বাস্তুতন্ত্র উন্নয়নের নামে শবরদের চাষের জমি, বাড়ির উঠোন দখল করে বনসৃজন


  • June 22, 2020
  • (0 Comments)
  • 2623 Views

জাইকা রাজ্য সরকারের যৌথ প্রকল্পের মোদ্দা নীতি হল, বনের বাস্তুতন্ত্রের উন্নতি, জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ, এবং বনসৃজনের মধ্য দিয়ে জীবনজীবিকার উন্নতি। বনসৃজনের নামে আদিম বনবাসী এবং অন্যান্য পরম্পরাগত অধিবাসীদের চাষের জমি, বাস্তুভিটা খুঁড়ে তাদের জীবনজীবিকারই বা কী উন্নতি ঘটবে? প্রশ্ন তুললেন দেবাশিস আইচ

 

গীতাঞ্জলি আবাস যোজনায় ২০১৩-‘১৪ সালে বাড়ি পেয়েছেন রঞ্জিৎ শবর। ২০২০ সালে সেই বাড়ির কয়েক হাতের মধ্যে অন্তত ২০টি পিট খোঁড়া হল বনদপ্তরের নির্দেশে। শুধু বাড়ির চৌহদ্দিতেই নয়, সব্জির খেতেও খোঁড়া হয়েছে পিট। সেখানেও বনসৃজন হবে। ঘটনাটি ঘটেছে মানভূম-১ ব্লকের বামনি মাঝিহিরা গ্রাম পঞ্চায়েতের জনারা শবরপাড়ায়। বনদপ্তরের এই ভূমিকায় প্রমাদ গুনছেন দেবেন কিংবা গোপাল শবররা। এর পর তবে কি উচ্ছেদ? প্রশ্ন উঠেছে সরকারের এক দপ্তর যে জমিতে ঘর তৈরি করে দিচ্ছে আর এক দপ্তর তা কেড়ে নিতে উদ্যোগী কেন?

 

কোভিড-১৯ অতিমারি এবং লকডাউন পরিস্থিতিতে ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পে রাজ্যের গ্রামে গ্রামে বনসৃজন, পুকুর কাটার কাজ চলছে। একই ভাবে গ্রাম পঞ্চায়েতের জমিতে বনসৃজনের জন্য পিট খোঁড়া ও গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু কংসাবতী দক্ষিণ ডিভিশনের জনারা বিটের এই প্রকল্পটি ভিন্ন। ২০১৮-১৯ সালে জাপানি সংস্থা জাইকার আর্থিক সহায়তায় এখানে শুরু হয় ‘ফরেস্ট অ্যান্ড বায়োডাইভারসিটি প্রজেক্ট’। জনারাতেও ১০ হেক্টর জমিতে পিট খোঁড়ার বা গাছ লাগানোর প্রকল্প নেওয়া হয়। জাইকা ও রাজ্য সরকারের এই যৌথ উদ্যোগের আওতায় রয়েছে সারা রাজ্যই। এই উন্নয়নী সিদ্ধান্তের কোপে পড়েছেন ২৪টি শবর পরিবার। খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতির দাবি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জমিতে শবররা বসবাস করেন। জনারার দেবেন্দ্রনাথ শবর অবশ্য জানান, আমার বড় বাপও  (দাদুর বাবা) এখানে বাস করতেন সেই ব্রিটিশ আমল থেকে। বর্তমান সময়ে তাঁরা যেমন শসা, টমাটো, তরমুজ চাষ করেন তেমনি ধান, ভুট্টাও ফলান। সারা বছরই কোনও না-কোনও চাষ চলতেই থাকে। অভিযোগ, বনবিভাগ বিনা অনুমতিতে গাছ লাগানোর নামে সে জমি দখল নিচ্ছে।

 

দেবেনবাবু আরও জানান, দীর্ঘকাল ধরে বসবাস ও চাষাবাদ করলেও তাঁদের জমির অধিকার দেওয়া হয়নি। বার বার তাঁরা সে আবেদন করেছেন। ২০১৮ সালে বনাধিকার আইন, ২০০৬ অনুযায়ী বাস্তু ও কৃষিজমির পাট্টা দেওয়ার লিখিত আবেদনও জানান হয়। সে আবেদন জনারা বিট গ্রহণ করলেও দু’বছরের কম সময়ে বাস্তু ও কৃষিজমি বনদপ্তর দখল করছে বলে শবরদের অভিযোগ। তবে, গাছ লাগানোর জন্য গর্ত খোঁড়ার কাজ শুরু করলে কিছু গ্রামবাসী বাধা দেন। অভিযোগ, তাঁদের বলা হয়, ‘এ জমি যে তোদের তার দলিল দেখা। এ ফরেস্টের জমি গাছ লাগানো হবে।’ এই কাজে নেতৃত্ব দেয় এই বনদপ্তর গঠিত এবং প্রকল্পের অংশীদার জয়েন্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও বনরক্ষা কমিটি এবং সিঁদুরপুর বিটের অফিসার সুরজিৎ কুণ্ডু। বাড়ির উঠোন, ভিটে থেকে উঁচু মাঠের জমি, যেখানে নানা সব্জির চাষ করা হয়, এমন প্রায় ১২০-৩০ বিঘা জমি খুঁড়ে পিট বানানো হয়েছে বলে গ্রামবাসীদের অভিযোগ। শুধু, ধান চাষের জন্য প্রস্তুত কিছু জমিকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। যেহেতু জমির দলিল নেই তাই সঠিক মাপটাও বলতে পারেন না তাঁরা। ‘কাছি ফেলা’ মাপে ওই পরিমাণ কিংবা তার বেশি হতে পারে বলেই মনে করছেন। প্রকল্প শুরুর আগে শবরদের নানা প্রলোভন দেখানো হয় বলে জানা গিয়েছে। শবরদের একাংশকে বোঝান হয়েছে, গাছ বড় হওয়ার পর যখন কাটা হবে তা বিক্রির লভ্যাংশ পাবেন শবররা। বনবিভাগ থেকে শবরদের সোলার ল্যাম্প, গ্রামে টিউবওয়েল করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। একটি তালিকাও তৈরি করা হয়। আবার পঞ্চায়েতের মেম্বারকে ধরলে তিনি ‘তোদের জায়গা দেওয়া হবেক’ বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যান। চাষজমি, ভিটে হারানোর ভয়ে ভীত গোপাল শবর বলেন, ‘আমরা অত বুঝিনি। আমিও সতর্ক ছিলাম না। পরে খেয়াল করলাম।’ পিট খোঁড়ার কাজের সময় বিট অফিসার জনৈক বুলু শবরকে প্রশ্ন করেন, ‘দু’চার লাইন ছেড়ে দিলে তো অসুবিধা নাই?’ বুলুও জানান, ‘অসুবিধা নাই।’ অভিযোগ, এই কথোপকথন ওই মহিলার অজান্তেই মোবাইলে রেকর্ড করা হয়। যা পরবর্তীতে শবরদের ‘অনুমতি’ হিসাবে  কংসাবতী ডিভিশনের আধিকারিকের কাছে দাখিল করা হয়েছে। গোপাল জানান, তিনি কাছাকাছিই ছিলেন কিন্তু ‘ফরেস্টবাবু ইভাবে খেলে নিবে বুঝতে পারি নাই।’

 

শুধু মাত্র শবরদের জমি নয় স্থানীয় সমাজসেবী এবং কাঁসাই-কুমারী ফার্মাস প্রোডিউসার্স অর্গানাইজেশন -এর চেয়ারম্যান পরিমল মাহাত জানান, ৫ জুন জনৈক গ্রামবাসীর ৪২ বিঘা চাষ জমি জোর করে দখল করেছে বনদপ্তর। তিন পুরুষ ধরে এই জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে। জমির ডিডও রয়েছে এমনকি খাজনাও দেওয়া হয়। পুরুলিয়া সদর থেকে অতিরিক্ত পুলিশি বাহিনী নিয়ে এসে জমির দখল নেয় সরকার। নষ্ট করে দেওয়া হয় ফসল। এর বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন জানানো হবে। এর পর ফের শবরদের সামান্য জমিও খুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। পরিমল বলেন, আমরা শবরদের ওই সামান্য জমি ছাড় দিতে বলেছিলাম। আর তাছাড়া আদিবাসীদের তো আইন অনুযায়ী বনে বসবাসের অধিকার রয়েছে সে কথাও জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনও কথা শোনা হয়নি।

 

আরও অভিযোগ, এ কাজে যেমন শবরদের অনুমতি নেওয়া হয়নি, তেমনই প্রায় কোনও শবরকেই  কাজ দেওয়া হয়নি। বনরক্ষা কমিটি এবং তার সদস্যরাই কাজ পেয়েছেন। শবররদের অনেকের যেমন আজও জবকার্ড নেই, তেমনি কাজ করেননি অনেকে। পাশাপাশি, এই বনরক্ষা কমিটি কিংবা জেএফএম কমিটিতেও শবরদের কোনও প্রতিনিধিত্ব নেই। গ্রাম পঞ্চায়েতে শবর ছাড়াও মাহাতো, সিং সর্দার, সহিস ও মুসলমান সম্প্রদায়ের বাস। এই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে এবং শাসকদলের ঘনিষ্ঠরাই বন কমিটিগুলির অঙ্গ।

 

পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া শবর কল্যান সমিতির ডিরেক্টর প্রশান্ত রক্ষিত বিষয়টি জেলাশাসক এবং কংসাবতী দক্ষিণ ডিভিশনের ডিএফও-কে জানালে খোঁজখবর শুরু করে জেলা প্রশাসন। প্রশান্ত জানান, ডিএফও জেলা প্রশাসনকে জানান, শবরদের অনুমতি নিয়েই কাজ হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে তিনি ওই ভিডিও রেকর্ডটি জেলাশাসককে পাঠান। যেখানে শবর মহিলা বলছেন, আমাদের ‘অসুবিধা নাই’। শবরপাড়ার অনৈক্যকেও এই ঘটনার জন্য দায়ী করছেন সমিতির সম্পাদক জলধর শবর। ১৯ জুন বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জলধর শবরের নেতৃত্বে  জনারা গ্রামে যান সমিতির সদস্য লক্ষ্মণ শবর, ফটিক হেমব্রম ও ফটিক মাহাত। জলধরবাবু জানান, আলাপ-আলোচনার পর সব শবর পরিবার একমত হয়েছে যে বাড়ির উঠোনে ও চাষের জমিতে গাছ লাগাতে দেওয়া হবে না। এই কথা লিখিত আকারে বনদপ্তর এবং জেলাপ্রশাসনকে জানানো হবে। ফটিক হেমব্রম বলেন, এর পিছনে রাজনৈতিক অনৈক্য কাজ করেছে। আমরা ওদের বুঝিয়েছি, সকলেই নিজস্ব মতামত ও বিশ্বাস অনুযায়ী রাজনীতি করতে পারে কিন্তু ‘সমাজকাঠামো থেকে আলাদা হবার চেষ্টা’ যেন না করা হয়। জলধর বলেন, প্রাথমিক ভাবে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় কোনও কোনও শবর এই কাজে সহযোগিতা করলেও সমিতির হস্তক্ষেপে সকলে একজোট হয়েছেন।

 

জাইকা ও রাজ্য সরকারের যৌথ প্রকল্পের মোদ্দা নীতি হল, বনের বাস্তুতন্ত্রের উন্নতি, জীববৈচিত্র‍্যের সংরক্ষণ, এবং বনসৃজনের মধ্য দিয়ে জীবন-জীবিকার উন্নতি। প্রকল্প এলাকায় পোঁতা আরও একটি বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যাচ্ছে ২০১৯-২০ সালে, ১০ হেক্টর জমিতে শাল প্ল্যান্টেশন করা হবে। প্রশ্ন উঠেছে, শুধুমাত্র  শালের বন কোন জীববৈচিত্র্য রক্ষা কিংবা বাস্তুতন্ত্রের উন্নতি সাধন করবে। সর্বোপরি বনসৃজনের নামে আদিম বনবাসী এবং অন্যান্য পরম্পরাগত অধিবাসীদের চাষের জমি, বাস্তুভিটা খুঁড়ে তাদের জীবন-জীবিকারই বা কী উন্নতি ঘটবে?

 

দেবাশিস আইচ সাংবাদিক ও সমাজকর্মী ।

 

Share this
Leave a Comment