অধ্যাপক জি এন সাইবাবা-র মুক্তি ও চিকিৎসার দাবি এনপিআরডি-র


  • July 17, 2020
  • (0 Comments)
  • 251 Views

এই মুহূর্তে ভারতবর্ষে রাষ্ট্রের অমানবিক আচরণ ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। মহামারী, লকডাউন সব মিলিয়ে যে সময়ের মধ্যে দিয়ে দেশ চলেছে সেখানে রাষ্ট্রের নাগরিক-বিরোধী অবস্থান স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। এমন এক সময় যখন মানুষ অনেকাংশেই গৃহবন্দী থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, যখন প্রতিবাদ-প্রতিরোধের স্বাভাবিক পথগুলি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, তখনই রাষ্ট্র তার দাঁত-নখ বার করে প্রতিরোধের-প্রতিবাদের স্বরগুলির উপর নামিয়ে এনেছে চূড়ান্ত আক্রমণ। এই পরিস্থিতির অনেক আগে থেকেই রাষ্ট্রবিরোধী কাজকর্মের অভিযোগে দেশের নানা প্রান্ত থেকে বহু সমাজকর্মী, অধ্যাপক, মানবাধিকারকর্মী, শিল্পী, আইনজীবী, সাংবাদিকদের আটক করা, ইউএপিএ-তে কারারূদ্ধ করা, বারংবার জামিন নামঞ্জুর করার মধ্যে দিয়ে তাঁদের যাবতীয় অধিকার খারিজ করা হয়েছে। এখন যখন কোভিড সংক্রমণ দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দীদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে তখন এই মানুষগুলি রয়েছেন সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায়। কারণ বয়স ও বিভিন্ন বয়সজনিত শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁরা কোভিড সংক্রমণের শিকার হতে পারেন যে কোনও সময়ে এবং জেলে তাঁদের সঠিক চিকিৎসা ও দেখভালের কোনও ব্যবস্থাই নেই। এর উদাহরণ আশি ছুঁই-ছুঁই প্রতিবাদী কবি ভারাভারা রাও ইতিমধ্যেই বন্দী থাকাকালীন কোভিড আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন ও হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হলেও তাঁর জীবন বিপন্ন।

 

চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সম্পূর্ণভাবে হুইলচেয়ার নির্ভর এবং বর্তমানে ১০০% প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়া কারাবন্দী অধ্যাপক জি এন সাইবাবা। তিনি বিগত ছবছর জেলবন্দী। রয়েছেন নাগপুর সেন্ট্রাল জেল-এর অন্ডা সেল-এ, অর্থাৎ যেখানে জেলকুঠুরিতে একা বাস করতে হয় তাঁকে। বন্দী হওয়ার সময় তিনি ৯০% শারীরিক প্রতিবন্ধী অবস্থায় ছিলেন, কিন্তু জেলজীবনে নিয়মিত ওষুধ না পাওয়া, মানসিক ট্রমা, শারীরিক যত্ন না পাওয়া, সঠিক ও স্বাস্থ্যকর খাবারের অভাব তাঁকে আজ ১০০% প্রতিবন্ধী করে তুলেছে। অধ্যাপক সাইবাবা-কে ভালবেসে কয়েক জন সহবন্দী স্বেচ্ছায় তাঁর প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন কাজে তাঁকে সহায়তা করতেন, কিন্তু এই কোভিড সংক্রমণের সঙ্কটকালে তাঁরাও আর এগিয়ে আসছেন না। ফলে চূড়ান্ত অসহায় অবস্থায় প্রতিটি দিন কাটছে অধ্যাপকের। সেইসঙ্গে আতঙ্কের বিষয় হল তিনি যেখানে বন্দী সেই জেল ব্যারাকেই থাবা বসিয়েছে কোভিড। শারীরিক অবস্থার কারণে অধ্যাপক সাইবাবা রয়েছেন চরম ঝুঁকির সামনে। একবার কোভিড আক্রান্ত হওয়া মানে, এখন মৃত্যুর সমন। জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলি দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর মুক্তির বিষয় নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু রাষ্ট্র উদাসীন। 

 

এমতাবস্থায় গত ১৬ জুলাই একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে এ দেশে প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের জাতীয় মঞ্চ ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর দ্য রাইটস্ অফ দ্য ডিসএবেলড। এই মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক মুরলিধরন এই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন  

 

ডঃ জি এন সাইবাবা-কে মুক্ত করা হোক; তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। 

 

দ্য ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর দ্য রাইটস অফ দ্য ডিসএবেলড (এনপিআরডি) –  কেন্দ্র সরকার ও মহারাষ্ট্র সরকার যেভাবে জেলবন্দী মানবাধিকার কর্মীদের সঙ্গে অসংবেদনশীল ব্যবহার করে চলেছে তার তীব্র নিন্দা  করছে।

 

এর মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় হল অধ্যাপক জি.এন. সাইবাবা-র মতো বন্দীদের অবস্থা, যেখানে সমস্ত আর্ন্তজাতিক সনদ ও দেশের অভ্যন্তরের আইন যেমন প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার আইন ২০১৬, জেল ম্যানুয়াল এই সবই লঙ্ঘন করা হচ্ছে। ৯০% প্রতিবন্ধী ডঃ সাইবাবা-র ১৯ রকমের জটিল শারীরিক অসুস্থতা রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী হতে পারে। তাঁর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম এবং সেইসঙ্গে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা। তাঁর প্রতিবন্ধকতা তৈরির কারণ হল শৈশবে পোলিও আক্রান্ত হওয়া যা তার দুটি পা-কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সেইসঙ্গে মেরুদন্ড ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্রমশ বাড়তে থাকা ও চিকিৎসাহীন অসুখ। তাঁর স্ত্রী-র বক্তব্য অনুযায়ী তাঁর দুটি হাতও এখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও অকেজো হয়ে পড়েছে, কারণ তাঁকে গ্রেফতার করার  সময় পুলিস তাঁকে যেভাবে আঘাত করেছিল এবং জেলে তাঁর কোনওরকম চিকিৎসা না হওয়া। নাগপুর সেন্ট্রাল জেল যেখানে তিনি বর্তমানে বন্দী সেখানে তিনি চূড়ান্ত অসুবিধার মধ্যে রয়েছেন। জেল-এর ভেতরে যাওয়ার কোনও উপায় নেই, তা একপ্রকার অগম্য। নিয়মিতভাবে পুলিস ও জেলকর্মীদের দ্বারা তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও রূঢ় আচরণ করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, একা কারাবাসের শাস্তিপ্রাপ্ত হওয়ায় তিনি আগে যে সহবন্দীদের থেকে যে সহায়তা পেতেন তা বেশ কিছুদিন যাবৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া; যার জন্য তাঁকে এখন অন্ডা সেল-এ অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।

 

নাগপুর সেন্ট্রাল জেল-এর শোচনীয় অবস্থা ও জেলের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য অনেক রক্ষী ও বন্দী (একজন এমনকি তাঁর সেল-এর খুবই কাছে) ভয়ানক কোভিড ১৯ সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন এবং এই সম্ভাবনাও পুরোদমে রয়েছে যে তিনি সে কোনও মুহূর্তে এই ভাইরাস-এ আক্রান্ত হতে পারেন। তাঁর কো-মর্বিডিটি-র কারণে তা মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে যেতে পারে। অধ্যাপক সাইবাবা-কে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য, যা এখন তিনি একেবারেই পাচ্ছেন না। 

 

এই পরিস্থিতিতে, আমরা কেন্দ্র সরকার ও মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি তাঁকে তাঁর পছন্দের কোনও চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে জামিনে মুক্ত করা হোক। 

         

Share this
Leave a Comment