দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সরকারী প্রশিক্ষণকেন্দ্রের আঞ্চলিক শাখা বন্ধের সিদ্ধান্ত : প্রতিবাদে প্রতিবন্ধীরা


  • December 19, 2020
  • (0 Comments)
  • 488 Views

কোনও রকম আগাম নোটিস না দিয়ে, কোনও রকম আলোচনার মধ্যে না গিয়ে আচমকাই আগামী ২৪ ডিসেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও তেলেঙ্গানার সেকেন্দ্রাবাদে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বিজেপি শাসিত কেন্দ্র সরকারের চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতার আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকতে চলেছে এই সিদ্ধান্ত। সুদর্শনা চক্রবর্তীর রিপোর্ট।

 

 

কোনও রকম আগাম নোটিস না দিয়ে, কোনও রকম আলোচনার মধ্যে না গিয়ে আচমকাই আগামী ২৪ ডিসেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও তেলেঙ্গানার সেকেন্দ্রাবাদে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ এমপাওয়ারমেন্ট অফ পার্সনস উইথ ভিশ্যুয়াল ডিসএবিলিটিস (এনআইইপিভিডি) (পূর্বতন এনআইভিএইচ) বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বিজেপি শাসিত কেন্দ্র সরকারের চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতার আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকতে চলেছে এই সিদ্ধান্ত। শুধু ‘দিব্যাঙ্গ’ বলে দায়িত্ব সেরেই প্রতিবন্ধী অধিকারের বিষয়টিকে যাবতীয় আলোচনার বাইরে রেখে দিয়েছে এই সরকার প্রথম থেকেই। প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের দীর্ঘ বহু বছরের নিরন্তর লড়াইয়ের ফলস্বরূপ এ দেশে এখন রয়েছে প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকার আইন, ২০১৬। কিন্তু তারপরেও প্রতিবন্ধীদের মৌলিক ও প্রাথমিক অধিকারগুলিকে উপেক্ষা ও অবহেলা করার রাষ্ট্রের যে স্বভাব তা বদলায়নি। এখনও শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জীবিকা প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলছে এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র।

 

যেমন এখন এই ২২ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুর্নবাসনের বিষয়টির উপরে এক মারাত্মক আঘাত আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কলকাতার বনহুগলীতে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ৩৫০০ থেকে ৪০০০ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে পরিষেবা দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে রয়েছে একদম শিশু যারা প্রি-স্কুলে যায় থেকে মোটামুটি ৪৫ বছরের মধ্যের ব্যক্তিরা। পড়াশোনার পাশাপাশি নানারকম বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও জীবনযাপনের উপযোগী নানা প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় তাদের এখানে। এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে এই বিরাট সংখ্যক প্রতিবন্ধী মানুষ বাস্তবিকই অত্যন্ত অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়বেন।

 

ভারত সরকারের সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ণ দপ্তরের অধীন এই দু’টি আঞ্চলিক কেন্দ্রে প্রতি বছরই শিক্ষা ও পরবর্তীতে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য এক বিরাট সংখ্যক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ যোগ দেন। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এমনিতেই হাতে গোনা। অনেক ক্ষেত্রেই আর্থিক অসঙ্গতির জন্য বহু প্রতিবন্ধী মানুষ বা তাদের পরিবার এ ধরনের সহায়তামূলক পরিষেবা থেকে বঞ্চিতই রয়ে যান। কিন্তু সরকারী এই প্রতিষ্ঠান এনআইইপিভিডি-তে বিভিন্ন পরিষেবা দেওয়া ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের যে বিভিন্ন সহায়ক সরঞ্জামগুলি সেগুলি যেমন পাওয়া যায় বিনা খরচে, কোনও কোর্স আবার রয়েছে বিনামূল্যে, যেগুলিতে খরচ নেওয়া হয় সেগুলিও ১০ থেকে ২৫টাকার মধ্যে। কারণ মনে রাখা দরকার এখানে যারা আসেন তারা অধিকাংশই আর্থ-সামাজিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত, অন্তত ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জনই। সুতরাং এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, এনআইইপিভিডি বন্ধ হয়ে গেলে এই মানুষগুলি কার্যতই নিরূপায় হয়ে পড়বেন।

Mothers of children with disabilities protesting against closure of Regional Centre of NIEPVD at Kolkata

ইতিমধ্যেই এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধীতা করে বক্তব্য জারি করেছে প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় সংগঠন দ্য ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর রাইটস্‌ অফ ডিসএবেলড (এনপিআরডি)। তাদের তরফ থেকে বলা হয়েছে – এই ধরনের সংগঠনগুলি ও তাদের আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলি তৈরি হয়েছে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক ও বৈষম্যের শিকার বিভাগুলির মধ্যে একটি – প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমান সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দায়বদ্ধতা থেকে। এই আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলি এখন বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে বর্তমানে যে পড়ুয়ারা রয়েছে তাদের উপরে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হওয়াই নয়, ভবিষ্যতের পড়ুয়াদের জন্যও দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই শাখাগুলির মাধ্যমে বিনামূল্যে যে সহায়তা ও সহায়ক সরঞ্জামগুলি পাওয়া সরকারী প্রকল্পে তাও বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া এই আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কখনওই বিচ্ছিন্নভাবে দেখা ঠিক হবে না, নতুন শিক্ষানীতি ২০২০-এর সঙ্গে তা গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত, যাতে শিক্ষার বাণিজ্যিকরণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে আর এর মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র সহজেই তার দায়িত্ব এড়াচ্ছে। শিক্ষা পণ্য হয়ে উঠলে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষদের উপরেই। এই সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় যেসব শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিল ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বা ‘দিব্যাঙ্গ’-র মতো অনুগ্রহসূচক শব্দ তৈরি করেছিল, তার সঙ্গে সম্পূর্ণ বৈপরীত্যমূলক কাজ করে চলেছে তারা। এনপিআরডি-র তরফ থেকে সরকারের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে এই সিদ্ধান্ত রদ করার জন্য ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দু’টি বন্ধ না করার জন্য। এই অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল ও অমানবিক সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ ও তেলেঙ্গানায় এনপিআরডির স্বীকৃত সংগঠন প্রতিবাদ দেখাবে। আগামী ২২ডিসেম্বর কলকাতার বনহুগলীতে প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কেন্দ্রের সামনে রয়েছে এই প্রতিবাদ জমায়েত।

 

১৮ ডিসেম্বর কলকাতায় বিক্ষোভ দেখান দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের অভিভাবক ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা, তারা এই সিদ্ধান্ত রদের জন্য জোরদার আওয়াজ তোলেন। প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ হয়ে গেলে মহামারী পরিস্থিতি, আর্থিক সমস্যা জর্জরিত এই সময়ে প্রতিবন্ধী মানুষেরা আরও এক বিরাট বড় সমস্যার সম্মূখীন হবেন। জানা গেছে, কলকাতায় বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা এর প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসবেন, তারা, তাদের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সকল পরিষেবা প্রাপকই অত্যন্ত দিশাহীন হয়ে পড়েছেন। চিঠি পাঠানো হবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও। তাছাড়া রাজনৈতিক দলের রং না দেখে এই সামাজিক বিষয়টি যাতে সব রাজনৈতিক দলই একইরকম গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে, তারজন্য সব দলের কাছেও চিঠি পাঠানোর কথা ভাবা হচ্ছে। বিষয়টির বিরূদ্ধে একজোট হচ্ছেন প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিমানুষ। কলকাতার বিক্ষোভে অসহায় অভিভাবকেরা জানান, অন্য স্কুলে তদের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সন্তানেরা কত অসুবিধার মধ্যে পড়ে, এই স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে তাদের কাছ থেকে শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া। প্রি-স্কুল শিক্ষা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ সবেরই একটা প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এই সরকারী প্রতিষ্ঠানে। আচমকা বছর শেষে ও একটি জরুরি অবস্থাকালীন সময়ে এমন একটি সহায়তাকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া আবারও প্রমাণ করে দেশের ক্ষমতাসীন সরকার আদপেই প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার, পুর্নবাসন কিছু নিয়েই চিন্তিত নন, বরং চূড়ান্ত উদাসীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন।

 

Share this
Leave a Comment