দেওচা-পাচামি কয়লাখনি প্রকল্প চান না আদিবাসীরা


  • July 25, 2020
  • (0 Comments)
  • 517 Views

করোনা মহামারির সময় লকডাউনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব বীরভূমের মহম্মদবাজার ব্লকেপৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লার ভাণ্ডারদেওচাপাচামিতে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা করে এলেন। এই মিটিংয়ে কয়েকটি গ্রামের একজন দুজন করে মোট ২০ জন উপস্থিত ছিলেন। যে পরিকল্পনা কার্যকর হলে হাজার হাজার আদিবাসী নিম্নবর্গের শ্রমজীবী কৃষিজীবী মানুষ উচ্ছেদ হবেন। এর আগে আদিবাসীদের বিক্ষোভে ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ তারিখে এই কয়লা খনি প্রকল্পের উদ্বোধনের পরিকল্পনা বাতিল হয়েছিল। এবারও যে সব গ্রামের আদিবাসীরা উচ্ছেদ হবেন তারা দেওচাপাচামি কয়লা খনি প্রকল্প চাই না বলে তাদের লিখিত প্রতিবাদপত্র মুখ্যসচিবকে দিয়েছেন। সারা ভারতের অভিজ্ঞতায় তাঁরা দেখেছেন এই ধরণের প্রকল্পে আসলে সাধারণ আদিবাসী বা গরিব মানুষরা তাদের জীবনজীবিকা থেকে উচ্ছেদ হন। এই খনি প্রকল্প তাঁদের কোনও উপকারে আসে না, বরঞ্চ তাদের বিনাশ করে।

 

দেওচাপাচামি কয়লাখনি প্রকল্প আদতে সাধারণ মানুষের জীবনে কোনও উন্নয়নের আলো দেখাবে কিনাএই বিষয়ে একটি প্রবন্ধ আসানসোল শিল্পাঞ্চলেরউদ্যোগপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটি সেই প্রবন্ধের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ।

 

পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লার ভাণ্ডার দেওচা-পাচামিতে কয়লা উত্তোলনের আয়োজন শুরু হয়েছে। আমাদের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী খুব উল্লসিত। এখানে এক লক্ষ লোকের কাজ হবে। বর্তমানে ভারত সরকার কয়লা শিল্পে ১০০ শতাংশ বিদেশি পুঁজির ছাড়পত্র দিয়েছে। ১৯৯৩ থেকেই কয়লা শিল্পকে ধাপে ধাপে ব্যক্তি পুঁজির হাতে তুলে দেবার ফলে ক্রমশ বন্ধ হয়েছে শ্রম নিবিড় মাটির তলার খনি ও বেড়েছে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কম সময়ে বেশি বেশি কয়লা তোলা যায় এমন খোলামুখ খনির সংখ্যা। আমরা আজ জেনে গেছি খোলামুখ খনিতে টাকার অঙ্কে কয়লাখনির সরকারি বা বেসরকারি মালিক লাভবান হলেও মাটির উপরের জনবসতি, গাছপালা, নদী-নালা, জীবিকার উৎস সমস্ত কিছু স্থায়ীভাবে ধংস হয়ে উঠে আসে সামান্য কয়লা। আর কয়লার মতো জীবাশ্ম শক্তি পুড়িয়ে বেড়ে চলেছে বাতাসে কার্বনের মাত্রা, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা। তবুও সাধারণ মানুষের যেহেতু প্রত্যেকের কাজ চাই, তাই মমতা ব্যানার্জি যখন বলছেন ১ লক্ষ কাজ হবে তখন উচ্ছেদের আশঙ্কা সত্ত্বেও তাঁরা ভাবছেন এখানে কয়লা খনি হলে কাজ পাবেন।

 

তাঁদের এই আশা সত্যি হবে কি?

 

দেওচা-পাচামি কোল ব্লক বীরভূমের মহম্মদবাজার কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ব্লকের মধ্যে অবস্থিত। এখানে মোট ২১০২ মিলিয়ান টন কয়লা আছে। এই কয়লা ব্লক অবস্থিত ৯.৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দেওচা, নিশ্চিন্তপুর, জগতপুর, ভারকাটা পঞ্চায়েত এলাকায়। এই এলাকার মধ্যে আছে ৪২টি গ্রাম। যার বেশিরভাগ আদিবাসী গ্রাম। মোট জনসংখ্যা ১৯ হাজার। আদিবাসী মানুষের সংখ্যা ৭০০০। আদিবাসী মানুষরা ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন তারা তাদের বাসস্থানের জমিতে, চাষের জমিতে কয়লাখনি চান না। গত ১৯ ডিসেম্বর হরিণসিংহাতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবের আসার পরিকল্পনা হাজার হাজার আদিবাসী মানুষের বিক্ষোভে বাতিল হয়। এই আদিবাসী মানুষরা একটি কনভেনশানের মধ্যে দিয়ে সিধান্ত নিয়েছেন কোনোভাবেই তাঁরা তাদের জমিতে কয়লাখনি হতে দেবেন না।

 

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বার বার বলছেন দেওচা-পাচামি অঞ্চলের মানুষদের সাথে কথা বলে তাঁদের সাথে নিয়ে তিনি প্রকল্প গড়বেন। কিন্তু তিনি সেপ্টেম্বরে কোল ব্লকের বরাদ্দকরণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে যাবার পর পরই প্রধানমন্ত্রীকে নিমন্ত্রণ করে এসেছিলেন উদ্বোধনে আসার জন্য। তখনও আমাদের মুখ্যমন্ত্রী এই অঞ্চলের মানুষের সাথে কথা বলে জানতে চাননি তাঁরা এখানে কয়লাখনি চান কিনা। যে কোনও খনি প্রকল্প বা শিল্পের জন্য সেই অঞ্চলের মানুষরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই আইনত প্রকল্প শুরুর আগে কয়লাখনি এলাকার সামাজিক-অর্থনৈতিক সমীক্ষা হয়। তার ভিত্তিতে পরিবেশের উপর কয়লাখনির প্রভাব বিষয়ে তৈরি হবে এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট বা ইআইএ। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রকল্প অঞ্চলে গণশুনানি করে সেই অঞ্চলের মানুষের ছাড়পত্র পেলে তবেই এই খনি প্রকল্প পরিবেশ দপ্তর-সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ছাড়পত্র পাবে। তারপর প্রকল্পের ফাইনাল প্রজেক্ট প্ল্যান তৈরি হবে।

 

বীরভূমের কয়লাখনির জন্য এখনও ইআইএ তৈরি হয়নি এবং জনশুনানিও হয়নি। জনশুনানি হবার আগেই আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একতরফা অগণতান্ত্রিকভাবে সিধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন যে এখানে কয়লা খনির উদ্বোধন করবেন। এখনও সেই সিদ্ধান্তে তিনি অবিচল আর হুমকি দিচ্ছেন বাইরের কেউ এখানে কয়লাখনির বিরোধিতা করতে আসলে তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষরা যে বলছে তারা কয়লাখনি চান না সেই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মতামত জানতে পারা যায়নি। যে কয়লাখনি প্রকল্পের পরিকল্পনা এখনও তৈরিই হয়নি সেই প্রকল্পে কত জন কাজ পাবেন এটা বলা মানে মানুষকে বোকা বানানো। তাছারা প্রজেক্ট প্ল্যান ছাড়াই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বলতে শুরু করেছেন এই গ্রামগুলো উচ্ছেদ করে পুনর্বাসন দেওয়া হবে। আগ বাড়িয়ে আরও বলছেন এখানে কয়লাখনি হলে পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুৎ তৈরির জন্য ১০০ বছর কয়লার অভাব থাকবে না। এগুলি কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্যের উপর ভিত্তি করে বলা হচ্ছে না।

 

দেওচা পাঁচামি কয়লাখনি প্রকল্পের ইতিহাস

 

এই ব্লক পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কোল ব্লক। এই অঞ্চলে প্রায় দেড় কিলোমিটার নিচ থেকে কয়লা তুলে আনতে হবে। কয়লাস্তরের উপরে রয়েছে পুরু পাথরের স্তর। এই পাথরের স্তর ভেদ করে কয়লা পাওয়া যাবে। এখানে কয়লাখনি করার জন্য রাজ্য সরকার পোল্যান্ডের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে গিয়েছিলেন। তাদের প্রাথমিক মত, এখানে খোলামুখ খনি করে কয়লা উত্তোলন সম্ভব নয়। এখানে আন্ডারগ্রাউন্ড খনির মাধ্যমেই কয়লা তুলে আনতে হবে।

 

এবার আমার এই কয়লা ব্লকের ইতিহাসটা দেখেনি। দেওচা-পাঁচামি কোল ব্লক ১০ বছর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত কোল কোম্পানিকে বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু কোনও এক বা একাধিক কারণে ইসিএল এই ব্লক থেকে কয়লা তোলেনি। তারপর ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ-সহ আরো পাঁচ রাজ্যকে এই কোল ব্লক বণ্টন করা হয়। তার মধ্যে রয়েছে কর্নাটক, বিহার, পঞ্জাব, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ। কয়লা তোলার জন্য স্পেশাল পারপাস ভেহিকেল (এসপিভি) হিসাবে ২০১৪ সালে তৈরি হয় বেঙ্গল বীরভূম কোলফিল্ডস লিমিটেড। এই ব্লক এসপিভিকে পুনর্বরাদ্দ করা হয়। দেওচা-পাচামির থেকে কয়লা নেবার লিঙ্কেজ চুক্তি হয় এই রাজ্যগুলির বিভিন্ন চালু ও প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সঙ্গে। কিন্তু রাজ্যগুলির মধ্যে মতপার্থক্য হওয়ার কারণে একটি একটি করে রাজ্য প্রকল্প থেকে সরে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আর কোনও রাজ্যই এই কয়লা ব্লকের বিষয়ে আগ্রহ দেখায় না। শুধু এই কোল ব্লকটির অবস্থানের কারণে পশ্চিমবঙ্গ আগ্রহ দেখায়। ২০১৯ -এর সেপ্টেম্বরে আবার পশ্চিমবঙ্গের হাতে কোল ব্লক দেওয়া হয়।

 

১০ বছর ধরে এই ব্লক থেকে কয়লা তোলার পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি। আজ যে সময়ে এই ব্লকের থেকে কয়লা  তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে তখন কয়লা শিল্পে ১০০ শতাংশ বিদেশি পুঁজি নিবেশের ছাড়পত্র দেওয়া হয়ে গেছে। রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী ইতিমধ্যে পোল্যান্ডের বিশেষঞ্জদের কাছে চলে গেছেন কারিগরি পরামর্শের জন্য। শুধু তাই নয় আমরা সারা ভারতের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে পাচ্ছি নতুন কয়লা খনি গড়ে তুলছে ব্যক্তি পুঁজি, কোথাও তার মালিকানা রাষ্টায়ত্ত কোল কোম্পানির বা রাজ্য সরকারের এবং ব্যক্তি মালিকের। এই নতুন কয়লাখনি কোনোটাই শ্রমনিবিড় (যেখানে বেশি শ্রমিক দরকার হয়) আন্ডারগ্রাউন্ড বা মাটির তলার খনি নয়। প্রত্যেকটি যন্ত্র নির্ভর খোলামুখ খনি। খোলামুখ খনি বা ওসিপি-তে বিদেশি কোম্পানির তৈরি যন্ত্রের ব্যবহারে খুব কম শ্রমিক নিয়োগে ও কম সময়ে কয়লা তুলে আনা যায়। লাভের অঙ্ক বেশি হওয়ায় বেসরকারি মালিকরা এই ওপেন কাস্ট মাইন বা ওসিপি থেকে কয়লা তুলতে আগ্রহী।

 

স্বাভাবিক ভাবেই অনুমান করা যায় দেওচা-পাচামিতে পুরনো পদ্ধতিতে মাটির তলার খনি থেকে কয়লা উত্তোলনে কোনও ব্যক্তি পুঁজি আগ্রহ দেখাবে না। আর যদি খোলামুখ পদ্ধতিতে কয়লা তোলা সম্ভব না হয় তবে অনেক গভীর থেকে কয়লা তোলার যে পদ্ধতি আছে কয়লাকে গ্যাসিফিকেশান করে মানে কয়লাকে গ্যাসে পরিণত করে তোলা হলে তা এই অঞ্চলের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে অনেক জল প্রয়োজন হয়।

 

এই প্রকল্প থেকে কয়লা তোলা অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক?

 

সারা ভারত জুড়ে যন্ত্রের সাহায্যে কয়লা তোলার ফলে কয়লা শিল্প থেকে বহু মানুষ ছাঁটাই হয়েছেন ও হবেন। ১০০ শতাংশ বিদেশি পুঁজি আসার পর কয়লা শিল্পের ৫ লক্ষ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কায়। দেওচা- পাঁচামি বীরভূমের পাঁচটি ব্লকের একটি কয়লা ব্লক। এই ব্লকের কয়লার সঞ্চয় রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চলের তুলনায় ২৫ গুণ কম। রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চলে কয়লা শিল্পের ৫৩ হাজার স্থায়ী শ্রমিক নিয়ে মোট কর্মসংস্থান প্রায় ৭৫ হাজার। সরকার বলছে ১২ হাজার কোটি টাকা সরকারের খরচ হবে এই ব্লক থেকে কয়লা তোলার প্রস্তুতি নিতে। আর ২২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে। তাহলে মোট বিনিয়োগ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। যদি ধরে নিই কয়লাখনির মজুর, সিন্ডিকেটের মালিক, কয়লা চুরির মাফিয়া এবং এলাকার মানুষকে চুপ করিয়ে রাখার জন্য রানিগঞ্জ বা ঝরিয়ার মতো এলাকার কিছু মানুষকে বিনা বাধায় কয়লাচুরি করতে সাহায্য করা কোল কোম্পানি ও প্রশাসন – এই নিয়ে যদি টেনেটুনে ১ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয় তাহলে একটি কর্মসংস্থানের জন্য ৩৪ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ দরকার (যদি আমরা কয়লা করা বা কয়লা চুরিকে কর্মসংস্থান বলে ধরে নি)। কোনও সভ্য দেশের মানুষের যা করা উচিত নয়। এই বিনিয়োগে ২.১০ লক্ষ কোটি টাকার কয়লা পাওয়া গেলে তার বেশিরভাগ লাভের অঙ্ক চলে যাবে বিদেশি কোম্পানির হাতে। বর্তমানে ভারতের বা সারা পৃথিবীতে  কোনও একটি কয়লা ব্লকে ১ লক্ষ কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। ভারতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিদিন আরো আরও ব্যক্তি মালিকের লাভের অঙ্ক বহুগুণ বাড়িয়ে দেবার নীতি নির্ধারণ করছে তাতে একটি কয়লা ব্লকে ১ লক্ষ কর্মসংস্থান (কয়লা চুরি করার ছাড়পত্র দেওয়াটা কোনও কর্মসংস্থান নয়) করা বাজে কথা বা ভোটের রাজনীতি ছাড়া কিছু নয়। এই প্রকল্প থেকে কয়লা তোলা আদৌ প্রয়োগসাধ্য ও বাস্তবোপযোগী কিনা – এই প্রশ্ন যেখানে উঠছে, সেখানে এই প্রকল্প আদিবাসী মানুষের জমি কেড়ে নেবার চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়।

 

৯.৭ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে কয়লাখনি হলে সামাজিক কারণে ও পরিবেশ দূষণে অতিষ্ঠ হয়ে আশেপাশের গ্রামের মানুষরা খুব কম পয়সার বিনিময়ে জমি বেঁচে দিতে বা এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবেন। কর্পোরেট পুঁজির এটাই লক্ষ্য। যে মমতা ব্যানার্জি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন আজ কেন্দ্রের চক্রান্তে রাজ্যের ১২ হাজার কোটি টাকা খরচা করে বিদেশি মালিকের হাতে কেন জমি ও কয়লা খনি তুলে দেবেন? তিনি বিজেপির জনবিরোধী নীতি নিয়ে এত কথা বলছেন, অথচ কেন খনির জন্য রাজ্যের মাধ্যেমে জমি হাতিয়ে নেবার চক্রান্তের শিকার হচ্ছেন? তবে এই রাজ্যেরই পাশের জেলা জেলা পশ্চিম বর্ধমানের রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চলে তাঁর দলের নেতাদের মদতে সরকারি কোল কোম্পানি মানুষকে ঠকিয়ে বিনা পুনর্বাসন, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ছাড়া খনির জন্য জমি হাতিয়ে নিচ্ছে। সব জেনেশুনেও রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চলে খনির জন্য উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলন কেন্দ্রীয় বাহিনী সিআইএসএফ-এর সঙ্গে রাজ্যের পুলিশ কঠোর হাতে দমন করছে।

 

পাশের কয়লাখনি অঞ্চলের ভয়াবহ পরিস্থিতি প্রভাবিত করেছে এই আদিবাসীদের

 

দেওচা-পাচামির মানুষরা দেখছেন রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চল প্রায় আড়াইশো বছর ধরে কয়লা উত্তোলনের ফলে এই অঞ্চলের মানুষ ধস, গ্যাস, আগুন, কয়লার ধুলো, বেআইনি খাদানের মৃত্যুর অন্ধকারে বাস করছেন। এক ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার বা রাষ্ট্রায়ত্ত কোল কোম্পানি ইস্টার্ন কোলফিল্ডিস লিমিটেড ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কোনও পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেনি।

 

অনেকেই বলছেন এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনও আশা নেই। রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চলেই সোনপুর বাজ়ারি মেগা খোলামুখ কয়লাখনির যে ১৫টি গ্রামের ২৫ হাজার মানুষকে নানা কায়দায় বিভিন্ন স্তরে ঠকিয়ে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তার মধ্যে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৯টি আদিবাসী গ্রামের মানুষরা। কয়লা থেকে তৈরি বিদ্যুৎ দেশের মানুষকে আলো দিলেও রানিগঞ্জ-ঝরিয়া কয়লাখনি অঞ্চলের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল অন্ধকারে ডুবে আছে। বাড়িগুলোতে একটা বা দুটো করে টিম টিম করে আলো জ্বলে। সেই আলোতে পড়াশুনো করা যায় না। কয়লাখনি শ্রমিকদের বাড়ির শিশুরা আজও পড়তে শেখে না। স্বাস্থ্যব্যবস্থা বলে কোলিয়ারি অঞ্চলে কিছু নেই। দিনের পর দিন অপরিষ্কার হওয়া নালার পাশে কয়লার ধুলো মাখামাখি হয়ে বসবাস করে।

 

সরকারি কোল কোম্পানির এলাকার এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা দেখে আজ দেওচা-পাঁচামি অঞ্চলের মানুষরা কয়লাখনি করতে দেবেন না – এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হাজার হাজার আদিবাসীরা জমায়েত হয়ে কয়লাখনি প্রকল্পের উদ্বোধন আটকে দিয়েছেন। বীরভূম আদিবাসী জুমিত গাঁওতার সুনীল সোরেন জানিয়েছেন, ‘এই প্রকল্পের আওতাধীন জমিতে বসবাসকারী আদিবাসী মানুষ কয়লাখনির জন্য জমি দেবে না।’ রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চলে ধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের দাবিতে ও খোলামুখ খনির জন্য উচ্ছেদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা যৌথমঞ্চ ‘কয়লাঞ্চ (?) বাঁচাও মঞ্চ’-র সম্পাদক ইন্দ্রজিৎ মুখার্জি বলেন ‘কয়লাখনি চাষের জমি, সাবেকি জীবিকা, পরিবেশকে ধংস করে কয়লাখনি কখনওই সমর্থন করা যায় না। এই অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে আদিবাসীরা একজোট হয়েছেন কয়লাখনির বিরুদ্ধে। আমাদের যৌথমঞ্চের পক্ষ থেকে এই আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন আছে।’ কিন্তু আন্দোলনের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া এলাকার কয়েকজন। যাঁদের লোভ দেখিয়ে প্রকল্পের পক্ষে দালাল তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। বিকল্প জীবিকা না থাকার ফলে সাধারণ মানুষকে লোভ দেখানো সহজ হচ্ছে।


বিকল্প জীবিকার ভাবনা

 

এই অঞ্চলে সেচের কোনও ব্যবস্থা নেই। এই অঞ্চলের চাষ বৃষ্টি নির্ভর। চাষ ছাড়াও এই অঞ্চলের মানুষ জঙ্গল, মাঠ, জলাভূমি থেকে তাদের বেঁচে থাকার রসদ সংগ্রহ করেন। এর সঙ্গে এই অঞ্চলে অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিকভাবে চলে পাথর খাদান ও পাথর ভাঙ্গার ক্রাশার। অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া ও গরিব আদিবাসীরা বাধ্য হন পাথরের গুঁড়ো পেটে বুকে ঢুকিয়ে নিয়ে পাথর খাদানে ও ক্রাশারে কাজ করতে আসতে। ২০১০ সালে এই অঞ্চলের ৩০-৪০হাজার মানুষ পাথর খাদান বন্ধ করার দাবিতে এবং সুস্থায়ী ও সহনীয় জীবিকার দাবিতে শক্তিশালী লড়াই গড়ে তোলেন। সেই লড়াই ভেঙ্গে দিতে আসে তখনকার আমলের বামফ্রন্ট সরকার। ঐক্যবদ্ধ লড়াইতে কিছুটা ফাটল ধরাতে পারলেও আন্দোলনের ফলে বেশ কিছু বেআইনি পাথর খাদান বন্ধ হয়। বিকল্প জীবিকার দাবি পূরণ না হওয়ায় ধীরে ধীরে আবার পাথর খাদান ও ক্রাশার চালু হয়ে যায়। বাইরে থেকে আসা খাদান ও ক্রাশার মালিক এক টুকরো জমি কিনে খাদান ও ক্রাশার চালু করার পর আস্তে আস্তে অন্য জমির দিকে এগোতে থাকে। জমি নষ্ট করে দিয়ে সামান্য দাম দিয়ে জমি হাতিয়ে নেয়। বীরভূমের এই অঞ্চলে বিকল্প জীবিকার জন্য কোনোরকম কোনও উদ্যোগ বর্তমান তৃণমূল সরকারও নেয়নি। অথচ রাজ্য সরকার নিজেই খনির জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে আসছে। কিন্তু প্রয়োজন ছিল এই অঞ্চলে বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করার। তার জন্য সরকারকে ১২ হাজার কোটি টাক খরচ করতে হবে না। তার খুব সামান্য অংশ ব্যয় করে এই অঞ্চলের কৃষি ও শিল্প অর্থনীতিতে উন্নতি করা যায়। জলের ব্যবস্থা করে, চাষের উন্নতি ঘটিয়ে, পড়ে থাকা ফাঁকা জমিতে ফলের বাগান তৈরি, গ্রামের মানুষকে দিয়ে যৌথ পদ্ধতিতে পশুপালন এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ-সহ কম মাত্রার দূষণ ছড়ায় এমন শিল্প তৈরি করে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করলে এখানে ১ লক্ষ না হলেও বহু সংখ্যক কর্মদিবস বাড়ত এবং স্থানীয় বাসিন্দারা খাদ্যে স্বনির্ভর হতে পারতেন। তার সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ , পশুপালনের উন্নতি ঘটিয়ে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বা শিল্প তৈরি করে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন ঘটানো যায়। এই বিকল্প অর্থনীতিতে উদ্বৃত আয় হবে, এলাকার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং জনসাধারণের থেকে আদায় হওয়া বাড়তি কর রাজ্যের হাতে থাকবে। এই অর্থনীতিতে যেহেতু দেশি বা বিদেশি কর্পোরেটদের কোনও ভূমিকা নেই তাই এলাকার অর্থনীতিতে তৈরি মুনাফার লুট আটকানো যাবে। রাষ্ট্র জানে এলাকার মানুষ বিকল্প জীবিকার সন্ধান পেয়ে কয়লাখনি প্রকল্প করে কর্পোরেটদের খনিজ সম্পদ লুট ও সার্বিক ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াবে।

 

বিকল্প অর্থনীতির উদ্যোগ না নিয়ে, ৯.৭ বর্গ কিলোমিটার বা ৪৮৫০ একর জমি ধংস করে, এলাকার বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশকে ধংস করে যে প্রকল্প হতে চলেছে তা অবশ্যই দেশি বা বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে।

 

Share this
Leave a Comment