ফেসবুক, ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদ-বিরোধী রাজনীতি


  • September 20, 2020
  • (1 Comments)
  • 757 Views

মুনাফা করার জন্য টেক কোম্পানিগুলোর যে বিগ ডেটার ব্যবসা, তার প্ৰযুক্তি এবং পদ্ধতিই এমন, যে আজকের সময়ের যে কোন ফ্যাসিবাদী প্রকল্পে তা নিরন্তর ব্যবহৃত হতে বাধ্য। ফ্যাসিবাদী মিথ্যা প্রচার বাড়ানোর পক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ার চাইতে ভালো কিছু ভাবাই সম্ভব নয়। বেশির ভাগ বড় মিথ্যার পিছনে বড় পুঁজি থাকে, রাষ্ট্রও থাকে। রাষ্ট্র ও পুঁজি একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, ফলে পুঁজির পক্ষে রাষ্ট্রবিরোধী হওয়া মুশকিল।  

ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ ট্যুইটার ব্যবহার করে রাজনৈতিক কাজ করার চেষ্টা করছেন যে বামপন্থী এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ব্যবহারকারীরা, তাঁরা বুঝতে পারছেন না কিম্বা চাইছেন না, ফ্যাসিবাদীদের পক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ার প্ৰযুক্তি যেভাবে ব্যবহার করা সম্ভব, বামপন্থীদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। ফ্যাসিবাদ অর্থে সংগঠিত ঘৃণার, মিথ্যার, অযুক্তির, কুৎসার, হিংসার চাষ। তথাকথিত সমাজমাধ্যমে এই চাষ যেভাবে করা যায়, সেভাবে ন্যায়ের ও সামাজিক সাম্যের লড়াই করা যায় না। প্রথমটা বিবর্ধন অর্থাৎ অ্যাম্পলিফিকেশনের ওপর টিকে থাকে, যা বলা হচ্ছে তার সত্য/মিথ্যা নির্ভর করে চিৎকারের শক্তির ওপর, পেশীবহুলতায়। দ্বিতীয়টাকে টিকে থাকতে হয় সমাজের গভীরে কাজ করে, অসাম্যের অযুক্তি থেকে সাম্যের যুক্তিতে উত্তরণের মধ্য দিয়ে। প্রথমটা দ্রুত ঘটতে পারে, যেহেতু গুজব ছড়াতে বা দাঙ্গা লাগাতে সময় লাগে না। দ্বিতীয়টা ধীর সময়সাপেক্ষ কাজ, তা নির্ভর করে স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে যৌথ বিরুদ্ধতার ওপর, সেই বিরুদ্ধতা যে সম্ভব সেই জ্ঞানের ওপর, সংগঠনের ওপর। জ্ঞান তৈরির সামাজিক প্রক্রিয়া একদিনে গড়ে ওঠে না, সমাজে সম্পৃক্ত থেকে সে জ্ঞান অর্জন ও আহরণ করতে হয়।

মাঠের সংগঠন, শারীরিক মেলামেশা, এসবের পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বামপন্থীদের কাজকে দুর্বল করে। রাষ্ট্র ক্রমশ ফ্যাসিবাদী, আক্রমণরত, এসময়ে স্ক্রিননির্ভর কাজের কোন অর্থ থাকতে পারে না। যে খণ্ডসর্বস্ব গোষ্ঠীকেন্দ্রিক অরাজনীতির ভাইরাস ভারতবর্ষের এবং বাংলার বামপন্থী আন্দোলনকে ভিতর থেকে নষ্ট করছে, তা বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে সমাজমাধ্যমের বস্তুত মিথ্যা স্ক্রিনপরিসরে। বামপন্থী কর্মীরা, বিশেষত তরুণ কর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছেন; প্রকৃত সামাজিক ঘটনা নয়, তাঁদের কাজ পরিচালিত হচ্ছে ওই ঘটনার স্ক্রিনপ্রচার ও স্ক্রিনবাস্তবতা দিয়ে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে কিনা, ঘটলে কিভাবে, বর্তমান লেখকের জানা নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার রাজনীতি এবং ফ্যাসিবাদের সঙ্গে এই প্ৰযুক্তির অঙ্গাঙ্গী যোগ বিষয়ে বামপন্থীরা কিঞ্চিদধিক সচেতন হবেন, বিষয়টা নিয়ে ভাববেন, এই প্রত্যাশায় এই লেখা। প্রয়োজনমতো পরে এ নিয়ে আরো কথা বলা যাবে। লিখলেন সৌমিত্র ঘোষ

 

 

ফেসবুক ও বিজেপি

ফেসবুক নিয়ে খুব হইচই চলছে কদিন। ওয়াল স্ট্রিট জর্নলে ফেসবুক কোম্পানির সঙ্গে এতদ্দেশীয় বিজেপি দল ও সরকারের নিগূঢ় ও নিয়মিত যোগাযোগের কিস্যাটি সামনে আসার পর থেকেই ভারতবর্ষের অ-বিজেপি বড় মিডিয়া ফেসবুক নিয়ে খবর করছে। ওয়াল স্ট্রিট জর্নলে প্রথম কিস্তির খবর হবার পর টাইম ম্যাগাজিনেও ওইরকম একটা খবর বেরোয়। হালে এমনকি আমাদের আনন্দবাজারেও দেখলাম ফেসবুকের কুপ্রভাব ইত্যাদি নিয়ে ধারাবাহিক খবর বেরুচ্ছে। ফেসবুক দেখি না, ফলে সেখানে কি হচ্ছে জানা নেই।

 

প্রথমত, ফেসবুক-বিজেপি যোগাযোগের যে ছবিটা সামনে আসছে, যেটা নিয়ে ইদানীং দেশীয় রাজনীতিতে শোরগোল, তার মোদ্দা সারসংক্ষেপ, ফেসবুক কর্পোরেশনের ভারতীয় কর্তাদের মধ্যে চাঁইস্থানীয়রা বিজেপির সঙ্গে গোপন বোঝাপড়া করেছেন। বোঝাপড়াটা এরকম : বিজেপি-আরএসএস-এর নেতামন্ত্রীরা মুসলমান ইত্যাদি পোকামাকড় এবং তাদের বাম-লিবরল সমর্থক খান-মার্কেট/লুটিয়েন এলিট গ্যাং ইত্যাদি দেশদ্রোহী বজ্জাতদের প্রতি যে জ্বলন্ত ঘৃণা উদ্‌গীরণ হামেশাই করে থাকেন, ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপে তা নির্বাধ চলতে দেওয়া হবে। হেট স্পিচ এবং এজাতীয় অসামাজিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ফেসবুক যেসব ব্যবস্থাদি নিয়ে থাকে (নেয় বুঝি?), সেসব এক্ষেত্রে নেওয়া হবে না। এসবের বিনিময়ে বিজেপি ফেসবুককে নানারকম সুবিধা করে দেবে। যথা, প্রস্তাবিত হোয়াটসঅ্যাপ মারফত টাকাকড়ি লেনদেনের বিষয়ে সরকারি ছাড়পত্র দেওয়া। দ্বিতীয় কথাটা হলো, দেশজুড়ে বিজেপির যে সমর্থকমণ্ডলী, তার প্রায় সবাই হয় ফেসবুক নয় হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে থাকে। সেই ব্যবহারের প্রায় সবটাই ঘৃণার চাষ, ফলে বিজেপির লোকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে ফেসবুকের ভারতবর্ষীয় বাজারটাই বিপর্যস্ত হয়ে যাবে।

 

সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ব্যবহার’?

বলে রাখা ভালো, এই লেখাটা ইতিমধ্যেই বহুচর্চিত ফেসবুক-বিজেপি যোগাযোগ নিয়ে নয়। ২০১৪-র আগে থেকেই বিজেপির পুনরুত্থানের জমি তৈরি হচ্ছিলো। এতদিনে মোটামুটি সবার জানা হয়ে গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা সেখানে কী ছিলো, সেসময় থেকে শুরু করে আজ অবধি বিজেপির যাবতীয় ভোট প্রচারে (এবং ভোট না থাকলেও) এই নতুন মাধ্যম কী সুকৌশলে, কী যত্নে দিবারাত্র ব্যবহৃত হয়। দলমতনির্বিশেষে বিজেপির বিরোধী যাঁরা, তাঁদের কাছে মূল বিষয়টা ছিলো সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার ও ব্যবহারের কৌশল বা ধরনধারণ। বিজেপি আসলে ব্যবহারের কায়দাটা ধরে ফেলেছে – তারা তৈরি – তাদের আইটিসেল ইত্যাদি চূড়ান্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার খাবার অর্থাৎ কন্টেন্ট তৈরি করে ফেলছে, আমরা পারছি না। মানে, ব্যাপারটা গিয়ে দাঁড়ালো, ‘না পারা’টাকে ‘পারা’ বানিয়ে ফেলতে হবে। বিজেপি এবং আরএসএস টেকনোলজি ব্যবহার করছে, আমাদের পিছিয়ে থাকলে চলবে না। ফলে যে যেখানে আছে ঝাঁপিয়ে পড়ো। বড় দলগুলো নিজেদের আইটি সেল/টিম খুলে ফেললেন। যাঁরা পারলেন না, ঝপাঝপ ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ গ্ৰুপ খুলতে শুরু করলেন। এর ভিতরে কাতারে কাতারে বামপন্থী জনগণও সামিল, সিপিএম জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক বড় বাম তো বটেই, অ-সিপিএম বামরাও, যাঁদের অনেকেই নিজেদের ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবী’ নামে ডাকতে পছন্দ করেন, কেউ বাদ গেলেন না। সমাজ না হোক, ‘ফেসবুক সমাজ’ মুষ্টিবদ্ধ লাল হাত, পৎপৎ লাল ঝান্ডা, লাল সেলাম ও ‘সঙ্গে আছি’ ‘ধিক্কার’ জাতীয় সহমর্মী বিজ্ঞপ্তিতে ভরে গেলো। এর ফল কী দাঁড়ালো সে প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাবে।

 

ইউরোপ-আমেরিকার পশ্চিমী দুনিয়ায় সমাজমাধ্যম অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়া এবং সাংখ্যমাধ্যম বা ডিজিট্যাল মিডিয়া নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে বহুদিন। সেটা শুধুমাত্র ফেসবুক-কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা-ট্রাম্প-পুটিন গ্যাঁড়াকল নিয়ে নয়। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য কী করে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা যথা বদ কোম্পানি মারফত মার্কিনি ভোট ব্যবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে, কী করেই বা পুটিনের লোকজন ভায়া সোশ্যাল মিডিয়া মার্কিনি ভোটারদের অন্দরমহলে পৌঁছে গিয়ে গোল পাকাচ্ছে, এসবই খবর, এবং অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ খবর। ঝামেলাটা হলো, সমাজমাধ্যম/সাংখ্যমাধ্যম এবং আমাদের ব্যক্তি ও কৌমজীবনে তার প্রভাব, এত সহস্র বছরের মানবসভ্যতা, সেই সভ্যতার ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি এবং ভাষা, এসবের মধ্যে সাংখ্যপ্ৰযুক্তিতে ভর করে ধেয়ে আসা নতুন সাংখ্যমাধ্যম কিভাবে সব গোল পাকিয়ে দিচ্ছে, এই সব বিষয়গুলো একে অন্যের সঙ্গে জড়াজাপটি করে আছে, সেই জট খোলা সহজ নয়। মার্কিনি ভোটে ফেসবুকের প্রভাব কিম্বা ফেসবুক-বিজেপি আঁতাত জাতীয় সহজ খবরের চৌহদ্দিতে সব ব্যাপারটা খোলসা হবে, এমনও নয়। সমাজমাধ্যম/সাংখ্যমাধ্যম বিষয়ে হালের পশ্চিমী চর্চা খবরের সহজ বৃত্ত ছাড়িয়ে বিষয়ের গভীরে ঢোকার চেষ্টা করছে। অন্যত্র এ নিয়ে বিস্তারিত বলা আছে। আপাতত আমরা মূলত সাংখ্যমাধ্যমের সঙ্গে রাজনীতির যোগ নিয়ে কথা বলবো। রাজনীতি বলতে এখানে শুধুমাত্র সাদামাটা রাষ্ট্রনির্ভর ভোটের রাজনীতি বোঝানো হচ্ছে না। রাজনীতি মানে এখানে অতিরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ফ্যাসিবাদী রাজনীতি, রাষ্ট্রবিরোধী বামপন্থী রাজনীতি উভয়ত।

 

ফ্যাসিবাদী রাজনীতি বলতে কি?

ফ্যাসিবাদী রাজনীতি দিয়ে শুরু করি। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে সংহত রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে ফ্যাসিবাদ আত্মপ্রকাশ করে। ইতালিতে মুসোলিনি, স্পেনে ফ্রাঙ্কো এবং জর্মনিতে হিটলারের আবির্ভাব প্রায় সমসময়ে। ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং আমেরিকায় ফ্যাসিবাদী রাজনীতি মাথা চাড়া দিতে থাকে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময় ধরে একটি বা একাধিক বিশেষ ভূখন্ডের ভৌগোলিক চৌহদ্দির মধ্যে সীমিত আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলি মাথা তোলে। জাতিরাষ্ট্র গঠনের মূল উপাদান জাতি। শুধু বিশেষ ভূগোল থাকলেই চলবে না। সেই ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত ইতিহাস চাই, সংস্কৃতি চাই, ভাষা চাই, এমনকি ধর্ম চাই, নৃতত্ব অর্থাৎ গায়ের রঙ শরীরের গড়ন এসবও চাই। একটি বিশেষ ভূগোলের মধ্যে একটি বিশেষ ভাষাভাষী সমসংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর বহুকাল বসবাস। অর্থাৎ জাতি, সেখান থেকে জাতিরাষ্ট্র। সভ্যতার আদিপর্ব থেকে পৃথিবীর একপ্রান্তের মানুষ অন্যপ্রান্তে গিয়ে আস্তানা গেড়েছেন, সভ্যতা সংস্কৃতির মিলন ঘটেছে, রক্তমাংসজিনেরও। ধর্মের সঙ্গে গায়ের রঙ এবং জাতি ও রাষ্ট্র মিশিয়ে যে জাতিরাষ্ট্র তৈরি হয়, তা অন্য জাতিরাষ্ট্রের মতো নয়। প্রকাশ্যে বলা হোক আর নাই হোক, এই জাতিরাষ্ট্রের কোষে কোষে ফ্যাসিবাদ ঢুকে রয়েছে।

 

ফ্যাসিবাদের কুললক্ষণ কী কী?

 

  • এক, রাষ্ট্রকে রাজনীতি ও সমাজনীতির কেন্দ্রে রাখা। কেন্দ্রে অর্থাৎ নির্ণায়ক-নির্ধারক ভূমিকায়, নাগরিকদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত-নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র মারফত। রাষ্ট্রবিরুদ্ধতা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে। রাষ্ট্রবিরুদ্ধতা বলতে কী বোঝায়, তাও ঠিক করবে রাষ্ট্র। ফলত রাজনৈতিক-সামাজিক বিরুদ্ধতা প্রকাশের ন্যূনতম অবকাশ থাকবে না।
  • দুই, রাষ্ট্র তার নিজের মতো করে জাতির সংজ্ঞা তৈরি করবে। ভাষা, ধর্ম, গায়ের রঙ, শরীরের গঠন ইত্যাদির ওপরে নির্ভর করে জাতি তৈরি হবে।
  • তিন, রাষ্ট্র ও জাতির সঙ্গে দেশ বিষয়টিকে এক ও অভিন্ন করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ যা জাতিরাষ্ট্র তাই-ই দেশ হয়ে দাঁড়াবে।
  • চার, দেশের জন্য দেশের ইতিহাস খুঁজে বার করতে হবে। সে ইতিহাসে বিধর্মী ও বিজাতীয়দের জায়গা হবে না। এমন ইতিহাস যদি না থাকে, ইতিহাস বানাতে হবে। নিছক গল্পকাহিনী পুরাণ সাহিত্য – এসব থেকে উপাদান নিয়ে সে ইতিহাস তৈরি হবে। দরকার মতো প্রত্ন-উপাদান নির্মাণ করতে হবে সাক্ষ্য হিসেবে।
  • পাঁচ, দেশ বলতে ইতিহাস, এবং ভূগোলও। কাল্পনিক, মনগড়া ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে কাল্পনিক ভূগোল তৈরি হবে, মানচিত্র তৈরি হবে।
  • ছয়, কাল্পনিক ভূগোলকে বাস্তব করে তোলার জন্য সামরিক অভিযান ও যুদ্ধবিগ্রহ চালাতে হবে।
  • সাত, ওপরের কাজগুলো নির্বিঘ্নে চালানোর প্রয়োজনে সমাজের ওপর ফ্যাসিবাদী আধিপত্য তৈরির জন্য চূড়ান্ত দমন চালাতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামো দরকার মতো বদলে নিতে হবে, অথবা সে কাঠামো গ্রাহ্য করা হবে না।
  • আট, রাষ্ট্রীয় এবং রাষ্ট্রের প্রশ্রয়বৃত্তে ঘটা দমনপীড়ন এমনকি গণহত্যা বা গণধর্ষণের মতো অপরাধকেও সমাজগ্রাহ্য করে তুলতে হবে। যে জাতিরাষ্ট্র ভিত্তি করে ফ্যাসিবাদ প্রমত্ত হয়ে উঠছে, তার গরিষ্ঠসংখ্যক নাগরিকদের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সক্রিয়, বা নিদেন পক্ষে নিষ্ক্রিয় সমর্থক করে তুলতে হবে।
  • নয়, জনসমর্থন এবং সমাজগ্রাহ্যতা তৈরি করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র নেতাদের তরফে নিরন্তর নির্জলা মিথ্যা বলে যেতে হবে।
  • দশ, এবং আমাদের বর্তমান আলোচনার ক্ষেত্রে সবচাইতে দরকারি যেটা, রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্র-অনুমোদিত মিথ্যাকে সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেবার উপযোগী পদ্ধতি-প্রকরণ বা মেকানিজম নির্মাণ করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে প্রয়োজন মতো আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ।

 

ফ্যাসিবাদ, প্ৰযুক্তি ও গণতন্ত্র

ফ্যাসিবাদ-পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী রাষ্ট্র এবং ফ্যাসিবাদ-উত্তর স্বৈরাচার পৃথক হয়ে উঠছে মূলত দুটি জায়গায়। প্রথম, পুঁজিবাদের উদ্ভব, পুঁজিবাদী শিল্পসভ্যতার উত্থান। উৎসে পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়া না থাকলে ফ্যাসিবাদী যুদ্ধযন্ত্র তৈরিই হতো না। পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির বেড়ে ওঠার ইতিহাস অচ্ছেদ্য বন্ধনে যুক্ত। পুঁজিহীন, প্ৰযুক্তিহীন পরিসরে নাজি ব্লিৎসক্রিগ ভাবাই সম্ভব নয়। গোয়েবলসীয় প্রচার এবং হলোকস্ট বা গণহত্যাও নয়। দু’ক্ষেত্রেই প্ৰযুক্তির চূড়ান্ত প্রয়োগ ঘটেছিলো। দ্বিতীয়ত, সংসদীয় গণতন্ত্র। ফ্যাসিবাদ বা আধুনিক স্বৈরাচার সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনৈতিক সূতিকাগৃহে জন্ম নেয়, গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠে। অথবা, গণতন্ত্রকে রক্ষার কথা বলে ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতায় আসে। যে জনপ্রিয়তা এবং সমাজগ্রাহ্যতা ছাড়া ফ্যাসিবাদী জননায়কদের বহিরঙ্গ ভেবে ওঠা যায় না, তার উৎসে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্রিয়াশীল থাকে।

 

সংসদীয় গণতন্ত্র এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার যে অতিপরিচিত ধাঁচ ইদানীং পৃথিবীর বেশির ভাগ জাতিরাষ্ট্রে বর্তমান, প্রচার বিষয়টার সেখানে একটা বড় ভূমিকা আছে। প্রচার বলতে সরকারের প্রচার। ভোটে জিতে সরকারে যায় যে দল, তার প্রচার। সরকারে নেই কিন্তু ভবিষ্যতে যেতে পারে, এমন বিরোধী দলের প্রচার। প্রচার না থাকলে জনসমর্থন, জনমত তৈরি হয় না, ভোটে জেতাও যায় না। প্রচার বস্তুত বিজ্ঞাপন; আর দশটি বাজারি পণ্য যেভাবে বিজ্ঞাপিত হয়, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রনায়কেরাও, রাজনৈতিক দল এবং তার কাজও সেভাবেই। প্রচার/বিজ্ঞাপন ব্যাপারটা নির্বাচনী রাজনীতির এবং অর্থনীতির রক্তমাস – পুঁজি না থাকলে প্রচার হয় না, প্রচার না হলে ভোট হয় না। ভোটের প্রচার থেকে সরকারের, রাষ্ট্রের প্রচার, রাষ্ট্রের নীতির প্রচার। “মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে”, কবে বলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। প্রচার বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় চলে যায় যে প্রচারের আড়ালের বাস্তব বিলুপ্ত হয়ে যায়। সকালসন্ধ্যা রাত্রিদুপুর জুড়ে প্রতিদিন বিরামহীন ছেদহীন প্রচার চলছে। বিক্রি চলছে। থামা যাবে না, থামলেই সেখানে অন্য কেউ ঢুকে পড়বে। না পড়লেও পড়ার সম্ভাবনা থাকবে। ফ্যাসিবাদে সেটাও হতে দেওয়া যাবে না। ফলে গোয়েবলস। ফলে ছেদহীন নিরন্তর প্রচার। নাজি প্রচারযন্ত্র অহোরাত্র যা ফেরি করতো রেডিও ও সংবাদপত্র মারফত তা আমনাগরিকের কাছে পৌঁছে যেতো। এর সঙ্গে ছিলো নাজি প্রচারপত্র, দেয়ালে সাঁটানো বিজ্ঞপ্তি, ছবিওলা বিলবোর্ড, ফিল্ম। জর্মনি সেযুগে ফিল্ম বানানোর মক্কাবিশেষ। গোয়েবলসের তত্ত্বাবধানে রাশি রাশি ছবি বানানো হতে থাকলো। রেডিও না শোনা যায়, কাগজ না পড়া যায়, ছবিও না দেখা যায়। ফলে হিটলার এবং অন্যান্যদের অমৃতবাণী লোকের কানে ঢোকানোর জন্য অন্য উপায় বের করতে হলো। প্রত্যেক শহরে প্রতি রাস্তার মোড়ে মাইক লাগানো হলো। অ্যামপ্লিফায়ার। যা বলা হচ্ছে তাকে কয়েকগুণ, লক্ষগুণ, লক্ষগুণ বাড়াতে থাকো। যত বাড়বে, চিৎকার যত জোর হবে, তত শক্তি, তত ক্ষমতা। প্রচার, বিজ্ঞাপন, আরো প্রচার, আরো বিজ্ঞাপন। মিথ্যাকে এত বাড়িয়ে তোলা হোক, যেন লোকে ভুলে যায় মিথ্যার বাইরে কিছু আছে, কোনোকালে ছিলো, থাকতে পারে।

 

সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান

ঠিক এই জায়গাতেই ফেসবুক এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্রসঙ্গে ফিরতে হয়। কেন, সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। সোশ্যাল মিডিয়ার শুরুটা যেভাবেই হোক, বছর কয়েকের মধ্যে ব্যাপারটা যেখানে গিয়ে পৌঁছোয়, তা অভূতপূর্ব। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা টুইটারের মতো কোনো যন্ত্রপ্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা ইতিপূর্বে মানবসমাজে ছিলো না, এই নতুন প্ৰযুক্তি কী করতে পারে, সে বিষয়েও ধারণা ছিলো না, না ব্যবহারকারী ভোক্তাদের, না প্ৰযুক্তিবিদদের, না পুঁজিমালিকদের। যখন বোঝা গেলো এবং দেখা গেলো ব্যবহারকারীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, এবং ব্যবহারকারীদের অধিকাংশের কাছে নতুন প্ৰযুক্তি অপরিহার্য এমনকি আসক্তির বস্তু হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এর অনন্ত রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়তে থাকলো। ফলে সমাজমাধ্যম/সাংখ্যমাধ্যম ক্ষেত্রে লগ্নি বাড়তে থাকলো, প্ৰযুক্তির পরিবর্তনও ঘটতে থাকলো আরো তাড়াতাড়ি। দ্রুত, অর্ন্তজাল (ইন্টারনেট) নির্ভর টেক কোম্পানিগুলো ফুলে ফেঁপে দৈত্যাকার হয়ে উঠলো। প্রথম প্রথম আরো বহু মানুষের মতো, এই লেখকও বিশ্বাস করতো অর্ন্তজাল বস্তুত বিনিপয়সার ব্যাপার, ইন্টারনেট ইজ ফ্রি। ফ্রি মানে যে শুধু বিনামূল্যে পাওয়া যায়, এমন নয়, নেট ও নেট প্ৰযুক্তি একটা আলাদা দুনিয়া, সেখান মুক্তচিন্তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ সদা-উৎসারিত, রাষ্ট্রের চোখরাঙানি নেই। ভাবতে ভালো, ব্যবহার করতে আরো ভালো। আমরা যারা দিনের অধিকাংশ সময় জাল ব্যবহার করি, তাদের মনে থাকে না, মনেও আসে না, পুঁজিশাসিত দুনিয়ায় মুক্তিটুক্তি মায়ামাত্র, আশা শুধু মিছে ছলনা। প্ৰযুক্তি যেখানে নিরন্তর বাজারলীন, টেক কোম্পানিগুলো যেখানে পুঁজির পাহাড়ে বসে আছে, সেখানে মুক্তির কথা ভাবা নেহায়েত আখাম্বা মূর্খতা।

 

একটু তলিয়ে ভাবলে ব্যাপারটা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। দুনিয়াজোড়া অর্ন্তজাল ব্যবস্থাটা টিঁকে আছে যে প্ৰযুক্তির ওপর সেটা প্রথমাবধি যন্ত্র, শ্রম ও পুঁজি নির্ভর। আপনি জালে ঢুকছেন কম্পিউটার, ট্যাব কি স্মার্টফোন মারফত, যেগুলোর কোনটাই বিনামূল্যে পাওয়া যায় না, যা তৈরি হয় আপাদমস্তক পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থায়, যার মূল মন্ত্র, যত তাড়াতাড়ি পারো মুনাফা বাড়াও, বাড়াতেই থাকো। মুনাফা বাড়াতে গেলে শ্রমকে সস্তা করতে হয়। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোয় হালের নিওলিবরল সময়ে সস্তা শ্রম রাস্তায় গড়াচ্ছে, সেটা ধরে ফেলো। ফোন কম্পিউটার তৈরি এবং নেট প্ৰযুক্তি খাড়া করতে গেলে যে জমি লাগবে, জল লাগবে, খনিজ কাঁচা মাল লাগবে, বিদ্যুৎ লাগবে, দক্ষিণ গোলার্ধেরই বিস্তর জনগোষ্ঠীর জীবনজীবিকা তছনছ করে তা লুটে আনা হোক। আমরা নেটে মানবসভ্যতার এতবছরের সঞ্চিত জ্ঞান জমা করছি বলে এই লুটপাট চলছে না। যে অতিকায় তথ্যকেন্দ্রে অর্থাৎ ডেটা সেন্টারে সারিবদ্ধ পরস্পরসংযুক্ত প্রসেসরশিকলে জ্ঞান জমা হচ্ছে, সেখানে আরো বেশি জমা থাকছে লক্ষ লক্ষ কোটি বাইট বাজারতথ্য। শেয়ার বাজার, যা এখন পুরোটাই চালায় যন্ত্র, যেখানে উচ্চকম্পনশীল ব্যবসা বা হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ট্রেডিং-এ ন্যানোসেকেন্ডে পুঁজি লগ্নি হয়, বাড়ে। যন্ত্রবাজার, যে যন্ত্র ছাড়া আধুনিক বাজারকে ভাবাই যায় না। সাধারণ ভোগ্যপণ্যের বাজার, যে বাজারে পরিচিত দোকানদারদের হটিয়ে টেক কোম্পানিগুলো ঢুকে আসছে প্রতিদিন। সবচাইতে বেশি করে, তথ্যবাজার। বাজারের তথ্য শুধু নয়, তথ্যের বাজার।

 

তথ্যবাজার ও বিনি মজুরির শ্রম

নেটব্যবসা এবং টেক কোম্পানির খেলা বুঝতে গেলে তথ্যবাজারটাকেও অল্পবিস্তর বোঝা প্রয়োজন। তথ্যবাজারে যে তথ্য বিক্রি হয়, তাকে ইদানীং বলা হচ্ছে বড় তথ্য বা বিগ ডেটা। বড় একারণে যে, যে পরিমাণ তথ্য প্রতিদিন প্রতি সেকেন্ডে তৈরি হচ্ছে, তার সমতুল কিছুর কথা মানবেতিহাসে নেই। এমন নয় যে তথ্য আগে ছিলো না বা বিগ ডেটা কোম্পানিগুলোর আবির্ভাবের আগে তথ্য কেনাবেচা হয়নি। বাজার এবং সম্ভাব্য বাজারে ক্রেতা/ভোক্তাদের পছন্দ অপছন্দ নিয়ে তথ্য সংগ্রহের রেওয়াজ বহুকালের। পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনের সঙ্গে এই বাজারতথ্য বরাবর সংযুক্ত; বিজ্ঞাপন সংস্থা এবং সমীক্ষা সংস্থাগুলো আগেও এই কাজ করতো, এখনো করে। আগের বাজারতথ্য আর হালের তথ্যবাজারের মধ্যে পার্থক্য করে দিচ্ছে যন্ত্র ও যন্ত্রবুদ্ধি। বিষয়টা কিঞ্চিৎ বিশদে বলা প্রয়োজন।

 

আধুনিক তথ্যপ্ৰযুক্তির এক অংশ হচ্ছে যন্ত্র। অর্থাৎ হার্ডঅয়্যার। ছোট বড় কম্পিউটার, স্মার্টফোন, নেট সংযোগ গড়ে তোলার উপযুক্ত পরিবহন বা লজিস্টিক, তার ভিতর উপগ্রহ, মোবাইল টাওয়ার, সার্ভার, এই সব। আসলে আরো বেশি, বিদ্যুৎ, খনি, বড় নির্মাণ, এগুলোও কার্যত যন্ত্র বা হার্ডঅয়্যার অংশের অঙ্গ, যদিও বড় তথ্যবাজারু কোম্পানিরা সেসব কথা চেপে যেতে পছন্দ করে। তারা যেটা সাতকাহন করে বলে তা হচ্ছে যন্ত্রমেধার বা সফটঅয়্যারের কথা। সফটঅয়্যার অর্থে এ.আই., আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্থে যাবতীয় কম্পিউটার প্রোগ্রাম। যন্ত্রের বাইরে যে পৃথিবী, সেখানে যে তথ্য নির্মিত/উৎপন্ন/সংগৃহীত হয়, তা যন্ত্রের উপযোগী ভাষায় অনুবাদ করে দেয় প্রোগ্রাম। অন্য এক বা একাধিক প্রোগ্রাম সে যন্ত্রভাষাকে বাইরের পৃথিবীর মতো করে আবার অনুবাদ করে। বহু যন্ত্র এমন, সেখানে বাইরের পৃথিবীর তথ্য যন্ত্রের ভাষায় অনুবাদ করে যন্ত্রে দিতে হয়। সে কাজটা করতে মানবশ্রমের দরকার হতো। এখনও মানবশ্রম নানাভাবে লাগে। কিন্তু টেক কোম্পানির অপূর্ব হাতসাফাইয়ে সে শ্রম অদৃশ্য হয়ে যায়, শ্রমিক বুঝতে পারে না সে শ্রম দিচ্ছে। যা পড়ে থাকে তা তাক লাগানো যন্ত্রমেধা, স্মার্টফোন, স্মার্ট ঘড়ি, স্মার্ট গাড়ি, স্মার্ট বাড়ি, স্মার্ট ব্যবসা (যেমন শেয়ারবাজার, বিটকয়েন মাইনিং)। আপনি বসে বসে দু তিনটি বোতাম টিপবেন। বাকি কাজ যন্ত্র করবে।

 

যন্ত্র করছেও। স্রেফ একটা স্মার্টফোন দিয়ে যত কাজ একদিনে স্বল্পায়াসে করে ফেলা যাচ্ছে, তা করতে আগে মাস ঘুরে বছর গড়িয়ে যেতো। বোতাম টিপে যত আপনি কাজ সেরে ফেলছেন, তত তথ্য তৈরি হচ্ছে, জমা হচ্ছে। যন্ত্র যে কাজ করে এবং আপনি যে কাজ যন্ত্র মারফত করে ফেলছেন, তার সমস্ত হিসাব তথ্য হিসেবে হয় যন্ত্র জমা করছে নয় নেটে জমা হচ্ছে। একদিনে পৃথিবীতে, পৃথিবীতে না হোক ভারতবর্ষে, নিদেন বাংলায়, কতগুলো স্মার্টফোন, কতগুলো ব্যক্তিগত কম্পিউটার বা পিসি ব্যবহৃত হচ্ছে ভাবুন। তারপর, সেই যন্ত্রগুলোর প্রত্যেকটা কতগুলো করে কাজ করছে সেটা ভাবুন। তথ্যের গোলা, ভাঁড়ার, সিন্দুক, তোরঙ সব ভরে উঠছে তো উঠছেই।

 

কাজ ও অকাজ

এ তো গেলো কাজের কথা। আমরা কথা বলছিলাম অকাজ নিয়ে। সমাজমাধ্যম/সাংখ্যমাধ্যমে আইটি সেলওয়ালা ও মিডিয়া ইনফ্লুয়েনসার ছাড়া কে আর কাজ করে? আপনি ফেসবুক খুলে সকালসন্ধ্যা ওপরে নীচে ডাইনে বাঁয়ে আঙুল কিম্বা মাউস চালাচ্ছেন, আপনার নিউজফিড জুড়ে হইহই করে এর জন্মদিন তার মৃত্যুদিন অমুকের নতুন জামা তমুকের মেয়ের নাচ রাশি রাশি ফ্যাশন স্টেটমেন্ট কুইজিন রেসিপি লাইফস্টাইল ছুটি কাটানো বেড়াতে যাওয়া সব তাজা খবর ঝাঁপিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে রাজনীতি সমাজনীতি অর্থনীতি সব। লোকে গাদা গাদা লিঙ্ক পাঠাচ্ছে, পোস্ট দিচ্ছে, কবিতাগল্প লিখছে, গান গাইছে, মিছিল ধর্ণা করে সেই ছবি পোস্ট করছে। আপনি মন দিয়ে লাইক দিচ্ছেন কিম্বা দিচ্ছেন না, কারুর পোস্টে কমেন্ট করছেন বা করছেন না। বিশেষ পছন্দ হলে পোস্ট শেয়ার করছেন। সেটা ইতিমধ্যেই শখানেক শেয়ার হয়ে গিয়েছে, আপনারটা একশোএক নম্বর। অথবা হোয়াটসঅ্যাপ। আপনি গোটা বিশেক গ্ৰুপের সদস্য, কোনটা স্কুলের বন্ধুদের, কোনটায় বেড়ালদের ছবি বিনিময় করা হয়, কোনটায় উইকএন্ডে বেড়ানো, কোনটায় করোনার সঙ্গে যুদ্ধ, কোনটায় আন্দোলন, কোনটায় বিপ্লব। এছাড়া তাল তাল ছবি গান আবৃত্তি এটা সেটা। তারপরে ট্যুইটার, সেখানে সেলিব্রিটি ফলো করার দুশো মজা। এই যে এত কিছু করার কথা বলা হলো, তার কোনটাকে আপনি কাজ বলবেন?

 

অথচ দিনশেষে আপনার বুদ্ধিমান ফোন আপনার স্ক্রিনটাইমের বিস্তারিত খতিয়ান দেবে। আপনি হাঁ করে দেখবেন, কিম্বা দেখবেন না, আট থেকে দশ ঘন্টা আপনি ফোন দেখেছেন। দেখছেন কিন্তু ভাবছেন না কত ভাগ্য করে এলে দিনে দশ ঘন্টা অকাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়। অকাজ বলতে নিজের কাজ, যাকে কাজ বলে কেউ মনে করে না, সে কাজের পিছনে অপরশাসন নেই, যে কাজের বিনিময়ে অন্য কেউ মুনাফা করে না। বটে? আপনি জানেন না, সোশ্যাল মিডিয়ার তৃপ্ত ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই জানেন না, ফেসবুক/হোয়াটসঅ্যাপ/ট্যুইটার/ইনস্টাগ্রাম দিনপিছু গড় দশঘন্টা ব্যবহারের প্রত্যেক মুহূর্তে আপনি শ্রম দিচ্ছেন, টেক কোম্পানির বিনিমজুরির মজুর হিসেবে। আপনার প্রতিটি পোস্ট, শেয়ার, লাইক, ইমোজি, কমেন্ট, প্রত্যেক মুহূর্তের অকাজ, মজা, নিজের কাজ, সমাজের কাজ, দেশের কাজ, বিদ্রোহের এবং প্রতিবাদের পবিত্র আবেগ, শোক দুঃখ ভালবাসা যৌনতা অবিরল তথ্য তৈরি করছে। সেই তথ্য আপনার ফোনে কি কম্পিউটারে বসানো অ্যালগরিদম পড়ে ফেলছে তৎক্ষণাৎ, এবং অনুবাদ করে ফেলছে। সেই অনুবাদ জালে ভেসে পৌঁছে যাচ্ছে টেক কোম্পানির কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে। আরো উন্নত কোন যন্ত্রমেধা তা পড়ে ফেলে ঝাঁ করে ভেবে নিচ্ছে ঠিক কে ওই তথ্যে আগ্রহী হতে পারে, অর্থাৎ কাকে ওই তথ্য বিক্রি করা যায়। যাকে বিক্রি করা হচ্ছে সে দোকানদার, পণ্যদ্রব্যের নির্মাতা কোম্পানিমালিক, কনসালটেন্সি ফার্ম, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র যে কেউ হতে পারে। আপনার পছন্দ অপছন্দ অ্যাপ ব্যবহার পোস্ট বা গ্ৰুপচরিত্র ফলো করা, এসব দেখে অ্যালগরিদম ঠিক করে কোন খাপে কোন মাল যাবে, অর্থাৎ কোন ক্রেতার কাছে কোন তথ্য। সেই অনুযায়ী আপনার স্ক্রিনে বিজ্ঞাপনী প্রচার আসতে থাকবে। প্রিসিশন টার্গেটিং। কাস্টমাইজড অ্যাড। যে যা পছন্দ করে তাকে সেই মাল বেচো। আপনি একই অঙ্গে ব্যবহারকারী, বিনি মজুরির মজুর, ভোক্তা এবং ক্রেতা, অথচ হায়, আপনি তা বোঝেন না। ফেসবুক বা ট্যুইটার টেক কোম্পানি আপনাকে বিনা পয়সায় পরিষেবা, যাকে বলে ফ্রি সার্ভিস, প্রদান করছে না। আপনি বিনা দামে নিজের শ্রম, সময়, মেধা, আবেগ অহোরাত্র স্বেচ্ছায় মেছোহাটায় বেচছেন।

 

ব্যবহারকারী না ব্যবহৃত?

মেছোহাটাটা তৈরিও করছেন আপনি। প্রধানত না বুঝে। ফেসবুক বলুন, হোয়াটসঅ্যাপ বলুন, ট্যুইটার বলুন, আপনাকে নিরাপত্তার ও স্বাতন্ত্র্যের আশ্বাস দেয়। আপনার ওয়াল, আপনার প্রোফাইল, আপনার অ্যাকাউন্ট। রাষ্ট্র যখন আপনার ব্যক্তিজীবনের তথ্য নেবার পঞ্চাশ কল তৈরি করতে থাকে, আপনি সরবে হোক নীরবে হোক আপত্তি করেন, রাষ্ট্রীয় নজরদারি আপনার পছন্দ হয় না। সেই আপনিই নির্দ্বিধায় এবং সোৎসাহে ব্যক্তিজীবনের যাবতীয় তথ্য টেক কোম্পানিগুলোকে দিতে থাকেন। দিতে থাকেন এবং অন্যদের দিতে প্ররোচিত করেন। নিজের তথ্য দেওয়া এবং অন্যের তথ্য জোগাড় করে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া, তা সাংখ্যমাধ্যমের যন্ত্রমেধা অর্থাৎ অ্যালগরিদমে ওতপ্রোত। ফেসবুক আপনাকে বন্ধু করো বলে ‘সাজেশন’ পাঠায়, অন্যের জন্মদিন বিবাহবার্ষিকী ইত্যাদি মনে করায়। আপনি বন্ধু বাড়াতে থাকেন। নিজের পাঁচহাজারি বন্ধুকোটা শেষ হলে আর একটা প্রোফাইল খোলেন, বন্ধু বাড়তেই থাকে। হোয়াটসঅ্যাপ আপনাকে দুনিয়ার মেসেজ পাঠাতে থাকে, ফেসবুক মেসেঞ্জারও তাই। ট্যুইটার মেসেজ অনবরত রিট্যুইট হতে থাকে, আপনি অন্যকে ফলো করেন, অন্য কেউ আপনাকে ফলো করে। ফেসবুক বন্ধুদের (যাদের নব্বই শতাংশকে আপনি চেনেন না) অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে আপনি মনের কথা উজাড় করেন, সেই কথা শেয়ার হতে থাকে। হোয়াটসঅ্যাপ-এ যে মেসেজই আসুক, তা নির্বিচারে ফরোয়ার্ড হতে থাকে।

 

অ্যাম্পলিফিকেশন!

মেছোহাটাটা তৈরি হয় এই সব উপাদানে। একটা কথা/খবর/তথ্য/অন্য কিছু একবার কোথাও তৈরি হলো, তা ছড়াতেই থাকলো। বলা হলো, ভাইরাল। ভাইরাল হোক না হোক, সোশ্যাল মিডিয়া কথা/খবর/তথ্য/অন্য কিছু যেভাবে ছড়ায়, তা অন্য কোন মাধ্যমে সম্ভব নয়। ছড়ানো মানে এক্ষেত্রে বাড়া। যা সীমিত, ব্যক্তিগত, তা মুহূর্তে বারোয়ারি, যা ছোট তা মুহূর্তে বড়, দৈত্যাকার। বাড়া মানে বিবর্ধন, বাড়ানো। অ্যাম্পলিফিকেশন। নাজি প্রচার মনে পড়ে?

 

সোশ্যাল মিডিয়ার জন্ম নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রচার চালানোর জন্য, এমন বলার কারণ নেই। এই মাধ্যম যারা বাজারে ছেড়েছেন, সেই টেক কোম্পানির মূল লক্ষ্য নতুন বাজার তৈরি করে মুনাফা বাড়ানো। সে বাজার ফ্যাসিবাদী প্রচার দিয়েও হতে পারে, আরব স্প্রিং, মিটু, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার দিয়েও। অ্যালগরিদম প্রচার বোঝে, প্রচারের ভালোমন্দ নয়। বেশি প্রচার মানে বেশি বাড়া, বেশি অ্যাম্পলিফিকেশন। শেষতক, টেক কোম্পানির বেশি মুনাফা। তাদের ব্যবহারকারীর সংখ্যা যত বাড়বে, তত বিজ্ঞাপনদাতাদের পক্ষে বেশিসংখ্যক সম্ভাব্য ক্রেতা/ভোক্তার কাছে পৌঁছোনো সহজ হবে।

 

এই পর্যন্ত বলে বলতে হয়, বলতেই হয়, মুনাফা করার জন্য টেক কোম্পানিগুলোর যে বিগ ডেটার ব্যবসা, তার প্ৰযুক্তি এবং পদ্ধতিই এমন, যে আজকের সময়ের যে কোন ফ্যাসিবাদী প্রকল্পে তা নিরন্তর ব্যবহৃত হতে বাধ্য। ফ্যাসিবাদী মিথ্যা প্রচার বাড়ানোর পক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ার চাইতে ভালো কিছু ভাবাই সম্ভব নয়। বেশির ভাগ বড় মিথ্যার পিছনে বড় পুঁজি থাকে, রাষ্ট্রও থাকে। রাষ্ট্র ও পুঁজি একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, ফলে পুঁজির পক্ষে রাষ্ট্রবিরোধী হওয়া মুশকিল। বাজারের প্রয়োজনে এবং রাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখতে সোশ্যাল মিডিয়ার তথাকথিত মুক্ত মাধ্যম প্রয়োজনমাফিক বন্ধ হবে, ফ্যাসিবাদ এবং রাষ্ট্রের দিকেও ঝুঁকবে। বিজেপির সঙ্গে ফেসবুক কোম্পানির কর্তাদের যোগাযোগ থেকে দিব্য বোঝা যাচ্ছে ফেসবুকের অ্যালগরিদম এবং মানুষকর্তা, দু’তরফেই বিজেপি আরএসএস-এর মিথ্যা প্রচারকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। সরাসরি প্রশ্রয় এবং অনুমোদনের এই গল্প প্রকাশ্যে না এলেও বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়, মিথ্যার চাষে মুনাফা বেশি। বিজেপির আইটি সেলের পক্ষে যতজন পেশাদার কন্টেন্ট নির্মাতা (যারা সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য গল্প বানান) মোতায়েন করা সম্ভব, যাবতীয় অনলাইন মঞ্চে ট্রোল লাগানো সম্ভব, তার ধারেকাছে এই মুহূর্তে অন্য রাজনৈতিক দলের পক্ষে পৌঁছোনো সম্ভব নয়। এর অর্থ বিজেপি ও হিন্দু ফ্যাসিবাদীরা টেক কোম্পানির বাজার অনেক বেশি বাড়াতে সক্ষম, তাদের অ্যামপ্লিফাইং পোটেনশিয়াল বেশি। অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদী আধিপত্যের অন্যতম উপাদান প্রচার, এবং বিবর্ধিত প্রচার। মিথ্যা বলো, বলো, বলতেই থাকো। জোরে বলো, আরো জোরে বলো, অনেকে মিলে বলো। সমাজমাধ্যম/সাংখ্যমাধ্যমের প্ৰযুক্তি এই বলাটাকে সম্ভব করে তোলে। টেক কোম্পানির মুনাফার প্রয়োজনে প্ৰযুক্তি তৈরি হয়। সোশ্যাল মিডিয়া ফ্যাসিবাদী প্রচারে ব্যবহৃত হচ্ছে কারণ সেটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই মাধ্যম এবং ফ্যাসিবাদী প্রচার এ দুইয়ের মধ্যে সহজাত রসায়ন রয়েছে।

 

অ্যালগরিদম এবং ফ্যাসিবাদী প্রচার

এই রসায়নের মূল খুঁজতে গেলে সমাজমাধ্যম/সাংখ্যমাধ্যমের অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে বুঝতে হবে। স্মার্টফোন বা কম্পিউটার খুলে সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনে গিয়ে যা দেখা যায়, তা যে দেখছে তার ইচ্ছাধীন নয়। ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে যন্ত্র ঠিক করে নেয় কী দেখানো হবে। ব্যবহারকারীর স্ক্রিনে মূলত তা-ই ওঠে যা সে দেখতে চায়। যন্ত্রবুদ্ধি যাকে সমমনস্ক মনে করে, সেই ‘বন্ধু’র নাম ও ছবি দেওয়া ‘সাজেশন’, ‘পছন্দসই’ গ্ৰুপ, এবং খবরদানি অর্থাৎ নিউজফিডে নির্বাচিত বন্ধুদের পোস্ট। কোন পোস্ট কে দেখবে ঠিক করে দেয় অ্যালগরিদম।

 

অ্যালগরিদমের দু’নম্বর এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ কাজ, ‘পুশ’ বা ‘নাজ’ করা। স্ক্রিন এমন জিনিসে ভরাতে হবে প্রথমত যা ব্যবহারকারী চায়, দ্বিতীয়ত যা ব্যবহারকারীর চাওয়াটাকেই প্রভাবিত করতে পারে। আপনি ছবি দেখতে ভালোবাসেন; এমন বন্ধু, পোস্ট, গ্ৰুপ আপনার জন্য বাছাই করা হলো যে বুঝে না বুঝেই আপনি বোতাম টিপতে শুরু করলেন। আপনি গান শুনতে ভালোবাসেন, ডিটো। আপনি হিন্দু রাজত্বে বিশ্বাসী অথবা বিশ্বাসটা ওইদিকে হেলে আছে, পুরো পেকে ওঠেনি, আপনার জন্যও ঐ। আপনি হিন্দুবিরোধী বাংলাদেশীয় মুসলমান জিহাদি, আপনার জন্যও ঐ। আপনি হিন্দু মুসলমান নন, দাভোলকার গৌরী লঙ্কেশের লাইনের যুক্তিবাদী অথবা ভয়ঙ্কর আগুনখেকো বিপ্লবী, আপনার জন্যেও ঐ। শুধু যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই কারবার চলে, তা নয়। গুগল সার্চ ইঞ্জিনের অ্যালগরিদমও এই কাজ করতে থাকে। কী দেখবেন ঠিক করে দেয় যন্ত্র। এসবের ফলে সমাজমাধ্যম/সাংখ্যমাধ্যমে বাস্তব দুনিয়ার সমান্তরাল, অন্য এক বা বহু স্ক্রিনদুনিয়া গড়ে ওঠে। যে দ্রুততায় আপনার স্ক্রিনে খবর ইত্যাদি আসে যায় এবং সমভাবাপন্ন বন্ধু পরিজনের নিরাপদ স্ক্রিনবেষ্টনীর মধ্যে থাকতে থাকতে আপনার ভিতর যে আত্মতৃপ্তি জন্ম নেয়, এ দুইয়ের মোদ্দা ফল, স্ক্রিনদুনিয়াকে আপনি সত্যি বলে ভাবতে শুরু করেন। এতদিনে আপনার সোশ্যাল মিডিয়া এবং গ্যাজেটের নেশা ধরে গেছে, ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ ছাড়া দিন কাটে না। স্ক্রিনে যা উঠছে সেটাকে সত্যি বলে ধরে নিতেই হয়, বিশেষত যদি ভাইরাল কিছু হয় কিম্বা প্রচুর শেয়ার/ফরোয়ার্ড/রিট্যুইট ইত্যাদি থাকে। সত্যি কথা অন্যকে জানানো কর্তব্য, আপনিও শেয়ার/ফরোয়ার্ড/রিট্যুইট করতে থাকেন। ফ্যাসিবাদী হোন আর না-ই হোন, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করলে আপনাকে প্রচার করতেই হবে, ব্যবহারকারী হিসেবে আপনি সহজাত অ্যাম্পলিফায়ার। যুক্তিবুদ্ধির প্রয়োগ করার অবকাশ এখানে বিশেষ নেই। স্ক্রিনে যা উঠছে তা নিয়ে আপনাকে দ্রুত কিছু করে ফেলতে, মানে অ্যাক্ট করতে হবে। অ্যাক্ট করা মানে লাইক দেওয়া, শেয়ার/ফরোয়ার্ড করা, ইমোজি পাঠানো, এমনকি দরকার হলে রাস্তার আন্দোলনের ডাক দেওয়া। তলিয়ে দেখতে ভাবতে গেলে বিষয় বা খবর পালিয়ে যাবে কিম্বা পুরোনো হয়ে যাবে। তাছাড়া অত সময় কার থাকে আজকাল? ফলে বিশ্বাস করো, বিশ্বাসে ভর করে কাজ করো। স্ক্রিনে যা আসে তা ঠিক, বিশেষত যদি তা আপনার মতের পক্ষে যায়।

 

সোশ্যাল মিডিয়ার নেশা এবং নেট-আসক্তির পিছনে আরো বহুবিধ মনস্তাত্বিক এবং সামাজিক কারণ ও উপাদান আছে, তার সবটা নিয়ে এ লেখায় চর্চা করা সম্ভব নয়। এতক্ষণ যা বলা হলো গুটিয়ে আনতে হয়, লেখা শেষ করতেও হয়। আগে সারসংক্ষেপ। ওপরের আলোচনা থেকে কী বোঝা যাচ্ছে? এক, হাল আমলের ফ্যাসিবাদ সমাজমাধ্যম/সাংখ্যমাধ্যমকে চূড়ান্তভাবে ব্যবহার করছে। মিথ্যা প্রচারকে বাড়ানোর পক্ষে, এই প্রচারের মাধ্যমে সমাজের ওপর ফ্যাসিবাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য, সমাজমাধ্যম/সাংখ্যমাধ্যম এ মুহূর্তে শ্রেষ্ঠ প্ৰযুক্তি। দুই, সমাজমাধ্যম/সাংখ্যমাধ্যম বস্তুত টেক কোম্পানিগুলোর মুনাফামৃগয়ার স্বর্গোদ্যান। তিন, নতুন মাধ্যমগুলো চলে যে অ্যাঅ্যালগরিদম দিয়ে, তা ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে তোলে। চার, অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের প্রভাবিত করে। প্রভাবিত ব্যবহারকারীরা নতুন ব্যবহারকারী তৈরি করেন। পাঁচ, নেটওয়ার্ক বা জাল যত সম্প্রসারিত হয়, তত টেক কোম্পানিদের বাজার বাড়তে থাকে। বিজ্ঞাপনদাতারা ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের পণ্যের নিদির্ষ্ট বাজার খুঁজে পায়। ছয়, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা ব্যক্তিগত তথ্য টেক কোম্পানিগুলোকে দিয়ে এই বাজার সম্ভব করে তোলে। সাত, সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী টেক কোম্পানিগুলোর বিনি মজুরির শ্রমিক, তাঁরা না থাকলে এই মাধ্যম থাকবেই না। আট, সমাজমাধ্যমের সমাজ আসলে বাস্তবকে প্রতিস্থাপিত করে কল্পিত স্ক্রিনদুনিয়া দিয়ে। নয়, প্রত্যেক ব্যবহারকারী এই কল্পদুনিয়ার মিথ্যাকে জ্ঞানে-অজ্ঞানে বাড়াতে থাকেন বা অ্যামপ্লিফাই করেন। দশ, বাড়ানো বা অ্যাম্পপ্লিফাই করার পদ্ধতি/প্রযুক্তি একইসঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিবাদী এবং আসক্তি উৎপাদক; এই পদ্ধতিতে মিথ্যা পুষ্ট হয়।

 

সমাজমাধ্যম না সমাজ: বামপন্থা কোন পথে?

দশ নম্বরটা নিয়ে পড়া যাক। ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ ট্যুইটার ব্যবহার করে রাজনৈতিক কাজ করার চেষ্টা করছেন যে বামপন্থী এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ব্যবহারকারীরা, তাঁরা বুঝতে পারছেন না কিম্বা চাইছেন না, ফ্যাসিবাদীদের পক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ার প্ৰযুক্তি যেভাবে ব্যবহার করা সম্ভব, বামপন্থীদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। ফ্যাসিবাদ অর্থে সংগঠিত ঘৃণার, মিথ্যার, অযুক্তির, কুৎসার, হিংসার চাষ। তথাকথিত সমাজমাধ্যমে এই চাষ যেভাবে করা যায়, সেভাবে ন্যায়ের ও সামাজিক সাম্যের লড়াই করা যায় না। প্রথমটা বিবর্ধন অর্থাৎ অ্যাম্পলিফিকেশনের ওপর টিকে থাকে, যা বলা হচ্ছে তার সত্য/মিথ্যা নির্ভর করে চিৎকারের শক্তির ওপর, পেশীবহুলতায়। দ্বিতীয়টাকে টিকে থাকতে হয় সমাজের গভীরে কাজ করে, অসাম্যের অযুক্তি থেকে সাম্যের যুক্তিতে উত্তরণের মধ্য দিয়ে। প্রথমটা দ্রুত ঘটতে পারে, যেহেতু গুজব ছড়াতে বা দাঙ্গা লাগাতে সময় লাগে না। দ্বিতীয়টা ধীর সময়সাপেক্ষ কাজ, তা নির্ভর করে স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে যৌথ বিরুদ্ধতার ওপর, সেই বিরুদ্ধতা যে সম্ভব সেই জ্ঞানের ওপর, সংগঠনের ওপর। জ্ঞান তৈরির সামাজিক প্রক্রিয়া একদিনে গড়ে ওঠে না, সমাজে সম্পৃক্ত থেকে সে জ্ঞান অর্জন ও আহরণ করতে হয়।

 

ফ্যাসিবাদের মূলে যে জ্ঞান, তা মিথ্যা, সুতরাং অসামাজিক। ফ্যাসিবাদের সামাজিক কাজ বলতে সমাজে মিথ্যার সংগঠিত প্রচার, রাষ্ট্রীয় শক্তিতে মিথ্যাকে সত্যি করে তোলা। সমাজমাধ্যমের যে স্ক্রিনসমাজ, যা বাজারসৃষ্ট ও পুঁজিনির্ভর, সে সমাজে এই কাজ অনেক স্বল্পায়াসে, কম সময়ে হয়। বামপন্থীদের কাজটা যেহেতু স্ক্রিনের বাইরের প্রকৃত সমাজ নিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, সমাজমাধ্যমে সে কাজ হয় না। ফ্যাসিবাদীরা সমাজমাধ্যম ব্যবহার করছে সুতরাং আমাকেও করতে হবে, এটা শুধু কুযুক্তি নয় অপযুক্তি। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা যায়, কিন্তু সে প্রচার ক্রমাগত বাড়িয়ে নেবার ক্ষমতা বামপন্থীদের থাকে না, কারণ বাড়াতে গেলে পুঁজি লাগে এবং টেক কোম্পানির ও তাদের অ্যালগরিদমের সহায়তা লাগে। সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্ৰুপ করা যায়, কিন্তু বাস্তব সংগঠন করা যায় না। আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ার যথেচ্ছ ব্যবহার এবং প্ৰযুক্তিনির্ভরতা কতটা ক্ষতি করতে পারে, তা বোঝার জন্য দিল্লী দাঙ্গা নিয়ে কী ঘটছে তা দেখাই যথেষ্ট। বহু বামপন্থী কর্মীদের ধারণা, হোয়াটসঅ্যাপ বিষয়টা ফেসবুকের তুলনায় নিরাপদ ও আন্দোলন-সহায়ক। সিএএ বিরোধী আন্দোলনের সমর্থনে তৈরি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্ৰুপের যাবতীয় চ্যাটের আগাপাছতলা তুলে তুলে দিয়ে দিল্লী পুলিশ ফ্যাসিবিরোধী বামপন্থীদের ফাঁসাচ্ছে। আনুষ্ঠানিক চার্জশিটে হোয়াটসঅ্যাপ গ্ৰুপের বিশদ উল্লেখ, চ্যাট বিবরণ। ফেসবুক পোস্ট ধরে কী ঘটতে পারে সেটা বলার প্রয়োজন নেই, সবাই জানেন।

 

মাঠের সংগঠন, শারীরিক মেলামেশা, এসবের পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বামপন্থীদের কাজকে দুর্বল করে। রাষ্ট্র ক্রমশ ফ্যাসিবাদী, আক্রমণরত, এসময়ে স্ক্রিননির্ভর কাজের কোন অর্থ থাকতে পারে না। যে খণ্ডসর্বস্ব গোষ্ঠীকেন্দ্রিক অরাজনীতির ভাইরাস ভারতবর্ষের এবং বাংলার বামপন্থী আন্দোলনকে ভিতর থেকে নষ্ট করছে, তা বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে সমাজমাধ্যমের বস্তুত মিথ্যা স্ক্রিনপরিসরে। বামপন্থী কর্মীরা, বিশেষত তরুণ কর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছেন; প্রকৃত সামাজিক ঘটনা নয়, তাঁদের কাজ পরিচালিত হচ্ছে ওই ঘটনার স্ক্রিনপ্রচার ও স্ক্রিনবাস্তবতা দিয়ে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে কিনা, ঘটলে কিভাবে, বর্তমান লেখকের জানা নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার রাজনীতি এবং ফ্যাসিবাদের সঙ্গে এই প্ৰযুক্তির অঙ্গাঙ্গী যোগ বিষয়ে বামপন্থীরা কিঞ্চিদধিক সচেতন হবেন, বিষয়টা নিয়ে ভাববেন, এই প্রত্যাশায় এই লেখা। প্রয়োজনমতো পরে এ নিয়ে আরো কথা বলা যাবে।

 

  • লেখক বামপন্থী ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী।

 

পড়ে দেখুন:

নতুন রাজনীতির সন্ধানে—করোনা পরিস্থিতি এবং বামপন্থীরা কী করতে পারেন (প্রথম পর্ব) 

নতুন রাজনীতির সন্ধানেকরোনা পরিস্থিতি এবং বামপন্থীরা কী করতে পারেন (দ্বিতীয় পর্ব)  

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Bibhas Saha on September 22, 2020

    লেখাটা পড়লাম। সারসংক্্ষেপে যে ১০ টা পয়েন্ট বলেছে লেখক, সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন ব্যক্তি যদি সত্যিই সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করতে চায় তার রাজনৈতিক প্রয়োজনে, তাহলে তাকে সেখানে যতটা সময় দিতে হবে, তা দিয়ে এবং রোজগার ও পরিবার সামলে তার পক্ষে নন-ভার্চুয়ালে আন্দোলন সংগঠন তৈরি করার সময় তার থাকে না। উল্টোদিকেও একই কথা প্রযোজ্য। ব্যক্তির সীমাবদ্ধতা এটা। তাই বলে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করব না, এই মনোভাব ঠিক না। আর ব্যবহার করলে ব্যবহৃত হতেই হয়। এটা ঠিকই ভার্চুয়ালে অ্যাম্পলিফিকেশন করা খুব সহজ। কিন্তু রাজনীতি মানেই অ্যাম্পলিফিকেশন। সেটা শুধু ফ্যাসিবাদীদের নয়, সমস্ত রাজনীতির। সংগঠন, মিডিয়া, রাষ্ট্র এই অ্যাম্পলিফিকেশনের কাজ করে। এরা প্রত্যেকেই ব্যুরোক্রেটিক। কিন্তু সামাজিক মাধ্যম হল একমাত্র জায়গা যেখানে এই ব্যুরোক্রেসির প্রভাব কম সবচেয়ে। সেই জন্যই একটা কলেজের একটা ক্লাসের তিরিশ জন যদি চায়, তাহলেই একটা পোস্টকে মিনি-ভাইরাল করে দিতে পারে। এটাই সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয়তার কারণ, অন্যান্য মোড অফ অ্যাম্পলিফিকেশনের তুলনায়। এখনও অব্দি সামাজিক মাধ্যম অন্যগুলির তুলনায় (রাষ্ট্র, পার্টি, মিডিয়া) অনেক বেশি স্বতস্ফুর্ত, অনেক বেশি জনগণের আওতার মধ্যে। সেই কারণে এই পরিসরে ফ্যাসিবাদের বিস্তারও বেশি। ফ্যাসিবাদ হল তলা থেকে উঠে আসা ব্যাপার। জনগণের মধ্যেকার ব্যাপার। লেখায় ফ্যাসিবাদের এই মৌলিক চরিত্রটি ফ্যাসিবাদের কুলক্ষণ গুলোর পয়েন্টে অনুপস্থিত। ফ্যাসিবাদ শুধু ফ্যাসিবাদী ষড়যন্ত্রের ফসল নয়, হতে পারে না। তা জনগণের বাসনার বিকৃত প্রকাশ। এইখানেই ফ্যাসিবাদ ভয়াবহ। এবং মৌলিক। সামাজিক মাধ্যম যে স্বতস্ফুর্ততার কারণে এবং জনগণের আওতার মধ্যেকার মোড অফ অ্যাম্পলিফিকেশনের কারণে ফ্যাসিবাদীদের প্রিয় পরিসর, সেই একই কারণে তা বামপন্থী বদলকামী শক্তিগুলিরও প্রিয় পরিসর।

Leave a Comment