টেলিভিশনে মুখোমুখি : নেরুদা ও গাবো


  • September 22, 2020
  • (0 Comments)
  • 1475 Views

১৯৭১ সালে চিলের কবি পাবলো নেরুদার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির দু’দিন পরে ভেনেসুয়েলা টেলিভিশনের চ্যানেল Tele Sur নেরুদা ও গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মধ্যে এই কথোপকথনটি রেকর্ড করে। গার্সিয়া মার্কেস তখন বার্সেলোনায় ছিলেন এবং একনায়কতন্ত্র নিয়ে তাঁর উপন্যাস ‘কুলপতির শরৎকাল’ লিখছিলেন। নেরুদার বিশেষ অনুরোধে তিনি প্যারিসে যান নোবেল প্রাপ্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক ভোজসভায় যোগ দিতে। সেখানেই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয় এবং দর্শক সেই প্রথমবার বিশ্বসাহিত্যের এই দুই মহারথীকে টেলিভিশনের পর্দায় মুখোমুখি হতে দেখলেন। নেরুদা কথা বলেছেন কিভাবে কবিতার মধ্যে গল্প বলা যায় আর গার্সিয়া মার্কেস বলেছেন কিভাবে তাঁর গল্পকে কাব্যধর্মী করতে চান। ওঁরা কথা বলেছিলেন স্প্যানিশে, এখানে পড়ে নেওয়া যেতে পারে তার বাংলা ভাষান্তর। অনুবাদ: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

 

গার্সিয়া মার্কেস: তুমি জানো যে নামকরা সাংবাদিকদেরও যখন কিছু বলবে, তাঁরা সেটা না লিখে ঠিক অন্য কিছু লিখবেন। তবুও, আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি, যে আমি সাংবাদিকতায় ফিরে যেতে চাই। আর তা রিপোর্টার হিসেবে। কেননা আমার মনে হয় যে সাহিত্যকর্মে যত বেশি নিমগ্ন হবেন, বাস্তব থেকে তত বেশি দূরে চলে যাবেন। অন্যদিকে রিপোর্টারের কাজ করলে সর্বক্ষণ প্রত্যক্ষ বাস্তবের সঙ্গে যোগ থাকতে বাধ্য। এখন একজন ঔপন্যাসিকের যদি এটা মনে হয় আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে যে পাবলো তুমি যখন কবিতা লেখ তখন তোমার কি মনে হয়। কবিতা কি তোমাকে প্রতিদিনের বাস্তব থেকে দূরে নিয়ে যায়, না কি বাস্তবকে ব্যাখ্যা করতে, তাকে আবিষ্কার করতে সাহায্য করে?

 

পাবলো নেরুদা: বেশ, আসলে কবিদের একটা সাধারণ প্রবণতা থাকে জীবন্ত বাস্তব থেকে, প্রতিদিনের বাস্তব থেকে, জলজ্যান্ত বাস্তব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা। সর্বোপরি, কিছু বছর আগের কবিরা, বিশেষ করে এই শতাব্দীর শুরুর পর থেকে, মানে মালার্মের পর থেকে, হেরমেটিক কবিদের সময় থেকে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ঔপন্যাসিকদের প্রতি ঈর্ষা অনুভব করি, কেননা, যে কোনও ভাবেই হোক না কেন গল্পের সঙ্গে তাঁদের সরাসরি যোগ রয়েছে। কত কিছু নিয়ে তাঁরা গল্প বলতে পারেন যা কবিতার ক্ষেত্রে পরিত্যজ্য হয়ে গেছে। কিন্তু এই গল্পই ছিল কবিতার উৎস, যাকে নাম দেওয়া হয়েছিল মহাকাব্যিক কবিতা, সে কবিতা আর ফিরে আসে নি। মহাকাব্যিক কবিতার প্রতি চিরকালই আমার একটা ঝোঁক ছিল। চিরকাল আমি হিংসা করেছি ঔপন্যাসিকদের, কেননা তাঁরা অনেকটা বলতে পারেন। অনেক কিছু নিয়ে বলতে পারেন। আর যদি কোনও লেখকের লেখায় অনুসন্ধান ও নিমজ্জন একত্রিত হয় প্রত্যক্ষ বাস্তব ও জাদু বাস্তবের মধ্যে তাহলে তার অন্যতম উদাহরণ হল গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, যার সঙ্গে এই মুহূর্তে আমি কথা বলছি।

 

গার্সিয়া মার্কেস: আমার কিন্তু সত্যিকারের প্রবণতা আছে আমার গল্পকে বা উপন্যাসকে কবিতার দিকে নিয়ে যাওয়ার। আমি জানি না এটা আমার সহজাত প্রবণতা, না কি কাজ করতে করতে এই ঝোঁকটা আমার মধ্যে জন্ম নিয়েছে। কাজের অনুপ্রেরণার মতো আমি খুঁজতে থাকি কিভাবে আমার লেখার শেষটা আখ্যানধর্মী না হয়ে কাব্যধর্মী হয়ে উঠবে। এখন, আমার জানা নেই, আমাদের এই আলোচনাটা ঠিক কোনপথে আমাদেরকে নিয়ে যাবে। আমরা তো বসেছি দূরদর্শনের জন্য, অনেকটা কৃত্রিমভাবে, তাই না?

 

পাবলো নেরুদা: যতটা কৃত্রিম ভাবছ, ঠিক ততটা নয়। তোমার ঠিক বিপরীতে সারাটা জীবন ধরে আমি খুঁজেছি কিভাবে কিছু বলব, কিভাবে আমার লেখার মধ্যে দিয়ে একটা গল্প বলব। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে আমি আর ভয় পাই না। আর ঠিক এই প্রসঙ্গেই ভাবি যে মহাকাব্যিক কবিতাকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করেছিল, সেই কবিতা যা একটা গল্প বলে, বা আরও ভালো করে বললে যা একটা জনপদের গল্প বলে। বলে সেখানকার মানুষদের সংগ্রামের কথা, তাদের আবেগ-অনুভূতির কথা, যেমনটা লিখেছিলেন হোমার বা দান্তে। কিন্তু আর কেউ সে কবিতা লিখতে চায় না। আমি অবশ্য লিখতে ভয় পাই না, যদিও আমি হোমারও নই, দান্তেও নই। শুধু মহাকাব্যিক কবিতা কেন, মানুষ নীতি কবিতাও ভুলে গেছে, যে কবিতা কিছু শেখায়। আমি চেয়েছিলাম যে আমার কবিতা নিয়ে গদ্য তৈরি হোক। এই যে তুমি তোমার নিজস্ব ধরণের জন্য, পরিবর্তনশীলতার জন্য কবিতার দিকে যাওয়ার তাগিদ অনুভব কর, আমারও সে অনুভূতি ছিল গল্পের প্রতি। এ হল একজন লেখকের সমৃদ্ধ হওয়ার দুটি উপকরণ। কেননা সমস্ত প্রান্তে-প্রত্যন্তেই নিজেকে মেলে ধরতে হবে আর তা করতে হবে একজন সাংবাদিকের মতো, যেমনটা তুমি বলছো।

 

গার্সিয়া মার্কেস: তাহলে আমার মনে হয় যে আমরা পৌঁছতে পারি। তুমি কবি হিসাবে আর আমি লেখক হিসাবে, মানে কবিরা কবি হিসাবে আর লেখকরা গল্পকার হিসাবে এমন একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে পৌঁছতে পারি যেখানে কবিরা প্রতিনিয়ত আরও বেশি গল্পকার হয়ে উঠবে আর গল্পকাররা কবি। (নেরুদা বক্তব্যের মাঝে বললেন: একটি সম্মিলিত বোঝাপড়া) আর এর জন্য আমরা ঝগড়া করব না, বরং আরও বেশি বন্ধু হয়ে উঠব আর আনন্দ করব, এই যেমন তোমার নোবেল প্রাপ্তির জন্য এখন আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। তোমার মতো একজন কবিকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার জন্য আমরা গল্পকাররা যতখানি খুশি হয়েছি, আমাকে যখন পুরস্কারটা দেওয়া হবে, তখন তুমিও একই রকম খুশি হবেন। কেননা, যেভাবে সবকিছু এগোচ্ছে এবং আমার সম্বন্ধে যেসব কথা তুমি বলে বেড়াচ্ছ তাতে তো আমার মনে হচ্ছে যে অত্যন্ত সন্দেহভাজনভাবে তুমি সুইডেনের একাডেমিকে প্রভাবিত করছ। (নেরুদা হাসছেন)

 

পাবলো নেরুদা: কেউই সন্দেহজনক কিছু করছে না, আমি তো নয়ই। তুমি তোমার মহৎ কাজের জন্য এই পুরস্কারের যোগ্য। কিন্তু আমরা আমাদের মূল বিষয় থেকে সরে যাচ্ছি। ফিরে আসা যাক। তোমাকে বলেছি যে আমি ঔপন্যাসিকদের হিংসা করি। কিন্তু গদ্যে কোনও কিছু বলতে আমি অপারগ, এটাও সবসময় অনুভব করি। এবং তার প্রমাণ হচ্ছে এই যে আমি সবসময় ভাবি কিভাবে একজন গল্পলেখককে খুঁজে পাব, যাকে এই গল্পটা বলতে পারব। তুমি তো সবসময় এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে ব্যস্ত, কখনও কলোম্বিয়ায় বা কখনও বার্সেলোনায়। তাই তোমাকে ধরতে পারি না, তোমাকে বলতে পারি না যে কি জানলাম, কি দেখলাম।

 

গার্সিয়া মার্কেস: কিন্তু আসল ব্যাপারটা হল এই যে যখনই আমরা একসঙ্গে কোথাও যাই বা আমাদের দেখা হয় তুমি এমন সব অসাধারণ গল্প বল যে তোমার হাতে শুধু একটা মাইক্রোফোন দেওয়াই বাকি থাকে। তাহলেই সেগুলো লেখা হয়ে যেত আর হয়ে উঠত অত্যাশ্চর্য কিছু কাহিনী।

 

পাবলো নেরুদা: তুমি যদি সত্যি সত্যিই একটা মাইক্রোফোন দিতে তাহলেই দেখতে সেগুলো কিরকম ক্লান্তিকর হয়ে উঠত। কেউ সেগুলো পড়ত না, আমি একদম নিশ্চিত। বিপরীতে তোমাকে খোলাখুলি ভাবে বলছি, আমার কাছে কবিতার সমস্যার, অন্যান্য সমস্ত কাজের মতো যে সব বাধা-বিপত্তি কবিতায় আসে তাদের সম্মুখীন হওয়া আমার পক্ষে যেন মাছ হয়ে একটা ছোট্ট শান্ত নদীর জলে সাঁতার কাটার মতো। কষ্ট করে হলেও বিভিন্ন গঠন রীতির মাধ্যমে, বৈচিত্রের মাধ্যমে সেই সমস্যাগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। কিন্তু আরও গভীরে আমি একজন উপন্যাস পাঠক। আমি প্রায় সব ধরণের উপন্যাস গোগ্রাসে পড়ি। আমি কাব্যধর্মী উপন্যাস পড়ি। যেগুলো তোমার লেখার আগেই প্রকাশিত হয়েছে, যেমন লুই আরমন্ড (Louis Armand), বাস্তবধর্মী উপন্যাস পড়ি যেমন, একাকিনী (Sola)। আবার একই সঙ্গে ডজন ডজন গোয়েন্দা কাহিনী পড়ি। বাস্তবিক যে কোনও উপন্যাসই কোনও না কোনও ভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছায়। কিন্তু আমার কাছে এটা খুবই আশ্চর্য মনে হবে যেমন ধরা যাক একজন ট্রেন ধরার আগে আমার একটি বই কিনছে। আমি খুশিই হতাম যদি দেখতে পেতাম যে একটা দিন ট্রেনে যাওয়ার জন্য কেউ পয়সা দিয়ে আমার বই কিনল। তবে এটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়; বরং অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত হবে যদি ওই ব্যক্তিটি মানে ওই যাত্রীটি একটা উপন্যাস কেনে পড়ার জন্য। এরকমটাই আমার মনে হয়। আমি তো বলেইছি যে উপন্যাস হচ্ছে গরুর মাংসের স্টেক যা মানুষ মজা করে খায়।

 

গার্সিয়া মার্কেস: তাহলে কবিতা কি?

 

পাবলো নেরুদা: কবিতা, কবিতা স্বতন্ত্র বিষয়।

 

গার্সিয়া মার্কেস: উপন্যাস যদি গরুর মাংসের স্টেক হয় তাহলে কবিতা কি?

 

পাবলো নেরুদা: কবিতা খুব সূক্ষ একটি কাজ, একটু উন্নাসিকও বটে। কবিতা প্রেমেরই একটা অংশ, শরীরি প্রেমের একটা প্রকাশ। কবিতা আরও অনেক কিছু, একান্ত নিজস্ব আর খুব বেশি গাঢ়। কিন্তু এসব বিতর্কিত কথা। কেননা আমিই তো বৃহৎ প্রেক্ষাপটের কবিতা ভালোবাসি, যা ছড়িয়ে পড়ে বাইরে, গণ আন্দোলনের ডাক দেয়। কিন্তু বাস্তবত কেউ যখন একটা কবিতার বই হাতে তুলে নেয় এবং সচেতনভাবে তা পড়ে, কবি-আত্মার সঙ্গে তার গোপন ও অজ্ঞাপনীয় এক সংযোগ তৈরি হয়। এই আত্মনিষ্ঠ সংযোগের অস্তিত্ব আছে এবং তা সত্য আর এই বিশেষ পাঠক তা অনুভব করে এক বিকল্প তড়িৎ প্রবাহের মতো।

 

গার্সিয়া মার্কেস: বেশ, আমার মনে হচ্ছে বিষয়টা নিয়ে অনেক কথাই বলা হয়ে গেছে। দেখ তুমি আর কিছু বলতে চাও কিনা। কেননা পাবলোর সঙ্গে আমার যে সুন্দর আলাপচারিতা হয়, তা আসলে হয় সাংবাদিকদের অনুপস্থিতিতে, এত মাইক্রোফোন বা এত ক্যামেরা সামনে না থাকলে। তবে সময় শেষ হওয়ার আগে আমি এই সুযোগে চিলের মানুষদের অভিনন্দন জানাতে চাই। প্রথমত চিলের এমন একজন কবিকে এতখানি সম্মান জানানোর জন্য যিনি আমার কাছে বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর সমস্ত ভাষার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কবি এবং তারপর চিলের জনগণকে ফ্রেন্তে পপুলার-এ্রর সাফল্যের জন্য জানাই আমার উচ্ছ্বাস ও সমর্থন।

 

পাবলো নেরুদা: গাব্রিয়েল, এবার আমাকে অনুমতি দাও, আমার রাষ্ট্রদূতের কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য। আমি অভিনন্দন জানাই আমার দেশ চিলেকে এবং তোমার আন্তরিকতা ও আমার সম্বন্ধে যা বললে তার জন্য। তবে আমি ব্যাপারটাকে উল্টোদিক থেকে বলব, প্রথমে আমি আমার দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাব আমাদের বিশাল মহাদেশের একটা অংশের ও দেশের মানুষকে ন্যায় বিচার ও সম্মান দেওয়ার জন্য যে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে তারা লড়াই করেছে তার জন্য। আমার মনে হয় যে আমাদের সময় শেষ হয়ে আসছে এবং চিলের মানুষদেরও, যাঁরা আমার কথা শুনছেন। তবে আমি একজন নতুন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কথা বলতে চাই। এখানে শুধু তুমি আর আমি কথা বলব এমনটা হওয়া উচিত নয়। তাই আমি পরিচয় করিয়ে দিতে চাই এক ভয়ংকর জীবের সঙ্গে যাকে আমি আফ্রিকা থেকে নিয়ে এসেছি। এক সিংহ (একটি বড় টেডি সিংহকে দর্শকদের সামনে উপস্থিত করলেন এবং নেরুদা ও গার্সিয়া মার্কেস দুজনেই হাসছেন), একটা সিংহ, সত্যিকারের সিংহ। ওকে আমরা কিছু প্রশ্ন করবঃ এই যে দুটো কাকা এতক্ষণ ধরে বকবক করে গেল এ ব্যাপারে তোমার মতামত কি? এ একদম চুপ করে গেছে।

 

গার্সিয়া মার্কেস: কিন্তু ওর নিস্তব্ধতাটা অনেক কিছু বলছে।

 

পাবলো নেরুদা: ও আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞানী।

 

 

১ Frente Popular: চিলের একটি বামপন্থী জোট।

 

অনুবাদক স্পেনীয় ভাষার অধ্যাপক ও অনুবাদক।

Share this
Leave a Comment