ফ্যাসিবাদী সরকার ও জনবিরোধী শ্রমিক-কৃষক নীতির বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ধর্মঘট


  • November 25, 2020
  • (1 Comments)
  • 387 Views

এই ধর্মঘট আজকের এই কোভিড মহামারী, লকডাউন, আনলকডাউন, নিউ নর্মাল, সামাজিক দূরত্ব – সব কিছু নিয়ে বিপর্যস্ত ভারতে এক অন্য গুরুত্ব বহন করছে। ফ্যাসিবাদ, হিন্দুত্ববাদ ও কর্পোরেট রাজের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হচ্ছে বিরোধী স্বর। মিলে যাচ্ছে প্রতিবাদের স্বরগুলি। লিখছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

 

২৬ নভেম্বর সাত দফা দাবি নিয়ে দেশব্যাপী এক দিনের সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে দশটি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের ফ্যাসিবাদী নীতি, শ্রমিক ও কৃষকদের স্বার্থবিরোধী আইন, কোভিড মহামারী ও তার ফলে দেশ জুড়ে যে জরুরি অবস্থাকালীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের অমানবিক অবস্থান, বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জীবিকা, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলার অবনতি, হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডা প্রচার করে চরম হিংসা ছড়ানো, নারীসুরক্ষার বেহাল দশা – এই সমস্ত ইস্যুর বিরূদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হয়েছে একাধিক ট্রেড ইউনিয়ন, স্বতন্ত্র জাতীয় ফেডারেশনগুলি, কৃষক সংগঠন, নারী সংগঠন, বিভিন্ন ক্ষেত্রের শ্রমিক/কর্মীদের স্বার্থে কাজ করা অরাজনৈতিক এবং স্বাধীন সংগঠনও। দেশের নানা প্রান্তে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি পর্বের পর এই ধর্মঘটকে সর্বাত্মক রূপ দেওয়ার জন্য শ্রমিক, কৃষক, অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীরা, শ্রমজীবী নারীরা, প্রতিবন্ধী মানুষেরা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা, মানবাধিকার কর্মীরা, রাজনৈতিক কর্মীরা সম্মিলিতভাবে এই ধর্মঘটকে সফল করার জন্য দেশ জুড়ে জোট বাঁধছেন। বিশেষত এই মহামারীকালীন সময়ে দেশের সরকারের এই জরুরি পরিস্থিতিতে উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বা প্রকল্পের পরিবর্তে যে জনবিরোধী নীতি ও অবস্থান, ধর্ম-জাতিসত্তা-বর্ণবাদের ভিত্তিতে উসকানিমূলক বৈষম্যের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ২৬ তারিখের এই ধর্মঘট এই মূহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করেছেন শ্রমিক নেতৃত্ব।

 

যে দাবিগুলিকে কেন্দ্র করে দানা বেঁধেছে ধর্মঘট –

 

  • স্থায়ী কাজ, ন্যায্য মজুরি ও ৮ ঘন্টা কাজ ও ধর্মঘটের অধিকার কেড়ে নেওয়া শ্রম কোড বাতিল করা
  • কর্পোরেট স্বার্থবাহী কৃষকবিরোধী কৃষি আইন বাতিল করা
  • রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও দেশের সম্পদ লাগামহীন বিক্রি বন্ধ করা
  • স্থায়ী কাজে অস্থায়ী নিযুক্তি, ঠিকা প্রথা, অবাধ ছাঁটাই বন্ধ করা
  • সমস্ত শিল্পে সঠিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও চালু করা
  • পরিযায়ী ও অসংগঠিত শ্রমিকদের যথাযথ সুরক্ষা ও মজুরি দেওয়া
  • নির্দিষ্ট আয়হীন, যারা আয়কর দিতে পারেন না সেই অসহায় পরিবারগুলিকে প্রতি মাসে ৭৫০০ টাকা করে অনুদান
  • প্রত্যেকের জন্য ১০ কেজি খাদ্যশস্য
  • এমএনআরইজিএ-তে ২০০ দিন কাজ ও ৬০০ টাকা মজুরি

 

এই মূল দাবিগুলির সঙ্গেই সার্বিকভাবে যে বিষয়গুলিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে –

 

  • বাস্তবিকভাবে বেকার যুবক-যুবতীদের কাজের সংস্থান
  • অতিমারীর অর্থনৈতিক বোঝা আমজনতার উপর না চাপানো
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মুনাফা লোটা বন্ধ করা
  • প্রতিবাদ ও সংগঠন করার অধিকারে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা
  • সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতি, ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন বন্ধ করা
  • সারা দেশে মহিলাদের উপর নৃশংস নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ করা

 

এই ধর্মঘটে যে ট্রেড ইউনিয়ন ও সংগঠনগুলি অংশগ্রহণ করছে, সমর্থন করছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য – অসংগঠিত ক্ষেত্র শ্রমিক সংগ্রামী মঞ্চ, সংগ্রামী শ্রমিক মঞ্চ, সংগ্রামী কৃষক মঞ্চ, পশ্চিমবঙ্গ সংগ্রামী শ্রমিক সমন্বয় মঞ্চ, শ্রমিক-কৃষক একতা মঞ্চ, জুটমিল মজদুর মোর্চা, হোসিয়ারি ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টার, অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (চেন্নাই), সিআইটিইউ, ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টার অফ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অফ ট্রেড ইউনিয়ন, অল ইন্ডিয়া ডেমোক্রেটিক উইমেন’স ইউনিয়ন, ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর দ্য রাইটস অফ দ্য ডিসএবেলড, জমিন প্রতিকার সংঘর্ষ কমিটি (পাঞ্জাব), কনট্র্যাক্টরস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন অফ বিএসএনএল (ক্যালকাটা টেলিফোনস), অল ওয়েস্ট বেঙ্গল সেলস রিপ্রেজেনটেটিভ ইউনিয়ন, চা বাগান সংগ্রাম সমিতি, সিঙ্কোনা সিটিজেনস্‌ রাইটস ফোরাম, বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্ট, নারী চেতনা, মাইগ্রান্ট সলিডারিটি নেটওয়ার্ক প্রমুখ।

 

দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটে শামিল হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারি কর্মচারী ইউনিয়নও। ধর্মঘট সফল করার আহ্বান জানিয়ে সাংবাদিক বিবৃতি জারি করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারি কর্মচারী ইউনিয়ন। সংগঠনের সম্পাদক বলেন, “সামগ্রিক ভাবে শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থ বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে ডাকা ধর্মঘটকে আমরা সমর্থন করছি। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারি ক্ষেত্রের সর্বস্তরের কর্মচারীদের এই ধর্মঘটকে সর্বতো ভাবে সফল করার আহ্বান জানাচ্ছি”।

 

সামগ্রিক দাবিদাওয়ার পাশাপাশি উঠে এসেছে কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দাবিও। তার মধ্যে কয়েকটি –

 

পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য

 

  • শ্রম কোড ও খসড়া নীতিতে সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের কোনও দায়িত্ব নেয়নি। অবিলম্বে সেই দায়িত্ব নিতে হবে।
  • ৮ ঘণ্টা কাজ, কাজের নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার অধিকার, বাসস্থানের অধিকার, নির্বাচনের অধিকার ও মহামারীতে জীবিকা হারানোর জন্য ক্ষতিপূরণ সুনিশ্চিত করতে হবে।

 

প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য

 

  • মহামারীর মেয়াদে প্রত্যেক প্রতিবন্ধীকে মাসিক ৫০০০/- টাকা প্রদান
  • বেসরকারি সংস্থায় প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণ
  • রেগা-র কাজে প্রতিবন্ধীদের যুক্ত করা ও বছরে ২০০ দিন কাজ
  • প্রতিবন্ধী অধিকার আইন ২০১৬ অনুযায়ী প্রতিবন্ধীদের পরিচর্যা ও বেকারত্বের জন্য নির্দিষ্ট ভাতা

 

জুটমিল শ্রমিকদের জন্য

 

  • সমকাজে সমবেতনের নীতি অনুযায়ী ঠিকা শ্রমিকদের মিলহ্যান্ডসের সমান মজুরি দিতে হবে
  • ভাউচারে নিযুক্ত শ্রমিকদের ইএসআই-পিএফ এবং অভিন্ন ন্যূনতম মজুরি দিতে হবে
  • ম্যানেজমেন্ট ও ঠিকাদারদের ইচ্ছা মতো কাজ থেকে বসিয়ে দেওয়া চলবে না
  • হাইকোর্ট-এর নির্দেশ অনুযায়ী ‘লকডাউন’-এর দিনগুলির মজুরি মেটাতে হবে
  • মাসিক ২৫,০০০ টাকা মজুরি দিতে হবে
  • শ্রমিক বিরোধী শ্রম আইন সংস্কার বাতিল করতে হবে

 

ব্যাঙ্ককর্মীদের জন্য

 

  • ব্যাঙ্কগুলির বেসরকারিকরণ বন্ধ করতে হবে
  • পাবলিক সেক্টর ব্যাঙ্কগুলিকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে
  • ঋণখেলাপিদের বিরূদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে
  • বিরাট অঙ্কের কর্পোরেট এনপিএ-গুলি উদ্ধার করতে হবে
  • ব্যাঙ্ক সঞ্চয়ে সুদের হার বাড়ানো
  • নিয়মিত ব্যাঙ্কের চাকরি আউটসোর্সিং বন্ধ করতে হবে
  • ব্যাঙ্কে যথেষ্ঠ পরিমাণে কর্মী নিয়োগ করতে হবে
  • ব্যাঙ্কের কর্মীদের জন্য নতুন পেনশন প্রকল্প বাতিল করতে হবে
  • সকল ব্যাঙ্ককর্মী, যার মধ্যে কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ককর্মীরাও রয়েছেন তাদের জন্য ডিএ সংযুক্ত পেনশন
  • কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক ও আরআরবি-গুলির পুনরুজ্জীবন ও সেগুলিকে শক্তিশালী করে তোলায় জোর দেওয়া

 

নিঃসন্দেহে এই ধর্মঘটে কৃষকদের দাবিদাওয়াগুলি আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। একদিকে আর্থিক ক্ষতির অপরিসীম ভার বহন করতে হচ্ছে তাদের, অবিরাম আসছে কৃষক আত্মহত্যার খবর, কৃষকদের পদযাত্রার ছবি এখনও ভোলেনি এ দেশ। অন্যদিকে তাদের পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন সরকার। উপরন্তু তাদের স্বার্থ উপেক্ষা করে পুঁজিপতিদের হাত শক্ত করতেই ব্যস্ত বিজেপি সরকার। কথা হচ্ছিল জমিন প্রতিকার সংঘর্ষ কমিটি (পাঞ্জান)-এর গুরমুখ মান-এর সঙ্গে। বললেন,

“যেখানেই ধর্মঘট হবে, আমরা শামিল হব। এ লড়াই মোদি-আরএসএস-এর ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরূদ্ধে। শ্রমিক বন্ধুদের অধিকার নতুন শ্রম আইনে বাতিল করা হয়েছে। আমাদের এগুলোর বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে। তাছাড়া কৃষকদের স্বার্থবিরোধী যে তিনটি কৃষি আইন এসেছে তা লাগু হলে সারা দেশে বিশেষত পাঞ্জাবে কৃষকেরা শেষ হয়ে যাবেন। তাই প্রতিবাদ ছাড়া পথ নেই। আমাদের এখানে বাবা বান্দা সিং বাহাদুর গত এক বছর ধরে কৃষিজমির লড়াই লড়ছেন। তার বর্ষপূর্তি উদযাপনের পাশাপাশি আমরা এবার আরও জোর দিচ্ছি জমির লড়াইয়ের উপরে। কোনওভাবেই যাতে কৃষক, দলিতরা কৃষিজমির অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। তাই এই ধর্মঘট আমাদের প্রতিরোধের ভাষা।”

 

এই ধর্মঘটের মূলবিন্দুতে রয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি চরম বৈষম্যমূলক আচরণ। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে তাদের মৃত্যসংবাদ উঠে এলেও সরকারি খাতায় সেই সংখ্যা শূন্য। কেন্দ্রীয় সরকার, সুপ্রিম কোর্ট কেউই তাদের দুরাবস্থা কাটাতে পাশে দাঁড়ায়নি। হাতে গোনা কয়েক’টি রাজ্য বাদে তাঁদের বিষয়ে উদাসীন রাজ্য সরকারগুলিও। এ রাজ্যেও পরিযায়ী শ্রমিক ও অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য সহায়ক দু’টি প্রকল্প চালু করলেও কতজন সেই সুবিধা পেলেন সেগুলির পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ভিন্‌রাজ্য থেকে নিজেদের রাজ্যে তাদের ফেরানো নিয়েও কেন্দ্র তো বটেই অধিকাংশ রাজ্যের মধ্যেই উদ্যোগের অভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। সিআইটিইউ-এর পক্ষ থেকে মৃণাল রায়চৌধুরি যেমন আশাবাদী এই ধর্মঘটে সর্বাত্মক প্রভাব পড়তে চলেছে। কারণ,

“করোনা মহামারীকালীন সময়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের ও তাদের পরিবারের বিরাট সংখ্যক মানুষের প্রতি সরকারের যে অমানবিক আচরণ, মহামারী রুখতে দেশের সকল নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা ব্যবস্থার বদলে পুঁজিপতিদের পকেটস্ফীতি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের খাদ্য সংস্থানের বদলে মুদ্রাস্ফীতি ও তার ফলস্বরূপ এই জরুরি অবস্থাকালীন সময়ে বহু মানুষের খাদ্যাভাব, এমতাবস্থাতেও ধর্মের জিগির তুলে দেশে হিংসা ছড়ানো সরকারের উপর নাগরিকের এক বড় অংশ আস্থা হারিয়েছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-ব্যাঙ্ক-রেল যাবতীয় পরিষেবার বেসরকারিকরণে সকলেই দিশেহারা। এখন তাই ধর্মঘটের প্রতিবাদের পথেই আস্থা রাখতে হবে। শ্রমিক, কৃষক, অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের দাবি-দাওয়া অধিকার তুলে ধরতে হবে। গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ। বিরোধীশূণ্য সংসদ বা বিধানসভা গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকারক।”

 

সরকার বা বিরোধী পক্ষ সকলেরই যে কোনও আলোচনায় প্রতিবন্ধী মানুষেরা সব সময়েই থাকেন শেষের দিকে, কখনও থাকেন না। ‘চ্যারিটি’ মনোভাব থেকে রাষ্ট্র কখনওই বেরোতে পারে না। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য – বিশেষত এখন এই মহামারীকালীন সময়েও তাদের প্রতি সরকারের উদাসীনতা লজ্জাজনক। অথচ আমাদের দেশে এখন প্রতিবন্ধী অধিকার আইন ২০১৬ রয়েছে এবং প্রতিবন্ধী মানুষদের যাবতীয় অধিকারই দেশের যেকোনও নাগরিকের মতোই মৌলিক অধিকার। ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর দ্য রাইটস অফ দ্য ডিসএবেলড-এর যুগ্ম সম্পাদক শম্পা সেনগুপ্ত যেমন বলছিলেন,

“এবারের ধর্মঘটে বেসরকারিকরণের বিরূদ্ধে প্রতিবাদ একটা বড় ইস্যু। বেসরকারিকরণ মানেই প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য সংরক্ষণ উঠে যাওয়া। আর প্রতিবন্ধী মানুষদের একটা বড় অংশ এই সংরক্ষিত পদেই চাকরি পান, না হলে তাদের জন্য চাকরি নেই। এক বিরাট সংখ্যক প্রতিবন্ধী মানুষদের জীবিকা হকারি। এখন ট্রেন চালু হলেও ট্রেনে হকার উঠতে দিচ্ছে না। অতিমারী, লকডাউন এই সময়ে প্রতিবন্ধী মানুষদের চাকরি চলে যাওয়া ভয়ঙ্কর। তাছাড়া এই সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও যখন তাদের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের তালিকায় রাখছে, সরকার তা মেনে নিয়ে গাইডলাইনে কয়েক লাইন লিখল, কিন্তু সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যে প্রতিবন্ধী ভাতা তা দিল না। সুতরাং এই ভাতা-র দাবিটা তো খুবই বড়। তাছাড়া রয়েছে শিক্ষানীতি। যার আমরা সর্বতোভাবে বিরোধিতা করছি। সেখানে উচ্চশিক্ষায় প্রতিবন্ধীদের কোনও উল্লেখ নেই। সংরক্ষণের কথা নেই। স্পেশাল এডুকেশন অনেক কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এই যে অনলাইন শিক্ষাপদ্ধতি তা একেবারেই প্রতিবন্ধী পড়ুয়াদের উপযুক্ত নয়। এর ফলে একটা বিশাল সংখ্যক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় বাধা পড়ছে ও পড়বে।”

 

সরকারের শ্রমিকবিরোধী নীতির পাশাপাশি রয়েছে সরকারি মদতপুষ্ট মালিক কর্তৃপক্ষের স্বৈরাচারী আচরণ। অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, ঠিকা শ্রমিকেরা এর ভুক্তভোগী। এই প্রসঙ্গেই উল্লেখ করা যায় বিএসএনএল  (ক্যালকাটা টেলিফোনস)-এর মালিক পক্ষের কথা। গত ১৫ মাস ধরে এখানকার ঠিকা শ্রমিকদের বেতন বন্ধ, ইতিমধ্যেই আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন ঠিকা শ্রমিক। মহামারী, লকডাউন কোনও কিছুই শ্রমিকদের পরিস্থিতি বিবেচনা করাতে পারেনি। তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের দু’টি যৌথ মঞ্চ। একটি – রাজ্যের শাসকদলের অনুগামী, তার সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগে জানা গেল তারা এই ধর্মঘটে শামিল হচ্ছেন না। আরেকটি স্বাধীন ইউনিয়ন – কন্ট্র্যাক্টরর্স ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন অফ বিএসএনএল (ক্যালকাটা টেলিফোনস), যার সদস্য সংখ্যা এই মুহূর্তে ২০০০-এরও বেশি – তারা এই ধর্মঘটে যোগদান করছেন। এই মঞ্চের পক্ষ থেকে অমিতাভ ভট্টাচার্য বিশদে জানালেন এই ইউনিয়ন কীভাবে ঠিকা শ্রমিকদের কাজ ও বেতনের অধিকারের দাবি নিয়ে এক দীর্ঘ লড়াই শুরু করেছেন, আইনি পথে মালিক কর্তৃপক্ষকে অন্যায়ভাবে বকেয়া রাখা বেতন মেটাতে বাধ্য করছেন এবং এসএলএ প্রথার সন্পূর্ণ বিরোধীতা করে এই ঠিকা শ্রমিকদের স্থায়ীকরণের জন্য লড়ছেন। তাঁর বক্তব্য,

“আমরা এই ধর্মঘটে শামিল হচ্ছি। কিন্তু আমরা মনে করি বেসরকারিকরণের বিরূদ্ধে লড়াই এক দিনের ধর্মঘটে সীমাবদ্ধ থাকার নয়। আমরা মনে করছি ভবিষ্যতে আমাদের লড়াইটা বড় জায়গায় যাবে। তাই সর্বভারতীয় স্তরে শ্রমিকদের এই যে প্রতিবাদ তাতে নির্দিষ্টভাবে শ্রমকোড, বেসরকারিকরণ ও ঠিকাপ্রথার বিরুদ্ধে আমরা বিএসএনএল ঠিকা শ্রমিকেরা শামিল হচ্ছি। পোস্টারিং, প্রচার অভিযান চলেছে শ্রমিকদের ধর্মঘটের দিন কাজে যোগদান না করতে বলার জন্য। আমাদের ইউনিয়ন দলমত নির্বিশেষে শ্রমিকেরা গড়ে তুলেছেন কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরোধীতা করার জন্য। তাই ধর্মঘটে যোগ দিচ্ছি।”

 

এই মুহূর্তে এ দেশে শ্রমজীবী নারীদের সংখ্যা বিরাট। দেশের অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ লিঙ্গবৈষম্যের কারণে তাদের স্থান সেই বরাবরের মতো শেষেই। এই চূড়ান্ত অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সময়ে দেশের শ্রমজীবী মহিলা, অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মহিলা – তাদের দাবি ও লড়াই উঠে আসছে শুরুতেই।

“ঋণমুক্তি নিয়ে এ রাজ্যে লকডাউনের শুরু থেকেই মহিলাদের নেতৃত্বে একটা শক্তিশালী লড়াই দানা বেঁধেছে। হুগলি, বর্ধমানে তা চোখে পড়ার মতো। হুগলিতে এই মহিলারা একটা বড় ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। মিড-ডে মিল, আশা কর্মীদের মতো প্রকল্প কর্মীদের জোরদার ধর্মঘট চোখে পড়বে উত্তর ২৪ পরগনা, বর্ধমানে। কৃষি আইনের বিরুদ্ধে ধর্মঘট বলে গ্রামীণ বনধ তো বড় করে হবেই। শহরে ধর্মঘটের নানা স্তর থাকবে। যেমন গৃহ শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়াটাই সমস্যার মুখে রয়েছে। কাজে ফিরতে না পারা, কাজ চলে যাওয়া, অত্যন্ত কম বেতনে কাজ করা – এই সমস্যাগুলির মধ্যে থেকে তারা কতটা বনধে শামিল হতে পারবেন, অন্তত এ রাজ্যে বোঝা যাচ্ছে না। তবে চাকরি না থাকা বা বিনা নোটিসে ছাঁটাই, ন্যূনতম মজুরি না পাওয়ার সমস্যায় শ্রমজীবী নারীরাও ভুক্তভোগী। যে সুপারিশে শ্রমকোড তৈরি হল, সেই সুপারিশেই মহিলাদের শ্রমিকের স্বীকৃতি দেওয়ার উল্লেখও ছিল। অথচ তা হল না। আশাকর্মীরা কত প্রতিকূলতার মধ্যেও কোভিডকালীন সময়ে ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার হিসাবে কাজ করেও বঞ্চিতই রয়ে গেলেন, মিড ডে মিলের কর্মীদের বলা হল বাড়ির রান্নার মতোই কাজ, ফলে যেটুকু টাকা পাচ্ছেন তা শ্রমের মজুরি নয়, নেহাতই সাম্মানিক ভাতা। এই সব বৈষম্যের বিরুদ্ধেই ধর্মঘট। এখন গ্রামে ক্ষেতমজুর মানেই মহিলা, পুরুষেরা যেহেতু অতিরিক্ত আয়ের জন্য অন্য রাজ্যে যাচ্ছেন। এই সুযোগে বেড়েছে ক্ষুদ্রঋণের প্রতিপত্তি। এই লকডাউনের সময়ে ঋণ নেওয়া মহিলারা বলেছিলেন সুদটুকু মকুব করতে, যা করতে পারেনি সরকার। তাদের উপর টাকা আদায়ের জন্য অত্যাচার বেড়েছে, উল্টোদিকে আন্দোলনও শক্তিশালী হয়েছে,” জানালেন অল ইন্ডিয়া ডেমোক্র্যাটিক উইমেন’স ইউনিয়নের তরফে চন্দ্রাস্মিতা চৌধুরী।

 

বিজেপি সরকারের আমলে দেশের অর্থনীতির কঙ্কালসার চেহারা ক্রমেই প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আর লকডাউনে যতই আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলার জন্য প্যাকেজ ঘোষণা করুক না কেন দেশের অর্থমন্ত্রক অর্থনীতি যে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে তা আর লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। অর্থমন্ত্রীর কাছে সমাধান নেই, দেশের যাবতীয় সম্পদ পুঁজিপতিদের কাছে বিক্রি করে দেওয়াতেই স্বস্তি ও সমাধান খুঁজছে সরকার। আর অর্থনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ব্যাঙ্ক পরিষেবা। এই ধর্মঘটে যোগ দিয়েছে অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (চেন্নাই)। কারণ তারা মনে করেছে প্রতিটি ক্ষেত্রই আসলে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত, বিশেষত ব্যাঙ্কিং পরিষেবার সঙ্গে। কৃষক ও শ্রমিকদের দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করেই মূলত যে ধর্মঘট তাতে শামিল তারা, দেশের অর্থনীতি ও ব্যাঙ্কিং পরিষেবার স্বার্থে। দূরভাষে এই ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সি এইচ ভেঙ্কটাচালম জানালেন,

“ধর্মঘটের সাতটি দাবিকেই আমরা সমর্থন করছি। এই করোনার সময়ে দেশের মানুষের সুস্থতা, জীবন নিয়ে না ভেবে সরকার নিজেদের স্বার্থ গোছাতেই ব্যস্ত। এখন শুধু উৎপাদনে নজর দিলেই চলবে না, টাকা থাকতে হবে সকলের হাতে, যাতে প্রত্যেকে উপভোক্তা হতে পারেন, তাহলে বিক্রিবাটা হবে, চাহিদা বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে, জিডিপি বাড়বে। তার বদলে একশ্রেণীর মানুষের হাতেই টাকা জমছে, আরেক দল ক্রমশ গরীব হচ্ছে। কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। যাতে রোজগার বাড়ে। তবেই মানুষ জিনিস কিনবে, অর্থনীতি সচল হবে। গণবণ্টন ব্যবস্থা কার্যকরী করতে হবে। বিনামূল্যে রেশন না দিলে এই জরুরি অবস্থায়, উপার্জনহীন নাগরিকদের খাওয়ানোর যে দায়িত্ব সরকারের উপর বর্তায় তা তারা পালন করবেন না। এটা শুধু কৃষক, শ্রমিকদের দাবি নয়, আমাদের প্রত্যেকের দাবি, কারণ আমরা সকলেই এবং অথনীতিও এদের উপরে নির্ভরশীল। সরকার সব কিছুকেই বেসরকারিকরণ করছে, যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে, নাহলে অর্থনীতি আরও বেহাল হবে। তাই এই লড়াই আমাদের সকলেরই।”

 

এই ধর্মঘট আজকের এই কোভিড মহামারী, লকডাউন, আনলকডাউন, নিউ নর্মাল, সামাজিক দূরত্ব – সব কিছু নিয়ে বিপর্যস্ত ভারতে এক অন্য গুরুত্ব বহন করছে। ফ্যাসিবাদ, হিন্দুত্ববাদ ও কর্পোরেট রাজের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হচ্ছে বিরোধী স্বর। মিলে যাচ্ছে প্রতিবাদের স্বরগুলি। রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সংগঠন সকলেই মিলিতভাবে শামিল হচ্ছেন এই কৃষক-শ্রমিক বিরোধী সরকারী নীতির আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে। সেখানে রাজ্য সরকারগুলির ভূমিকা বা ধর্মঘটে তাদের অবস্থানও তাই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মঘট সমর্থন করলে তা বার্তা দেবে ফ্যাসিবাদ বিরোধীতার, আর যদি তা ব্যর্থ করতে ব্যস্ত হয় রাজ্য প্রশাসন তবে তা পরোক্ষে কেন্দ্র সরকারকে সমর্থনের বার্তাই দেবে। ইস্যুগুলি সমর্থন করে বনধের বিপক্ষে দাঁড়ানোর অবকাশ থাকছে না। অধ্যাপিকা ঈশিতা মুখোপাধ্যায় জানালেন,

 

“এই ধর্মঘটে রিটেল কর্মীরা, সুইগি, জোম্যাটো, ওলা, উবের-এর মতো অ্যাপ নির্ভর পরিষেবার কর্মীরা, যারা অত্যন্ত কম মাইনেতে কাজ করেন, তারা শামিল হয়ে তা সর্বাত্মক করার ডাক দিয়েছেন। এরা একদিন কাজ বন্ধ করলেই ভারত থমকে পড়বে। স্কুল, কলেজের অনিয়মিত কর্মীরা, ক্যাজুয়াল, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকেরা, যারা সংগঠিত ক্ষেত্র নয়, সাধারণত ধর্মঘটে থাকেন না কোনওবার, এবার তারাও যোগ দিয়েছেন। গোটা লকডাউনে যারা ছাঁটাই হয়েছেন, যুক্ত হয়েছেন তারাও। ট্রেড ইউনিয়ন বা কৃষক সংগঠনের বাইরে থাকা বহু ক্ষেত্র নিজেরা একত্রিত হয়ে ধর্মঘটে শামিল হচ্ছে। মহিলারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিচ্ছেন, যেহেতু তারা নানাভাবে সনস্যায় পড়ছেন, ক্রমশ বাড়তে থাকা জিনিসপত্রের দাম, সব ভর্তুকি বন্ধ হয়ে যাওয়া, একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে ডুবে রয়েছেন তারা। রয়েছেন অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিরাট সংখ্যক শ্রমজীবী মহিলারা। বহু কাজ এখন শ্রমকোডের বাইরে। যারা সমকাজে সমবেতনের দাবি আদায় করল, সেই বিড়ি শ্রমিকেরা কোনও কোডের মধ্যে নেই এখন। সব শ্রেণির মহিলা সংগঠনগুলির সর্বাত্মক সাড়া পড়েছে। নতুন শিক্ষানীতিতে অঙ্গনওয়াড়ি, মিড ডে মিল কর্মীদের কাজ কঠিনতম করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের পরিষেবা বঞ্চিত হলে অসংখ্য পড়ুয়ার পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। নেই সংরক্ষণের কথাও। এই নীতি সরকার ছাড়া কেউ চালু করার কথা বলেননি। ফলে এখনই তো সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময়।”

 

Share this
Recent Comments
1
Leave a Comment