একশ দিনের রোজগার যোজনা – মোদি সরকারের উল্টো পুরাণ


  • June 26, 2020
  • (0 Comments)
  • 199 Views

সময়টা ছিল ২০১৪। নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি প্রধানমন্ত্রীর তখতে বসলেন। মোদি ‘মহাত্মা গান্ধী একশ দিনের রোজগার যোজনা’কে উপহাস করে বলেছিলেন এই প্রকল্প আদতে গর্ত খোঁড়ার কাজ এবং বিগত দিনের ব্যর্থতা স্মারক হিসাবে প্রকল্পটিকে তিনি সামান্য হলেও জীবিত রাখবেন। তারপর গঙ্গা-যমুনা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। এখন ২০২০। অপরিকল্পিত লকডাউন, লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের অবর্ণনীয় দুঃখের দিনলিপি, ভয়ঙ্কর কর্মহীনতার আঘাতে ভেঙে পড়ছে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন মিনার। আর তখন গ্রামীণ অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য একশ দিনের রোজগার যোজনা (এখন থেকে মনরেগা) কেই খড়কুটোর মত আঁকড়ে ধরেছে মোদি সরকার। একে সময়ের নিদারুণ পরিহাস বললেই গল্প টা শেষ হয়ে যায় না। গিরগিটির মত রঙবদল সংসদীয় রাজনীতির কারবারিরা অহরহ করে থাকেন কিন্তু আমরা সে পথের যাত্রী নই, তাই আরেকবার আমরা বলতে চাই গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণে মনরেগার গুরুত্ব আগে যেমন ছিল, আজো একই আছে। সঠিকভাবে রূপায়ণ করতে পারলে বর্তমান সময়ে এই প্রকল্প আরো কার্যকরী সাব্যস্ত হবে। লিখেছেন সুমন কল্যাণ মৌলিক

 

কথা রেখেছিলেন নরেন্দ্র মোদি, অন্তত প্রথম দু- তিন বছর। তার আগে বলে নেওয়া ভাল যে মনমোহন সিং এর প্রধানমন্ত্রীত্বে ইউএপিএ-১ সরকার মনরেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছিল অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের সুসংগঠিত গণ-আন্দোলনের চাপে। সে সময়ে দুটি আইন (কাজের অধিকার ও খাদ্যের অধিকার আইন) উন্নয়ন অর্থনীতির ময়দানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল। এই কথাটিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল যে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধিতে গরীব মানুষেরও অধিকার আছে। তারা নিছক দয়া বা চুঁইয়ে নামা উন্নয়নের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচতে বাধ্য নন। কিন্তু মোদি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে তার অর্থনীতি সংক্রান্ত উপদেষ্টারা লাগাতার মিথ্যাচার করে ও বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে একশো দিনের রোজগার যোজনা প্রকল্পটিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলেন। অথচ ভারতীয় সংসদের দুই কক্ষেই বিপুল সমর্থনে এই বিলটি পাশ হয়েছিল। মোদ্দা কথাটা ছিল যতদিন কর্মসংস্থানের চাহিদা থাকবে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রকল্প চালিয়ে যেতে বাধ্য থাকবে। টাকার অভাব এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে কোন অজুহাত হবে না। মোদি সরকারের আগে এই প্রকল্পটি দেশের ৬,৫৭৬টি ব্লকে প্রচলিত ছিল। মোদি জমানায় স্পষ্ট ঘোষণা করা হল দেশের মাত্র ২,৫০০ টি ব্লকে যোজনাটি চালু থাকবে। একই সঙ্গে রাজ্যসরকারগুলিকে প্রকল্প বাবদ অনুদান কমিয়ে দেওয়া হল। যার ফলে ২০১৪-১৫-য় সারা দেশের মনরেগা প্রকল্প বাবদ বকেয়া মজুরি ৯,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এমন কি বিজেপি শাসিত রাজ্যসহ মোট ১০টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা এই প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে মোদি সরকারকে অনুরোধ করেন কিন্তু সরকার তাঁদের দাবিতে কান দেয়নি।

 

মনরেগা প্রকল্পটি কি সত্যিই অকার্যকর বা সরকারি অর্থের অপচয় তা বোঝার জন্য নিম্নলিখিত তথ্যগুলি কার্যকর হতে পারে –

 

# প্রথম ৮ বছরের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছর দেশের ৫ কোটি পরিবারকে কাজ দেওয়া হয়েছে, যা মোট গ্রামীণ পরিবারের ২৯%। উপকৃতদের মধ্যে ৫৪% মহিলা, ৪০% দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের।

 

# ক্যাগের রিপোর্ট অনুযায়ী উপকৃতদের ৯০% হয় অস্থায়ী মজুর বা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক।

 

# সরকারের প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে মাত্র ৩০ পয়সা (জিডিপির ০.৩%) এই প্রকল্পের জন্য ব্যয় করা হয়, অথচ সুফল পান ২৫ কোটি মানুষ।

 

# ২০০১-২০০৬ সময়পর্বে এই প্রকল্পের কারণে গ্রামীণ মজুরি বৃদ্ধি পায়।

 

অবশ্য মোদি সরকারের এই বাগাড়ম্বর বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ‘আচ্ছে দিনে’র ফানুস চুপসে চুপসে যাওয়ার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির কঙ্কালসার চেহারাটা সামনে চলে আসে। সরকার তথ্য চেপে দেওয়ার চেষ্টা করলেও  সংবাদমাধ্যম সরকারি তথ্য প্রকাশ করে যাতে দেখা যায় ২০১১-১২ থেকে ২০১৭-১৮ সময় কালে গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ৯% কমেছে। গ্রাম-ভারত প্রত্যক্ষ করে কৃষক জনতার বিদ্রোহ। মুখে স্বীকার না করলেও মোদি সরকার বাধ্য হয় মনরেগা প্রকল্পের বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে।তাই আমরা দেখি ২০১৪-১৫ আর্থিক বর্ষে যেখানে মনরেগায় বরাদ্দ ছিল ৩৩,০০০ কোটি টাকা তা ২০১৭-১৮ বর্ষে ৫৫,০০০ কোটি টাকা এবং ২০১৯-২০ বর্ষে ৬০,০০০ কোটি টাকা।

 

করোনার দিনগুলোতে একশ দিনের রোজগার যোজনা

 

নির্মলা সীতারামনের প্যাকেজে মনরেগার জন্য অতিরিক্ত ৪০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর আগে  ফেব্রুয়ারী মাসের কেন্দ্রীয় বাজেটে বর্তমান আর্থিক বছরে ৬৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। মোট হল ১,০১,৫০০ কোটি টাকা। যদিও মনে রাখতে হবে পুরনো বছরের দায় মেটাতে (এরিয়ার পেমেন্ট)  ১০,০০০ কোটি টাকা বেরিয়ে যাবে। তবুও আমরা মনে করি গ্রামীণ অর্থনীতিকে বাঁচাতে এই প্রকল্পটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ফলে গরীব  মানুষের হাতে টাকা থাকবে যা আবার বাজারে চাহিদা তৈরি করবে। মোদি সরকারের নির্বোধ অর্থনৈতিক ধারণা ও কর্পোরেট দায়বদ্ধতার কারণে প্রকল্পটি ইতিমধ্যেই বহুলাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন প্রয়োজন যুদ্ধ কালীন তৎপরতায় মনরেগা প্রকল্পের সফল প্রয়োগ।

 

একশ দিনের রোজগার যোজনা – সমস্যার চালচিত্র

 

মনরেগার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় গলদ হল আমলাতান্ত্রিক বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকা এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাব। এটা চাহিদানির্ভর কর্মসূচি কিন্তু চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ২০১৯-২০ আর্থিক বর্ষে ৫৭৮ লক্ষ জন কাজ চেয়েছিল, কিন্তু কাজ পায় ৫১২ লক্ষ জন। কিছু রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান দেখা যেতে পারে।

 

সারণী ১ :  কর্মপ্রার্থী ও কর্মপ্রাপ্তি (২০১৯-২০)

রাজ্য কাজ চেয়েছেন (লক্ষ জন) কাজ পেয়েছেন (লক্ষ জন)
পশ্চিমবঙ্গ ৫৯ ৫৫
উত্তরপ্রদেশ ৬৩ ৫৫
তেলেঙ্গানা ২৮ ২৫
তামিলনাড়ু ৫৯ ৫৬
ওড়িশা ২৬ ২৩
বিহার ৪২ ৩৪
ছত্তিশগড় ২৯ ২৪
ঝাড়খন্ড ১৬ ১৪

 

একশ দিনের কাজ বলা হলেও আজ পর্যন্ত কখনো বছরে ১০০টি শ্রমদিবস সৃষ্টি করা যায় নি। ২০১৭-২০ সময়পর্বে  গড় করে দেখা যাচ্ছে  একনম্বর স্থানে থাকা পশ্চিমবঙ্গেও বছরে গড় শ্রমদিবসের সংখ্যা ৬২ দিন।

 

সারণী ২ : ২০১৭-২০ (গড়)

রাজ্য শ্রমদিবস (দিন)
পশ্চিমবঙ্গ ৬২
উত্তরপ্রদেশ ৪২
তেলেঙ্গানা ৪৫
তামিলনাড়ু ৪৪
ওড়িশা ৪২
বিহার ৪০
ছত্তিশগড় ৫৫
ঝাড়খন্ড ৪৩

 

মনরেগার ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হল বিভিন্ন রাজ্যে অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য যে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত, মনরেগা প্রকল্পের মজুরি তার থেকে কম।

 

সারণী ৩ : দৈনিক মজুরির তুলনা (টাকা)

রাজ্য মনরেগার মজুরি অদক্ষ শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি
পশ্চিমবঙ্গ ১৭১ ২৪৭
উত্তরপ্রদেশ ১৮২ ৩১৮
তেলেঙ্গানা ১৫৪ ৩০২
তামিলনাড়ু ১৭২ ১৯৮
ওড়িশা ১৮৭ ২৯৮
বিহার ১৭৭ ২৬৮
ছত্তিশগড় ১৬৬ ২৪০
ঝাড়খন্ড ১৭১ ৩০৭

 

প্রকল্পের বিস্তার জরুরি

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে মনরেগায় শুধু একশ দিনের কাজ নিশ্চিত করলেই চলবে না,দাবি তুলতে হবে দুশো দিনের কাজের। গড়পড়তা হিসেবে যারা কাজ চাইছে তাদের একশ দিনের কাজ নিশ্চিত করতে হলে এক বছরে সরকারের খরচ হবে ১,০৫,২৪২ কোটি টাকা ( জিডিপির ০.৪২%)। যদি আমরা দুশো দিনের কাজ চাই তবে সরকারের খরচ ২,১০,৪৮৩ কোটি টাকা (জিডিপির ১% এরও কম)। আর যদি সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি দিতে হয় তবে দুশো দিনের কাজের জন্য খরচ হবে ৩,১৩,৭৪১ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৪%)। আর একইসঙ্গে শহরের গরীব মানুষের জন্য এই প্রকল্পকে বিস্তার করার কথাও আমাদের ভাবতে হবে। সেক্ষেত্রে ওয়ার্ড ভিত্তিক ভাবে কাজ চান, এমন মানুষদের চিহ্নিত করতে হবে।

 

(সমস্ত তথ্য কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন দপ্তর প্রকাশিত বিবরণী The Wire-এর একটি রিপোর্ট থেকে গৃহীত।)

 

লেখক স্কুলশিক্ষক ও গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী। 

 

Share this
Leave a Comment