আমফানের ক্ষতিপূরণের দাবিতে অবস্থানরত গ্রামবাসীদের উপর প্রশাসনের মদতে হামলা, গ্রেফতার


  • June 22, 2020
  • (0 Comments)
  • 300 Views

গ্রাউন্ডজিরো রিপোর্ট

 

বর্তমানের বিপদকালীন সময়ে নিজেদের দাবি-দাওয়া দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক আধিকারিদের কাছে নিয়মিত জানিয়েও কোনও ফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত যখন তাঁদের প্রতিবাদের সামনে প্রশাসনিক নানা কারচুপি ও দুর্নীতি ধরা পড়ার মুখে তখন সেই প্রতিবাদকারীদের উপরেই নেমে এল শাসক দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা দুষ্কৃতিদের আক্রমণ। রাজ্য পুলিসের হাতে গ্রেফতার হতে হল প্রতিবাদকারীদেরই।

 

এই ঘটনাই ঘটেছে উত্তর ২৪ পরগণার দেগঙ্গায়। সোমবার সকাল থেকেই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছিল কারণ গত কয়েক মাস ধরে ক্রমাগত প্রশাসনিক গাফিলতি ও স্বজনপোষনের ফলে সাধারণ দরিদ্র, খেটে খাওয়া গ্রামবাসী তাঁদের হকের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। করোনা সংক্রমণের কারণে লকডাউনে রুজি- রোজগার বিপর্যস্ত, তার সঙ্গে আমফান ঝড়ে সম্পূর্ণ ধসে পড়ে জীবন-জীবিকার কাঠামো। প্রশাসন থেকে ত্রাণ আসবে, যা এই মানুষগুলির অধিকার। এমনটাই ভেবেছিলেন তাঁরা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল কোনও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া মেনে আমফান ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি হচ্ছে না। সেখানে বরং নাম ঢুকে যাচ্ছে শাসক-ঘনিষ্ঠদের। সরকার থেকে ঘোষিত ২০ হাজার টাকা অধিকাংশই পেয়েছেন যাদের প্রয়োজন নেই অথচ শাসক দলের অনুগত তাঁরাই, অথচ যে গ্রামবাসীরা প্রকৃতই ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁরা রয়েছেন সেই তিমিরেই। তাছাড়া একশ দিনের কাজের প্রাপ্য মজুরিও পাননি বহু গ্রামবাসী। সেইসঙ্গে জব কার্ড ও রেশন কার্ড পাওয়ার দীর্ঘদিনের দাবি তো রয়েছেই।

 

এই সব মিলিয়েই সোমবার সকালবেলা বিডিও অফিস ঘেরাও করেন দেগঙ্গা ব্লকের ১৩টি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় ১৫০০ গ্রামবাসী। দীর্ঘদিন ধরে মহামারি, লকডাউন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় সবের মাঝে যখন তাঁদের জীবন বিপন্ন তখনও প্রশাসনের তরফে এহেন দুর্নীতি তাঁরা আর বরদাস্ত করতে পারেননি। বিডিও অফিস থেকে এই প্রতিবাদ কর্মসূচীর খবর আগে থেকে পেয়ে যাওয়ায় বিডিও অফিসের গেটে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু গ্রামবাসীরা সেই গেট ভেঙেই ঢুকে পড়ে বিডিও অফিসের দখল নেন। ভেতরে আটকে থাকেন খোদ বিডিও। গ্রামবাসীরা বিডিও অফিসের ভেতরে সভা চালাতে থাকেন, জোরালোভাবে বারেবারে নিজেদের দাবিগুলি পেশ করতে থাকেন। প্রশাসনের উচ্চ থেকে মধ্য ও নিম্ন – সব স্তরেই আমফানের ক্ষতিপূরণকে কেন্দ্র করে যে বিপুল পরিমাণ কারচুপি চলছে তা নিয়ে তাঁরা নিজেদের ক্ষোভ উগরে দেন। একশ দিনের কাজে পরিশ্রমের টাকা হাতে না পাওয়া নিয়েও ছিল জমে থাকা অভিযোগ যা উপস্থিত মানুষেরা বক্তব্যে পেশ করেন। জমায়েতের পাশাপাশি এই মানুষেরা বিডিও অফিসেই রান্না-খাওয়ার প্রস্তুতিও নেন ও গণ-আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে মিলে কবিতায়-গানে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।

 

ইতিমধ্যেই বিশাল পুলিসবাহিনী নিয়ে ডিএসপি এসে উপস্থিত হন, যদিও তাঁর আশ্বাসেও গ্রামবাসীরা সরেননি। প্রথমে বিডিও সরাসরি গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলতে অরাজি হলেও, কিছু সময় পরে তাঁদের জোরালো দাবির সামনে কথা বলতে রাজি হন, যদিও তিনি আমফানের ক্ষতিপূরণ নিয়ে কোনও রকম রিপোর্ট দিয়ে উঠতে পারেননি। উপরন্তু তিনি নিজের ব্লকের পঞ্চায়েতের প্রধান ও উপপ্রধানদেরও ডেকে নেন। মনে রাখা দরকার, ব্লক, পঞ্চায়ত স্তরের আধিকারিকেরাও অর্থনৈতিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলেই গ্রামবাসীদের অভিযোগ, যারা প্রতিনিয়ত ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে তাঁদের দাবিয়ে রাখছেন। তবে এদিন দুপুর পর্যন্ত গ্রামবাসীদের কোনও প্রতিনিধি অফিসের ভেতরে গিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। বিডিও, আইসি-কে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এসে মাইক নিয়ে উপস্থিত সব গ্রামবাসীদের সামনে কথা বলতে হয়। বিডিও গ্রামবাসীদের চাপে কিছু দাবি মেনে নিলেও ক্ষতিপূরণের যে তালিকা নিয়ে অভিযোগ, তা কোনওভাবেই প্রকাশ করতে রাজি হননি। গ্রামবাসীরা স্পষ্ট জানান আমফানের ক্ষতিপূরণের যে তালিকা তৈরি হয়েছে তা কার্যতই ভুয়ো, কোনও রকম গ্রামসভা করে বা স্বচ্ছ পদ্ধতিতে তা ঠিক করা হয়নি, এই তালিকা তাই বাতিল করতে হবে।

 

সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেলে পৌঁছলেও প্রশাসন প্রতিবাদরত গ্রামবাসীদের ন্যায্য দাবিগুলি মেনে না নেওয়ায় সন্ধ্যার সময়ে গ্রামবাসীরা টাকি রোড-এ বসে পড়ে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন। সমস্ত যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। একশ দিনের কাজ, একশ দিনের কাজের বকেয়া মজুরি মিটিয়ে দেওয়া, জব কার্ড, রেশন কার্ডের দাবির পাশাপাশি এদিনের সবচেয়ে বড় দাবি ছিল, আমফানের ক্ষতিপূরণের ভুয়ো তালিকাটি সকলকে দেখিয়ে তা বাতিল করে গ্রামসভা করে একটি নতুন ও সঠিক তালিকা তৈরি করতে হবে প্রশাসনকে।

 

এই সমস্ত দাবি নিয়ে টাকি রোডে অবস্থান শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে শাসক দলের ঘনিষ্ঠ আক্রমণকারীরা উপস্থিত হয়ে নির্বিচারে তাঁদের উপর আক্রমণ শুরু করে। পুলিসের তরফ থেকে তাঁদের বাধা তো দেওয়া হয়ইনি বরং একইসঙ্গে গ্রামবাসীদের উপর তারাও বর্বরোচিত আঘাত নামিয়ে আনে। ইঁট, পাথর, লোহার রড দিয়ে হামলাকারিরা মারাত্মক মারে প্রতিবাদরত শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানকারী গ্রামবাসীদের। শুধু তাই নয়, হামলাকারীদের নয় পুলিস গ্রেপ্তার করে গ্রামবাসীদের মধ্যে কয়েক জন ও তাঁদের সঙ্গে থাকা গণ আন্দোলনের কর্মীদের। মহামারী ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাঝে রুজি-রোজগার, এমনকি বাসস্থান হারানো, স্বাভাবিক জীবন খোওয়ানো গ্রামবাসীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লড়াইয়ের উপর প্রশাসনের মদতে এই হামলা আবারও প্রমাণ করল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কোনও নির্দিষ্ট রং হয় না, তার রং শুধুই ক্ষমতার আর যা মানুষ অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হলেই তার টুঁটি চেপে ধরতে চায়।

 

Share this
Leave a Comment