প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ত্রাণ সংগ্রহ ও বিলি এবং ত্রাণের রাজনৈতিকতা


  • July 19, 2020
  • (0 Comments)
  • 651 Views

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর আমরা গাঁয়ে গাঁয়ে খাবার ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য বিলি করতে যাই, মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়ায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে, ঠিক কী রকম মানবিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে এই দু’দলের মধ্যে ? আদৌ তৈরি হতে পারে কি ? আমপান-পরবর্তী সুন্দরবনে কয়েকদিনের ত্রাণ বিলি করার অভিজ্ঞতা থেকে লিখলেন নন্দিনী ধর

 

১।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার মধ্যে কোনও ধরনের মানবীয় হিরোগিরি নেই। যেমন আছে হয়তো বিদ্রোহে, বিপ্লবে, সংঘর্ষে। বরং, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে আছে একধরনের সংকোচন। প্রকৃতির কাছে মানুষের অসহায়ত্বের কাহিনি। একদিকে, সেই অসহায়ত্বর পাশে দাঁড়ানোটাই মানবিকতা। যে মানবিকতা প্রতিফলিত হয় ত্রাণ-সংগ্রহ ও বিলি করার মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরে আমরা কলকাতার মানুষরা সুন্দরবনে ত্রাণ দিতে যাবার মধ্যে একটা গোদা গল্প রয়েছে – আমি বা আমরা দাতা, বাকিরা গ্রহীতা। একবিংশ শতাব্দীর বিশ বছর পেরিয়ে যাবার পরও, আমরা গাঁয়ে গাঁয়ে খাবার ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য বিলি করতে যাই, মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়ায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে, ঠিক কী রকম মানবিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে এই দু’দলের মধ্যে ? আদৌ তৈরি হতে পারে কি?

 

আমাদের আজকের সময়ে তথ্যের অভাব ঘটে না। আমরা জানি, ঠিক কতটা টাকা পাওয়া গেছে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে। আমরা জানি, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কতটা ঋণ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। আমরা জানি, রাজনৈতিক দলবাজির কারণে ত্রাণের অসম বণ্টনের কথা। আমরা জানি, ত্রাণের অপ্রতুলতার কথা। কিন্তু, তাতে কি আসে যায়? আমাদের জানা দিয়ে কি আসে যায় সুন্দরবনের মানুষের? এই যে আমাদের দল বেঁধে সুন্দরবনে যাওয়া, তার মধ্যেও কি নেই একধরনের প্রগাঢ় নাগরিক মানসিকতা? কোথাও একটা কি গভীর আত্মপ্রসাদ মেলে আমাদের যে আমরা সঠিক কাজটি করেছি, মানুষের বিপদের সময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছি, কাজেই আবার আমরা নিশ্চিন্তে ফিরে যেতে পারি নিজ নিজ কাজে, নিজ নিজ জীবনে? সুন্দরবনে যাওয়া যেন অনেকটা আমাদের ত্রাণ-পর্যটন।

 

আমাদের বন্ধু আলোকচিত্রী রক্তিম মণ্ডল একটি ছবি তুলেছিল আমপান-পরবর্তী সুন্দরবনে ত্রাণ বিলি করতে গিয়ে। ছবিটি এক মহিলার – থালা হাতে তিনি লাইন দিয়েছিলেন আমাদেরই সংগঠিত ত্রাণশিবিরে। তাঁর স্টেইনলেস স্টিলের থালায় তাঁরই মুখের প্রতিবিম্ব। চমকে উঠেছিলাম। মানুষ যখন বাধ্য হয় তার শূন্য থালায় মুখ দেখতে, তখন ঠিক কোথায় দাঁড়ায় তাঁর মনুষ্যত্ব? একেই কি বলে “অনাবৃত জীবন” বা “বেয়ার লাইফ”? যেমন অনেকটা বলেছিলেন গ্রেগোরিও আগামবেন ইতালীয় দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী অন্য পরিপ্রেক্ষিতে? “অনাবৃত জীবন” যে মানুষটির, তিনি কি বিদ্রোহের কথা ভাবেন? তাঁর কি আছে নিজস্ব সংস্কৃতি? নিজস্ব গল্প? আমরা যখন যাই ত্রাণবিলি করতে, আমরা কি নিজের অজান্তেই সুন্দরবনের খেটেখাওয়া মানুষকে, আমাদের ত্রাণের লাইনে দাঁড়ানো পেটে পরিণত করি না?

 

আমি জানি, এর কোনো সহজ সমাধান নেই। কারণ, পেট বাদ দিয়ে যেমন মানুষ হয় না, তেমনি শুধু পেট নিয়েও মানুষ হয় না।অন্যদিকে, আমাদের ত্রাণ দিতে যাওয়া একধরনের ত্রাণ-পর্যটনের দ্যোতনা নিয়ে এলেও, ত্রাণ দিতে যাওয়ার মধ্যেও এক ধরনের বেড়া ভাঙার গল্প আছে। স্বল্পক্ষণের জন্যে হলেও, আমরা শহুরে বাবু-বিবিরা আমাদের নাগরিক আরামের ঘেরাটোপ ভাঙতে বাধ্য হই। বাধ্য হই অন্য এক বাস্তবতাকে জানতে। সেই জানার মধ্য দিয়ে হলেও হতে পারে তো অন্যরকমের একধরনের বিনিময়ের সূচনা। একধরনের বেড়াভাঙার গল্পের শুরু। এই লেখা কোনো প্রামাণ্য রিপোর্ট নয়। এই লেখা কোনো সুন্দরবন-বিশারদের লেখা নয়। কয়েকদিনের ত্রাণবিলি করার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, সুন্দরবনের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের কিছু টুকরো টুকরো ছবি আমার সামনে এসেছিল। এই লেখা সেই ছবিরই একটি প্রাথমিক সংকলন।

 

২।

এই প্রসঙ্গে বারবার মনে হয়, একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই বারবার করা প্রয়োজন। সেই প্রশ্নটি হলো, ঠিক কেমনভাবে গড়ে ওঠে সুন্দরবনের অধিবাসীদের প্রকৃতি-চেতনা? যার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে তাঁদের দুর্যোগ-চেতনাও? যেমন ধরুন, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কুঁয়েমুড়ি গ্রামের বাসিন্দারা ঝড় আসছে জেনেও ঘর আঁকড়ে বসেছিলেন অনেকেই। “আমরা ঝড়জলের দেশের মানুষ। এইটুকু হাওয়া আমাদের কি করবে?” বলেছিলেন বিশ্বম্ভর মণ্ডল। বিশ্বম্ভরের বয়স সাতান্ন, সামান্য জমিজমা থাকলেও, মূলত গ্রামের বাইরেই কাজ করেন। সাধারণত কন্ডাক্টেড ট্যুরের বাসে রান্নাবান্না করেন, অনেক দেশ দেখেছেন বলে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব আছে।

 

বিশ্বম্ভর সেই অর্থে পরিযায়ী শ্রমিক। পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ার ফলে তাঁর সাংস্কৃতিক চেতনায় একধরনের বদল ঘটেছে। যেমন, বেশ সহজভাবে আমাদের বুঝিয়ে বলতে পারেন, করোনাভাইরাসের কথা, গ্রামে কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের কথা। কেরল থেকে আসা গ্রামের যুবকদের করোনা নিয়ে অত কিছু ভয় নেই, যতটা রয়েছে অন্য রাজ্য থেকে আগত শ্রমিকদের নিয়ে। কিন্তু, কোথাও একটা বিশ্বম্ভর আদ্যোপান্ত সুন্দরবনের মানুষ। সেটা বেরিয়ে আসে তার কথার মধ্যে দিয়ে, নদীজলের গল্প যেভাবে বলেন তার মধ্যে দিয়ে, আশেপাশে পিরবাবার থানের গল্পের মধ্যে দিয়ে।

 

খুব স্বাভাবিকভাবেই, আমাদের সাথে জলের যে সম্পর্ক, সুন্দরবনের মানুষের জলচেতনা তার থেকে আমূল আলাদা। সেই পৃথক বোধ – যাকে বলা যেতে পারে একধরনের সামাজিক-ভৌগোলিক চেতনা – আমপানের সময়েও কার্যকরী হয়েছে।

 

 

তাই, বিশ্বম্ভরের মতো অনেকেই একদম অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত ঘর ছেড়ে বেরোননি। আরেকটু জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেলো যে, গ্রামের যে স্টর্ম সেন্টার, তার যে ধারণক্ষমতা, তা আসলে অপর্যাপ্ত। গ্রামের লোকসংখ্যা যদি হয় ২০০০০, স্টর্ম সেন্টারগুলির ধারণক্ষমতা ৭০০ বা ৮০০। সাথে সাথে, সরকারি তরফ থেকেও, তাদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার প্রায় কোনো প্রচেষ্টাই হয়নি। কাজেই, মানুষজন তৎপর হতে শুরু করেছেন বেলা আড়াইটার পর থেকে। বিশেষত, বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকে, তাঁরা আশ্রয় নিতে থাকেন পড়শিদের বাড়িতে – যাঁদের আছে পাকা কিংবা তুলনামূলকভাবে শক্তপোক্ত মাটির বাড়ি।

 

তো, এখানে দাঁড়িয়ে আমার মতো শহুরে লেখক-সাংবাদিক-শিক্ষক কী করবে? আমরা কি গোটা বিষয়টিকে দেখব অধিকারের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে? যেখানে দাঁড়ালে বারবার বলতে হবে গ্রামে গ্রামে স্টর্ম সেন্টারের অপ্রতুলতার কথা? নাকি, আমরা রোমান্টিকতা-মেদুর চোখে দেখব বিশ্বম্ভরের “এইটুকু হাওয়া”-র ব্যাখ্যা? যার মধ্যে আছে অন্য এক ধরনের প্রকৃতিবোধ, একধরনের নিবিড় কাব্যিকতাও। নাকি, এইখানে দাঁড়িয়েই আমাদের আরও গভীরভাবে বিষয়টিকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হবে? যেখানে থাকবে অধিকারের রাজনীতিও, আবার বিশ্বম্ভরের প্রকৃতি-চেতনাও একেবারে বাদ পড়বে না?

 

তো, কথাবার্তা বলে যেটা বুঝতে পারি, তা হলো, বিশ্বম্ভর, নিবেদিতা, আশারা – অর্থাৎ, কুঁয়েমুড়ি গ্রামের বাসিন্দারা – সেইদিন মাঝদুপুরে ঝড়ের চেহারা দেখে প্রথমে চেষ্টা করেন গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি একটা উঁচু জায়গায় বেঁধে রাখতে। তারপর, তাঁরা আশ্রয় নেন কোনো না কোনো পড়শির বাড়িতে – যাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো। কুঁয়েমুড়ি গ্রামের এই পাড়াটিতে সেইরকম বর্ধিষ্ণু পরিবারের সংখ্যা হাতেগোনার বেশি নয়। পরেরদিন ফিরে এসে তাঁরা দেখেন, গরু, ছাগল বা মুরগি অধিকাংশই মৃত। হাঁস,জলজ প্রাণী হওয়ার কারণে, বেঁচে আছে। সুন্দরবনের নিজস্ব বিকাশের হিসেবেও কুঁয়েমুড়ি বিশেষভাবে “পিছিয়ে থাকা” একটি জনপদ। তবে, অন্য অনেক গ্রামেও চিত্রটা খুব আলাদা নয়।

 

আমি ওঁদের মুখে এই সমস্ত বর্ণনা শুনি। আর, শব্দনির্মাতা হিসেবে আতঙ্কিত হই। এই বাস্তবতা আমার নয়। এই গরু-ছাগল-মুরগি-হাঁস-ধানখেত-জল-বাঁধ-লোনাজলে ঘেরা প্রাত্যহিকতাও আমার নয়। যাকে আমার জগৎ জ্ঞানচর্চা বলে, যাঁকে সেই জগৎ বিশারদের শিরোপা দেয়, সেখানে এই জ্ঞানের কোনো স্থান নেই। আমি ভয় পাই। লিখব যখন, তখন থাকবে কি এতসব খুঁটিনাটি মনে? মানে, এখানে আমরা ত্রাণ বিলি করতে এসেছি। আগেই যে বলেছি, “ত্রাণ” শব্দটির মধ্যেও তো আছে কতরকমের রাজনীতি। দাতা-গ্রহীতার মধ্যেকার যে অসম ক্ষমতাবিন্যাস, তা তো এই শব্দটির ছত্রে ছত্রে। কাজেই, আমাদের দেওয়া দু’কেজি চাল আর দুটো মুড়ির ঠোঙা গ্রামের মানুষ যাঁরা লাইন দিয়েছিলেন, তাঁদের কতদিনই বা চলবে? সেই যে অসম ক্ষমতাবিন্যাস ধরা পড়ে গ্রামবাসীদের সাথে আমাদের ব্যবহারেও। আমরা প্রায় ছোট ছোট নবাব। তাই, গ্রামের মানুষের খাওয়া জুটুক না জুটুক, আমাদের খাওয়ানোয় ব্যস্ত হয়ে ওঠেন গ্রামের মুরুব্বিরা। কিন্তু, আবার ভাবি যে, এই যে আমাদের না খাইয়ে ছাড়তে না চাওয়া, এর মধ্যে কি নেই গ্রামবাসীদের একধরনের সম্মানবোধও ?

 

সুন্দরবনের মানুষ আমাদের দেওয়া ত্রাণে কতটা উপকৃত হয়েছেন, আমি জানি না। কিন্তু, যদি কেউ এই “ত্রাণ” বিলি করতে গিয়ে আসলে কিছু শিখে থাকি, সেটা আমি। যেমনভাবে, সুন্দরবনে এই সময়ে না গেলে জানা হতো না যে কেমনভাবে লোনাজলের ঝাপ্টা এসে পুড়িয়ে খাঁক করে দেয় ইউক্যালিপ্টাস থেকে ম্যানগ্রোভের সারিকে। বন্যা কি, সাইক্লোন কি জানতাম। কিন্তু, জানা হতো না যে নোনাজল কেমনভাবে ধ্বংস করে মিষ্টি জলের মাছের পুকুর, ধানজমি, শাকসবজির খেত।কেমন দেখতে হয় সেই ধ্বংসস্তূপের ছবি।

 

তো, প্রকৃতি এখানে ভয়ানক। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে, পুঁজি বা রাজনীতি বা ক্ষমতা-পরিকাঠামোর বাইরে কোনও প্রকৃতিচেতনা আদতে হয় না, একথাও মানিনা। তবু, স্বীকার না করেও যে পারি না যে এস্থানে প্রকৃতি বড়োই সুন্দর। ভেতর অবধি কাঁপিয়ে দেওয়ার মতন সুন্দর। তো, এই অতীব ভয়ানক প্রকৃতির মাঝে দাড়িয়ে ঠিক কেমনভাবে প্রকৃতি হয়ে ওঠে মানবীয় সামাজিক ইতিহাসের স্বাক্ষর ?

 

যেমন ধরুন, সুন্দরবনের যে নদীটির নাম ঠাকরান, আর যে নদীটির নাম ওয়াল্টার্স ক্রিক বা ক্লাইভস ক্রিক, তারা কি দুটি ভিন্ন ভিন্ন বসতি গড়ে ওঠার ইতিহাসের কথা বলে না? ঠাকরান শব্দটি শুনলে কেমন মনে হয়, ঠাকরুন, মা-ঠাকরুন। বাড়ির কর্ত্রী। চলনেবলনে প্রভূত সামন্ততান্ত্রিক, কিন্তু মমতাময়ী। আবার সেখানে আছে একধরনের লোকধর্মের অনুষঙ্গও। যে লোকধর্ম একধরনের দেবী-কেন্দ্রিক মাতৃতান্ত্রিকতার কথাও বলে। নদী সেখানে দেবী, দেবী সেখানে মা, মা সেখানে নদী। সুন্দরবনের গ্রামেগঞ্জে আজও দেখতে পাওয়া যায় তেমনি কতই না দেবীর থান। কুমির বা মকর বা মাছ তাদের বাহন। এ দেবীকুলকে যেমন আর্য, ব্রাহ্মণ্যবাদী দৃষ্টি দিয়ে বোঝা যাবে না, তেমনি ভারতমাতাও এঁরা নন। অন্যদিকে, ক্লাইভস ক্রিক বা ওয়াল্টার্স ক্রিক নামগুলো নিয়ে আসে ঔপনিবেশিক পৌরুষের অনুষঙ্গ। সেই ইতিহাসও সুন্দরবনের পরিপ্রেক্ষিতে খুব ছোট নয়।

 

আমি ভাষাশ্রমিক। আমি জানি, ভাষা একদিকে ক্ষমতা, অন্যদিকে অস্ত্র। একদিকে বৈষম্য, অন্যদিকে প্রতিবাদ। আমি জানি, রূপকে লুকিয়ে থাকে রাজনীতি। সে রাজনীতি গভীরতর রাজনীতি। নির্বাচনভিত্তিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে তাকে ধরা যায় না। ধরা যায় না ক্ষমতাদখলের রাজনীতির মধ্য দিয়েও। যেমন, সুন্দরবনে কৃষকরা যখন বলেন, এবছরের ফলন ও তারপর লকডাউন ও তারপর আমপান প্রসঙ্গে, “প্রকৃতি মা এবার দিলেন দুহাতে, আর নিলেন চার হাতে,” তখন তার মধ্যে আছে গভীর রূপক। সে রূপক প্রকৃতি বা জমিকে শুধুই পুঁজিবাহিত সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করে না। সেখানে আছে আরও অনেক কিছু। একধরনের আবেগজাত সম্পর্ক, একধরনের অন্য অনুশীলনের ধারা।

 

তবে সুন্দরবনের ইতিহাস তো এক নির্নিমেষ পুঁজির ইতিহাসও। তাই, গ্রামের পর গ্রাম ছেড়ে শক্তসমর্থ পুরুষরা পরিযায়ী শ্রমিক হয়েছেন। কেউ বা কলকাতায়, কেউ বা কেরলে, কেউ বা দিল্লিতে। মেয়েরাও অনেকেই গ্রাম ছেড়েছেন। মূলত গৃহশ্রমিক হিসেবে। কমসংখ্যক হলেও নার্স হিসেবে। কোনও কোনও গ্রামে, যেখানে গ্রামের মধ্যেই আছে মেয়েদের হাইস্কুল, সেসব জায়গায়, কমসংখ্যক হলেও, মেয়েরা নিজেরাই পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে গ্রামের বাইরে যেতে পেরেছেন। সেসব মেয়েরা বেশিরভাগই নার্সিং শিক্ষাপ্রাপ্ত।

 

পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারের লোকজন গ্রামে রয়ে যান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদের স্ত্রী বা সন্তানেরা একধরনের অনিশ্চয়তা বোধের মধ্যে ভোগেন। একধরনের বিষণ্ণতা ঘিরে থাকে পরিবারগুলিকে। আবার একরকমের ক্ষমতায়নও ঘটে। যে ক্ষমতায়নের মুলে থাকে তুলনামূলকভাবে জীবনযাত্রার উন্নীত মান, একধরনের শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপনের সাথে পরিবারটির পরিচিতি। আবার, পরিযায়ী শ্রমিকের যে স্ত্রী গ্রামে রয়ে যান, তাঁকে বিভিন্ন সময়ে সংসার চালাতে গিয়ে নিতে হয় গুরুত্বপূর্ণ একক সিদ্ধান্ত।

 

৩।

যেমন ধরুন, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বল্লভপুর গ্রাম পঞ্চায়েত অন্তর্গত ক্ষেত্রমোহনপুর গ্রামের গৌরী প্রধান। বয়স ৩০। দুই সন্তানের মা। প্রথম সন্তানের বয়স ১৬, দ্বিতীয়টির ১২। প্রথমটি মেয়ে, দ্বিতীয়টি ছেলে। চমকে উঠলাম। তার মানে, ১৪ বছর বয়সে প্রথম মা হয়েছেন গৌরী।

 

“বিয়ে হয়েছিল যখন, তখন বয়স কত ছিল?”

 

“ওই এগারো-বারো। ”

 

গৌরীর ছেলে অটিস্টিক। চিকিৎসার চেষ্টা করলেও, বড়ো একটা সুযোগ মেলেনি।

 

“কলকাতায় নিয়ে দেখাতে শুরু করেছিলাম। মাসে একবার করে নিয়ে যেতাম। তারপর, আর একা একা টানতে পারলাম না, দিদি। আর গ্রামে তো এসব কিছু নেই। কাকদ্বীপেও নেই।”

 

মেয়ে কাকদ্বীপে হোস্টেলে থেকে পড়ছে। একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। গ্রামের মেয়েদের স্কুলের পঠনপাঠনের অবস্থা ভালো নয়। তাই, স্বামীর সাথে কিছুটা বচসা করেই মেয়েকে হোস্টেলে রেখে পড়াচ্ছেন গৌরী।

 

“আসলে ছেলেটার তো কিছু হবে না, দিদি। মেয়েটাকেই দেখতে হবে ছোট ভাইকে। নিজের পায়ে না দাঁড়ালে অত দায়িত্ব কি আর নিতে পারবে? তাই বরও মেনে নিয়েছে। ”

 

“আর তুমি?”

 

“মেয়েটা যেভাবেই হোক, নিজের পায়ে দাঁড়ালে ভালো। ”

 

প্রথম আলাপেই এর থেকে বেশি কিছু জানতে চাওয়া যায় না। বিশেষত, সম্পর্কটি যখন ত্রাণের লাইনের দাতা ও গ্রহীতার। তবু, এই যে গৌরীর পরোক্ষ ইঙ্গিত, কিংবা প্রত্যক্ষ আলাপচারিতা, তার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসে কত কি গভীর সামাজিক সত্য। কতরকমভাবেই না প্রান্তিক মেয়েরা পিতৃতন্ত্রের সাথে যোঝার চেষ্টা করেন। পিতৃতন্ত্রের ছিদ্রসমূহের মধ্যে দিয়ে খুঁজে ফেরেন নিজেদের জন্য ক্ষমতায়নের সীমিত সুযোগ।

 

গৌরী প্রধানের স্বামী পরিযায়ী শ্রমিক। কেরলে কর্মরত। যেদিন আমরা ত্রাণ দেওয়ার জন্য গেলাম ওঁদের গ্রামে, গৌরীর স্বামী সদ্য সদ্যই ফিরেছেন – কয়েক ঘণ্টা আগে। গৌরীর সাথে দেখা হয়নি তখনও। কারণ, উনি আছেন কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে, গৌরী দাঁড়িয়েছেন ত্রাণের লাইনে।

 

ক্ষেত্রমোহনপুরে মানুষজন ত্রাণের জন্য লাইন দিতে শুরু করেছেন সকাল ৭টা থেকে প্রায়। আমরা গিয়ে পৌঁছই বেলা ১১টা-সাড়ে এগারোটা নাগাদ। ক্ষেত্রমোহনপুরের বাসিন্দারা বেশিরভাগই অবশ্য স্টর্ম-সেন্টারে গিয়ে উঠেছিলেন। স্টর্ম-সেন্টারটিও অন্য গ্রামের থেকে বড়। কিন্তু, পরেরদিন ফিরে এসে দেখেন, ঘর ভাঙা। ত্রাণ বাবদ, সরকার থেকে কিছু চাল ও ত্রিপল মিললেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আর অন্য কিছু বড় একটা পাওয়া যায়নি, এও সত্যি।

 

কাজেই, গৌরীরা তাই ত্রাণের লাইনে। এখানে যদি আমরা আমপান-জনিত ক্ষয়ক্ষতি ও ত্রাণ না-মেলা, এর মধ্যে দিয়েই গৌরীদের জীবন দেখতে চাই, তাহলে বোধহয় বিষয়টা ঘোরতরভাবে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

 

 

৫০ বছর বয়সি কানন নায়েক যেমন গৌরীর পড়শি। স্বামী জনমজুর। কাননের নিজের ছিল কিছু পানের বরজ। সব ভেঙে গেছে।

 

“১০০ দিনের কাজ তো মেলেনি দিদি। মিলবেও না। ”

 

“কেন?”

 

“ওদের লিস্টে নাম বেশি হয়ে গেছে। দ্যাখো না, তোমরা যদি কিছু করতে পারো।”

 

অন্যদিকে মুখ ফেরাই। কি-ই-বা করতে পারি এখানে? কী-ই বা মানবিক সম্পর্ক সম্ভব এখানে?

 

৪।

সুন্দরবনে গৌরী একা নন। সাধারণভাবে, মেয়েদের বিয়ের বয়স, আমার কয়েকদিনের ঘোরার অভিজ্ঞতা বলে, বেশ কম। সরকারি ১৮ বছর বয়সের অনেক আগেই বহু মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। এবং, প্রত্যাশিতভাবেই, মেয়েদের স্কুল থেকে ড্রপ-আউটের হার বেশ বেশি।

 

যেমন ধরা যাক, কুঁয়েমুড়ি গ্রামের নিবেদিতা দাস। বয়স ২১ বছর। দুই সন্তানের মা। বড়টির বয়স ৬, ছোটটির বয়স ৬ মাস। নিবেদিতা চতুর্থ শ্রেণির পর আর স্কুলে যায়নি বা পড়াশুনা করেনি।

 

“কেন?”

 

“আমরা চার বোন। একভাই। পাঁচজনকে পড়ানোর ক্ষমতা বাবার নেই। ভাইকে পড়াতে হবে।”

 

নিবেদিতার ভাই ক্লাস টেনে পড়ে।

 

নিবেদিতার স্বামী একই গ্রামের ছেলে। “ট্রলিং” তার পেশা – অর্থাৎ , ট্রলারে করে গভীর জল থেকে মাছ ধরে আনা। একটু খোঁজখবর নিলে যেটা জানা যায় মোটামুটি, তা হলো, “ট্রলিং” – এর থেকে যে রোজগার হয়, তার ৬০ ভাগ পান ট্রলারের মালিক, ৪০ ভাগ হয় ট্রলারের শ্রমিকদের মধ্যে।

 

ঝড়ের সময়ে নিবেদিতা দুই সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এক প্রতিবেশীর পাকা বাড়িতে। স্বামী সেদিন গ্রামে ছিলেন না। ফিরে এসে দেখেন, বাড়িঘরদোর ভাঙা। গরুবাছুর মৃত। নিবেদিতা জানেন, সরকারি ত্রাণ তার প্রাপ্য। কিন্তু, তখনও কিছু এসে পৌঁছয়নি।

 

“এই গ্রামে আপনারাই প্রথম এলেন,” নিবেদিতা বলেন আমাদের।

 

“আসলে আমাদের গ্রামটা (কুঁয়েমুড়ির গঙ্গাধর পল্লি) বড়ই ছোট। কয়েকঘর তো মাত্র লোক। এখানে ভোট নাই বেশি,” নিবেদিতা হাসে।

 

নিবেদিতার কোলে তার ৬ মাসের মেয়ে। স্বাস্থ্য ভালো। “ওর নাম দিশা। ২৫ ডিসেম্বর জন্মেছে তো, তাই নাম রেখেছি দিশা,” নিবেদিতা জানাল।২৫শে ডিসেম্বরকে ঘিরে নিবেদিতার একটা ইতিহাসবোধ আছে। সেটা কী, জানতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু, ওই যে একদিন হঠাৎ করে গিয়ে পড়ে প্রচুর প্রশ্ন করার মধ্যেও এক ধরনের ক্ষমতা-প্রদর্শন আছে। সেটা ঠিক বলে মনে হয় না। তাই, কথা বাড়াই না।

 

“আমি কিন্তু দিদি নৌকো করে গিয়ে হাসপাতাল থেকে প্রসব করিয়েছি,” একটু প্রচ্ছন্ন গর্বের সাথেই জানালেন নিবেদিতা।

 

“সেসব লোকডাউনের আগে। এখন হলে কি হতো কে জানে”, অনেকটা যেন নিজেকেই বললেন নিবেদিতা।

 

নিবেদিতা জানায়, লকডাউনের পর থেকে বন্ধ গ্রামের আইসিডিএস।কেন্দ্র। দরিদ্র শিশু, গর্ভবতী মায়েদের প্রতিদিন পুষ্টি জোগানোর কথা যে প্রতিষ্ঠানটির মহামারি আর লকডাউনের আয়হীন সময়ে সারা দেশেই সে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রেখেছে সরকার। বিকল্প ব্যবস্থাও করেনি। একই কথা মিড ডে মিলের ক্ষেত্রে। স্কুল বন্ধ তাই মিড ডে মিলও বন্ধ হল প্রথমে। অবশেষে, মাসে ২ কেজি চাল আর এক কেজি আলু দেওয়া শুরু হল বাচ্চাদের। যে স্কুল পড়ুয়াটির জন্য প্রতিদিন ধার্য ছিল ভাত, ডাল, সব্জি, সয়াবিন, অন্তত দু’দিন ডিম সেই বর্ষা ভুঁইয়াদের পাত থেকে একরকম কেড়েই নেওয়া হল প্রোটিনের অধিকার।

 

“সবচাইতে সমস্যা গর্ভবতী মায়েদের,” নিবেদিতা জানায় আমাদের। সাথে করে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে আনে ভাঙাচোরা নদী বাঁধ। চারদিকে নোনাজলে চাষের জমি, অথবা মাছ চাষের পুকুর।

 

নিবেদিতার স্বপ্রতিভতা দেখে ভাবি, হয়তো অন্য কোনো সামাজিক পরিকাঠামোয়, নিবেদিতা হতে পারত আমার ছাত্রী, আমার বান্ধবী, ছোটপত্রিকার সহকর্মী। হাতে কলম পেলে কোন গল্প, কী গল্প লিখবে নিবেদিতা? বাংলা সাহিত্য কি প্রস্তুত নিবেদিতার লেখনীর জন্য? জানা হয় না। কারণ, দাতা-গ্রহীতা সম্পর্কের মধ্যে দাঁড়িয়ে এর থেকে বেশি কিছু জানা যায় না, জানা হয় না।

 

৫।

সঙ্কটের সংজ্ঞা বদলে যায় সামাজিক অবস্থানের সাথে সাথে। সুন্দরবনের গ্রামগুলির যে প্রাত্যহিক অবস্থা, সেখানে আমাদের মধ্যবিত্ত, শহুরে জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, “জরুরি অবস্থা” সর্বসময়ে। তার জন্যে অতিমারি বা সাইক্লোনের প্রয়োজন হয় না। যেমন ধরুন, জব কার্ড থাকা সত্ত্বেও, অধিকাংশ মহিলাই ১০০ দিনের কাজ পান না।যদিও, বিপিএল কার্ড বাবদ অনেক পরিবারেই লকডাউন পর্যায়ে ৫ থেকে ৭ কিলো চাল বা আটা ঢুকেছে। প্রায় সবারই বক্তব্য, সেই আটার গুণমান খুবই খারাপ।

 

তবে, কোথাওই কোনো সামাজিক একশিলাবর্তী হয় না। সুন্দরবনের গ্রামেও নয়। তাই, ত্রাণ দিতে গিয়ে আপাতভাবে চোখে না পড়লেও হিন্দু-মুসলিম বিভাজন আছে গ্রামগুলিতে। আছে হিন্দু-মৌলবাদের প্রবেশও। যার হাত ধরে সুন্দরবনের যে প্রথাভাঙা একধরনের সংকর ধর্মীয় সংস্কৃতি, তা আজ আক্রমণের মুখে। সচেতনভাবে বনবিবিকে হচ্ছে বনদেবী। তো, সেসব নিয়ে প্রয়োজন গভীর গবেষণা, অন্য ধরনের রাজনীতির। এই লেখার উদ্দেশ্য সেই গভীরতা নয়।

 

তবে, দারিদ্র্যের মধ্যেও থাকে বৈষম্য। জাতপাতজাত বৈষম্য। অন্যান্য বৈষম্য।

 

যেমন ধরুন, গোবিন্দপুর গ্রামের যে আদিবাসী পাড়া, সেখানে বাস ১৮টি পরিবারের। এই উপমহাদেশের জনপদগুলিতে, ঐতিহাসিকভাবে, স্থানিক রাজনীতি একটা বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলার গ্রামে গ্রামে বামুনকায়েতরা থাকে একই পাড়ায়, সেইসব পাড়ার নাম হয় বামুনপাড়া বা কায়েতপাড়া। নমঃশুদ্র সহ “ছোট” জাতদের বাস হয় অন্যত্র। তেমনি, এই গ্রামে আদিবাসী পাড়া একদম বাঁধের ধারে। ঝড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায়, সেই পাড়াতেই ক্ষতির মাত্রা সবচাইতে বেশি। কিন্তু, ত্রাণের লাইনে যে আদিবাসী মহিলার সংখ্যা মাত্র তিন। এক মা ও তাঁর দুই কিশোরী মেয়ে।এক মেয়ে বিবাহিত। কাজেই, হিসেবমতো, দুই পরিবার। তবে, ওই এক পরিবারই ধরুন।

 

“দিদি, আমরা আদিবাসী। তাই আমাদের টোকেন দেয় নাই। আমাদের পাড়ার বাকিরা তাই আসেও নাই।”

 

আমরা “আলোকপ্রাপ্ত” শহুরে ত্রাণকর্তারা গ্রামের মাতব্বর ছেলেছোকরাদের কাছে গিয়ে ব্যাখ্যা চাই।

 

“ওমা, সে আবার কি? এই তো দেখুন, খাতায় নাম লেখা আছে।” তারা বলে।

 

কিন্তু, টোকেন নেই। মানে, নথি আছে, বাস্তবতা নেই। বাস্তবে ত্রাণ মেলার কোনো সুযোগ নেই। বন্দোবস্ত নেই। কত বিবিধ পন্থায় যে প্রতিষ্ঠিত হয় এদেশের আইনানুগতা ও বে-আইনির মধ্যেকার ফাঁকফোকর, কীভাবে সেই ফাঁকফোকরের মধ্যে দিয়ে গলে যায় ব্যক্তি প্রান্তিক জীবন। কত গভীরভাবে যে সেখানে চলে জাতপাতগত বৈষম্য। আদিবাসী হওয়ার কারণে বৈষম্য।

 

তো, দেওয়া গেলো তিন আদিবাসী মহিলাকে ত্রাণ।

 

বেশ কিছুটা হুজ্জত করে। সে হুজ্জতে এই তিন মহিলাও যোগ দিলেন, রঙিন খিস্তি ডালির সম্ভার নিয়ে। কল্পনা করতে চেষ্টা করেও পারি না এই গ্রামে এঁদের প্রাত্যহিক জীবন। এই যে বৈষম্য ও খিস্তি – এই দ্বান্দ্বিকতাকে – ধরব কোন সাহেব স্কুলে পড়া “এজেন্সি” বা “ইন্টারসেকশনালিটি”-র তত্ত্বকথা দিয়ে? সত্যিই কি খিস্তি দিয়ে সব হয়? এঁদের জীবনে কি হয়েছে? হয়নি তো! তাহলে?

 

“জানেন তো, এই যে আমার দিদি, তিন দিন আগে ওর বাচ্ছা হয়েছে। ছেলে।” বলে আদিবাসী কিশোরী।

 

“নাম কি রেখেছো বোনপোর?”

 

“রাজ ভক্তা।”

 

দিদিকে জিজ্ঞাসা করি, “চিনতে নাকি ছেলের বাবাকে অনেক আগে থেকেই?”

 

লাজুক হাসে কিশোরী দিদি। সেই অর্থে, চটুল কথা। কিন্তু, কেমন করে মানবিক সম্পর্ক তৈরি হয় এক দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে? সমস্তরকম বদান্যতার বেড়া ডিঙিয়ে?

 

“দিদি, আমাদের বাড়ি চল। “দুই কিশোরী বলে। কথা দিই, আবার আসব।

 

“বেশ, তাহলে আমাদের সাথে সেলফি তোলো।”

 

তুললাম। ওদের নাম রূপা ভক্তা, বুলি ভক্তা। ওদের মার নাম, সাধনা ভক্তা।

 

ওদের সঙ্কটের বোধ আর আমাদের সঙ্কটের বোধ এক নয়। কোন ভাষায় কোনো একদিন রূপা বা বুলি লিখবে ওদের সঙ্কট, প্রান্তিকতা জনিত যে মানসিক-আবেগী অবস্থান, তার গল্প।

 

৬।

বল্লভপুরের গ্রামবাসীরা বলেন, “দিদি, কিছু মনে করবেন না। কিন্তু, এই যে আপনারা চালডাল দিচ্ছেন, এসব কিছু অত লাগে না। তবে, আপনারা যদি কাছাকাছি একটা বড় ফ্লাড সেন্টার দেন, বড় সুবিধে হয়। আমরা জায়গা বেছে দেব – দেখুন না, সব গাছ নোনাজলের ঝাপটে পুড়ে গেছে। কিছু গাছও লাগিয়ে দিতে পারেন।” এখানে প্রশ্ন থেকেই যায়। যখন ত্রাণ দিতে যাই আমরা, তখন তার মধ্যে নিঃসন্দেহে থাকে শুভবুদ্ধিসম্পন্নতা। কিন্তু, তার থেকেও আরও একটু বেশি কিছু কি থাকা প্রয়োজন আমাদের ত্রাণ-প্রচেষ্টাগুলিতে ?

 

ত্রাণ যখন আন্দোলন-বিচ্ছিন্ন একটি কার্যক্রম হয়ে দাঁড়ায়, তখন ঠিক কি রকম হয় তার রাজনীতি?

 

সামাজিক গণমাধ্যমের স্মৃতির বয়স গড়ে এক থেকে দুই সপ্তাহ। সেই সময়সীমা মাথায় রাখলে আপাতত শেষ আমপান। শেষ ত্রাণকার্য। কিন্তু, বাস্তবিক মানুষের জীবন অতো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় না। সামাজিক গণমাধ্যমের বাইরে থাকে মানুষের বাস্তবিক বেঁচে থাকা। কাজেই, এই আমপান-পরবর্তী সময়ে কেমন হবে সুন্দরবন-কেন্দ্রিক সার্বিক রাজনীতি, তার ওপরেই অনেকাংশে দাঁড়াবে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ। এখানকার মানুষের ভবিষ্যৎ ও বর্তমানও।

 

 

 

লেখক শিক্ষক ও ছোট পত্রিকা কর্মী। 

 

ছবি – রক্তিম মণ্ডল

 

Share this
Leave a Comment