ওএনজিসি প্রকল্প : জমি অধিগ্রহণ, বিক্ষোভ, আশা ও আশঙ্কা


  • November 30, 2020
  • (0 Comments)
  • 1611 Views

এই রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে প্রচুর তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান মিলেছে। দেশের তেল-গ্যাসের মানচিত্রে নতুন ভান্ডার হিসেবে উঠে এসেছে অশোকনগরের নাম। এদিকে ২০১৭-২০১৮ থেকেই আন্দোলনে নামেন স্থানীয় কৃষকরা। তাঁদের ক্ষোভ, তাঁদের জমি থেকে উৎখাত করে সে জমি নিচ্ছে ওএনজিসি। গত ২৩ নভেম্বর বাইগাছি শ্রমলক্ষী কলোনীর কয়েকশ’ কৃষিজীবী মানুষের বিক্ষোভ প্রদর্শন ও রাস্তা অবরোধ ভাঙতে পুলিশকে ছুটে আসতে হয়। দেশভাগের পরে বহু জায়গাতেই জমির দখল সত্ত্ব পেলেও মালিকানা পাননি উদ্বাস্তু কৃষকরা। তারই সুযোগ নিয়ে আজও তাঁদের বংশানুক্রমে চাষ করা জমি অধিগ্রহণ করে নেয় সরকার ও কর্পোরেট, ন্যূনতম ক্ষতিপূরণটুকু দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। যদি বা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়, তা স্থানীয় ভোট রাজনীতির উর্ধে উঠে‌, বৃহত্তর আন্দোলনের সাথে জুড়ে যায় না, খবর হয়ে ওঠে না। এমনটাই ঘটছে অশোকনগরেও। লিখেছেন শৌভিক মুখার্জী

 

 

পশ্চিমবঙ্গ তথা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গোটা ভারতে এই মুহূর্তে আর কারুর অজানা নয় যে, এই রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে প্রচুর তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান মিলেছে। দেশের তেল-গ্যাসের মানচিত্রে নতুন ভান্ডার হিসেবে উঠে এসেছে অশোকনগরের নাম। আর সেই মতই তোড়জোড় বেঁধে কাজ শুরু করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ওএনজিসি। ২০০৯ সাল থেকেই অশোকনগর এলাকায় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান চালায় এই অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশন। ২০১৭-১৮ সালে তেল ও গ্যাসের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিত হবার পর সেই মতো জোর কদমে কাজ শুরু হয় বাইগাছি মৌজার ২২ নম্বর ওয়ার্ডে। তাহলে হঠাৎ এখন কেন এত আলোচনা?

 

আমরা জানি শুধু মাটির তলায় তেল পাওয়া গেলেই হয়না, সেই তেলের পরিমাণ, গুণগত মান, তোলার যাবতীয় খরচ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে তা বাণিজ্যিক ভাবে লাভজনক কিনা খতিয়ে দেখা হয়। চলতি মাসের শুরুর দিক থেকেই অশোকনগরের মাটির তলায় খুঁজে পাওয়া তেল হলদিয়ায় পরিশোধনাগারে পাঠায় ওএনজিসি। সেই তেল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একে বাণিজ্যিক ভাবে লাভজনক ঘোষণা করা হয়। ২২ নভেম্বর দেশের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এই প্রজেক্টকে ‘কমার্শিয়ালি ভায়াবল’ ঘোষণা করেন। এমসিসিআই-এর বার্ষিক সাধারণ সভায় তিনি নিজে এই কাজ দেখতে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বিভিন্ন সূত্র মাধ্যমে জানা যায়, এই ব্লক থেকে প্রতিদিন এক লক্ষ কিউবিক মিটার গ্যাস এবং সমপরিমাণ লিটার তেল পাওয়া সম্ভব। এখনো পর্যন্ত ৪ একর জমিতে দুটো কুয়ো খোঁড়া হয়েছে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানোর জন্য। আরো ১২-১৫ একর (আপাতত) রাজ্য সরকারের থেকে চেয়েছিল তারা। রাজ্য সরকার সেই মতো কাজও সম্পন্ন করেছে যাতে জমি নিয়ে কোনো জট না বাঁধে। পাশাপাশি দেশের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রীর আসার কথা শুনে তড়িঘড়ি হাবড়া-নৈহাটি রোড থেকে ওএনজিসি প্রকল্প পর্যন্ত প্রায় ১ কিমি নতুন রাস্তা নির্মাণ হয়েছে।

 

 

এদিকে ২০১৭-২০১৮ থেকেই আন্দোলনে নামেন স্থানীয় কৃষকরা। তাঁদের ক্ষোভ, তাঁদের জমি থেকে উৎখাত করে সে জমি নিচ্ছে ওএনজিসি। প্রথম নেওয়া ৪ একরের মধ্যে কৃষক জীবন সিকদারের ফলানো ১০ কাঠার সর্ষে ক্ষেত আছে। সদ্য ফোটা সর্ষে ফুলে মাটি ফেলে সে জমি এখন এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার। জোটেনি ন্যূনতম ক্ষতিপূরণের টাকাও। বছর দুই ধরে কৃষকরা রাজ্য প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে তাঁদের অভিযোগ জানান, বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন জেলার এডিএম-এর কাছে গেলে তাঁদের ‘পেটানো’র হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। পাশে পাননি কাউকেই। সেসময় স্থানীয় পৌরপ্ৰধান ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলেও বর্তমানে তিনিই জানান, এই জমি সরকারি খাস জমি, জমির মালিকানা কৃষকদের নয়। স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষিপ্ত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারেরা।

 

কিন্তু সত্যিই কি জমির মালিকানা কৃষকদের নয়? সে বিষয়ে ধারণা পেতে গেলে আমাদের যেতে হবে অশোকনগরের ইতিহাসে। স্বাধীনতা পরবর্তী তৎকালীন বিধান চন্দ্র রায়ের সময় বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুরা এইসব অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। রিফিউজি রিহ্যাবিলিটেশন দপ্তরের আনুকুল্যে উদ্বাস্তু মানুষদের বসবাস ও চাষের জন্য অনুমতি দখল সত্ত্ব দেওয়া হয়। বাইগাছি মৌজার অনেকে দখল সত্ত্বের সাথে জমির মালিকানা পেলেও যে অঞ্চলে এই প্রকল্প, তার অন্তর্ভুক্ত বেশিরভাগ জমির ‘মালিক’ অনুমতি দখলের কাগজ পাওয়া সত্ত্বেও সরকার তাঁদের মালিকানা দেয়নি। অথচ সেই জমির উপর দখল সত্ত্ব কারো কারো পঞ্চাশ ষাট এমনকি সত্তর বছরের কাছাকাছি। বছরের পর বছর তিন-চার ফসলি (পেঁয়াজ, ডাল, সর্ষে, ধান) জমিতে চাষ করে এসেছে তাঁদের পরিবার। স্বাভাবিক ভাবে জমিটুকুই একমাত্র সম্বল বিপুল মণ্ডল, জীবন সিকদার, নারায়ণ দাসেদের। ‘৯২ সালে বিপুল মন্ডল ২ বিঘা ৫ শতক জমি স্ট্যাম্প ডিউটি মিটিয়ে, রেজিস্ট্রি ফি দিয়ে কেনেন। দলিল ও অনুমতি দখলের সত্ত্ব থাকলেও জমি ওএনজিসির কাছে, মেলেনি ক্ষতিপূরণ। একই অবস্থা তপন দাস, জীবন সিকদার, হারান দাসের পরিবারের। তাই নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের একজনের চাকরির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন তারা।

 

 

যাঁদের বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা আছে, এমন সকল কৃষকেরা মিলে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গড়ে তুলেছেন কৃষক কল্যাণ সমিতি। এই লড়াইয়ে বর্তমানে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় প্রশাসক মণ্ডলীর সদস্য সমীর দত্ত। অন্যদিকে প্রাক্তন পৌরপ্রধান মুখ্য প্রশাসক প্রবোধ সরকার (একই দলে বিরোধী লবি হিসেবে পরিচিত) জানাচ্ছেন, তাঁদের দল এই আন্দোলনে যুক্ত নয়, কেউ থাকলে তা ব্যক্তিগত ভাবে। তিনি আরো বলেন, আজ নাকি হঠাৎ করে এঁদের মুখে ক্ষতিপূরণের কথা শোনা যাচ্ছে। এইসব মন্তব্যে ক্ষোভে ফুঁসছেন কৃষক পরিবার। কেউ কেউ বলছেন, ওএনজিসির টাকা পৌরসভার কাছে এলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছে এসে পৌঁছোয়নি। হাওয়া গরম থাকতে মাঠে নেমেছেন স্থানীয় সিপিআইএম নেতৃত্বও। আন্দোলনে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটাতে চাইছেন তাঁরা। তবে কৃষকেরা দাবিতে অনড়। একদিকে যেমন আইনি পথে লড়ছেন (নতুন ভূমি অধিগ্রহণ আইনে মালিকানা না থাকলেও তপশীল II, III অনুযায়ী অনুমতি দখল স্বত্ত্বে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা), তেমনি রাস্তায় নেমে সামিল হচ্ছেন বিক্ষোভেও। তাঁদের দাবি পরিষ্কার – তাঁরা ওএনজিসির বিরুদ্ধে নন, তবে আগে তাঁদের অধিকৃত জমি বাবদ উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও চাকরি দেওয়া হোক। গত ২৩ নভেম্বর শয়ে শয়ে আন্দোলনরত কৃষক পরিবারের মানুষ ওএনজিসি প্রকল্পের সামনে, হাবড়া নৈহাটি রোডে বিক্ষোভ দেখান, রাস্তা অবরোধ করেন। বিক্ষোভ তুলতে ছুটে আসতে হয় পুলিশ প্রশাসনকে।

 

 

সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম লালগড়-এর মত জমি আন্দোলন থেকে শাসকদল থেকে কর্পোরেট গোষ্ঠী সকলেই কিছু না কিছু শিক্ষা নিয়েছে, তা বোঝা যায়। তাই আর একবারেই জমি নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে না তারা। এক্ষেত্রেও প্রথমে ৪ এবং তারপর ১৫ একরের মত ধাপে ধাপে অধিকৃত জমির পরিমাণ বাড়ছে। সম্প্রতি একটি সংবাদপত্রে প্রায় ১০০ একরের মত জমি নেওয়ার ইচ্ছেপ্রকাশের কথা জানানো হয়েছে ওএনজিসি সূত্রে। এই অধিকৃত জমির পরিমাণ বাড়লে জমির প্রশ্নে আন্দোলন যে আরো তীব্র হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ এখনো পর্যন্ত কৃষকেরা শুধু ন্যায্য ক্ষতিপূরণটুকু চেয়েছেন, পরবর্তীতে জমির পরিমাণ বাড়লে এই লড়াই কোনদিকে বাঁক নেয় বা আদৌ নেয় কিনা, তা সময় বলবে। তবে একদিকে যেমন এলাকার প্রভূত উন্নয়নের সম্ভাবনায় ভাসছেন গুমা হাবড়া অশোকনগরের মানুষ, অন্যদিকে জমি খুইয়ে বা জমি খোয়ানোর ভয়ে ক্ষতিপূরণটুকু না পেয়ে আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন বঞ্চিত কৃষক পরিবারগুলি। ওএনজিসি তার নিজের লাভের কড়ি বুঝে নেবে – ব্যবসা করতেই তাদের আসা। সেইমত কষা হয়ে গিয়েছে ভবিষ্যতের ছক। তাই তাদের পিঠ চাপড়ানোর মানুষের অভাব নেই, বরং অভাব এই শত শত বঞ্চিত কৃষক পরিবারের পিঠে হাত রাখার, ভোটসর্বস্ব রাজনীতি থেকে বেরিয়ে তাদের সাথে ন্যায্য অধিকারের দাবিতে প্রকৃত লড়াইয়ে সামিল হবার। এই মুহূর্তে এটাই সময় পক্ষ নেবার।

 

লেখক অধিকার আন্দোলন কর্মী।

 

Share this
Leave a Comment