করোনার দিনগুলিতে সুপার প্রফিটের গল্প


  • October 8, 2020
  • (1 Comments)
  • 556 Views

পৃথিবীতে করোনার অভিঘাতে এখনো পর্যন্ত ৪০ কোটি মানুষের কাজ চলে গেছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে। উল্টোদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে লাভজনক ৩২ টি সংস্থা গত বছরের চেয়ে এ বছরে (২০২০) ১০৯ বিলিয়ন ডলার বেশি মুনাফা করবে। পৃথিবীর ধনীতম ২৫ জন ব্যক্তি মার্চের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তাদের সম্পত্তি বাড়িয়েছে ২৫৫ বিলিয়ন ডলার। এই করোনার বাজারে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রির এমডি এবং চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানির ব্যক্তিগত সম্পত্তি ২,৭৭,৭০০ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৬,৫৮,৪০০ কোটি টাকা। মার্চ মাসে লকডাউনের পর থেকে প্রতি ঘন্টায় ৯০ কোটি টাকা আয় করেছেন তিনি। কর্পোরেটদের এই সুপার প্রফিট অর্জিত হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে বাজি রেখে। সারা পৃথিবীতে ৪৩.৬০ কোটি ক্ষুদ্র ব্যবসা (যার মধ্যে অনেকেই নিজেই মালিক এবং শ্রমিক) বন্ধের মুখে। ‘Reform with a human face’ যে এক নির্লজ্জ মিথ্যাচার তা করোনা পরিস্থিতিতে আরেকবার প্রমাণিত হল। মুনাফা ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন এই পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভিত্তিস্তম্ভ। একে সংশোধন করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন। লিখলেন সুমন কল্যাণ মৌলিক

 

 

করোনা অতিমারী ও অপরিকল্পিত নির্বোধ লকডাউনের যৌথ আক্রমণে দেশের অর্থনীতির ভেঙে পড়া, শ্রমজীবি মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ – কষ্টের মাঝে একটা খবর কিন্তু আমাদের কারো চোখ এড়াচ্ছে না। এই করোনার বাজারে নয়া কীর্তিসাধন করলেন ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানি। আইআইএফএল ওয়েলথ হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট ২০২০ অনুযায়ী মার্চ মাসে লকডাউনের পর থেকে প্রতি ঘন্টায় ৯০ কোটি টাকা আয় করেছেন তিনি। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রির এমডি এবং চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানির ব্যক্তিগত সম্পত্তি ২,৭৭,৭০০ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৬,৫৮,৪০০ কোটি টাকা। এই নিয়ে টানা নবছর ভারতের ধনীতম ব্যক্তির শিরোপা তার মাথায়। ‘হিংসা কোরো না, চেষ্টা করলে তোমারও হবে’ — এই মন্ত্রে বিশ্বাস করি না বলে এ প্রশ্ন মাথায় এল এটা ব্যতিক্রম না কি তীব্র বৈষম্যের এ দেশে তথা বিশ্বে এটাই দস্তুর। করোনা অতিমারীর কারণে অর্থনীতি যতই সংকুচিত হোক, কোটি কোটি মানুষের রুটি-রুজি চলে যাক; ধনকুবেরদের সুপার প্রফিটের আখ্যানে কি সাময়িক বিরতি আসে, না কি এখনো লাভের কড়ি উপচে পড়ছে? এই সময়েই হাতে এল অক্সফ্যামের Power, Profits and the Pandemic শীর্ষক প্রতিবেদনটি। এই কঠিন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কর্পোরেট সংস্থাগুলির আর্থিক হাল- হকিকতের নানান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে এই প্রতিবেদনে।

 

পৃথিবীতে করোনার অভিঘাতে এখনো পর্যন্ত ৪০ কোটি মানুষের কাজ চলে গেছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে। উল্টোদিকে পৃথিবীর সবচেয়ে লাভজনক ৩২ টি সংস্থা গত বছরের চেয়ে এ বছরে (২০২০) ১০৯ বিলিয়ন ডলার বেশি মুনাফা করবে। “গ্লোবাল ফরচুন ৫০০” তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো গতবছর মোট মুনাফা করেছিল ৮২০ বিলিয়ন ডলার। এবার তাদের মুনাফার পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২.১ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ১৫৬% বৃদ্ধি! আর পৃথিবীর ধনীতম ২৫ জন ব্যক্তি মার্চের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তাদের সম্পত্তি বাড়িয়েছে ২৫৫ বিলিয়ন ডলার। মোদ্দা কথাটা হল করোনা সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের জন্য ধ্বংস বয়ে আনলেও কিছু লোক তথা কর্পোরেটদের আঙুল ফুলে কলাগাছ। আঙ্কেল স্যামের দেশের ৫ টি কোম্পানি ‘GAFAM’ (গুগল, অ্যাপেল,ফেসবুক, আমাজন ও মাইক্রোসফট) ইতিমধ্যেই ৪৬ বিলিয়ন ডলার লাভ করেছে। এছাড়া রয়েছে ওষুধ কোম্পানিগুলোর বেলাগাম মুনাফা। সেই মুনাফার প্রথম সারির তিনটি নাম হল মার্ক, জনসন অ্যান্ড জনসন এবং রোচ। তবে গল্পটা শুধু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের মধ্যে রয়েছে নেসলে, ডয়েস টেলিকম, এএসএমএল, টেলিকম ইটালিয়া। ভারতের রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রি, নাইজেরিয়ার বিইউএ সিমেন্ট, দক্ষিণ আফ্রিকার এমটিএন টেলিকম, চিনের আলিবাবা সহ আরো কিছু সংস্থা। তবে মুনাফার এই অন্তহীন আখ্যানে শীর্ষ স্থানটি অবশ্যই আমাজনের দখলে। গত বছরের তুলনায় তারা ৯৫ শতাংশ মুনাফা বৃদ্ধি করেছে। অক্সফ্যামের রিপোর্টে বলা হয়েছে আমাজনের মালিক জেফ বেজোস যদি তার ৮,৭৬,০০০ কর্মীদের প্রত্যোক কে ১,০৫,০০০ ডলার বোনাস দিত চান, তাতেও তিনি অতিমারীর আগে যতটা ধনী ছিলেন ততটাই ধনী থাকবেন।

 

সুপার প্রফিটের গল্পকে চাপা দেওয়ার জন্য কর্পোরেট মিডিয়ায় প্রচার হচ্ছে ধনকুবেরদের দানধ্যানের কাহিনী যেন বিপন্ন মানুষের জন্য টাকার থলি উপুড় করে দিচ্ছে কর্পোরেট সংস্থাগুলি। যদিও ইতিমধ্যে ঝুলি থেকে বেড়ালটা বেড়িয়ে পড়েছে। ভারতে এখনো পর্যন্ত পিএম-কেয়ার্সে যত টাকা জমা পড়েছে তার সিংহভাগ এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর কোষাগার থেকে। আর কর্পোরেটরা যে টাকা দিচ্ছে তা কোম্পানি আইন অনুযায়ী কর্পোরেটদের সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রকল্পের (Corporate Social Responsibility) অন্তর্গত। অক্সফ্যামের রিপোর্টে দেখা যায় বিভিন্ন দেশে কর্পোরেট সংস্থা গুলো করোনা রিলিফ ফান্ডে যে টাকা দিয়েছে তা তাদের ২০১৯ সালের লভ্যাংশের ০.৫% মাত্র। অর্থনীতিবিদরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন একটা টাকাও ডোনেশন না দিয়ে যদি মুনাফার উপর একটা নির্দিষ্ট শতাংশ ট্যক্স (সর্বোচ্চ ২%-৩%) কর্পোরেট সংস্থাগুলোর উপর চাপানো হত তাহলে অতিমারী জনিত আর্থিক সংকট থেকে মানুষ অনেকটাই রেহাই পেতেন। পরিবর্তে যা হচ্ছে তা হল এই কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর শেয়ারহোল্ডারদের পর্বত প্রমাণ মুনাফা দিয়ে পুষ্ট করা। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যাচ্ছে জানুয়ারি মাস থেকে আগস্ট পর্যন্ত কোম্পানিগুলো শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিয়েছে ১৯৫ বিলিয়ন ডলার। একদিকে শেয়ারহোল্ডারদের পকেট ভরানো হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার গুলি জনগণের করের টাকা ব্যবহার করে এই কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে ত্রাণ প্যাকেজ দিচ্ছে। যেমন ইংল্যান্ডে রাসায়নিক নির্মাতা BASF ও BAYER কে যথাক্রমে ১ বিলিয়ন পাউন্ড ও ৬০০ মিলিয়ন পাউন্ড আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছে। কর্পোরেট লবিগুলোর চাপে করোনা অতিমারীকে সামনে রেখে ব্যাপক করছাড় দেওয়া হচ্ছে।

 

সুপার প্রফিটের গল্পের বিপরীতে আছে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (MSME) ধ্বংসের ইতিকথা। নিম্ন ও মাঝারি আয়ের দেশগুলির ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ কর্মসংস্থান আসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প থেকে। করোনা সংক্রমণের শুরুর দু’সপ্তাহের মধ্যেই ব্রাজিলে ৫ লক্ষ ক্ষুদ্র ব্যবসার ঝাঁপ পরে যায়। ILO প্রাথমিক খতিয়ান অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে ৪৩.৬০ কোটি ক্ষুদ্র ব্যবসা (যার মধ্যে অনেকেই নিজেই মালিক এবং শ্রমিক) বন্ধের মুখে। এই সেক্টরগুলি সবচেয়ে কমজোরি কারণ এদের পুঁজি অত্যন্ত কম ফলে বাজারে চাহিদা হঠাৎ করে কমে গেলে তারা টিকে থাকতে পারে না। এই ক্ষেত্রের ধ্বংসের সঙ্গে কাজ চলে যাবার বিষয়টা সরাসরি যুক্ত। আর এই কাজ চলে যাওয়ার প্রভাব ২০২০ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও থাকবে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক তাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনাকালে যত কাজ হারিয়েছে তার ৪২% আর কখনো ফিরে আসবে না। এই কাজ হারানোর খতিয়ানে লিঙ্গ বৈষম্যের ছাপ স্পষ্ট। অর্থনৈতিক অবস্থার অধোগতির ফলে অনেক বেশি সমস্যায় পড়েছেন নারী শ্রমিকেরা। বিশ্বজুড়ে শ্রমশক্তির ৩৯% মহিলা কিন্তু এই সময়ে তাদের কাজ হারানোর পরিমাণ ৫৪%। ভারতে শ্রমশক্তির ২০% মহিলা কিন্তু কর্মহীনতার সমীক্ষা অনুযায়ী তাদের মধ্যে ২৩% কাজ হারিয়েছেন।

 

অক্সফ্যামের প্রতিবেদনে এটাও পরিষ্কার যে কর্পোরেটদের এই সুপার প্রফিট অর্জিত হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে বাজি রেখে। আমেরিকার মাংসপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের মালিকরা কোন স্বাস্থ্য বিধি না মানার কারণে হাজার হাজার শ্রমিক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন,বহু মানুষ মারা গেছেন। করোণায় স্বামি হারানো এক মার্কিন মহিলা অক্সফ্যামের তথ্য সংগ্রাহকের  কাছে এক মর্মস্পর্শী বক্তব্য রেখেছেন — “they need workers to make money, but they don’t care about people’s life. The chicken plant still works, still makes money…. if my husband – if they care about his health, if they let him know about the fever…. he’ d still be living now”.

 

উল্টে আমরা দেখলাম সেদেশের সবচেয়ে বড় মাংসপ্রক্রিয়াকরণ কোম্পানি টাইসন ফুডস আরো নমনীয় সুরক্ষা বিধি প্রণয়নের জন্য সরকারের কাছে ওকালতি করছে। খনি শিল্পে পৃথিবীর কোথাও কখনো কাজ বন্ধ থাকেনি, সর্বত্র শ্রমিকরা কাজ করেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। পেরু, কঙ্গো, মেক্সিকো, গুয়াতেমালা — সর্বত্র একই চিত্র। এদেশে লকডাউনের সময় বিভিন্ন কয়লাখনিতে শ্রমিকরা বার বার স্যানিটাইজার, মাস্কের জন্য বিক্ষোভ করেছেন। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ কল সেন্টার টেলিপারফরম্যান্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে অস্বাস্থ্যকর, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করানোর। ফুড চেন ম্যাকডোনাল্ডের বিরুদ্ধে সুরক্ষাবিধি ভঙ্গের মামলা হয়েছে। আমাজনের বিরুদ্ধে নানা দেশে সুরক্ষা ছাড়া জোর করে শ্রমিকদের কাজ করানোর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কর্পোরেটরা তাদের লাভ বজায় রাখতে আর্থিক ঝুঁকিটা তাদের সাপ্লাই চেনের উপর ছেড়ে দিয়েছে। অক্সফ্যামের রিপোর্টে রয়েছে ভারতে চা শিল্পে টাটা টি, ইউনিলিভার হিন্দুস্তান মুনাফা করছে কিন্তু নারী শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি পাচ্ছে না। পৃথিবীর বৃহৎ পেশাক ব্র্যান্ডগুলি একতরফা অর্ডার বাতিল করেছে ফলে বিপদে পড়েছে থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, মায়ানমার প্রভৃতি দেশের খুদে কনট্রাকটার ও তাদের অধীনে কাজ করা শ্রমিকরা।

 

এই অসম আর্থিক কার্যকলাপের ফলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলি ঋণের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে। ২০২০ সালে এই ধরণের দেশগুলোর নতুন ঋণের পরিমাণ হবে ১১ ট্রিলিয়ন ডলার, আর ধার মেটাতে ব্যায় হবে ৩.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর বহু দেশ এখন স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে যত ব্যয় করছে তার থেকে বেশি টাকা খরচ করছে ঋণ মেটাতে।

 

অক্সফ্যামের এই প্রতিবেদন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিষ্ঠুর জনবিরোধী চরিত্রটা আরেকবার উন্মোচিত করল। করোনাকালে জোসেফ স্টিগলিজ সহ বহু অর্থনীতিবিদ প্রস্তাব দিয়েছিলেন কোভিড ট্যাক্স বসানোর। কর্পোরেটরা যদি সেই কর দিত তবে এই সময় আক্রান্ত মানুষদের পরীক্ষা, একটি উন্নত সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, সর্বোপরি আগামী দিনে সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য বিনামূল্যে টিকার ব্যবস্থা করা যেত। কিন্তু ‘Reform with a human face’ যে এক নির্লজ্জ মিথ্যাচার তা করোনা পরিস্থিতিতে আরেকবার প্রমাণিত হল। মুনাফা ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন এই পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভিত্তিস্তম্ভ। একে সংশোধন করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন।

 

  • লেখক স্কুল শিক্ষক  গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী 

 

  • Feature Image courtesy The Guardain

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Ratish Deb on October 8, 2020

    A very useful and informative article. It speaks for change of existing exploitative system. Thanks a lot.

Leave a Comment