প্রতিবন্ধী অধিকার আইনের সংশোধন বন্ধ হল লাগাতার প্রতিবাদে


  • July 15, 2020
  • (1 Comments)
  • 589 Views

প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার আইন, ২০১৬তে সম্প্রতি কিছু সংশোধন করতে চেয়েছিল দেশের সরকার। কারণটা স্পষ্ট, পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষা। করোনা মহামারী, লকডাউন ইত্যাদির আবহে রাষ্ট্র ভেবেছিল কোনওরকম বিরোধিতা ছাড়াই এই সংশোধন করে ভারতের এক বিরাট সংখ্যক প্রতিবন্ধী মানুষের আইনসম্মত অধিকার ছেঁটে ফেলে কর্পোরেটদের আস্থাভাজন থাকবে। কিন্তু দীর্ঘ দুদশক ধরে যে নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ের ফলে ভারতের প্রতিবন্ধী মানুষেরা রাষ্ট্রকে এই আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য করতে পেরেছিলেন, সেই তাঁরাই আবারও লাগাতার বিরোধীতায়, অনলাইন প্রচারে, স্বাক্ষর সংগ্রহে স্তব্ধ করতে পেরেছেন এই অনৈতিক প্রতিবন্ধী মানুষদের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপকে। লিখেছেন অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়

 

 

মে মাসের ১২ তারিখে দু মাসের মধ্যে চতুর্থ বারের জন্য দেশবাসীর মুখোমুখি হন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ততদিনে কোরোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হাজার পেরিয়ে লক্ষ স্পর্শ করেছে। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর দলের অতি বড় সমালোচকও হয়তো প্রত্যাশা করেছিলেন সংকটের এই পর্বে কিছু ইতিবাচক দিশা থাকবে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে। প্রায় আধ ঘণ্টার ভাষণে যে শব্দটা প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রের মতো ঊচ্চারণ করলেন বহুবার তা হল “আত্মনির্ভর”। বিপর্যস্ত দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে – যখন ভাইরাসের সংক্রমণে গোটা পৃথিবী থরহরিকম্প, তখন আত্মনির্ভরতার প্রচেষ্টার মধ্যে নীহিত আছে পরিত্রাণের পথ। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, শিল্পের জন্য জমি, বাজারের পর্যাপ্ত অর্থ, পরিকাঠামোর উন্নতি ও আইনের সংশোধন – এই চারটি ক্ষেত্রে আমূল সংশোধন করলে তবেই প্রকৃত আত্মনির্ভর হবে দেশ। শিল্পের জন্য জমি, বাজারের পর্যাপ্ত অর্থ, পরিকাঠামোর ঊন্নতি এবং আইনের সংশোধন। এর সহজ অর্থ হল এই যে, জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে যে সমস্ত বাধা রয়েছে সেই সব বাধা অপসারণের চেষ্টায় ব্রতী হবে দেশের সরকার, বাজারে অর্থের যোগান সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে তৎপরতার সঙ্গে, চেষ্টা হবে পরিকাঠামো ঊন্নয়নের আর এই কাজ করার পথে যে সব আইন অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে সেই সব আইনকেই সংশোধন করা হবে দ্রুত। দেশের তাবৎ অর্থনীতিবিদ মোটামুটি একমত হন যে, এ পথে দেশ মোটেই আত্মনির্ভর হতে পারবে না, আত্মনির্ভর হবেন শুধু সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু পুঁজিপতি। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসাবেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সমস্ত দপ্তরের কাছে জানতে চায় অবাধ পুঁজি বিনিয়োগের পথে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোন কোন আইন অন্তরায় হতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন। সেই সব আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবেই খাঁড়া নেমে আসে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার আইন, ২০১৬-র ওপর। প্রত্যাশিতভাবেই দেশের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক বিরাট অংশের মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হন, কিন্তু, যা ছিল অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত তা হল সমাজের অন্য নিপীড়িত অংশের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের এক বিরাট অংশ তথা কয়েকটি রাজনৈতিক দলের এই প্রতিবাদে সামিল হওয়া। এর ফলশ্রুতিতেই পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ণ দপ্তর। সংশোধনের প্রস্তাব রদ হয়ে গেলেও একটা আশঙ্কা কিন্তু থেকে গেল। কি সেই আশঙ্কা আর কিভাবেই বা রুখে দেওয়া যাবে আগামীর সব অপচেষ্টা-সেই আলোচনাই মূল ঊপজিব্য এই নিবন্ধের।

 

PWD থেকে RPD: এক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

 

দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর স্বাধীন ভারতবর্ষে সংবিধানের খসড়া মঞ্জুর করে গণপরিষদ। দেশের সমস্ত নিপীড়িত অংশের মানুষের অধিকার ও আইনী সুরক্ষার কথা বলা হয় এই সংবিধানে, শুধু অনুল্লিখিত থেকে যায় প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকারের প্রসঙ্গটি। বিশ্বের বৃহত্তম লিখিত সংবিধান দেশের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষকে কোনও সুস্পষ্ট আইনী সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টা বিবেচনাই করেনি! এই আইনী সুরক্ষা পাওয়ার জন্য প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল দীর্ঘ ৪৮ বছর। ১৯৯৫ সালে এক আন্তর্জাতিক সন্ধির শর্ত রক্ষার্থেই দেশের সংসদ কোনোরকম আলোচনা ছাড়াই পাস করে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের সমান সুযোগ, পূর্ণ অংশগ্রহণ এবং অধিকার রক্ষা আইন। কয়েক কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করবে এমন একটা আইন সম্বন্ধে আলোচনা করার জন্য এক মুহূর্ত সময়ও অতিবাহিত করার প্রয়োজন বোধ করে নি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের আইনসভা! এই ঘটনার ২১ বছর পর ২০১৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশের আইনসভায় পাস হয় প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার আইন, ২০১৬, বাতিল হয়ে যায় ১৯৯৫ সালের আইন। এই আইনটি নিয়ে বেশ কয়েক ঘণ্টা বিতর্ক হয় লোকসভা ও রাজ্যসভায়। দেশের আইনসভা এই সময়টুকু দিতে বাধ্য হয়েছিল কারণ গত দু দশক ধরে চলা প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সক্রিয়তা। ১৯৯৫ আর ২০১৬ সালের মধ্যে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের আন্দোলনের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা ঊল্লেখযোগ্য ঘটনাটা ছিল রাষ্ট্রসংঘ কর্তৃক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার সংবলিত বিশেষ সনদের অনুমোদন এবং সারা পৃথিবীর প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের তাকে অকুণ্ঠ সমর্থন। এই সনদকে হাতিয়ার করেই আমাদের দেশের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিরা সোচ্চার হয়েছেন নিজেদের অধিকারের দাবিতে, দাবি ঊঠেছে কেবলমাত্র প্রতিবন্ধকতাকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে কোনোভাবেই প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের আন্দোলনের চাপে এই সনদকে অনুমোদন করতে বাধ্য হয় আমাদের দেশের তদানীন্তন সরকারও। এর ফলে সরকার বাধ্য হয় প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার সংক্রান্ত সকল আইনকে রাষ্ট্রসংঘের সনদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করতে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে প্রথমে ১৯৯৫ সালের আইনকেই সংশোধন করার কথা ভাবা হয়। কিন্তু পরে ২০১০ সালের ৩০ এপ্রিল জারি করা এক নির্দেশিকায় সরকার ঘোষণা করে যে, প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের আন্দোলনের দাবি মেনে নিয়ে তৈরি হবে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটা আইন। এই আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় সব ধরণের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের মত প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়ার কথাও ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সরকার। অবশেষে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংসদে প্রথমবারের জন্য ঊত্থাপিত হয় প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার আইনের প্রথম খসড়া। এই খসড়ায় কিছু ঊল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি থাকায় বিলটিকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর পর মত বিনিময় চলে প্রায় দু বছর। অবশেষে ২০১৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশের সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়ে যায় এই বিল এবং ওই বছরের ২৭শে ডিসেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে বিলটি আইনে পরিণত হয়।

 

RPD আইনের কিছু ঊল্লেখযোগ্য দিক

 

আগের আইনে সাত ধরণের অবস্থার শিকার ব্যক্তিকে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত বলে বিবেচনা করার কথা বলা ছিল, কিন্তু, নতুন আইনে তা বেড়ে হয়েছে ২১ ধরণের অবস্থা। থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া, মাল্টিপল্ স্ক্লরোসিসের মতো অবস্থা যেমন প্রতিবন্ধকতা বলে বিবেচিত হয়েছে তেমনি যুক্ত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদী স্নায়বিক অসুখ, পার্কিনসন্স রোগে আক্রান্ত মানুষ অথবা অ্যাসিড হামলার শিকার মানুষেরাও। এই আইনে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের এমন কিছু অধিকার দেওয়া হয়েছে যা আগে স্পষ্টভাবে ঊল্লিখিত ছিল না। এই আইন প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, সুযোগ করে দিয়েছে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষালাভের। আগের আইন যেখানে ৩% সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করেছিল, সেখানে এই আইন মোতাবেক ঊচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে ৫% এবং চাকরির ক্ষেত্রে ৪% সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এক অভিন্ন পরিচয়পত্রের কথাও এই আইনে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। এই নতুন আইন প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য, কারণ এই আইনে স্পষ্টভাবে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। আইনের ষোড়শ অধ্যায়ে ঊল্লিখিত হয়েছে এই সব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

 

প্রস্তাবিত সংশোধন

 

কোরোনা অতিমারির আবহে যখন গোটা দেশকে কর্পোরেট পুঁজির বল্গাহীন মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত করতে চাইছে আমাদের দেশের সরকার, তখন প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার আইনের শাস্তিমূলক ধারাগুলোকে যে তারা বাতিল করতে চাইবে এর মধ্যে বিস্ময়ের খুব একটা অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। এই আইনের ৮৯, ৯২-এর ক এবং ৯৩ ধারায় বর্ণীত অপরাধকে লঘু করার প্রস্তাব করেছিল প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ণ দপ্তর। আইন বা এই আইন মোতাবেক তৈরি হওয়া কোনো বিধি না মানলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের থেকে জরিমানা আদায়ের সংস্থান আছে আইনের ৮৯ নং ধারায়। ৯২-এর ক ধারায় বলা আছে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিকে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কেঊ অপমান বা ভীতিপ্রদর্শন করেন তাহলে সেই ব্যক্তির ছ’ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। আইনের ৯৩ নং ধারায় বলা হয়েছে সমস্ত কোম্পানী প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণ করবে এবং নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে সেই তথ্য পরিবেশন করবে। তা না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা করার ব্যবস্থা থাকবে। এ কথা সহজেই অনুমান করা যায় যে, উপরোক্ত ব্যবস্থাসমূহ কর্পোরেট পুঁজির পক্ষে মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে যদিও বাস্তবে কোনো বেসরকারী শিল্পপতি অথবা শিল্পসংস্থা এরকম কোনো সুপারিশ করেছে বলে জানা যায় না। এমনকি, ২০১৭ সালে আইনটি বলবৎ হওয়ার পর এই সব ধারায় আমাদের দেশের আদালতে খুব বেশি মামলা দায়ের হয়েছে বলেও জানা যায় না। এমতাবস্থায় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এই আইন সংশোধনের প্রস্তাবের মধ্যে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার সম্বন্ধে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গীর স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে।

 

বর্তমান শাসক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিরা

 

২০১৫ সালের ৩রা ডিসেম্বর যখন প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার আইন পাসের দাবিতে রাজধানী দিল্লীর রাস্তায় হাঁটছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষ, তখনি প্রচারের তুফান তুলে দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সূচনা করছেন “সুগম্য ভারত” (Accessible India) প্রকল্পের। এই প্রকল্প কতটা সফলভাবে রূপায়িত হয়েছে তা গবেষণার বিষয়। কিন্তু, একথা বলতে কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি ব্যতিরেকে এই প্রকল্প প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের জীবনে কোনো স্পষ্ট প্রভাব ফেলতে পারেনি। তার মানে কি এই যে, প্রাপ্তির ভাঁড়ার সম্পূর্ণ শূন্য! মোটেই নয়। এই দিনই প্রথম দেশের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের এক নতুন অভিধা খুঁজে পেলেন। এতদিন তারা ছিল “বিকলাঙ্গ”, কিন্তু, সেদিন থেকে তারা হল “দিব্যাঙ্গ”। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজের জন্মদিনে হাজার হাজার প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষকে সমবেত করে সহায়ক সরঞ্জাম বিতরণ করে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নিজের নাম তুলেছেন আর তারপর বেমালুম ভুলে গেছেন এই সব মানুষের কথা। আসলে, প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সরকার হয়তো ভেবেছেন যাঁদের অঙ্গে নীহিত রয়েছে দেবত্ব, রাষ্ট্র তাঁদের কথা ভেবে কী করবে! তাই কোরোনা অতিমারিতে যখন ঘোর অনাহারের কবলে পড়েছেন লক্ষ লক্ষ প্রতিবন্ধী মানুষ, যখন কাজ চলে গেছে হাজার হাজার মানুষের, যখন নিজের বাড়িতেই এক বিপন্নতা গ্রাস করেছে এই ধরণের মানুষকে, তখন দু মাসে মাত্র হাজার টাকা অনুদান দিয়ে দায় সারেন দেশের অর্থমন্ত্রী। যে সহায়ক সরঞ্জাম গিনেস বুকে ঠাঁই করে দিয়েছিল দেশের প্রধানমন্ত্রীকে, সেই সহায়ক সরঞ্জামই আজ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের। এমতাবস্থায় দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলে অর্জিত কয়েকটি অধিকার বড় বেশি মনে হচ্ছে আত্মনির্ভরতার মন্ত্রে উদ্দীপিত সরকারের। তাই তো সবার অগোচরে এই আইনটিকে ধীরে ধীরে হীনবল করার অভিসন্ধি রচনা করেছিলেন তাঁরা।

 

চলবে লড়াই

 

ঘুরপথে এই আইনের সংশোধনের বিরুদ্ধে সঙ্গতভাবেই প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন দেশের আপামর প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের সঙ্গেই সমাজের অন্য স্তরের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও। National Platform for the Rights of the Disabled (NPRD)-র আহ্বানে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন বহু মানুষ। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে যে চিঠি NPRD পাঠিয়েছিল সেখানে স্বাক্ষর করেছিলেন ২০০-রও বেশি ব্যক্তি ও সংগঠন। ফলে আজ পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্রের সরকার, মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে প্রস্তাবিত সংশোধন প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের বৃহত্তম অংশের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে। তবে, এই রাউণ্ডের লড়াইয়ে মানুষের সমবেত শক্তির সামনে পিছু হঠতে বাধ্য হলেও আগামীতে বিভিন্ন অছিলায় এই আইনের ওপরে আরো আঘাত আসবে, প্রকাশ্যে বা গোপনে চেষ্টা চলবে এই আইনকে ভোঁতা করে দেওয়ার। অভিজ্ঞতা আমাদের এই শিক্ষাই দেয়, কিন্তু, এই সত্যই শেষ সত্য নয়। RPD আইন পাসের আগের সংগ্রাম যাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁরা জানেন দেশের বিভিন্ন অংশের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিরা কিভাবে বিভিন্ন সংগঠনের আহ্বানে হাজির হয়েছিল রাজধানীর রাজপথে। হাজির হয়েছিল বন্যায় ভেসে যাওয়া তামিলনাডুর গ্রামের মানুষ, মুড়ি-চিঁড়ে বেঁধে দীর্ঘ তিন দিনের পথকষ্টের শেষে যন্তরমন্তরের সামনে ধরনায় হাজির হয়েছিল ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া তথা সুন্দরবনের দরিদ্রতম প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষ। তাঁদের মুখে সেদিন সোচ্চারে ধ্বনিত হয়েছিল, “বাঁচার অধিকার চাই!” সেই দৃপ্ত মিছিলের স্মৃতি যাঁদের মনে এখনো টাটকা, তাঁরা আজও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হচ্ছেন, দাঁতে দাঁত চেপে ঊচ্চারণ করছেন শপথবাক্য, “চলবে লড়াই”!

 

 

লেখক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রতিবন্ধী সম্মীলনীর যুগ্ম সম্পাদক, ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর দ্য রাইটস্ অফ দ্য ডিসএবেলড্এর এগজিকিউটিভ সদস্য, পেশায় বিদ্যালয় শিক্ষক।

 

Share this
Recent Comments
1
Leave a Comment