হাথরাসের দলিত তরুণীর ধর্ষণ ও হত্যায় তথ্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন


  • October 9, 2020
  • (0 Comments)
  • 269 Views

হাথরস্‌-এর দলিত মহিলার উচ্চ বর্ণের পুরুষদের হাতে নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান উওমেন-র জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যানি রাজা, প্রগতিশীল মহিলা সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি পুনম কৌশিক এবং অ্যাক্ট নাউ ফর হারমোনি এন্ড ডেমোক্রেসির (আনহাদ) শাবনম হাশমি নিয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধি দল ৫ই অক্টোবর ২০২০ হাথরাস জেলার গুলগাড়ী গ্রাম পরিদর্শন করেন এবং সেখানে চার ঘন্টা সময় কাটান। এই প্রতিবেদনটি তাঁদের তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি।

 

গত ১৪ সেপ্টেম্বর যে দলিত মেয়েটির ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করা হয়েছিল, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সকালে সাফদারজং তার হাসপাতালে মৃত্যু হয়। সেই মেয়েটির পরিবারের আট জন সদস্যের সাথে দেখা করে তাদের সাথে দীর্ঘ কথোপকথন চালিয়েছে এই তথ্যানুসন্ধানী দল।

 

তাঁরা যা জানিয়েছেন তা তাঁদের বয়ান অনুযায়ী তুলে দেওয়া হল –

 

অঞ্চলটি সম্পূর্ণ ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। মূল যে বড় রাস্তাটি গ্রামের দিকে গিয়েছে এবং গ্রামের ভিতরের দীর্ঘ রাস্তা দু’ জায়গাতেই বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন রয়েছেl গ্রামের সীমানায় ব্যারিকেড থেকে শুরু করে মেয়েটির বাড়ি পর্যন্ত গ্রামের ভেতরে সম্পূর্ণ পথটি প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ, মাঝে কয়েকটি জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে কোনো পুলিশের উপস্থিতি নেই। দু’টি জায়গায় আমরা এলাকার প্রভাবশালী উচ্চবর্ণ সম্প্রদায়কে প্রচারমাধ্যমের কাছে তাদের নিজস্ব মতটি প্রচার করতে শুনলাম, সেই মত যা এখন তাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারাও প্রচারিত হচ্ছে।

 

আমরা তিনজন সেখানে পৌঁছে মেয়েটির বাবা, মা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রথমে দেখা করে আমাদের সমবেদনা জানাইl তাঁদের সন্তানের হত্যার ন্যায়বিচারের জন্য তাদের সংগ্রামরে প্রতি আমরা আমাদের সংহতি প্রকাশ করলাম। মেয়েটির বোন, ভগ্নিপতি, মা, দুই ভাই, মেয়েটির বাবা এবং বাবার ভাই-বোনদের সাথে আমরা  দীর্ঘক্ষণ কথা বলি। মেয়েটির বাবার অপর এক ভাইয়ের সঙ্গে আমরা পরে আলিগড়ে দেখা করি।

 

এরপর আমরা আলিগড়ের জওহরলাল নেহেরু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গিয়েছিলাম এবং শহরের কিছু লোকের সঙ্গেও দেখা করি যারা এই ঘটনাটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। আমরা বেশ কয়েকজন ডাক্তার এবং অন্য কর্মীদের  সঙ্গেও কথা বলেছি যাঁরা সেখানে চিকিৎসা চলাকালীন মেয়েটিকে দেখেছিলেন।

 

বিভিন্ন মহল থেকে ভয় ও চাপের যে পরিবেশ তৈরী হয়েছে তার কারণে আমরা চিকিৎসক বা অন্যান্য কর্মী যাঁদের সঙ্গে আমরা আলাপচারিতা করেছি তাঁদের নাম এখানে প্রকাশ করতে পারছি না।

 

মেয়েটির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন খুবই হৃদয়বিদারক হলেও সার্বিকভাবে তা ছিল সংযত। এই সমস্ত থেকে যা তথ্য আমরা সংগ্রহ করেছি তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে পেশ করছিI

 

প্রেক্ষিত, ঘটনা, চিকিৎসা, মৃত্যু, সৎকার

 

১. উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২৩.৭ কোটি। সংখ্যার বিচারে দলিতরা মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও বেশি, অথচ এরাই সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ভারত বর্ণ-ভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছিল ১৯৫৫ সালে, তবে আজও দলিতদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ অব্যাহত রয়েছে এবং আজও তারা সর্বাপেক্ষা  প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে  অফিসের (জাতীয় নমুনা সমীক্ষা অফিসের) ৬৬তম দফার রিপোর্ট অনুসারে, “কৃষিতে স্ব-নিযুক্ত”, অর্থাৎ নিজস্ব জমি আছে এমন পরিবারের আনুপাতিক সংখ্যা সামাজিকভাবে অগ্রসর শ্রেণির (এস.এ.সি) মধ্যে ৩৯.৪ শতাংশের তুলনায় গ্রামীণ তফসিলি জাতির (এস.সি) ক্ষেত্রে মাত্র ১৭.১ শতাংশ। বিভিন্ন সরকার একাধিকবার চেষ্টা করেছে জমি দান করে দলিত পরিবারগুলিকে স্বনির্ভর করবার। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে, বৈষম্য ও দুর্নীতির কারণে সমস্ত পরিবারকে জমি দেওয়া সম্ভব হয়নি কেবল মাঝেমাঝে মুষ্টিমেয় কিছু লোক জমির ক্ষুদ্র টুকরো পেয়েছেন মাত্র।

 

২. হাথরাস জেলার গুলগাড়ী গ্রামটিতে ঠাকুররাই প্রভাবশালী গোষ্ঠী, মাত্র চার পাঁচ ঘর দলিত পরিবার বাস করে। এটি উপজেলা সদর হাথরাস থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গ্রাম পঞ্চায়েত হ’ল বাঘনা এবং এটি চাঁদপা থানার অধীন। গ্রামটিতে প্রায় ৬৬টি বাড়ী রয়েছে ও প্রায় ৫০৪ জনের মতো মানুষের বাস। বেশ কিছু সময় ধরেই জমিদার ঠাকুর সম্প্রদায় চাইছিল দলিত পরিবারগুলি যেন গ্রামটি ছেড়ে চলে যান যাতে সেটি সম্পূর্ণভাবে একটি ঠাকুর গ্রামে পরিণত হতে পারে। মৃত মেয়ের পরিবারটিকে ঠিক কবে ওখানে জমি পেয়েছিলো তা আমরা নিশ্চিত জানতে পারিনি, তবুও এটা নিশ্চিত যে কোন সরকারী প্রকল্পের অংশ হিসাবে দলিত পরিবারগুলোকে ওখানে জমি দেওয়া হয়েছিল এবং তা ওই ঠাকুর সম্প্রদায়ের মন মতো হয়নি।  গ্রামের দলিত পরিবারের মেয়েরা এবং মহিলারা বাইরে যাতায়াতের সময় নিয়মিতভাবে হয়রানির মুখোমুখি হন। আমরা জানতে পারলাম অভিযুক্তদের একজন নাকি গত ছয় মাসে বেশ কয়েকবারই মৃত মেয়েটিকে হেনস্থার চেষ্টা করেছিল যার ফলে মেয়েটি একা বাড়ির বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।

 

৩. ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ভোর পাঁচটা থেকে রোজকার কাজ মহিষদের পরিচর্যা, রান্না, ঘর পরিষ্কার সমস্ত শেষ করে মেয়েটি সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ তার মা ও  ভাইয়ের সাথে পশুদের জন্য ঘাস কাটতে যায়। তারা একে অপরের থেকে কিছু দূরে ঘাস কাটছিলো। কিছু সময় পর মা মেয়েটির খোঁজ করেন, প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন সম্ভবত সে বাড়ি ফিরে গেছে। তারপর হঠাৎ তিনি দেখেন মাটিতে এক জায়গায় মেয়ের পায়ের চটিটা উল্টে পড়ে আছে। সেটি অনুসরণ করে একটু এগিয়ে গিয়ে তিনি মেয়েটিকে মাঠের ওপর পড়ে থাকতে দেখেন এবং তার গায়ে কোনো কাপড় ছিল না। তিনি তার গলায় শ্বাসরোধের চিহ্ন দেখেন, মেয়েটির চোখ ছিল লাল এবং গলা টিপে শ্বাসরোধের কারণে দাঁতের চাপে তার জিভ কেটে গিয়েছিলো বলে মেয়েটি কথা বলতে পারছিল না। মা সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরু করেন, অবশেষে একটি শিশুকে দেখতে পেয়ে তাকেই বলেন তার ছেলেকে বাড়ি থেকে ডেকে আনতে। ততক্ষন তিনি চারদিকে পড়ে থাকা ছেঁড়া কাপড় দিয়ে তার সন্তানের দেহটা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তার ছেলে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছালে কোনোমতে তারা অবশেষে চাঁদপা পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে একটা অভিযোগ নথিভুক্ত করেনl অভিযোগ দায়ের করতে বেশ খানিকটা সময় যায়, সেসময় মেয়েটিকে একটি উঁচু কাঠামোর উপর শুইয়ে রাখা হয়। এরপর তাকে পাঠানো হয় বগলা সম্মিলিত জেলা হাসপাতাল, আলিগড় রোড, হাথরাস।

 

৪. এখানে প্রাথমিক পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার পরে তাকে আলিগড়ের জওহরলাল মেডিকেল কলেজে নিয়ে যেতে বলে। যখন তাকে মেডিকেল কলেজে আনা হয় তার অবস্থা ছিল অত্যন্ত সঙ্কটজনক, তাই ওই অবস্থায় সে কোনও বয়ান দিতে পারেনি। শ্বাসরোধ ছাড়াও ছিল আরও বহু আঘাত। শ্বাসরোধের কারণে চোখে রক্তক্ষরণ হয়েছিল, ঘাড় এবং পিঠে ছিল গুরুতর জখম, সে সঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারছিলো না এবং তার দুই হাত-পা পক্ষাঘাতে অবশ হয়ে গিয়েছিলোl তাকে হাসপাতালের নিউরো সার্জারিতে রেফার করা হয়েছিল। চক্ষুবিশারদ, ফরেনসিক মেডিসিন, অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনোকোলোজি বিশেষজ্ঞদের কাছেও রেফার করা হয়। তারপরে তাকে রাখা হয়েছিল হাই -ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচ.ডি.ইউ)।

 

৫. ২২ শে সেপ্টেম্বর ২০২০, সে কিছুটা সচেতনতা ফিরে পেয়ে একটু কথা বলতে সক্ষম হলে, জওহরলাল মেডিকেল কলেজ, আলিগড় নিউরো-সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে মৃতপ্রায় মেয়েটির বিবৃতি রেকর্ড করতে নির্দেশ দেন। সংকটজনকভাবে আহত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি সরকারি নিয়ম l ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সেই বয়ান নথিভুক্ত করা হয়।

 

৬. কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ১৬১ নম্বর ধারার আওতায় তার বিবৃতি রেকর্ড করা হয়েছিল। হাথরাসে করা প্রাথমিক এফআইআর-টি নিবন্ধিত ছিল আইপিসি ৩০৭, শিডিউল কাস্ট এন্ড শিডিউল ট্রাইব অ্যাট্রোসিটিস অ্যাক্ট ৩২৫ ধারার আওতায়। পরবর্তীকালে এর সাথে ৩৭৬ ডি সেক্শনটি যোগ করা হয়। অ্যাডিশনাল এসপি’র ভিডিও যা কিনা ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০@HathrasPolice দ্বারা ট্যুইট করা হয়, তাতে বলা হয় যে মৃত মেয়েটি এফ.আই.আর দায়েরের সময় কোনও বিবৃতি দিতে অক্ষম ছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তা যখন তার বক্তব্য রেকর্ড করেছিলেন তখন সে ধর্ষণকারী ৪ জন ব্যক্তির নাম বলে। যারজন্য পরবর্তীকালে ৩৭৬ ডি সেক্শনটি যুক্ত করা হয়, ও চার জনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কেউ পলাতক না থাকায় মামলাটি ফাস্ট  ট্র্যাক আদালতে তোলার কথা। ট্যুইট-এর লিঙ্ক: https://twitter.com/hathraspolice/status/1309859079112646656?s=20

 

৭. এম.এল.সি (মেডিকোলিগ্যাল) রিপোর্টে রোগীর দেওয়া আইন সম্পর্কিত বিবরণে বলা হয়েছে: যোনিরন্ধ্র অনুপ্রবেশ: সম্পূর্ণ / চেষ্টা: সম্পূর্ণ; অনুপ্রবেশ: পুরুষ-লিঙ্গ;

প্রভিশনাল চিকিৎসকের মতামত: স্থানীয় পরীক্ষার ভিত্তিতে আমি মতামত দিচ্ছি যে বল প্রয়োগের লক্ষণ রয়েছে। সহবাস সম্পর্কিত অনুপ্রবেশ বিষয়ে সিদ্ধান্ত এফ.এস.এল (ফরেনসিক সাইন্স ল্যাবরেটরি) রিপোর্টে পাওয়া পর্যন্ত মুলতুবি রয়েছে।

 

৮. এফ.এস.এল (ফরেনসিক সাইন্স ল্যাবরেটরি) রিপোর্ট বলছে:

১) যোনি/মলদ্বারে সহবাসের কোনও চিহ্ন নেই। ২) ঘাড় এবং পিছনে শারীরিক নির্যাতনের প্রমাণ আছে। ২২ সেপ্টেম্বর ফরেনসিক পরীক্ষা হয়েছিল ঘটনার আট দিন পরে। ধর্ষণের ক্ষেত্রে, সরকারী নির্দেশিকা অনুসারে, ঘটনার ৭২ ঘন্টার মধ্যে ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ করা উচিত। ৯০ ঘন্টার বেশি সময় পরে শুক্রাণু বাঁচতে পারে না।

 

৯. এসব ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে মৃত মেয়েটির দেওয়া বিবৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

১০. জে.এন.এম.সি হাসপাতালে (আলিগড়) আমরা যেসব বিভিন্ন ডাক্তার এবং অন্যান্য কর্মীদের সাথে কথা বলেছি  এবং পরিবারের সদস্যরা সকলেই জানিয়েছে যে স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় বিজেপি সাংসদ, যিনি আলিমগড় হাসপাতালেও গিয়েছিলেন, তার দ্বারা পরিবারের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয় মেয়েটিকে দিল্লি এইমসে (AIIMS) স্থানান্তরিত করার জন্য। শেষ অবধি পরিবার যখন চাপের কাছে নতিস্বীকার করে এবং মেয়েটিকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করার জন্য রাজি হয়, আলিগড়ের জে.এন.এম.সি হাসপাতাল তাকে এইমস-এ রেফার করে। অথচ ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে সাফদারজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে পরের দিন ভোরে তার মৃত্যু ঘটে। পুলিশ পরিবারকে জানিয়েছিল তারা নাকি মেয়েটিকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে প্রস্তুত ছিল।

 

১১. যখন পোস্টমর্টেমের জন্য মৃতের বাবার সম্মতি নেওয়া হয়েছিল, তখন শুধুমাত্র বাবাকেই একবারের জন্য মেয়েটির মুখ দেখতে দেওয়া হয়। এছাড়া আর কাউকেই তখন বা তারপরে মেয়েটিকে দেখবার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

 

১২. পরিবারের সদস্যরা জানালেন যে কেবলমাত্র প্রথম এফ.আই.আর.-এর কপি ছাড়া তাদের কাছে আর কোনও কাগজপত্র নেই, এমনকি মেয়েটির ডেথ সার্টিফিকেটও নয়।

 

১৩. ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ভোররাত্রে ২.৩০ মিনিটে গ্রামের একটি শ্মশানে পুলিশ প্রশাসন জোর করে পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মৃতদেহের দাহ সম্পন্ন করে। এমনকি পরিবারকে শেষবারের মতো মেয়েটির মুখ দেখবার সুযোগও দেওয়া হয়নিl মেয়েটির মাসি-পিসিরা মিনতি করেছিল, শববাহী অ্যাম্বুলেন্সটিকে বাধা দেবারও চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এরপর পরিবারের সদস্যদের অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করা হয় এবং অভিযোগ যে তাদের বাড়ি ব্যারিকেড করে ঘিরে রাখা হয়।

 

১৪. পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে প্রতি পদক্ষেপে তাদের ভয় দেখানো ও দেরি করিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশ বা প্রশাসন থেকে কোনও সমর্থন পাওয়া যায়নি। তাকে হাথরাস থানায় নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে জোর করে শ্মশানে দাহ করা অবধি, তাদের ক্রমাগত নানারকম ভয়ভীতি, অত্যাচার, হুমকি, সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি খবরটি ছড়িয়ে পড়তে না দেওয়ার জন্য অর্থের লোভও দেখানো হয়েছে। বিশেষত সৎকারের সময় পরিবারের প্রতি পুলিশের নৃশংস আচরণ এবং পরিবারকে অন্তত শেষ দেখা দেখতে না দেওয়ার ঘটনা তাদের এখন খেপিয়ে তুলেছে।

 

১৫. অতীতে ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রের দ্বারা সতীচ্ছদ-সংক্রান্ত (হাইমেনাল) জখমের ফলাফল এবং নিরাময়ের প্রক্রিয়া সংক্রান্ত একটি গবেষণা করা হয়েছিল। যেখানে সতীচ্ছদ-সংক্রান্ত দৈহিক আঘাতের (trauma) ফলাফল এবং নিরাময়ের প্রক্রিয়াটি বয়ঃসন্ধি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অবস্থার ২৩৯ জন মেয়ের ওপর ভিত্তি করে, ফটোগ্রাফসহ নথিভুক্ত করা হয়।

লিঙ্ক: https://www.researchgate.net/publication/6402926_Healing_of_Hymenal_Injuries_in_Prepubertal_and_Adolescent_Girls_A_Descriptive_Study

 

এই অধ্যয়নের উদ্দেশ্য ছিল বয়ঃসন্ধি পূর্ব ও পরবর্তী মেয়েদের ক্ষেত্রে এই নিরাময় প্রক্রিয়া এবং হাইম্যানাল আঘাতের ফলাফল জানা। ১২৬ জন কিশোরীই ছিল যৌন নির্যাতনের শিকার। ক্ষত সেরে ওঠার হার বিভিন্ন এবং গভীর ক্ষতগুলো ছাড়া পুরোনো আঘাতের ছাড়া কোনও প্রমাণ থাকে না। সতীচ্ছদের চূড়ান্ত “প্রস্থ” নির্ভর করে  প্রাথমিক ক্ষতের গভীরতার ওপর। কোনও বয়েসের মেয়েদের মধ্যেই ক্ষত কোষ (টিস্যু) গঠনের বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়নি। সতীচ্ছদের জখম দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে এবং বিস্তৃত ক্ষতগুলি ছাড়া আগের আঘাতের কোনও প্রমাণ থাকে না।  প্রকৃত ঘটনার ৮ দিন পরে সংগ্রহ করা নমুনায় ধর্ষণের কোনও প্রমাণ পাওয়া সম্ভব নয়।

 

উত্তরপ্রদেশ রাজ্য প্রশাসন কর্তৃক নির্মিত বিবরণী

১. আমরা গভীর উদ্বেগ ও ক্রোধের সাথে লক্ষ করি যে মৃতের মৃত্যুকালীন বিবৃতি এবং আরো নানান প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন সদস্য এবং প্রভাবশালী বর্ণের সদস্যরা আদপেই ধর্ষণ করা হয়নি বলে একটি আখ্যান নির্মাণ করেছেন। বিজেপি আইটি সেলের প্রধান, মেয়েটির ভিডিও নিয়ে একটি ট্যুইট করেছেন, ধর্ষিতার পরিচয় উল্লেখ করে যা কিনা আইনত নিষিদ্ধ, এটি প্রমান করার চেষ্টা করে যে মেয়েটি ধর্ষিত হয়নি। ভারতীয় দণ্ডবিধির আওতায় ধর্ষিতার পরিচয় প্রকাশ করা দণ্ডনীয় অপরাধ এবং দু’বছর পর্যন্ত কারাদন্ড হতে পারে। ওই ভিডিওতে, মেয়েটিকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় কেন অপরাধীরা তাকে শ্বাসরোধ করেছে, সে জানায় কারণ সে ওদের ‘জবরদস্তি’ আটকানোর চেষ্টা করেছিল। যৌন নিপীড়ন বোঝাতে ‘জবরদস্তি’ কথাটি ব্যবহার করা হয় এবং ওই ভিডিওটি হাথরাস থানার। অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য সরকার ও বিজেপির এই জাতীয় প্রচেষ্টা অত্যন্ত নিন্দনীয়।

 

২. উচ্চবর্ণের পুরুষদের দ্বারা দলিত মেয়েদের উপর নৃশংস হামলার বিরুদ্ধে যারা বিক্ষোভ সমাবেশ করেছিল ইউ.পি সরকার তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং এখন এটিকে যোগী সরকারকে বদনাম করার জন্য ও ইউ.পিতে বর্ণবৈষম্যমূলক দাঙ্গা বাঁধানোর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হিসাবে অভিহিত করতে চাইছে। বর্তমান সরকারের অধীনে কেন্দ্রে এবং ইউ.পি রাজ্যে, প্রতিটি বিরুদ্ধমতকেই এখন বিজেপি এবং রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। তারা ভুলে গেছে যে ভারতের সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রয়েছে যে কোনও ধরণের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার। আমরা, বর্তমানে ইউ.পিতে বা দিল্লিতে শান্তিপূর্ণ নাগরিক প্রতিরোধকে ষড়যন্ত্র হিসাবে অভিহিত করবার এই জাতীয় সমস্ত প্রয়াসের তীব্র নিন্দা জানাই।

https://indiatomorrow.net/2020/10/05/hathras-up-police-lodges-open-fir-against-unnamedpersons-for-conspiring-to-create-caste-tensions-and-destabilise-up-government/

https://www.ndtv.com/india-news/hathras-case-deep-conspiracy-in-hathras-up-police-files-19cases-across-state-2305419\

 

৩. বেশ কয়েকজন বিরোধী নেতা যখন মৃতের পরিবারের সাথে দেখা করতে গ্রামে যান , তাদের স্থানীয় উচ্চবর্ণদের দ্বারা লাঞ্ছিত হতে হয়েছে এমনকি পুলিশ কর্তৃক তাদের ওপর লাঠিচার্জও করা হয়। আমরা এর তীব্র নিন্দা করছি।

 

প্রতিনিধিদের দাবী :

 

  • সাংবিধানিক অবনতিজনিত অবস্থার জন্য এবং মহিলা, বিশেষত দলিত মহিলাদের ওপর ক্রমবর্ধমান অত্যাচারের ঘটনার নিরিখে, যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে বরখাস্ত করতে হবে।
  • সময়সীমা বেঁধে আদালত হাথরাসের মামলার তদন্তের তদারকি করুক।
  • বিবিধ বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী বিবরণীও প্রচারের তদন্ত চাই।
  • আমরা মৃত দলিত মেয়েটির পরিবারের জীবন ও জীবিকাসুরক্ষিত করার দাবী জানাই।
  • আমাদের দাবী জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সাসপেন্ড করা হোক।
  • আমরা জনপ্রতিনিধিসহ সকল কর্তৃপক্ষের ভূমিকার তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।
  • আমাদের দাবী প্রতিটি বিরুদ্ধ মতকেই কেন অপরাধী বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে তা এন.এইচ.আর.সি-র (ন্যাশনাল হিউমান রাইটস কমিশন) পক্ষ থেকে তদন্ত করা হোক।
  • শিডিউল কাস্ট এন্ড শিডিউল ট্রাইব অ্যাট্রোসিটিস আইনের (এস.সি / এস.টির ওপর অত্যাচার প্রতিরোধআইনের) কঠোর প্রয়োগের দাবী জানাই।
  • এস.সি / এস.টি সাব প্যান অ্যান্ড কম্পোনেন্ট প্যান পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দলিতসম্প্রদায়ের জন্য এই আইনের আওতাধীন প্রকল্প এবং কর্মসূচিগুলি সম্পর্কে বিস্তৃত প্রচারের দাবী জানাই।

 

মূল প্রতিবেদনটি পেতে : https://twitter.com/KaushikPms/status/1313471107454906368

 

বাংলা অনুলিখন : ঊর্মিমালা ব্যানার্জী

 

Share this
Leave a Comment