মহামারী আক্রান্ত শহরে শ্রমজীবী বস্তিবাসীদের প্রতিবাদ


  • June 20, 2020
  • (0 Comments)
  • 222 Views

গত ১৫ জুন বস্তিবাসী শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা কমিটির ডাকে কলকাতা, সল্টলেক ও নিউ টাউনের ২০টি বস্তির শ্রমজীবী বস্তিবাসী মানুষেরা প্রতীকী অনশন ও অবস্থান কর্মসূচি নেন। কোভিড-১৯, আমফান ও লকডাউনের আক্রমণে এবং সরকারি তরফে অমানবিকতা ও গাফিলতির ফলে শহরের শ্রমজীবী মানুষেরা এক অভাবনীয় দুর্গতির শিকার। লকডাউনজনিত খাদ্যাভাব, বেকারত্ব, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদির হাত থেকে বাঁচতে এবং সাধারণ ভাবেও শ্রমজীবী বস্তিবাসী মানুষের অধিকারের দাবীর জন্য তাঁদের নিজেদেরকেই লড়তে হবে, কোনও সরকারই তাঁদের জন্য ভাবিত নন -এমনটাই জানালেন প্রতিবাদকারীদের কয়েকজন। লিখেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

গত তিন মাস ধরে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ, দেশ জোড়া লকডাউন, তারই সঙ্গে আমফান ঝড়ে বিধ্বস্ত পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল – সব মিলিয়ে নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষেরা পরিবার পরিজন নিয়ে এক অসম্ভব বিপর্যস্ত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। বেঁচে থাকার মৌলিক প্রয়োজনটুকু, অর্থাৎ বাসস্থান ও খাদ্য সংস্থানটুকুও তাই তাঁদের কাছে অনিশ্চিত। সকলেই সংক্রমণের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত। এই মুহূর্তে শহরের দরিদ্র মানুষদের, বস্তিবাসী নাগরিকদের অধিকাংশেরই নেই কোনও রোজগারের উপায়, প্রাপ্য টাকাও কর্মস্থল থেকে পাননি অনেকেই। তার উপর যেভাবে তাঁদের দিন গুজরান হয়, তাতে তথাকথিত ‘সামাজিক দূরত্ব’ মেনে করোনা সংক্রমণ এড়ানো খুবই জটিল। উল্টোদিকে আবার এই কারণেই রটছে, এঁদের থেকেই না কি ছড়াতে পারে সংক্রমণ! যদি সেটা সত্যিও হয়, তাহলেও প্রশাসন সে বিষয়ে উপযুক্ত সাহায্য দিয়ে এই মানুষগুলির পাশে দাঁড়াতে কি ব্যবস্থা নিচ্ছেন তা একেবারেই স্পষ্ট নয়।

 

এই পরিস্থিতিতে গত ১৫ জুন কলকাতায় ‘বস্তিবাসী শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা কমিটি’র ডাকে কলকাতা, সল্টলেক, নিউ টাউনের প্রায় ২০টি বস্তির (সল্টলেকের ৫ নং ট্যাঙ্ক, ৯ নং ট্যাঙ্ক, ১২ নং ট্যাঙ্ক, টালা ও ডিএলএফ ২) শ্রমজীবী বস্তিবাসী মানুষেরা এক প্রতীকী অনশন ও অবস্থান কর্মসূচি নিয়েছিলেন, সরকারের কাছে এই বিপদকালীন পরিস্থিতিতে তাঁদের দাবি-দাওয়াগুলি তুলে ধরার জন্য। সঙ্গে ছিল ‘সংগ্রামী গৃহশ্রমিক ইউনিয়ন (দক্ষিণবঙ্গ)’।

যে দাবীগুলি উঠে এল –

  • পি এম কেয়ার্স ফান্ড থেকে অবিলম্বে লক ডাউনে কাজ হারানো সমস্ত শ্রমজীবী মানুষদের জন্য অন্তত ছ’মাস নিয়মিত ১০,০০০ টাকা মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে।

 

  • প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষের বর্তমান ঠিকানাতেই তাঁর জন্য নিয়মিত রেশনের বন্দোবস্ত করতে হবে গণবন্টন ব্যবস্থা মারফত।

 

  • দেশের সমস্ত বস্তি এলাকায় করোনা সহ সব ধরনের সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে তহবিল তৈরি ও বিশেষ ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

 

  • অসংগঠিত ক্ষেত্রের সকল শ্রমজীবী মানুষের জন্য সামাজিক প্রকল্পগুলি লাগু করুক কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার।

 

  • বস্তিবাসী শ্রমজীবী মানুষদের সুবন্দোবস্ত, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, শৌচাগারসহ অন্যান্য নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে কলকাতা ও বিধাননগর পৌরসভাকে।

 

  • মজুরি না দেওয়ার অজুহাতে কোনও গৃহশ্রমিককে কাজ থেকে ছাড়ানো চলবে না অথবা একজনকে ছাড়িয়ে অন্য জনকে কাজে রাখা চলবে না। এরকম ঘটনা ঘটলে প্রশাসনকে হস্তক্ষেপ করতে হবে।

 

  • কেন্দ্রীয় সরকারকে দেশের গৃহশ্রমিকদের জন্য জাতীয় নীতি অবিলম্বে লাগু করতে হবে।

 

  • সমস্ত গৃহশ্রমিকদের শ্রমিক হিসাবে নথিভুক্ত করতে হবে ও সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে।

 

এই অনশন ও অবস্থান কর্মসূচীর পরিপ্রেক্ষিতেই কথা বলা গেল বস্তিবাসী শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা কমিটি-র কয়েক জনের সঙ্গে।

 

সুভাষ দেবনাথ পেশায় রিক্সাচালক, থাকেন সল্টলেকের ডিডি ব্লক-এ। জানালেন দু’বার এক কেজি আড়াইশো গ্রাম আর একবার আড়াই কেজি চাল পেয়েছেন রেশন-এ। লকডাউন আর সংক্রমণের ভয়ে বেরোনো নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় রিক্সার সওয়ারির সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। তিনি সল্টলেক সিটি সেন্টার এলাকায় রিক্সা চালান। বললেন, “আমাদের মতো মানুষদের জন্য পি এম কেয়ার্স থেকে ১০,০০০ টাকা মাসিক ভাতা আর রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করে দেওয়াটা আমাদের প্রধান দাবি। যেখানে থাকি সেইসব বস্তি এলাকায় জল, বিদ্যুৎ কিছুই তো প্রায় নেই। ঝড়ের পর বেশির ভাগ বাড়ির প্লাস্টিকের ছাউনি উড়ে গেছে। থাকি সব ১০ ফুট বাই ১২ ফুটের ঘরে। ঐ কিসব সোশ্যাল (‘ডিস্ট্যান্সিং’ শব্দটি নিজের সুবিধা মতো উচ্চারণ করলেন) আমরা মানব কি করে?” তিনি জানেন, থাকার সুব্যবস্থা, জল, বিদ্যুৎ-এর দায়িত্ব যেমন রাজ্য সরকারের তেমনি সামাজিক সুরক্ষা, ভাতা এগুলি কেন্দ্র সরকারের দেখার কথা। অথচ কোনও সরকারই তাঁদের শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে ভাবছে না। নানা সরকারি প্রকল্প খাতায়-কলমে থাকলেও তাতে তাঁদের কীভাবে নথিভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে কোনও সরকারি আধিকারিকই ভাবিত নন। সুভাষ অবশ্য বলেই দিলেন, “আমরা শুধু আমাদের অধিকারের কথা বলছি না, আমাদের ন্যায্য দাবির কথা তুলছি। লড়াই তো চালিয়ে যাবই। আগামী দিনে আমাদের লড়াই আরও জোরদার হবে।”

বিধাননগর স্টেশন-এর কাছে চার নং বাসন্তি কলোনীতে থাকেন বিশ্বজিৎ হালদার। স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। এই যে দাবী সনদ তৈরি করে কর্মসূচী নেওয়া হয়েছিল, তাতে প্রশাসনিক স্তরে কতটা কাজ হবে মনে করছেন জানতে চাওয়ায় বললেন, “সেইভাবে দেখলে প্রতিটা রাজনৈতিক দলের যে চরিত্র দেখেছি, তারা দাবীগুলো মেনে নেবে না। আর আমাদের তাই লাগাতার দাবি তুলে যেতেই হবে। যে নাগরিক পরিষেবা আমাদের প্রাপ্য তা যেভাবেই হোক যেন পাই, সেটা বুঝে নেওয়া এখন আমাদেরই দায়িত্ব। আমরা বস্তিবাসী শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা কমিটি থেকে যখন ত্রাণ বিলি করেছি, তখনও এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আসলে পেটে খিদে থাকলে তো লড়াইয়ের কথা সব সময় বলা যায় না। আবার লড়াই তো ছেড়েও দেওয়া যায় না।” বিশ্বজিৎ মনে করেন ত্রাণ দিয়ে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই ভালো পার্টি, ভালো মানুষ সাজার চেষ্টা করছে। লকডাউন, করোনা সংক্রমণের আবহে অধিকাংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা মানুষদের বা প্রাইভেট অফিসে ছোটখাটো কাজ করা কর্মীদের কাজ নেই। তাই পি এম কেয়ার্স ফান্ড থেকে ১০,০০০ টাকা মাসিক ভাতা এরকম মানুষদের জন্য এই পরিস্থিতিতে দেওয়া বিশেষ দরকার বলে মনে করছেন তিনি। “প্রধানমন্ত্রী তো ২০ লাখ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। সেই টাকা কোথায়? নিম্নস্তর পর্যন্ত এইসব টাকা আসছে না। পি এম কেয়ার-এর টাকা কোনও কাজে লাগছে না। এই বার্তাগুলো মানুষের কাছে আমাদের দিয়ে যেতে হবে। তারপর শ্রমজীবী মানুষ নিজেরাই বুঝে নিয়ে লড়াই চালাবেন,” স্পষ্ট বক্তব্য বিশ্বজিতের।

নিউ টাউনের ভাগীরথী নেওটিয়া হাসপাতালে হাউজ কিপিং-এর কাজ করেন পুষ্প মন্ডল, থাকেন নিউ টাউনেই। তাঁর বাবা ও পরিবার আদপে সুন্দরবনের বাসিন্দা, তারপর কাজ খুঁজতে বহু বছর আগেই চলে আসেন কলকাতায় আর তারপর কয়েক দশক ধরে এখানেই বসবাস, জীবন-জীবিকা। পুষ্পর বেড়ে ওঠাও সল্টলেক এলাকায়, বিয়ের পরেও রয়েছেন। “আগে তো আর সল্টলেকে এত উচুঁ উঁচু লম্বা বিল্ডিং ছিল না। তখন সব অন্যরকম ছিল। আমরা সবাই একসঙ্গে থাকতাম। তারপর এতবার উচ্ছেদ হয়েছে আমাদের যে সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছি। কিন্তু এখনও বেশিরভাগই একে অন্যকে চিনি আর তাই আমাদের লড়াইটাও একজোট হয়েই লড়ছি। বাবাদের জীবনটা লড়াই-লাঞ্ছনার মধ্যে দিয়েই গেছে। শ্বশুরবাড়ির পরিবারেরও একই ঘটনা। উচ্ছেদের মধ্যে দিয়েই জীবন চলছে। আসলে একা তো কেউ লড়তে পারে না। জোট বাঁধতে হয়। তাই এবারের লড়াই আমরা ছাড়ব না,” একটানা বলে থামলেন পুষ্প। বারবারই বলছিলেন মা-বাবার কাছে শুনেছেন আর নিজেও দেখেছেন যে বিপদের সময় তাঁদের মতো মানুষদের কথা কোনও সরকারই ভাবে না, কিছুই করে না। পরিষ্কার বললেন, বেকার ভাতা পাওয়া, রেশন কার্ডের ব্যবস্থা বা আমফান ঝড়ের পর বস্তির কী অবস্থা সেসব খোঁজখবর করতে সরকারি স্তরের কেউই আসেননি। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতেও স্বাস্থ্য দফতর থেকে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বস্তি এলাকাগুলিতে। যা কিছু স্বাস্থ্য পরিষেবা তা বস্তিবাসী শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা কমিটি থেকেই দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পুষ্পর সাফ কথা – “এই যে বলছে বস্তি থেকে করোনা ছড়াচ্ছে, কীভাবে ছড়াবে? আমরা তো আর বিদেশে যাইনি, যারা বাইরে গেছে বস্তি থেকে তো তাদের বাড়িতেই কাজ করতে গেছে, তাহলে কারা ছড়াচ্ছে? আমরা কেন্দ্র সরকারের কাছে ভাতার দাবী জানাচ্ছি, কারণ তারা টাকা তুলছে। আমরা চাই, যারা কাজ হারিয়েছেন তাঁরা কাজ পান, বেতন পান, আটকে থাকা বেতন মিটিয়ে দেওয়া হোক। আমরা মহিলারা বিশেষ করে নিরাপত্তাহীন বোধ করছি। এইসব দাবী আমাদের সকলের একসঙ্গে দাবী।”

লেদ কারখানায় কাজ করেন টাল পোস্ট অফিসের কাছে এক বস্তি এলাকার বাসিন্দা শিবদারি প্রসাদ মেহতা। তাঁর প্রতিটি কথায় ঝরে পড়ছিল হতাশা ও ক্ষোভ। লকডাউনের জন্য কারখানা বন্ধ ছিল গত কয়েক মাস, সদ্য খুলেছে ও অর্ধেক টাকা পেয়েছেন। আগামী দিন নিয়ে খুব আশাবাদী না হলেও হকের জন্য নিজেদের লড়াই যে চালিয়ে যাবেনই সে নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই। জানালেন, “টালা ব্রিজের নীচে আমাদের বস্তি ছিল। ব্রিজ মেরামতির জন্য সাত-আট মাস আগে কোনও পুনর্বাসন ছাড়াই আমাদের তুলে দিয়েছে। এখন এখানে একটা ক্যাম্প মতো করে রেখেছে আমাদের ৩৮টা পরিবারকে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০, ১৫০ জন মানুষ। আমাদের কী হবে, কীভাবে থাকব সরকারের থেকে কেউ এসে কোনও কথা বলছে না।” এই ক্যাম্পের মতো থাকার জায়গাটিতে একেকটি ঘরের আয়তন ৭ ফুট বাই ৮ ফুট। পরিবার ও তাদের যাবতীয় ঘর সংসারের জিনিস ঐটুকু জায়গার মধ্যেই। খুব স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার কোনও অবকাশই নেই। ৩৮টি পরিবারের জন্য দু’টি শৌচালয় ও দু’টি স্নানের জায়গা। বিকেল পাঁচটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্তই শুধু বিদ্যুৎ সংযোগ থাকছে। এই পুরো জায়গাটি সংক্রমণের খবরের শুরুর দিকে সরকার থেকে এসে একবার স্যানিটাইজ করে দিয়েছিল তারপর থেকে সংক্রমণ প্রতিরোধে আর কোনও রকম সচেতনতামূলক প্রচার বা স্বাস্থ্যসম্মত পদক্ষেপ কিছুই নেওয়া হয়নি। ঐ বসতির অধিকাংশ মানুষ ভ্যান চালান, সব্জি বেচেন, গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। প্রায় সবারই আর্থিক অবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য পি এম কেয়ার্স ফান্ড থেকে বেকার ভাতা, রেশন কার্ডের দাবিকেই প্রাধান্য দিলেন শিবদারি। তাঁর মূল কথা – কেন্দ্র, রাজ্য কোনও সরকারই আসলে গরীবদের দেখছে না। তবে শিবদারির শেষ কথাটাই এই শ্রমজীবী মানুষগুলো কেন এই আপদকালীন সময়ে জোট বেঁধে বাঁচার লড়াই লড়ছেন তা স্পষ্ট করে দেয় – “সরকার মুখে বলে গরীবী সরাও, আসলে ধান্দা হল গরীব সরাও, ওরা চায় আমরা যেন এভাবে মরে যাই।”

 

Share this
Leave a Comment