ভারতের অধিকাংশ পার্টির ফ্যাসিবাদের চেতনা নেই : দীপঙ্কর ভট্টাচার্য


  • November 25, 2020
  • (2 Comments)
  • 1347 Views

১৮ নভেম্বর কলকাতায় আমরা সিপিআই (এমএল) লিবারেশন দলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের মুখোমুখি হই। আমাদের সবিশেষ উৎসাহ ছিল এই দেশের উপর নেমে আসা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপদকে তিনি ও তাঁর দল কী চোখে দেখছেন এবং এই বিপদ মোকাবিলায় তাঁদের ভূমিকা কী হবে – তা বোঝার চেষ্টা করা। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাম জোট-রাজনীতির সম্ভাবনা, এবং তাঁর দলের সম্ভাব্য নির্বাচনী রণকৌশল বিষয়েও আমাদের আগ্রহ ছিল। আমাদের দীর্ঘ প্রশ্নাবলী তিনি সাক্ষাৎকারের প্রাক্কালে চোখ বুলিয়ে নিয়েছিলেন। টানা কর্মসূচির চাপে প্রত্যেক প্রশ্নের পৃথক পৃথক উত্তরের সময় ছিল না। কিন্তু, আমাদের মূল জিজ্ঞাস্যগুলো প্রধানত দু’টি প্রধান ভাগে ভাগ করে টানা আধঘণ্টা আলোচনা করেছেন। প্রথম ভাগে ছিল জাতীয় রাজনীতি, ফ্যাসিবাদের বিপদ এবং ফ্যাসিবাদে-বিরোধী জোটের প্রয়োজনীয়তা এবং সমস্যা। দ্বিতীয় ভাগে ওই আলোচনার প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ, আসন্ন নির্বাচন এবং জোট রাজনীতি, সিপিএম, রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল সম্পর্কে মূল্যায়ন। আজ প্রথম কিস্তি ‘জাতীয় রাজনীতি’। সম্পাদকমণ্ডলী গ্রাউন্ডজিরো

 

 

জাতীয় রাজনীতি

 

প্রথম কথা হচ্ছে যে, ভারতবর্ষে ২০১৪-র পর থেকে ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিবাদের বিপদ নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। এখনও বেশ কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা ফ্যাসিবাদের বিপদটাকে সেভাবে বুঝে উঠতে পারছেন না। ফলে, এটা নিয়ে একটা স্ট্র‍্যাটেজিক বিতর্ক, অর্থাৎ যে, ভারতবর্ষে যেটা আসছে সেটাকে ফ্যাসিবাদ বলব না কি অন্য কিছু বলব ইত্যাদি ইত্যাদি নানা বহু প্রশ্ন আছে। কিন্তু, সব মিলিয়ে সে বিতর্কে না গেলেও যা কিছু হচ্ছে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এটা চলতে থাকলে গণতন্ত্রের কোনও জায়গা থাকবে না, আইনের শাসন যেটা আমরা বলি – একটা সভ্য সমাজের যা ন্যূনতম মাপকাঠি এ জিনিসটা থাকবে না। সেটা না থাকলে পরে, খেটে-খাওয়া মানুষদের যে বিভিন্ন দাবিদাওয়ার আন্দোলনগুলোর আর কোনও সুযোগ থাকবে না। আমার মনে হয়, এই বিপদগুলোর ব্যাপারটা মানুষ বুঝতে পারছে।

 

দ্বিতীয় যে জিনিসটা বুঝতে পারছে, যে আর্থিক নীতিগুলো মনমোহন সিংহের আমল থেকে শুরু হল, যেটাকে আমরা এককথায় কর্পোরেটমুখী নীতি বলি, সেই নীতিগুলোকে বিজেপি চরমে পৌঁছে দিয়েছে। এমন একটি জায়গা – আমরা ছোটবেলায় ‘টাটা-বিড়লার কোলে ইন্দিরা গান্ধী দোলে’ ইত্যাদি শুনতাম – করতে করতে এখন আর কোলে দুলতে হয় না। পকেটেই পুরে রেখে দিয়েছে। এখন আদানি-আম্বানি পকেটে পুরে রেখে দিয়েছে এই সরকারটাকে এবং এই করোনা-কালেও যেটা দেখা গেল – কৃষি একটুখানি বাইরে ছিল (শিল্পের মতো ঋণাত্মক হয়নি), যেখানে কৃষকরা সামান্য একটু অটোনমি ভোগ করতেন – সেইটাকেও কর্পোরেটের পুরোপুরি কুক্ষিগত করে ফেলার। নতুন শিক্ষানীতি এল। সেটার মধ্য দিয়ে এডুকেশনটাকে একটা ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে কমপ্লিট প্রফিট মেকিং সেক্টর করা হল। তার ফলে এডুকেশন, হেলথ থেকে শুরু করে পরিবেশ – যেখানে ইআইএ বা এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, যে ব্যাপারটা ছিল সেগুলোকে তুলে দিয়ে, সবদিক দিয়ে কমপ্লিট কর্পোরেট টেকওভার অফ ইন্ডিয়ান ইকোনমি বা যেটুকু যা ইন্সটিটিউশানগুলো আছে— এটা আমার মনে হয় মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে।

 

তৃতীয় যে জিনিসটা বোঝা যাচ্ছে, সেটা হচ্ছে যে, যদি সামাজিক ভাবে দেখি, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে – ধরুন জাতপাত বিষয়টা নিয়ে বলি – উত্তরপ্রদেশকে যদি নেওয়া যায় উদাহরণ হিসেবে, সেখানে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী এবং এত বর্বর দলিত বিরোধী, মহিলা বিরোধী হিংসা — সেটা আমরা দীর্ঘদিন কখনও দেখিনি। ফলে আপনি সাধারণ ভাবে দেখবেন যে, দলিত আন্দোলনের মধ্যে এই প্রশ্নটা ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে যে — আসলে তো আরএসএস — যখন ভারতীয় সংবিধান গৃহীত হচ্ছিল সেই সময় তারা তেরঙা ঝান্ডাটিকেও চায়নি, তারা মনে করেছিল গেরুয়া পতাকা হওয়া দরকার, তারা সংবিধানটাকেও চায়নি। তারা মনে করেছিল ‘মনুস্মৃতি’ যথেষ্ট ভারতবর্ষের জন্য।

 

ফলে, তাদের যে ধারণা ভারত সম্পর্কে, যে ভারতটা তারা চায় এবং যেটা আম্বেদকর বুঝে খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ভারতবর্ষে যদি হিন্দুরাজ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে এর চেয়ে বড় বিপর্যয় এ দেশের জন্য আর কিছু হতে পারে না। এ কথাটা আম্বেদকর সেই ১৯৪৯ সালে সংবিধান গ্রহণ করার সময় বলে গেছেন। এখন আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে আম্বেদকরের বহু কথা মার্কসবাদীরা হয়তো পড়েইনি বা পড়লেও বোঝেননি — কিন্তু, আম্বেদকরবাদীরাও অনেক কথা, আম্বেদকরের কথা ভুলে বসে গেছেন। এটা খুব চোখে পড়ার মতো আজকে, যে সময় সংবিধান গৃহীত হচ্ছে, সেই সময় সংবিধানের মূল রূপকার তিনটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে গিয়েছেন। সেই তিনটে কথার একটি কথা হচ্ছে, সংবিধান আমাদের যেটা দিল সেটা হচ্ছে, ইলেক্টোরাল ইক্যুয়ালিটি – অর্থাৎ, সকলের জন্য – প্রত্যেকের একটা করে ভোট। কিন্তু, সমাজটা যেখানে সম্পূর্ণ আনইক্যুয়াল, অর্থনীতি সম্পূর্ণ আনইক্যুয়াল – ফলে, সামাজিক ও আর্থিক যে বৈষম্য এটা যদি ক্রমেই বাড়তে থাকে, তাহলে এই ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য এটা তথাকথিত ভোটের যে সমতা, সেই সমতাটাকে অর্থহীন করে তোলে। যেটা আমরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

 

দ্বিতীয় হচ্ছে৷ তিনি বলেছেন, সংবিধানটা হচ্ছে ভারতে একটা টপ ড্রেসিং। মানে, মাটিটা যেটা, সেটা গণতান্ত্রিক নয়, সেই মাটির উপর একটা গণতান্ত্রিক প্রলেপ, একটা আধুনিক প্রলেপ সংবিধানের মধ্য দিয়ে আমরা দিলাম। অর্থাৎ, তিনি যেটা ইঙ্গিত করলেন, ইশারা করলেন – সেটা হচ্ছে, এই মাটিটাকে যদি নিয়মিত ভাবে গণতান্ত্রিকীকরণ না করা হয়— তাহলে কিন্তু এক সময় মাটির মধ্যে — সোশ্যাল সয়েল-এ — জমে উঠতে থাকা গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি এবং তার দাপট, তার প্রবণতা – তার কাছে কিন্তু এই সংবিধানটা ছেঁড়া কাগজে পরিণত হতে বাধ্য।

 

তৃতীয় কথাটা, তিনি খোলাখুলি বলেছিলেন, যদি হিন্দুরাজ হয় তাহলে তার চেয়ে বড় বিপর্যয় হবে না। এবং সেটা ভারতবর্ষের দলিত, নিপীড়িত মানুষ তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে এবং শত শত বছর ধরে দেখেছে। এটাই তাঁদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা যে সেই হিন্দুধর্ম, তথাকথিত হিন্দুধর্ম, তার যে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র, যে তন্ত্রের মধ্যে দলিতকে বা সাধারণ পিছিয়ে পড়া তথাকথিত অনুন্নত মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করা হয় না।

 

এই যে তিনটে অত্যন্ত মারাত্মক কথা ১৯৪৮-৪৯ সালে আম্বেদকর বলে যান – সে কথাগুলো আজকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। আমার মনে হয়, যাঁরা আজকে ফ্যাসিবাদ নিয়ে চিন্তিত, তাঁদের ওই হিটলার-মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ সেটা তো বোঝা খুব দরকার, কিন্তু ভারতবর্ষের মাটিতে এই যে অবস্থাটা আছে তাকে নির্দিষ্ট ভাবে বোঝা দরকার। এখন আমি বলব, এটাকে ধরে একটা বিরাট কোনও ফ্যাসিবিরোধী মোর্চা গড়ে উঠবে, এই মুহুর্তে সেটা হয়তো আশা করা একটু কঠিন। তার কারণ হচ্ছে, মোর্চা তো তখনই গড়ে উঠবে, যখন ফ্যাসিবাদের বিপদ সম্পর্কে সমানমাত্রায় লোকে ওয়াকিবহাল হবে। এখন এই বিপদটাকে যদি কেউ অনুধাবন না করতে পারে, যদি একটা সাধারণ ব্যাপার বলে মনে হয় বা যদি – দেখাই যাক না কেন, এত পার্টি তো দেখলাম এখন এই সরকারটা একটু চেখে দেখা যাক কেমন সরকার – তো এই যদি বিজেপি সম্পর্কে মানুষের ধারণাটা হয়, অর্থাৎ যদি বিজেপি ব্যাপারটা ট্রিভিয়ালাইজ হয়ে যায়, নরমালাইজ হয়ে যায় – তাহলে কিন্তু সেটা হবে না। এই মাত্রায় বিজেপি সম্পর্কে ধারণাটা কিছু কিছু জায়গায় গড়ে উঠতে শুরু করেছে।

 

আমরা যেটা মনে করি, সেটা হচ্ছে, যে মাত্রায় ধারণাটা গড়ে উঠেছে, সেই মাত্রায় বিজেপির বিরুদ্ধে, এনডিএর বিরুদ্ধে যে অ্যাভেলেবল পার্টিগুলো আছে, যে শক্তিগুলো আছে – আমরা তো নতুন করে পার্টি আবিষ্কার করে উঠতে পারব না – যে পার্টিগুলো ভারতবর্ষে নির্দিষ্ট সামাজিক, ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে, দানা বেঁধে রয়েছে, তাদের কিছু গণভিত্তি আছে সেই পার্টিগুলোকে নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইটা করা যাক। এবং যে লড়াইটা শুধুমাত্র সংবিধান কেন্দ্র করে হবে না। শুধুমাত্র, গণতন্ত্র বনাম ফ্যাসিবাদী অমূর্ত ধারণা দিয়ে হবে না। সেটা হবে মানুষের রুটিরুজির প্রশ্ন নিয়ে। বিজেপি আমলে মানুষের রুজিরুটি জীবিকা যেগুলি আক্রান্ত – সবকিছুই আক্রান্ত।

 

একটা উদাহরণ দিই – লোকে জানে না – বিজেপি সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গে এমন ধারণা যে, বিজেপি বোধহয় যেটাকে হিন্দিতে আমরা বলি অতিপিছড়ি জাতি – এক্সট্রিম ব্যাকওয়ার্ড কাস্ট (ইবিসি) – এই কাস্টগুলোর বন্ধুশক্তি, হিতৈষী। বিজেপি কীরকম হিতৈষী? তার সব থেকে বড় উদাহরণ পাওয়া যাবে যে, অতিপিছড়ি জাতির একটা নতুন পার্টি বিহারের বুকে এসেছে, যে পার্টিটার নাম হচ্ছে বিকাশশীল ইনসান পার্টি বা ভিআইপি। যে পার্টির নেতা হচ্ছেন মুকেশ সাহানি। যিনি নিজেকে মাল্লা বলে একটা বর্গের মানুষ হিসাবে তুলে ধরেন। এই পার্টিটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে বিজেপির সঙ্গে সমঝোতা করল। বিজেপির সঙ্গে সমঝোতা করে তারা ১৩টা আসনে লড়েছিল। যার মধ্যে আমার ধারণা দুটো আসন লড়েনি, ১১টা আসনে লড়ে তারা চারটে আসনে জয়লাভ করেছে। এই চারটি আসনেই যাঁরা জয়লাভ করেছে তাঁরা কেউ ওই পার্টির লোক নয়। বিজেপির লোক। (তাঁদের মধ্যে) দু’জন উচ্চবর্ণের, একজন যাদব, একজন দলিত। তাঁরা কেউ এই সাহানি জাতির কেউ নয়। বিজেপি প্র‍্যাকটিক্যালি ওই পার্টিটিকে সিট দেওয়ার নাম করে বিজেপির নেতাদের ওই পার্টির উপর চাপিয়ে দিয়েছে।

 

বলরামপুর বাংলার গায়ে লাগোয়া কাটিহার জেলার (একটি বিধানসভা কেন্দ্র), যেখান থেকে আমাদের বিধায়ক দলের নেতা মেহবুব আলম নির্বাচিত হয়েছেন এবং এবারের নির্বাচনে বিহারে হায়েস্ট ভিক্ট্রি মার্জিন তাঁর – ৫৪ হাজার ভোট – তিনি পরাজিত করেছেন ভিআইপি ক্যান্ডিডেটকে। সেই ভিআইপি ক্যান্ডিডেট হচ্ছেন বরুণ ঝা, যিনি ২০১৫ সালে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন। এই যে ব্যাপারগুলো বাংলার মানুষকে বোঝানো দরকার যে বিজেপি কীভাবে ঠকায় মানুষকে। সমস্ত মানুষকে ঠকিয়েছে। (ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে) ১৫ লক্ষ টাকা থেকে শুরু করে এক্সট্রিম ব্যাকওয়ার্ড কাস্ট, তোমাদের হিতৈষী আমি – এ সমস্তগুলো মিথ্যে কথা। কিন্তু, এ কথাগুলো মানুষকে জানাতে হবে, বোঝাতে হবে।

 

আমাদের যেটা মনে হয়েছে এই সমস্ত কাজ একসঙ্গে হওয়া উচিত। খুব ভালো একটা বিরাট কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠছে। এই কর্পোরেটের-কব্জা তার বিরুদ্ধে বড় কৃষক আন্দোলন। খুব ভালো লাগছে যে, শ্রমিক আন্দোলনে নতুন ঢেউ আসছে। শ্রমআইন সংশোধন থেকে শুরু করে এবং প্রাইভেটাইজেশন, যেটা কিছুদিন আগে পর্যন্ত সুধু ট্রেড ইউনিয়নের চিন্তাভাবনা ছিল, লোকে মনে করত ওটা লেফটের…  যেহেতু লেফটরা সোশ্যালিজমের কথা বলে তাই তারা আদর্শগত ভাবে প্রাইভেটাইজেশনের বিরোধিতা করে – কিন্তু, ব্যবহারিক ভাবে প্রাইভেটাইজেশন ভালো জিনিস, তাতে ইকনমিক্সে এফিসিয়েন্সি বাড়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু, এখন মানুষের মধ্যে আসছে যে প্রাইভেটাইজেশন মানে হচ্ছে – ধরুন প্রাইভেট শিক্ষা – শিক্ষা এমন এক্সপেন্সিভ হয়ে যাবে যেখানে গরিব মানুষের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা পাবে না। প্রাইভেট হেলথকেয়ার, তার মানে যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থাটা এত কস্টলি হয়ে যাবে যেখানে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাবেন না। প্রাইভেটাইজেশন মানে হচ্ছে – যেটাকে আমরা বলি মূল্যবৃদ্ধি – প্রাইভেটাইজেশন হচ্ছে মূল্যবৃদ্ধির আর একটি মাত্রা। প্রাইভেটাইজেশন মানে হচ্ছে, সরকারি চাকরি উঠে যাবে। সরকারি চাকরিটা ছিল ভারতবর্ষে একটু সম্মানজনক, একটু স্থায়ী চাকরি। এই চাকরিগুলো উঠে যাবার মানে হচ্ছে মানুষের চাকরির জীবনে কোনওরকম স্থায়িত্ব, স্থিরতা, সম্মান থাকবে না। এবং রিজার্ভেশন প্রাইভেট সেক্টরে কোথাও নেই। তাই সরকারি চাকরি কমে যাওয়ার মানে, সংরক্ষণের যে অধিকার, সেই অধিকারটা মূল্যহীন হয়ে যাবে।

 

আমার খুব ভালো লেগেছে, বিহারে এবারে – আপনারা শুনেছেন যে – এই যে রোজগার বা এমপ্লয়মেন্ট এটা ছিল প্রধান দাবি – সেই প্রধান দাবিটা কিন্তু সেখানে শুধু রোজগার বলে ছিল না। (ছিল) ডিগনিফায়েড, সিকিউরড অ্যান্ড ডিগনিফায়েড এমপ্লয়মেন্ট (বলে)। এটা ছাত্ররা-যুবরা বুঝেছেন যে, নরেন্দ্র মোদী যখন রোজগারের কথা বলেন, তখন তিনি বলেন যে, ইউ গিভ এ জব বাট নট বিকাম এ জব সিকার। দ্য জব সিকার শ্যুড বিকাম জব গিভার। এবং ওই পকোড়া বিক্রি ইত্যাদি ইত্যাদি। ওঁর এমপ্লয়মেন্টটা হচ্ছে বেসিক্যালি সেলফ এমপ্লয়মেন্ট। ওঁর এমপ্লয়মেন্টটা হচ্ছে বেসিক্যালি ইনসিকিউরড এমপ্লয়মেন্ট, যার মধ্যে কোনও পেমেন্টের ব্যাপার নেই – (যেন) সেবা করছেন। সেবা তো করছেনই। এই কৃষক-শ্রমিকের সেবাতেই তো দেশ চলছে। কিন্তু, তার মধ্যে দিয়ে তাঁরা যদি কিছু না পায় সেবার বিনিময়ে? সেবা করছ বলে এতদিনে ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং তো শেষ হল না। তিনি (নরেন্দ্র মোদী) বলে দিলেন, এটা নাকি বিরাট স্পিরিচুয়াল এক্সপিরিয়েন্স। এটা নাকি আধ্যাত্মিক ব্যাপার। নোংরা পরিষ্কার করে যদি আধ্যাত্মিক আনন্দ হয় – তবে আসুক না যাঁরা ভারতবর্ষে পুরোহিতগিরি করেন, যাঁরা সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায় – পুরো ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের লোকজন – তাঁরা নোংরা পরিষ্কার করে, নর্দমায় নেমে সেই আধ্যাত্মিক আনন্দ অনুভব করুন। আমাদের কোনও আপত্তির কিছু নেই।

 

এই যে ব্যাপারগুলো অর্থাৎ যে শ্রমগুলো সব থেকে নিপীড়িত, যার জন্য তাঁরা সব থেকে শোষিত, উৎপীড়িত বা মহিলা যাঁরা আশাতে কাজ করছেন, মিড ডে মিলে কাজ করছেন…, (বলছে) মেয়েদের কাজই তো এটা। মায়ের জাত। মায়ের জাত হচ্ছে নিজেরা না খেয়ে সকলকে খাওয়ায়। অতএব মেয়েদের শ্রমটাকে (ওই) মায়েদের শ্রম হিসেবে দেখিয়ে দিয়ে তার জন্য, তার বিনিময়ে পয়সা দিও না। তার বিনিময়ে তার কোনও মূল্য চেও না। স্বীকৃতি চেও না। এই যে ওদের পুরো ডিসকোর্সটা – যেখানে ওরা ওই সমস্ত সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মূল্যবোধগুলোকে কাজে লাগায় মানুষকে অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করা বা তাঁকে বঞ্চিত রাখার জন্য। আমার মনে হয় এটা কিন্তু মানুষ ধরতে পেরেছে। ফলে, এবারের বিহারের নির্বাচনে, আমরা দেখেছি, এই সমস্ত প্রশ্নগুলো, বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

 

ফলে আমার মনে হয়, আমরা এই স্তরে আছি এখন – একটা অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট বড় ফ্রন্ট বলতে, খুব স্ট্রাকচারড একটা ওই ধরনের ফ্রন্ট বলতে যা বোঝায় – ভারতবর্ষে অধিকাংশ পার্টির কাছে সেই ফ্যাসিবাদের চেতনাটা নেই। তাঁরা হয়তো কিছু কিছু প্রশ্নে কিছু বিরোধিতা করছে, কিন্তু অনেক প্রশ্নে করছে না। যেমন, ন্যায়ের প্রশ্নে বিরোধিতা করছে না। আজকে যেমন ইউএপিএ-তে আটক করা হচ্ছে – মুসলিম হলে তো কথাই নেই, আদিবাসী দলিত হলে তো কথাই নেই। এই ধরুন দিল্লি দাঙ্গার নাম করেই হোক, এলগার পরিষদ ওই ভীমা কোরেগাঁওয়ের নাম করেই হোক বা এখন নতুন একটা দেখছি তৃতীয় একটা ফ্রন্ট খোলা হচ্ছে। কাশ্মীরে তো ওরা আক্রমণ নামিয়ে আনলই – কাশ্মীরের প্রশ্নে যাঁরাই সহানুভূতিশীল ভারতের ভেতরে, যাঁরাই কাশ্মীরে গণতন্ত্রহরণ নিয়ে আওয়াজ তুলেছেন, তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের অ্যাটাক করা হচ্ছে। এই তিনটে ফ্রন্ট, যেমন ওই সময় কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা এই ওই (মিরাট, লাহোর) ষড়যন্ত্র মামলা ইংরেজ আমলে হতো…। তিনটে ষড়যন্ত্র মামলা – কাশ্মীর সংক্রান্ত, দিল্লি দাঙ্গা সংক্রান্ত ও ভীমা কোরেগাঁও – সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে এবং যাঁরা অ্যাক্টিভিস্ট তাঁদের বিরুদ্ধে। এই ব্যাপারগুলো নিয়ে দেখবেন কথা বলার লোক খুব কম। জানার লোক খুব কম। এত লজ্জার বিষয় যে, ৮৪ বছরের স্ট্যান স্বামী, পারকিনসন অসুখে ভুগছেন, তাঁকে রাঁচি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল। কিন্তু, ভারতবর্ষের সমাজে এটা নিয়ে কথাবার্তা বলা খুব কম, খুব কম। সুধা ভরদ্বাজ – তৃতীয় জন্মদিন (জেলে) পালন হল – তিন বছর ধরে জেলে পড়ে আছেন, এ নিয়ে কথা বলার লোক খুব কম। এটা হচ্ছে খুব ভয়ের দিক চিন্তার দিক যে গণতন্ত্র যেভাবে হত্যা হচ্ছে প্রতিদিন, সেটা নিয়ে কথা বলার লোক খুব কম। কিন্তু, তাহলেও বাড়ছে। আমার মনে হয়, যেটা আছে, যেটুকু আছে সেটাকেই ধরে, যতটা লড়াইকে গভীরে নিয়ে যাওয়া যায়।

 

আমরা যদি আমেরিকার সঙ্গে তুলনা করি একটা বিরাট পার্থক্য চোখে পড়ে। আমেরিকার এক টিভি চ্যানেল, তাদের সাহস আছে ট্র‍্যাম্পের ভাষণ মাঝখানে থামিয়ে দেওয়া যে, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। ভারতবর্ষের কোনও চ্যানেলের সে সাহস নেই। তাদের আদালত বিভিন্ন ইনস্টিটিউশনগুলো – আফটার অল সেটা একটা ডেভেলপড ডেমোক্র‍্যাসি… একটা অ্যাডভান্সড ক্যাপিটালিস্ট কান্ট্রি… তো সেখানকার – তাদের মধ্যে বর্ণবৈষম্য আছে, অনেককিছু আছে, সেটা আছে বলেই আজকে ট্র‍্যাম্প এরকম দাপট দেখাতে পারছেন – সেখানে একটা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ ও আছে। ভারতবর্ষে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ যেটা সেটা খুব দুর্বল। এটা ওই আম্বেদকর বলেই গিয়েছিলেন – আমরা ডেমোক্র‍্যাসি তো পেলাম, কিন্তু খুব দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। এই দুর্বলতার সম্পূর্ণ সুযোগ এই ফ্যাসিবাদী শক্তিরা নিচ্ছে।

 

ফলে এটা আমরা এভাবে দেখছি, খুব সুগঠিত এবং খুব সচেতন একটা অ্য্যান্টি ফ্যাসিস্ট ফ্রন্ট গড়ে তোলার জায়গাটা এখনও আসেনি। তার উপাদানগুলো এখনও বিকশিত হচ্ছে। কারণ পরিস্থিতিটা খারাপ হচ্ছে। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম বিকশিত এবং প্রতিরোধের উপাদানগুলো বিকাশ লাভ করছে। আমরা সেইগুলোকে সাহায্য করতে চাই। কাছাকাছি আনতে চাই। সেটা যেখানে যে মাত্রায় যেভাবে সম্ভব। হয়তো সব রাজ্যে একভাবে সম্ভব নয়, সব সময় একভাবে সম্ভব নয়। এইভাবে একটা ডাইভার্সিটি মাথায় রেখে – বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিসকোর্সের লেভেলে হতে পারে, কোনও ক্ষেত্রে আন্দোলনের লেভেলে হতে পারে, সেটা একটা কোনও নির্দিষ্ট প্রশ্ন ধরে হতে পারে অথবা ফ্যাসিবাদের একটা অবধারণা থেকেও হতে পারে – এইটা মাথায় রেখে আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে এটা দাঁড় করানো যায়।

 

Share this
Recent Comments
2
  • ফ‍্যাসিবাদ শব্দটির ব‍্যবহার বন্ধ হ‌ওয়া দরকার।বরং সমস্যার চেহারা স্পষ্টভাবে আলোচনায় আসা দরকার।কেন কেবলমাত্র হিটলার মুসলিনি ফ‍্যাসিস্ট ছিল, কেন অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল‍্যান্ড,উত্তর আমেরিকার ভূমিসন্তানদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে ফেলা পশ্চিমি সভ‍্যতা ফ‍্যাসিস্ট নয়, কেন জালিয়ানাবাগে,আর‌ওয়াল,কানসারায় যারা গনহত্যা চালালো তাদের ফ‍্যাসিস্ট বলা হবে না, কেন হিটলার মুসলিনির সময়কালে বাংলার বুকে মন্বন্তর চাপিয়ে কয়েক লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলা ব্রিটিশ সরকারকে ফ‍্যাসিস্ট বলা যাবে না, কেন বিজন সেতু, মরিচঝাঁপি,নন্দিগ্রামের হত‍্যাকারিদের ফ‍্যাসিস্ট বলা যায় না, কেবলমাত্র বিজেপিকেই ফ‍্যাসিস্ট বলা হবে ,সেটা পরিস্কার করা খুব মুশকিল।

  • comments
    By: Jogin on January 19, 2021

    সুমিত কুমারের কমেন্টএর সংগে সহমত। এরকম লেবেল ব্যবহার কম করলে ভালো। তাহলে লেবেলের পিছনে যা আছে তা নিয়ে মনোযোগ বেশি দেওয়া যায়না। ভিতরের বস্তু গুলি দেশ, সময় তে অনেক বদলায়। উনি উপরে যা বলেছেন তার সংগে যোগ করি –
    চীনের রাষ্ট্রকে ফ্যাসিস্ট কেন বলবো না? স্বৈরতন্ত্র, সর্ব-দখল বাদী এক দল, এক মত বাদী পুলিশ রাষ্ট্র, যেখানে স্বাধীন মত বা সংগঠন এর কোন যায়গাই নেই, গনতান্ত্রিক পরিসর এর বিলুপ্তি, পুর্ব তুর্কীস্তান, তিব্বত এ চরম বর্বর উপনিবেশিক শাসন, বল্গাহীন লুঠ তন্ত্র, সব দিকেই তারা মোদি রাজের থেকে অনেক অনেক আগুয়া, বহু যুগ ধরে। তাদের কেন ফ্যাসিবাদি বলা যাবেনা?
    তাছাড়া, ট্রাম্প, মোদি, হিটলার সকলকে এক লেবেলে ঢাকলে আমরা বহু ব্যাপার দেখতেই পাবোনা।

Leave a Comment