আমরা কোথাও যাচ্ছি নাঃ সিংঘু সীমান্তে লম্বা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত চাষিরা


  • December 2, 2020
  • (0 Comments)
  • 310 Views

গ্রাউন্ডজিরো দিল্লিতে আন্দোলনরত পাঞ্জাবের কৃষকদের খবর নানাভাবে সংগ্রহ করে পাঠকদের সামনে তুলে ধরছে। আন্দোলনকারীদের কথা, কখনও তাঁদের সঙ্গে কথা বলে লিখছি আমরা, কখনও আন্দোলন সমর্থনকারী কোনও সাথী ঘটনাস্থল থেকে রিপোর্ট তৈরি করে, ছবি বা ভিডিও তুলে পাঠাচ্ছেন। এই প্রয়াসে সর্বভারতীয় নিউজ পোর্টাল ডাউন-টু-আর্থ (www.downtoearth.org.in) আমাদের পাশে রয়েছে। তাদের অনুমতি সাপেক্ষে কিছু প্রতিবেদন বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে প্রকাশ করছি আমরা। গত ২৯ নভেম্বর শগুন কপিল-এর এই প্রতিবেদন ডাউন-টু-আর্থ’এ প্রকাশ হওয়ার পর গ্রাউন্ডজিরো-র জন্য তা বাংলায় অনুবাদ করলেন সুস্মিতা সরকার। 

 

দিল্লির সিংঘু সীমান্তে এ এক অভূতপূর্ব অবস্থান বিক্ষোভ! পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে আসা লক্ষ লক্ষ চাষি সেখানে এখন ধর্নায় বসেছেন। এই বছর সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রে যে তিনটি কৃষি বিল পাশ হয়েছে সেগুলো রদ না হওয়া পর্যন্ত এই অভূতপূর্ব জমায়েত থেকে তাঁরা কেউ উঠবেন না বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। খাবারদাবার, বিছানাপত্র, জ্বালানি আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সহ সার সার ট্রাক্টর আর ট্রেলার দাঁড়িয়ে সেখানে।

 

টিকরী আর গাজিয়াবাদ ও দিল্লী সীমান্তেও অনেক কৃষক জমা হয়েছেন। এছাড়াও দলে দলে আরও অনেক কৃষক আসছেন জমায়েতে যোগ দিতে। দিল্লীর দিকে যাওয়াই ওঁদের উদ্দেশ্য।

 

কৃষকদের মতে রাজধানী দিল্লীর হাড় কাঁপানো প্রবল ঠাণ্ডা বা করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা – কোনও ভয়ই তাঁদের আন্দোলনকে কমজোরি করতে পারবে না।

 

“আমাদের ট্রাক্টর আর গাড়িই এখন আমাদের ঘরবাড়ি। কমপক্ষে ছয়মাসের খাবারদাবারের রসদ আছে আমাদের সঙ্গে। এছাড়া আর কিছু প্রয়োজন হলে আমাদের যেসব কৃষক ভাই গ্রামে আছেন তাঁরা সেসব পাঠিয়ে দেবেন বা নিজেরাই বয়ে এনে এখানে পৌঁছে দেবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না সরকার ঐ তিন কালা কানুন প্রত্যাহার করছে ততক্ষণ আমরা এখান থেকে নড়বো না,” কৃষক নিছাত্তর সিং-এর এটাই বক্তব্য।  দু’দিন হলো পাঞ্জাবের মোহালি থেকে এখানে এসে বিক্ষোভে যোগদান করেছেন তিনি। ‘তিন কালা কানুন’ বলতে তিনি পার্লামেন্টের বাদল মরসুমে পাস হওয়া তিন কৃষি বিলের কথা বলতে চেয়েছেন।

 

জমায়েতের সব ব্যবস্থা সেভাবেই করা হয়েছে যাতে কিছু চাষি কোনও কারণে ফিরে যেতে বাধ্য হলে তাঁদের জায়গায় যেন অন্যরা যোগ দিতে পারেন।

 

“আমাদের শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে খাবার কম পড়ে না কখনই। আমাদের লঙ্গরখানা তো খোলা আছেই। আর দরকার পড়লে সারাদিনে মাত্র একবার খেয়েও আমরা টিকে থাকতে পারি।” কুণ্ডলী সীমান্তে প্রতিবাদে বসা বিকেইউ (লাখোয়াল)-এর সাধারণ সম্পাদক গুরবিন্দর সিং কুমকলন জানালেন।

 

এর আগেও প্রতিবাদ, প্রতিরোধ হয়েছে বিভিন্ন কারণে, কিন্তু এবারে যে কারণে এত কৃষক যোগ দিয়েছেন, তা সেসব কারণের থেকে একেবারেই আলাদা। বিতর্কিত আইন তিনটি হলোঃ

 

১। কৃষক উৎপাদন ব্যবসা ও বানিজ্য (সহায়তা এবং সম্প্রসারণ) আইন – এই আইন কৃষি পন্য বিপনন সমিতি (APMCs) নিয়ন্ত্রিত ও বিভিন্ন রাজ্যের আইন দ্বারা গঠিত মান্ডি বা বাজারের বাইরে গিয়ে চাষিকে তাঁর কৃষিজাত উৎপাদন বিক্রি করার অনুমতি দেয়।

 

২। ফসলের দাম নির্ণায়ক কৃষক (ক্ষমতায়ন এবং সুরক্ষা) চুক্তি আইন

 

৩। কৃষি পরিষেবা আইন, যা চুক্তিভিত্তিক চাষকে উৎসাহিত করে

 

এছাড়াও আছে অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্য (সংশোধন) আইন ২০২০, যা দানাশস্য, ডাল, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্য তৈলবীজের মতন খাদ্য দ্রব্যের উৎপাদন, সরবরাহ বা বিতরণকে সরকারী নিয়ন্ত্রণের আওতার বাইরে নিয়ে যায়।

 

চাষিদের ভয় এই যে এর ফলে শস্যের ন্যূনতম সমর্থন মূল্যের সরকারী ব্যবস্থাপনার দিকটি অবহেলিত হবে এবং মান্ডির পাইকারি ক্রয় ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাঁদের আরও ভয় যে এর ফলে কর্পোরেট সংস্থাগুলি কৃষি বাজার দখল করবে।

 

“গত কয়েক বছরে পাঞ্জাবে আমাদের কৃষক ইউনিয়নগুলি বিছিন্ন হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু এই আইনগুলি আবার আমাদের একজোট করে তুলেছে,” কুমকলন বললেন।

 

২০২০ এর ২০ নভেম্বরে কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিবাদী কৃষকদের বুরারি ময়দানে সরে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। এছাড়াও ডিসেম্বরের ৩ তারিখে পাঞ্জাবের ৩২টি কৃষক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছে সরকার। নভেম্বরের ২৮ তারিখে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ অবশ্য জানিয়েছিলেন যে চাষিরা বুরারি ময়দানে সরে গেলে তার আগেও কথা হতে পারে প্রাথমিক ভাবে কেউ কেউ বুরারি ময়দানের জন্য যাত্রা শুরু করলেও অনেক কৃষকই সীমান্তে থেকে গিয়েছেন। তাঁরা রামলীলা ময়দান বা যন্তরমন্তরে প্রতিবাদ জানানোর অনুমতি চান। ইতিমধ্যে রামলীলা ময়দানে জমায়েতের অনুমতি চেয়ে মোর্চার তরফ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে। সিং-এর মতে, “বুরারি ময়দানে গিয়ে আসলে কোনও লাভ নেই। কেউ আমাদের কথা শুনবে না। বরং পুলিশ ঐ মাঠকেই কারাগারে পরিণত করবে।”

 

ডাউন টু আর্থ-এর সঙ্গে রবিবারে যেসব কৃষক কথা বলেছেন তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন যে অনুমতি পেলে তাঁরা রামলীলা ময়দানে সরে যেতে রাজি আছেন, কিন্তু, বাকিরা বলছেন যে তাঁরা সিংঘু সীমানা থেকে নড়তে রাজি নন। “ওরা আগে আমাদের আটকাল কেন? জল কামান বা লাঠিই বা চালাল কেন শুনি? ওরা যদি শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের ঢুকতে দিত, তাহলে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করতে কোনও অসুবিধে ছিল না আমাদের। আমাদের ভাইরা আহত। এখন একমাত্র সমাধান এই কালা কানুন রদ করা,” ভারতীয় কৃষক ইউনিয়নের (সিধুপুর) সদস্য পাঞ্জাবের মোহালির কৃষক জসওয়ান্ত সিং বললেন।

 

“আমাদের বেঁচে থাকাই যেখানে অসম্ভব হয়ে পড়ছে, সেখানে ভাইরাস নিয়ে দুশ্চিন্তা করে কী হবে!”

 

কোভিড ১৯ এর ব্যাপারে কী ভাবছেন? বেশিরভাগ চাষিই মাস্ক, যা কিনা কোভিড ১৯ প্রতিরোধে সবথেকে প্রয়োজনীয়, তা ব্যবহার করছেন না। তাঁদের মতে এই নতুন আইন মহামারীর থেকেও বড় বিপদ। “আমাদের বেঁচে থাকাই যেখানে অসম্ভব হয়ে পড়ছে, সেখানে ভাইরাস নিয়ে দুশ্চিন্তা করে কী হবে!” হরিয়ানার কাইথাল জেলা থেকে আসা সিমরণজিত সিং তার বক্তব্য জানালেন। এটাও জানাতে ভোলেননি যে তিনি কোনও ইউনিয়নের সদস্য নন। তিনি আরও বললেন, “এরকম আমাদের মতন অনেকেই আছেন। এই আইনগুলোর জন্য আমাদের বেঁচে থাকাই দুষ্কর হয়ে উঠবে। কোনও কৃষক ইউনিয়ন ডেকেছে বলে আমরা এখানে এসেছি তা নয়। বরং বলা চলে যে এটা এখন ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ পরিস্থিতি। কাল যদি ইউনিয়নের দালালরা সরকারের সঙ্গে কোনও রফায় চলেও আসে, তাহলেও আমাদের প্রতিবাদ থামবে না।”

 

রবিশস্য বপনের মাঝেই এই আন্দোলনের শুরু। বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী চাষিরা বলছেন যে প্রয়োজন মতন তাঁদের পরিবারের বাকি সদস্য ও প্রতিবেশিরাই তাঁদের জমিতে বীজবপন, কীটনাশক ছড়ানোর কাজ করবেন।

 

কৃষক সংগঠনগুলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার উদ্যোগে সাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তাঁরা চান সেই আলোচনা যেন নিঃশর্ত আলোচনা হয়।

 

সর্ব ভারতীয় কিসান সংঘর্ষ সমন্বয় সমিতির (AIKSCC) দেওয়া প্রতিবেদনঃ

 

সত্যিই কৃষকদের দাবি দাওয়া নিয়ে চিন্তিত হলে সরকারের উচিত হবে না কোনও শর্ত রাখা। (যেমন, বুরারি ময়দানে নিয়ম মেনে সরে গেলে পরের দিনই আমরা আলোচনা শুরু করতে পারি।) এটাও ধরে নিলে চলবে না যে আলোচনার নামে শুধুমাত্র কৃষকদের এই আইনগুলির সুবিধা বোঝানো হবে। কৃষকরা জানেন তাঁরা কী চান। তাই সরকারের উচিত হবে সেই দাবির ব্যাপারে কী সমাধান হতে পারে, সোজাসুজি সেই ব্যাপারে কথা বলা।

 

সমিতির অভিযোগ যে পুরো শহর জুড়ে উর্দিধারি পুলিশের উপস্থিতি ভয় আর সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করে রেখেছে। এখনও পর্যন্ত চাষিদের রাস্তা থেকে ব্যারিকেড সরানো হয় নি।

 

ইতিমধ্যে সিংঘু সীমান্তে কৃষকরা আরও বড় লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। “এখান থেকে একমাত্র তখনই সরবো যখন এই আইনগুলো প্রত্যাহার করা হবে আর স্বামিনাথনের রিপোর্টে যে প্রস্তাবগুলি দেওয়া হয়েছে সেগুলিকে বাস্তবায়িত করা হবে,” জানালেন হরিয়ানার সিরসা জেলার গুরনাম সিং।

 

ইংরেজিতে মূল প্রতিবেদনটি পড়তে পারবেন এই লিঙ্ক-এ ক্লিক করে –

https://www.downtoearth.org.in/news/agriculture/we-are-not-going-anywhere-farmers-at-singhu-border-ready-for-long-haul-74446

 

Share this
Leave a Comment