাস (পিতা-কিরণ দাস),

রাম দাস,

সুরজিৎ দাস,

কৃষ্ণ দাস,

মৃণাল দাস

অক্ষয় দাস

সুরেশ দাস,

মধুসূদন বিশ্বাস,

নিরঞ্জন মাইতি,

বিষ্ণপদ বর (পিতা-গুণধর বর), বিচিত্র বারুই, জামালপুর।

 

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ট্রলারটি মাছ ধরতে ধরতে একেবারে বাংলাদেশ জলসীমার কাছাকাছি চলে আসে। এমতাবস্থায় আন্দাজ ডিসেম্বরের ২ তারিখ নাগাদ, ট্রলারটির যান্ত্রিক কিছু গোলযোগ নজরে আসে মাঝিদের। মাঝিরা যান্ত্রিক গোলযোগ মেরামতিতে ব্যস্ত থাকাকালীন সময়ে ট্রলারটি পূর্বমুখী বাতাসে ও স্রোতের টানে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে। এর পর বাংলাদেশের উপকূলরক্ষী বাহিনীর জোয়ানেরা ট্রলারসহ ১৭ জন ভারতীয় মৎস্যজীবীদের দলটিকে গ্রেপ্তার করে মংলা সমুদ্রবন্দরে ট্রলারটিকে আটকে রাখে। ১৭ জন ভারতীয় মৎস্যজীবীদের দলটিকে পার্শ্ববর্তী বাগেরহাট জেলে পাঠায়।

 

ঘটনার প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে, ট্রলারের মালিক ও বন্দি ভারতীয় মৎস্যজীবীদের পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলে, তাদের থেকে পাওয়া তথ্য আমরা তুলে ধরছি।

 

ট্রলার মালিক শিখা দাসের স্বামী সূর্য দাস এবং পরিবারের আরো তিন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যে, মালিকের কাছে ট্রলার আটক করার খবর আসে ২রা ডিসেম্বর। তারপর স্বাভাবিক নিয়মে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ১৭জন মৎস্যজীবীসহ নিজের ট্রলারটিকে ভারতে ফিরিয়ে আনতে। আমরা ওঁর সাথে কথা বলে জানতে পারি যে, মৎস্যজীবীদের নানা সুবিধা-অসুবিধার সমাধানে কাকদ্বীপের মৎস্যজীবী, ট্রলারমালিকদের নিয়ে West Bengal United Fishermen Association নামে একটি সংগঠন রয়েছে।

 

আমরা মৎস্যজীবী পরিবারগুলির সাথে কথা বলার জন্য কাকদ্বীপের পূর্ব স্টিমারঘাটের নতুন কলোনি ও শূকরকলোনিতে বাড়ি এমন তিনটি পরিবারের সাথে দেখা করি। নতুন কলোনিতে আটক মৎস্যজীবী রাজু দাস, ও অমূল্য বিশ্বাসের পরিবারের লোকজন, মা, বাবা, স্ত্রী, পুত্র, কন্যাদের সাথে কথাও বলা হয় এবং আরো সাতজন মৎস্যজীবী পরিবারের সঙ্গে দেখা করি মাইতির চক গ্রামে। এদের মধ্যে দুজন মৎস্যজীবীর স্ত্রী (তপন দাসের স্ত্রী শিখা দাস ও রাম দাসের স্ত্রী সীমা দাস) সন্তানসম্ভবা। পরিবারের বৃদ্ধবাবা-মা ও অন্যান্য সদস্যরা ভীষণ চিন্তায় রয়েছেন। অধিকাংশ পরিবারের মুখে থেকে শুনে যেটা বোঝা গেল তা হল, প্রতিটি পরিবারের রোজগারের মূল অবলম্বন হল আটকে থাকা মৎস্যজীবীরাই! প্রায় দু-সপ্তাহ রোজগারবিহীন পরিবারগুলির বর্তমান দিনগুজরান কীভাবে হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে ওদের উত্তর হল ট্রলারমালিকের থেকে পাওয়া ২০০০ টাকাই ওদের এই দু-সপ্তাহের যাবতীয় খরচের সম্বল! এক্ষেত্রেও ওরা স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য, প্রধান, মন্ত্রী, প্রশাসন কারো থেকে কোনও সাহায্য পায়নি! এমনকি মৎস্যজীবীদের বিমা ও অন্যান্য সাহায্যের জন্য সরকার থেকে বরাদ্দের কথা বলা হলেও এরা কিন্তু সেই তিমিরেই!

 

একমাত্র রোজগেরে মানুষটি কীভাবে ঘরে ফিরবে? আর না ফিরলেই বা কী হবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের ও জানা নেই। তাই দিতেও পারিনি। শুধু আশ্বাস দিয়েছি — নিরাপদে  ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব।

 

কিছু কথা:

যাদের কথা পেজ সিক্স বা পেজ সেভেনে জায়গা হয় বড়জোর স্ক্রোলে তাদের বাদ দিয়ে কি উন্নয়ন সম্ভব? সুন্দরবন উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের কথা শোনা যায়, সেই টাকা যায় কোথায়? এইসব হাভাতে মানুষের উন্নয়ন ব্যাতিরেক সুন্দরবনের কোন্ অগ্রগতিটা সম্ভব আমাদের জানা নেই!

 

আমাদের দাবি:

১) অবিলম্বে ১৭ জন মৎসজীবীকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

২) মৎসজীবীদের পরিবারের জন্য অবিলম্বে ২ লক্ষ টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩) মৎসজীবীদের সার্বিক উন্নয়নে (ঘরবাড়ি, জীবনবিমা-সহ) কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের উদ্যোগ নিতে হবে।

৪) সমুদ্রে যাওয়ার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সরকারকে করতে হবে।

 

শাহানারা খাতুন

আলতাফ আহমেদ

নারায়ণ সামন্ত

এপিডিআর

ডায়মন্ডহারবার শাখা

১৮/১২/২০২০

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Dr.Apurba Kanti Paik on December 21, 2020

    এই ভয়াবহ সমস্যার বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের এবং সরকারী শীর্ষ স্তুরে নেওয়া জরুরি

Leave a Comment