আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র, অঘোষিত জরুরি অবস্থা এবং ভারতে সাংবাদিকতার স্বরূপ


  • July 7, 2020
  • (1 Comments)
  • 302 Views

সংবিধান বাতিল হয়নি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকারও নয়। সাংবাদিকদের ধারাবাহিক ভাবে গলা টিপে ধরার প্রয়াস — হুমকি, গ্রেপ্তার এমনকি খুন — জরুরি অবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। যেন অঘোষিত এক জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়ে চলেছে দেশ। এমন দমবন্ধ পরিবেশের বিস্তৃত ছবি তুলে ধরলেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

প্রথম পর্ব

 

জরুরি অবস্থার ৪৫ বছর পূর্ণ হল ২০২০ সালের ২৫ জুন। আর কী আশ্চর্য সমাপতন! পঁয়তাল্লিশ বছর পরে সেই অতীতেরই প্রতিরূপ হয়ে উঠেছে আজকের ভারত। যেন ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে দেশ জুড়ে। ‘দেশদ্রোহী’, ‘দেশবিরোধী তকমা জুটে যাওয়া এখন আর নতুন কিছু নয়। হ্যাঁ, কোন্‌ কোন্‌ বিষয়ে কথা বললে বা মত প্রকাশ করলে এই তকমা জুটতে পারে সেটা আর এখন আমার-আপনার বোঝার মধ্যে নেই। কারণ ‘দেশ বলতে এখন রাষ্ট্র, বলা ভালো রাষ্ট্রশক্তি। ঠিক সেই জরুরি অবস্থাকালীন সময়ের মতোই। এখন অবশ্যই তার সঙ্গে ধর্মের আফিম মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় শাসক গোষ্ঠী সফল হয়েছে। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানোই এখন রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু এড়ানোর সবচেয়ে ভালো উপায়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এই সমীকরণের বাইরে নেই সংবাদমাধ্যমও। সমস্যা হল বদলে গেছে সংবাদমাধ্যমের চেনা ছবিও। সংবাদমাধ্যম বলতে যে চেনা সাহসী ছবিটা অনেক ছোট থেকেই আমাদের অনেকের মন আর মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছিল, যার জন্য আমরা অনেকেই হয়তো এই পেশাকে বেছে নিয়েছি, সেই ছবিটা গত ছ’, সাত বছরে আমূল বদলে গেছে। ১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থার সময়ে যদি রাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ খর্ব করে, তবে এখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সাবধানী হয়ে উঠেছে সংবাদমাধ্যমগুলিও। তাদের স্বেচ্ছা সেন্সরশিপ, সংবাদমাধ্যমের উপর রাষ্ট্রের ক্ষমতার আস্ফালনকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলছে। দেশের সব সংবাদমাধ্যম হয়তো নয়, সব সাংবাদিক বা সম্পাদকও নিশ্চয়ই নন – কিন্তু অধিকাংশ ‘কর্পোরেট মিডিয়া’এখন কোনওভাবেই আর রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন কাউকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে চায় না, রাগাতে চায় না। কারণ সৎ সাংবাদিকতার থেকে মুনাফার আকর্ষণ অনেক বেশি। সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে বঞ্চিত হতেও চান না তারা। সুতরাং এই সুযোগ রাষ্ট্র ও তার তাঁবেদারেরা কাজে লাগাচ্ছে মুষ্টিমেয় সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে কোণঠাসা করতে — যারা এই ব্যবস্থার লাগামছাড়া দুর্নীতি ও নাগরিক-বিরোধী, সংবিধান-বিরোধী কাজকর্মকে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার কাজটি করছেন। আইনব্যবস্থাও এখন ক্ষমতার সহায়।

 

২০১৭-তে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ-এর মৃত্যু সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। রাতের অন্ধকারে আততায়ীরা তাঁর বাড়ির সামনেই গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল এই নির্ভীক বর্ষীয়ান সাংবাদিককে। সুপরিচিত সাংবাদিক ও আন্দোলনকর্মী গৌরী লঙ্কেশ দীর্ঘদিন থেকেই বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন তাঁর ‘লঙ্কেশ পত্রিকা’য় তথ্যনির্ভর সরকার বিরোধী সংবাদ পরিবেশনের জন্য। কিন্তু কেউই ভাবেননি যে তার জন্য নিজের জীবন দিয়ে দাম দিতে হবে একজন সাংবাদিককে। যদিও ভারতে সাংবাদিক হত্যা নতুন নয়। তবে এই ধর্মান্ধ, আধিপত্যবাদী এবং গোটা দেশকে পুঁজিপতিদের হাতে বিক্রি করে দেওয়ার শলা করা সরকার যে বিরোধী মতপোষনকারী সাংবাদিক হত্যায়ও পিছপা হবে না, তা যেন গৌরীকে দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছিল। আর দিন গোনা শুরু হয়েছিল সংবাদমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার। আজ সেই ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে এসে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি, সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা আর নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে চাওয়া কতিপয় সংবাদসংস্থা ও সাংবাদিকের উপর রাষ্ট্রের অসাংবিধানিক আক্রমণ নেমে আসা বুঝিয়ে দেয় কেন আজ আমরা ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’র সামনে দাঁড়িয়ে।

 

একটা ছোট পরিসংখ্যানের দিকে নজর রাখা যেতে পারে। গত বছর একদল সাংবাদিক ও গণমাধ্যম গবেষক একটি সমীক্ষা করেন, যা প্রকাশিত হয় ২০১৯-এর ডিসেম্বর মাসের শেষে – ‘গেটিং অ্যাওয়ে উইথ মার্ডার’। এই সমীক্ষাটির উপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে ‘দ্য ওয়্যার’ নিউজ পোর্টাল-এ। এই সমীক্ষাটি থেকে জানা গিয়েছিল, ২০১৪ থেকে ২০১৯-এর মধ্যে পাঁচ বছরে ভারতে প্রায় ২০০ জন সাংবাদিকের উপরে গুরুতর আক্রমণ হয়েছিল। হত্যা করা হয়েছিল ৪০ জন সাংবাদিককে, যার মধ্যে ২১টি ক্ষেত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছিল যে এই হত্যাগুলি তাঁদের সংবাদ সংক্রান্ত কাজের জন্যই ঘটেছিল। এই গবেষণা থেকে উঠে আসা তথ্যে দেখা গিয়েছে, আক্রমণকারী বা আততায়ীদের মধ্যে ছিল সরকারি সংস্থা, রাজনৈতিক দলের সদস্যরা, সুরক্ষা কর্মীরা, ধর্মীয় সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, অপরাধীদের দল, স্থানীয় মাফিয়া। এরা সকলে যে টাকাপয়সা ও ক্ষমতার খেলায় ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে থাকে তা নতুন কথা নয়।

 

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে বিষয়টি এই সমীক্ষা থেকে উঠে আসে তা হল, নিজেদের তদন্তমূলক সাংবাদিকতার জন্য যে সমস্ত সাংবাদিক ২০১৪ থেকে আক্রমণের শিকার হয়েছেন, তার একটি ক্ষেত্রেও অপরাধীর সাজাপ্রাপ্তির কোনও উদাহরণ নেই। তার কারণ তারা পুলিস প্রশাসনের সাহায্যে আটক, সাজা এড়িয়ে যেতে পেরেছে সহজেই। আদালত পর্যন্ত পৌঁছলেও তাই ইচ্ছাকৃত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে কিছুই প্রমাণ করা যায়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চেষ্টা করা হয়েছে সাংবাদিকতা নয় এ ধরনের আক্রমণের কারণ হিসাবে সাংবাদিকের কোনও ব্যক্তিগত বিবাদ বা তাঁর বিরূদ্ধে আনা মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগকে প্রমাণ করার এবং পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার আঁতাতে তা সম্ভবও হয়েছে। একইসঙ্গে এই সময়কালের মধ্যে মহিলা সাংবাদিকদের উপরে আক্রমণও লক্ষ্যণীয়ভাবে বেড়েছে। বিশেষত শবরীমালা বিতর্কের সময়  এর বেশ কিছু উদাহরণ রয়েছে। কম-বেশি প্রায় ১৯ জন মহিলা সাংবাদিকের উপর আক্রমণের ঘটনা নথিবদ্ধ আছে এই সমীক্ষায়।

 

দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই সমীক্ষাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এক, যে সব সাংবাদিকের উপর আক্রমণ হয়েছে তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনও আঞ্চলিক সংবাদ সংস্থার কর্মী বা স্ট্রিঙ্গার, যারা দেশের ঝাঁ-চকচকে শহরাঞ্চলের বাইরের যে আসল ‘ভারতবর্ষ’ সেখানে অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্টিং করেছেন। অন্তত সাত জন এমন সাংবাদিকের উদাহরণ দেওয়া যায় যাঁরা বালি মাফিয়া, জল মাফিয়া, বেআইনি মদের ব্যবসা, জমি দখল ইত্যাদির উপর তদন্তমূলক রিপোর্টিং করতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। দুই, দেশে ক্রমাগত বাড়তে থাকা অ-নিরপেক্ষ সংবাদ সংস্থা ও সাংবাদিকের সংখ্যা যাঁরা হয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মালিকানায় রয়েছেন বা তাদের ঘনিষ্ঠ। এর ফলে স্পষ্টতই একটা মেরুকরণ ঘটে গেছে সংবাদের দুনিয়ায় ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে, যা এধরনের আক্রমণের পথই প্রশস্ত করেছে মাত্র।

 

মনে রাখা দরকার, যে সময়ে এই সমীক্ষাটি প্রকাশিত হচ্ছে, তখনই দেশজুড়ে সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনও তুঙ্গে পৌঁছাচ্ছে। আর সেই আন্দোলন নিয়ে যে সংবাদ সংস্থাগুলি বা যে সাংবাদিকেরা নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার চেষ্টা করেছেন তাঁরা সকলেই রাষ্ট্রক্ষমতার রক্তচক্ষু দেখেছেন। কখনও চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া, কখনও কোনও সাংবাদিককে দলীয় সমর্থকদের দিয়ে হেনস্থা, অপমান সবই হয়েছে। সেই কারণেই সম্ভবত এই সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক ও গবেষকেরা একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান যে, যেসব অন্যায়গুলির কথা তাঁরা উপস্থাপিত করেছেন সেগুলির ন্যায় পাওয়া বা অন্তত সেগুলির দায় নেওয়ারও সরকারের তরফ থেকে কোনও চেষ্টা হবে তেমন আশা সত্যিই কম, কারণ স্পষ্টতই গত ছ’বছরে বিচারব্যবস্থার লজ্জাজনক অবস্থান। এই সময়েরই মিডিয়া রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ২০১৯-এর ১১ থেকে ২১ ডিসেম্বর-এর মধ্যে সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ১৪ জন সাংবাদিক পুলিশি আক্রমণ, হুমকি ও হেনস্থার শিকার হয়েছেন এবং অবাক হওয়ার কিছুই নেই যে তাঁদের মধ্যে বড় সংখ্যক মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত।

 

আসলে ২০১৪ থেকে যে চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন দলটি কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসেছে এবং তাদের অনুপ্রেরক যে ধর্মীয় সংগঠনটি — তাদের এক ও একমাত্র লক্ষ্য ভারতের মতো একটি বহু ধর্মের, বিবিধ ঐতিহ্যের দেশকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের উপর বর্বর আক্রমণ, প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা, দেশের দরিদ্র জনসংখ্যাকে দরিদ্রতম করে দিয়ে পুঁজিপতিদের উদরস্ফীতি করা ছাড়া এই সরকারের আর কোনও পরিকল্পনা নেই। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে গত ছ’-সাত বছরে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক, সামাজিক অবনমন ঘটেছে তা এক কথায় অকল্পনীয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই দেশের সংবাদ সংস্থার, সাংবাদিকদের এই পরিস্থিতিতে একমাত্র কাজ প্রকৃত চিত্রটি উপস্থাপন করা। কোনওভাবেই যাতে সত্য গোপন না হয় বা তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থেকে কাজ করা। কিন্তু সেই ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থাকালীন সময় থেকেই এটা স্পষ্ট যে দেশে একনায়কতন্ত্র না থাকলেও রাষ্ট্র তার সবটুকু ক্ষমতা প্রয়োগ করে ও আইনের ফাঁক গলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া থেকে খর্ব করা কোনওটাতেই পিছিয়ে থাকে না। আর বর্তমানের অঘোষিত জরুরি অবস্থার সময়েও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

 

লেখক ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং স্বতন্ত্র সাংবাদিক

 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Prabir on July 8, 2020

    আমার আন্তরিক অভিনন্দন রইলো আপনার কাছে। ভালো লাগলো লেখাটা।

Leave a Comment