ইয়ে ইনকিলাব হ্যায়


  • December 1, 2020
  • (0 Comments)
  • 642 Views

শিঙা বেজে উঠেছে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত রুখে দাঁড়িয়েছে এই দেশের কৃষক সমাজ। লড়াই হারার নয়। লিখেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

 

দিল্লিতে আন্দোলনরত পাঞ্জাবের কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর ‘অপরাধে’ আটক করা হল এক ৮২ বছরের বৃদ্ধাকে, তিনি – ‘শাহিনবাগের দাদি’। গত সাত দিনে এই দেশ এক নতুন প্রতিরোধের সাক্ষী হতে শুরু করেছে। যেখানে গাড়ির উপর লাফিয়ে উঠে আন্দোলনরত তরুণ বন্ধ করে দিচ্ছে জলকামান। যেখানে প্রৌঢ় কৃষকের মেহনতি হাত উপড়ে ফেলছে পুলিশি ব্যারিকেড। যেখানে প্রতিবন্ধী কৃষকদের অংশগ্রহণের ছবি মনে করিয়ে দেয় প্রতিবন্ধীদেরও অধিকার। যেখানে নানা বয়সের মহিলা কৃষকদের গলার শ্লোগানে কেঁপে উঠছে আকাশ-বাতাস। যেখানে কোনও আটক, গ্রেফতার, মিথ্যে মামলা, শারীরিক আঘাত কোনও কিছুর পরোয়া নেই আন্দোলনকারীদের। তারা বর্ম পরা অস্ত্রধারী পুলিশের সামনে বিনা অস্ত্রে দাঁড়িয়ে, শান্ত গলায় চোখে চোখ রেখে বলতে পারেন – ‘ইয়ে ইনকিলাব হ্যায়’। হ্যাঁ, এটাই ইনকিলাব। স্বৈরাচারী, সরকার আর গোদি-মিডিয়া এই কৃষকদের কখনও বলছে ‘মাওবাদী’, কখনও ‘খালিস্তানি’, ‘ভক্ত’ সমর্থকেরা ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক বার্তা ছড়ানোর চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। অনেক অনেক দিন পর এই কৃষকদের হাতেই বেজে উঠছে দেশজোড়া আন্দোলনের দামামা। সারা দেশ জোট বাঁধছে। কৃষকদের আন্দোলন ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।

 

পাঞ্জাবের কৃষকদের কৃষিবিল প্রত্যাহারের দাবিতে মরণপণ আন্দোলন দেশের ফ্যাসিস্ত স্বৈরাচারী সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। জলকামান, কাঁদানে গ্যাস, পুলিশের নির্বিচার লাঠিচালনা কিছুই দমিয়ে রাখতে পারছে না নিডর কৃষকদের। রাস্তা খুঁড়ে রেখে, ব্যারিকেড বানিয়েও রোখা যায়নি নিজেদের হকের জন্য লড়ে যাওয়া এই কৃষকদের। সব বাধা উপেক্ষা করে তাঁরা রাজপথের দখল নিয়েছেন, কার্যত ঘিরে ফেলেছেন রাজধানী। তাঁদের লড়াইয়ের বার্তায় ভয় ধরেছে শাসকদের মনে। এই লড়াই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। এই আন্দোলন কৃষকদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার, এই আন্দোলন দেশকে কর্পোরেটদের কাছে বেচে দেওয়ার বিরুদ্ধে, এই আন্দোলন উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে, এই আন্দোলন সমস্ত অধিকারের আন্দোলনকে দেশদ্রোহীতার তকমা লাগিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে।

 

তাই ৫৬ ইঞ্চি যতই আন্দোলন-বিরোধী বার্তা প্রচারের চেষ্টা করুন আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক চেষ্টা চালিয়ে যাক প্রথমে কৃষকদের দিল্লি প্রবেশ যেনতেন প্রকারেণ আটকানোর আর তারপর নিজেদের স্থির করে দেওয়া জায়গায় তাদের অবস্থান চালানোর বা নানা শর্ত চাপিয়ে তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করার – প্রতি ক্ষেত্রেই তাদের পিছু হঠতেই হচ্ছে। পয়লা ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধি কৃষকদের সঙ্গে নিঃশর্ত ম্যারাথন আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। তাঁদের দাবি শোনেন, তবে আলোচনা শেষ হয়নি। আবারও ৩ ডিসেম্বর এই বৈঠক হবে। তিনি কৃষক প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন নতুন কৃষিবিলের প্রতিটি ধারায় কোথায় তাদের আপত্তি রয়েছে তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে। কৃষিবিল প্রত্যাহারের দাবি পূরণ হবে কি না তা সময় বলবে, তবে ফ্যাসিস্ত সরকার যে ভয় পাচ্ছে, মাথা নোয়াচ্ছে তা স্পষ্ট। আন্দোলনরত কৃষকেরা ‘গোদি মিডিয়া’ হিসাবে পরিচিত তিনটি নির্দিষ্ট টেলিভিশন খবরের চ্যানেলকেও বয়কট করেছে আন্দোলন সম্পর্কে মিথ্যে খবর প্রচার করায় ও সরকারের বশংবদ হওয়ায়।

 

ইতিমধ্যে এই আন্দোলন প্রতিদিনই বড় হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা দিল্লির সীমান্তে অনির্দিষ্টকালের চাক্কা জ্যাম শুরু করেছেন। দেশ জুড়ে আছড়ে পড়েছে সমর্থনের ঢেউ। প্রতিবাদের পাশে দাঁড়িয়ে সরকারি পদক ফেরাচ্ছেন পাঞ্জাবের বহু বিশিষ্টজন, বিশেষত ক্রীড়াবিদেরা। এই প্রাক্তন ক্রীড়াবিদদের তালিকায় একাধিক পদ্ম পুরস্কার জয়ী এবং একাধিক অর্জুন পুরস্কারজয়ীর নাম আছে – যেমন বাস্কেটবল তারকা সজ্জন সিং চিমা, অলিম্পিকে সোনাজয়ী হকি খেলোয়াড় এবং অর্জুন পুরস্কার প্রাপক গুরমেল সিং, প্রাক্তন হকি অধিনায়ক রাজবীর কউর, পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রাপ্ত কুস্তিগীর কর্তার সিং প্রমুখ। আগামী ৫ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি ভবনে নিজেদের মেডেল এবং পুরস্কারগুলি সমর্পণ করবেন পাঞ্জাবের মোট ১৫০ জন ক্রীড়াবিদ। প্রাক্তন সেনাকর্মী ও তাঁদের সহযোগীরা কৃষক আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর শপথ নিয়ে দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন। পাঞ্জাবের কৃষকদের সঙ্গে জোট বাঁধছেন সারা দেশের কৃষক সম্প্রদায়। দিল্লি পৌঁছতে না পারলেও নিজেদের রাজ্যেই আন্দোলনের সমর্থনে নিচ্ছেন নানা পদক্ষেপ। এমনকি নৈতিক সমর্থন জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রীও।

 

আমরা গ্রাউন্ডজিরো থেকে নানাভাবে কৃষকদের এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু থেকে তাঁদের কথা, সেখানে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাপরম্পরা তুলে ধরছি।

 

দু’দিন আগেই কথা হচ্ছিল গুরপাল সিং গুরি-র সঙ্গে, যিনি নিজে অমৃতসরের গুরু নানক দেব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। তাঁদের কৃষকদের ‘জাঠেবন্ধি’ বা কৃষকদের ইউনিয়নের নাম ভারতী কিষাণ ইউনিয়ন (উগরাহন), যার সভাপতি যোগিন্দর সিং উগরাহন। শুধুমাত্র তাঁদের ‘কাফিলা’ বা দলবদ্ধ মিছিলেই কৃষকের সংখ্যা লাখ খানিক, রয়েছেন শিশু থেকে বয়স্ক সব বয়সের মানুষ, তরুণের সংখ্যা বেশি। এই দলে মহিলাদের সংখ্যা ২৬ হাজারেরও বেশি। তাঁর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন তাঁদের ‘কাফিলা’ বাহাদুরগড়ে, তারপর তা এগিয়ে চলেছে। গুরপাল সিং জানালেন, তাঁরা দিল্লিকে স্তব্ধ করে দিতে পারেন, “কিন্তু আমরা কখনওই চাই না সাধারণ দিল্লিবাসীরা কোনও অসুবিধার মধ্যে পড়েন। আমরা ক্ষমতা রাখি চারদিক থেকে দিল্লিকে ঘিরে ফেলার, কিন্তু তাতে যাতে দিল্লির নাগরিকরা অসুবিধায় না পড়েন, সেদিকেও আমরা নিশ্চয় খেয়াল রাখব।”

 

জানতে চেয়েছিলাম, এই ছবি ভাইরাল হয়েছে যে আন্দোলনকারীদের লঙ্গরে খাবার খাওয়ানো হচ্ছে তাঁদের উপরেই জুলুম চালানো পুলিশদের। কিভাবে সম্ভব হয় এমন মানবিক আচরণ রাষ্ট্রের চরম অমানবিকতার সামনে দাঁড়িয়ে?

 

“লঙ্গরে সকলকে খাওয়ানোটা আমাদের রীতি। কেউ অভুক্ত ফিরে যান না এখান থেকে। ওরা পুলিশ কিন্তু মানুষ তো! ওদের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত কোনও বিবাদ নেই। আমাদের লড়াই সিস্টেমের বিরূদ্ধে। যখন ওরা আমাদের বাধা দিচ্ছেন, পথ আটকাচ্ছেন তখন তো আমরা রুখে দাঁড়াবই। তার সঙ্গে লঙ্গরে খাওয়ানোর কোনও বিবাদ নেই,” সাফ জবাব গুরপালের।

 

বলছিলেন কোনওরকম হিংসা চান না তাঁরা কেউই। নিজেদের দাবি, অধিকার আদায়ের জন্য সবটুকু শক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবেন। কৃষকেরা কেউ উত্তেজনা ছড়াচ্ছেন না। শান্তিপূর্ণভাবে পথের বাধা সরিয়ে এগিয়ে চলেছেন। যখন প্রয়োজন ‘কাফিলা’গুলি থামছে, চলছে রান্না, একটু বিশ্রাম, আবার শুরু হচ্ছে পথচলা। তাঁদের ইচ্ছা যন্তরমন্তরে অবস্থান করার। এই শীতের মরশুমে দিল্লির রাস্তায় দিনযাপন সহজ নয়, বিশেষত রাতে। কেমন করে সামলাচ্ছেন সকলে? গুরুপালের উত্তরে নিজেরই অস্বস্তি বাড়ল। “হ্যাঁ, আমরা রাস্তায় থাকছি। কিন্তু আমাদের সব রকম প্রস্তুতি আছে। রশদ আছে, কম্বল আছে। ট্রাকে শোওয়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছি। তাছাড়া এত মানুষের ভালবাসা। জানেন, কারা যেন এক ট্রাক নতুন কম্বল পাঠিয়ে দিয়েছেন! আশেপাশের সব্জি বাজারের বিক্রেতারা জানিয়েছেন আমাদের জন্য বিনামূল্যে সব্জি দেবেন। পাঞ্জাব থেকে যারা প্রথমে আসতে পারেননি, তারাও রওনা দিয়ে দিয়েছেন, আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন বলে। কেউ আনছেন খাবার, কেউ দুধ, কেউ টাকা পয়সা। এই লড়াই আমরা হারব না।”

 

শিঙা বেজে উঠেছে। অন্যায়ের, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত রুখে দাঁড়িয়েছে এই দেশের কৃষক সমাজ। এ লড়াই হারার নয়।

 

Share this
Leave a Comment