আমপান, একটি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং বিপর্যস্ত কটি চরিত্র


  • June 1, 2020
  • (1 Comments)
  • 340 Views

ত্রাণ যারা নিয়ে এসেছেন তারা সমীক্ষা করে গিয়েছেন। বাছাই করা স্থানীয় যুবককে দায়িত্ব দিয়েছেন। কুপন বিলির সেই হিসেবে চালডালের প্যাকেট হয়েছে। কিন্তু হাঁমুখ, বাড়ানো দুহাতের সংখ্যা যে সব সমীক্ষার বাইরে। করোনা লকডাউন আর আমপানের সাঁড়াশি চাপে কোন গৃহস্থের সংসারের শিকড় উপড়ে গিয়েছেরুটিরুজির সম্বল, ভবিষ্যতের সঞ্চয়টুকু ঠেকেছে তলানিতে তার হদিশ কি আর এমন ঝটিকা সফরে মেলে? কি উপড়ে পড়া গাছ, জলে ডোবা বাড়ি, ভাঙা বাঁধ যে গুনেগেঁথে খাতায় তুলে নেওয়া যাবে? হাসনাবাদ থেকে ফিরে লিখলেন দেবাশিস আইচ

 

পাটলিখানপুর গ্রাম পঞ্চায়েত।
জনসংখ্যা ২৫ হাজার (আনুমানিক)।
ব্লক – হাসনাবাদ।
মহকুমা – বসিরহাট।
জেলা – উত্তর ২৪ পরগনা।

 

মহঃ মনসুর আলি গাজি (৭০)

 

ঘুনির এক তিন মাথার মোড়ে নিশ্চিন্ত মনে বিত্তি/ আঁটল জাল তৈরি করছিলেন মনসুর আলি। আমপান তাঁর তিন বিঘার ভেড়ি খেয়েছে। ভেসে গিয়েছে প্রায় পৌনে দু’লাখ টাকার মাছ। অর্থাৎ, এই মুহুর্তে মাছ তুলে আড়তে বিক্রি করতে পারলে এই টাকাটুকু আয় হত। এই মোড় থেকে বাঁধ ভেঙে ডুবে যাওয়া ভেড়ি ও ভেড়ি লাগোয়া বাড়িটি দেখা যায়। না, ঠিক দেখা যায় না একটা হদিশ মেলে।

 

মনসুর আলি গাজি

 

‘অই গাছটা দাঁড়িয়ে আছে ওর ঠিক পিছনে।’
‘ও আচ্ছা।’ এটুকু বললে বোঝার ভাব ঘটে। তাই বলা।

 

সাত-আটটি দোকান ঘেরা এই মোড়, পাকা রাস্তার গা ছুঁয়ে নিশ্চিতে খেলা করে জোয়ার-ভাটা। দিনে দু’বার। আর একটু বাদেই একটা ছোট হাতি আসবে ত্রাণের বস্তা নিয়ে। আমরা দেখতে পাব কোমরে লুঙ্গির ভাঁজে গুঁজে রাখা একটা চিরকুট বার করে মনসুর যাবেন ত্রাণ নিতে। মাথায় প্রায় ১৯ কেজি শস্য, নুন-মশলা, সাবান ভরা বস্তাটি মাথায় নিয়ে হাঁটা দেবেন। তার আগে হিসেব বুঝে নেওয়াটা জরুরি।

 

মনসুর আলি গাজির মাথায় রেশনের বস্তা

 

হিসেবটা এরকম। মনসুরের তিন বিঘার দুটো পুকুর। পুকুরে ছাড়া হয়েছিল ৫০ গ্রাম ওজনের ২৬০০ গলদা। যা আমপানের আগেই ৭৫ গ্রামে দাঁড়িয়েছিল। এই মুহূর্তে আড়তে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা যেত। ক্ষতি হল কত? ৭৫ গ্রামের ২৬০০ গলদা ইজ ইক্যুয়াল টু ১৯৫ কিলো ইন্টু ৭০০ টাকা পার কেজি। কত দাঁড়াল? ক্যালকুলেটর বলছে ১৩৬৫০০। পাশে টাকা লিখে নিন। এখনো বাকি আছে। বাগদা বেচলে পাওয়া যেত হাজার বিশ আর ওই যে ভাঙন, পারসে, তেলাপিয়া – সেগুলি বেচে আরও হাজার দশেক। তা প্রায় পৌনে দু’লাখ হল কিনা?

 

আমপানের দুপুরেও বিশে মে ভেড়িতে ছিলেন মনসুর। একটা শেষ চেষ্টা। বিকেল চারটেয় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি। আজ নবম দিন। এখন তেমাথায় বন্ধ এক দোকানের দাওয়ায় বসে বিত্তির কাঠামোয় জাল বাঁধছেন এই সম্পন্ন মৎস্যজীবী । স্রোতের মুখে বিত্তি পেতে দিতে হয়। এ হল মাছের ফাঁদ, একবার আটকা পড়লে লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপিই সার। স্রোতের উল্টোদিকে সাঁতরে বের হওয়ার উপায় নেই। মনসুর আলি গাজিরাও এখন ফাঁদে পড়েছেন, তবু মানুষ তো। ভেড়ি হারিয়েছেন তবু এখন বিত্তিই সই। জোয়ার-ভাটায় স্রোতের মুখে ফাঁদ পেতে বসবেন। এক ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে আরও এক ফাঁদ পাতা। এও ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই বটে।

 

গীতা জানা (৪৫)

 

বাড়ির বেড়া পেরোলে ইটপাতা পাঁচফুটের রাস্তা। তিন চাকার গাড়ি কিংবা ছোট হাতি চলতে পারে। রাস্তার গা ঘেঁষে খলবল করছে জল। জোয়ার আসবে। যে দিকে দু’চোখ যায় সেদিকেই জল। যেন কালীদহ। যেন পাটলিখানপুর সায়র। যেন ওখানে ছিল না কোনও চাষের জমি, ছিল না কোনও মাছের ঘেরি কিংবা মানুষের ঘরবাড়ি। কোথাও কোথাও যদিও ঘরদোরের মাথা জাগিয়ে রাখা চেহারাটা ধরা পড়ে। গীতার বাড়িতে জল ঢুকেছিল প্রথম দিনই। ডাঁসা নদী অন্তত দু’জায়গায় বাঁধ ভেঙে ঢুকে পড়েছিল। কারও কারও দাবি বাঁধ ভেঙেছে আরও পাঁচ জায়গায়। ডাঁসার জলেই ভেসে গিয়েছে পাটলিখানপুর-সহ একাধিক পঞ্চায়েত এলাকা। ঝড় আর বৃষ্টির দাপটে খড়ের চাল দেওয়া ঘরের খাটে উঠে বসেছিল পুরো পরিবার। দিনমজুর স্বামী তারক জানা আর দুই পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে। দিনমজুর পরিবার তো শুধু মানুষের নয়, না-মানুষেরও। গরু থাকে, ছাগল, হাঁস-মুরগি থাকে সংসারের একজন হয়ে। গরু-ছাগল ছিল গীতারও। গরুটা বেঁচেছে ওর বাছুরটা বাঁচেনি। ছাগল তিনটে ছিল রান্নাঘরে। যেমন থাকে রোজ। বেড়ার ঘরে রান্নাবাড়া সারা হলে রাতে সেটাই ছাগলদের বাসা হয়। মানুষের কোমর সমান নোনা জলে সে-ঘরেই ডুবে মরেছে তিনটে ছাগল। নিজের ঘরের চালা মাটি ছুঁই ছুঁই প্রায়। দিনমজুরিতে টান, হাজার বিড়ি বাঁধলে মেলে ৭০-৮০ টাকা, লকডাউনের বাজারে তাও ধুঁকছে। গীতার বিবরণেও ফলের আশা নেই। মানে গীতা জানার বিবরণে। কিন্তু, হাড়ভাঙা কর্ম আছে।

 

গীতা জানা

ডুবেছে মাঠঘাট। নোনার জন্য বোরো হয় না এই এলাকায়, বর্ষার জলে আমন হয়। পাট হয়, সবজি হয়। পাট বোনা হয়েছিল, কিছু কিছু ধানও, একটু উঁচু জমিতে সব্জি। এবার তো হাসনাবাদ ব্লকেই চাষবাস প্রশ্নের মুখে। এমন যে কত ব্লক নোনায় খেয়েছে দুই ২৪ পরগনায়। যেখানে যেখানে জল ঢুকেছে আগামী দু’বছরের জন্য তো বটেই, নুনপোড়া সে মাটিতে ফসল ফলবে না। কথা বলতে বলতে গীতার ছেলে কাঁধে ত্রাণের বস্তা নিয়ে ঢোকে। ‘কী আছে বস্তায়?’ জিজ্ঞাসার উত্তরে জবাব আসে, ‘ত্রাণ।’ ‘কী দিয়েছে?’ ফ্যালফ্যাল করে মায়ের মুখের দিকে তাকায়। মা-ও জানে না। চাল, ডাল,  সয়াবিন, নুন, লঙ্কা ও হলুদের প্যাকেট, সাবান – তালিকা পেশ করার পরও মা কিংবা ছেলের চোখে আলো জ্বলল না। উঠোনে পাতা ইটে ভারসাম্য বজায় রেখে বেরিয়ে আসতে আসতে শুনি, ‘এই আবার জোয়ার আসার সময় হল।’ ডাঁসার জোয়ার।

 

গীতা জানার বাড়ি

 

সুরেল লেইয়ে (৫০)

 

বেলিয়াডাঙার লেইয়ে পাড়াটাই ডুবে গেছে। প্রায় ১০০ ঘর। ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার দুর্গত মানুষের পাশে’, একটি করে কাগজ সাঁটা রয়েছে তারপলিনের গায়ে। লেইয়েদের মাথা গোঁজার জন্য পরিবার পিছু একটা করে ১৭ ফুট x ১১ ফুটের তারপলিন দিয়েছে পঞ্চায়েত। আর তারপলিনের তাঁবু খাটানোর জন্য অপেক্ষাকৃত উঁচু একটি মাঠ বরাদ্দ করা হয়েছে। মাঠটি স্যাঁতস্যেঁতে। নীচে পাতার মতো কিছু নেই। কিছু দেওয়া হয়নি। লেইয়ে আর মণ্ডলদের অনেকেরই সেখানে ঠাঁই হয়েছে। এই সারিসারি, বাঁশ আর গাছের ডালের কাঠামোর উপর তারপলিন টাঙানো তাঁবুগুলি নিশ্চয় বিডিও কিংবা ডিএমের নবান্নে পাঠানো রিপোর্টে ‘ত্রাণ শিবির’ বলে খ্যাতি পেয়েছে। দু’লক্ষ ‘উদ্ধার’ হওয়া মানুষের তালিকাতেও নিশ্চয় আছেন তাঁরা। বলে ফেলা যাক এঁদের কেউ উদ্যোগী হয়ে ‘উদ্ধার’ করেননি। সে ব্যাখ্যা পড়ে দেওয়া যাবে।

 

দুপুরবেলা লেইয়ে পাড়ার সরকারি ত্রাণশিবিরে পৌঁছে দেখা গেল মানুষজন প্রায় নেই। হয় তাঁরা রাস্তায়, না-হয় ভাটার সময় বলে জল ভেঙে ঘর পাহারা দিতে গিয়েছেন চুরির ভয়ে। কিংবা যতটুকু গুছিয়ে তোলা যায় — ন’দিন হল। মাছ ধরতেও যেতে পারেন। লেইয়েরা মৎস্যজীবী। খাল বিল পুকুরে মাছ ধরে বেড়ান। এই মহিষপুকুর, ওই ধরমবেড়ে, গোলমারি, সেই উত্তরচক, নিমতলা ঘুরে ঘুরে মাছ ধরা। বাড়ির মেয়েদের পেশা বিড়ি বাঁধা।

 

লেইয়ে পাড়া

 

এমনই এক ত্রাণ শিবিরের মুখোমুখি হওয়া গিয়েছেল সকালে প্রথম খেপেই। দক্ষিণ মহিষপুরে। চকপাটলি উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চত্বরে সার সার তারপলিনের ছাউনি। জনৈক গ্রামবাসীর দাবি ছাউনির সংখ্যা ৫২, ছাউনিতে রয়েছেন প্রায় ৩০০ জন। শিবিরের কাছেই উপস্থিত পঞ্চায়েতের উপপ্রধানের সঙ্গেই কথা বলছিলাম। তাঁর কথা কেড়ে নিয়ে উত্তর দিতে এগিয়ে এলেন এক যুবক। উপপ্রধান মহিলাটি সরে দাঁড়ালেন ভিড়ের একজন হয়ে। তবুও ‘দাদা’ এড়িয়ে তাঁর কাছ থেকেও জেনে নেওয়া গেল – প্রতি পরিবার পিছু একটি ছাউনি। জেনে নেওয়া গেল, অধিকাংশ পুরুষরাই জল ঠেঙিয়ে ভিটেবাড়ি পাহারায় গিয়েছেন। জেনে নেওয়া গেল, গণপাকশালে জলে ডোবাদের জন্য রান্না হচ্ছে। জানা গেল, তামিলনাড় থেকে আসা দুই শ্রমিক গ্রামে ফিরেছেন, তাঁদের আলাদা রাখা হয়েছে, আলাদা খাওয়ার ব্যবস্থা। করোনায় কাজ গিয়েছে তাঁদের, আমপানে ভিটে। মাথার ছাদ।

 

আর তথ্য হিসেবে যা জরুরি, এখানেই বলে ফেলা যাক প্রায় ২৫ হাজার মানুষের এই পঞ্চায়েতে ফ্লাড সেন্টারের সংখ্যা ১টি। জানা গিয়েছে দাদনপাড়ে সেই কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে পেরেছিলেন ৯৭টি পরিবারের ৩৫০জন আর্ত মানুষ।

 

দক্ষিণ মহিষপুর চকপাটলি উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ত্রাণ শিবির

 

পাপিয়া খাতুন, ফার্স্ট এএনএম

 

উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দোতলা। এক গোলাপি শাড়ির স্বাস্থ্যদিদি একটু ফাঁকা পেয়ে জানালেন, দোতলাতেও প্রায় ৭৫ জন আছে। গাদাগাদি, ঠেসাঠেসি অবস্থা। কোথায় সামাজিক দূরত্ব? কিসের লকডাউন? আর অসুখ-বিসুখ? পাতলা পায়খানা, ঠান্ডা লাগা, জ্বরজারি, গ্যাস, চুলকোনি এমনই সব অসুস্থতা নিয়ে মানুষ আসছেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ডাক্তারবাবুরা আসছেন বটে তবে রোজ নয়। ক্যাম্প করছে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। উপপ্রধানের কথায় আঁচ পাওয়া গিয়েছিল আর এএনএম দিদিদের কথায় বোঝা গেল বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবীরা এগিয়ে না-এলে সামাল দেওয়া মুশকিল হত। আর না বললেও বোঝা যায় স্বাস্থ্য পরিষেবার অতিরিক্ত চাহিদাটি পূরণের চেষ্টা করে চলেছেন এই স্বাস্থ্যকর্মীরাই। গড়ে প্রতিদিন উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা ক্যাম্পে অন্তত ৫০০ জন হাজির হন। ওষুধ বলতে ওআরএস, মেট্রোজিল, সেটজিন, প্যান ফর্টি।

 

কী কী জরুরি এখন? ফার্স্ট এএনএম পাপিয়া খাতুন প্রথমেই পানীয় জলের কথা বললেন। জলের বড় অভাব। আর জরুরি ব্লিচিং পাউডার, ফিনাইল। ওষুধও বাড়ন্ত। গ্যাসের ট্যাবলেট চাই। খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই যে। আর চাই ক্যালসিয়াম। সে যে কেন কম পড়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে!

 

ত্রানের লাইনে দক্ষিণ মহিষপুরের মেয়েরা

 

অন্য এলাকা থেকেও একই খবর পাওয়া গেল। দুর্যোগের দিনে দেখা পাওয়া যাচ্ছে ‘দিদি’দের। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে অন্তঃসত্ত্বা মা কিংবা সদ্যপ্রসূতিকে ভিটামিন, আয়রন ট্যাবলেট, ইঞ্জেকশন দেওয়া হচ্ছে। লকডাউন সমস্যা সৃষ্টি করেছে বটে কিন্ত আশাদিদিদের দেখা গিয়েছে। অতি জরুরি যে কাজটি এখনও বন্ধ তার অন্যতম হল পালস পোলিও কর্মসূচি। যক্ষার চিকিৎসা। বিগত দু’মাস বন্ধ আইসিডিএস। স্কুল বন্ধ বলে বন্ধ মিড ডে মিলও। লকডাউন পর্বে পড়ুয়াদের একবারই চাল, ডাল, আলু দেওয়া হয়েছে। পরিকাঠামোর অভাব এবং ‘সামাজিক দূরত্ব’ নামক নতুন ব্যাধিটি শিশুদের মুখের খাবার কেড়ে নিল। যে ১৩০ কোটির দেশে ৮১ কোটি মানুষকে রেশন দিতে হয়, যে রাজ্যে ১০ কোটির ৮ কোটিই খাদ্য নিরাপত্তা আইনের অধীন,  আইসিডিএস ও মিড ডে মিলও যে খাদ্য নিরাপত্তা আইনের আওতায় পড়ে, সে কথাটি মনে না রাখাটা, সে দেশ ও রাজ্যের বড়কর্তাদের একটি বাড়াবাড়ি রকমের ভুল। অপুষ্টির দেশে এ এক অপরাধই বটে।

 

অলোকা দাস (৭৫) এবং ত্রাণের হাহাকার

 

ধরা পড়ে গেলাম এক বুড়ির কাছে। ছবির সন্ধানে ঘুরছিলাম।

 

‘দেখো বাবা, দেখে যাও কী হয়েছে ঘরের। আমাদের কেউ কিচ্ছু দেয়নি বাবা। এসো দেখে যাও ওই অবধি জল উঠেছিল। এই খড়ের চালাটা টেনেটুনে খাড়া করেছি। অন্যের বাড়িতে স্নান, পায়খান। রান্নাও করতে পারছি না। সবাই ওই ঘেরি পাড়ায় চলে যাচ্ছে। আমাদের কিছু দিচ্ছে না।’ বুড়ি বলেই চলল। এই স্রোতের মতো আর্তির সামনে হাঁ করে ঘরবাড়ি জরিপ করা ছাড়া কিছু যে করার নেই। ত্রাণ যারা নিয়ে এসেছেন তারা সমীক্ষা করে গিয়েছেন। বাছাই করা স্থানীয় যুবককে দায়িত্ব দিয়েছেন। কুপন বিলির সেই হিসেবে চাল-ডালের প্যাকেট হয়েছে। কিন্তু হাঁ-মুখ, বাড়ানো দু’হাতের সংখ্যা যে সব সমীক্ষার বাইরে। করোনা লকডাউন আর আমপানের সাঁড়াশি চাপে কোন গৃহস্থের সংসারের শিকড় উপড়ে গিয়েছে, রুটিরুজির সম্বল, ভবিষ্যতের সঞ্চয়টুকু ঠেকেছে তলানিতে তার হদিশ কি আর এমন ঝটিকা সফরে মেলে? এ কি উপড়ে পড়া গাছ, জলে ডোবা বাড়ি, ভাঙা বাঁধ যে গুনেগেঁথে খাতায় তুলে নেওয়া যাবে?

 

ত্রান শিবির : বেশিটাই গুনেগেঁথে খাতায় তুলে নেওয়া যায় না

 

‘ওই দেখুন আমার বাড়ি। এক কোমর জল ছিল এখনও জোয়ারে ঘরে থাকতে পারি না।’ কেরালা থেকে সেই মার্চ মাসেই ফিরে আসা শুভঙ্কর মণ্ডলের স্ত্রীর ত্রাণ চাই-ই চাই। স্বামী জোগাড়ে, ৩০০ টাকা রোজের পুরোটাই নিয়ে ফিরতে পেরেছে মার্চ মাসে। বাড়ি ফিরে আর কাজ নেই।’ নামধাম লিখতে দেখে এগিয়ে এলেন আর এক মহিলা তাঁর স্বামী কৌশিক মণ্ডল, ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে আটকে পড়েছেন তারও তো ত্রাণ চাই। ছোট হাতির বনেটের গার্ড রেল আঁকড়ে এক জলকাদা মাখা মজুর বলে উঠলেন, ‘সকালে বাঁধের কাজে গেছি। খবর পাইনি। স্লিপ পাইনি। আমি ত্রাণ পাব না কেন?’ হকের দাবি। বাঁধ মেরামতির কাজে ৩০০ টাকা দেবে বলেছে। হাতে পাননি। তবে, দেবে নিশ্চয়ই। ফিরে আসার সময় ছাতু, বিস্কুট, মুড়কি, গুঁড়ো দুধ ভরা একটি প্যাকেট আলাদা করেই বুড়ির হাতে তুলে দিয়ে আসতে হল।

 

এমন কত মানুষ। গাড়ি দাঁড়ালে মুখ বাড়িয়ে দেয়। ত্রান দেবেন? কী আর্তি সে গলায়! মেয়ে-বউরা সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তায় হাঁ-করে দেখে, কেউ বলে ত্রাণ দিতে এসেছে। কেউ হাত নেড়ে নেড়ে দাঁড়াতে বলে। বিস্কুট দিয়ে পেটের পিত্তি মারতে, গলায় জল ঢালতে, একটি বিশ্রামের ফাঁকে খুনখুনে বুড়ি এসে বলে, ‘জল দিবি বাবা, জল দিবি একটু, জল দে।’ পরিকল্পনার বাইরে থাকা কয়েক ঘরের মেয়ে-বউয়ের পাত্রে ঢেলে দিতে হয় অন্য এলাকার জন্য ভেবে রাখা পানীয় জল। আমপান আছড়ে পরার সময় থেকে নবম দিনেও পানীয় জল নেই, বিদ্যু নেই, শিবিরগুলি ছাড়া খাবার জোগানের ব্যবস্থা নেই। জল নেমেছে উঁচু এলাকায়। রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা হয়েছে। বাড়ি ফিরে এসেছেন অধিকাংশই, দোকানপাট খুলেছে। কিন্তু, খাওয়াদাওয়ার অভাব মেটেনি। তার জন্য পঞ্চায়েতকেই দায়ী করছেন প্রায় সকলেই। কোথাও কোথাও ‘মেম্বার’-এর প্রশংসা করেছেন অনেকেই কিন্তু অব্যবস্থার জন্য বিশেষ করে দায়ী করেছেন পঞ্চায়েত প্রধানকে। ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, বিশেষ এলাকা ভিত্তিক ত্রাণ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, বাঁধ মেরামতের জন্য ২৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হলেও কাজ হয়নি। কাজ হলে ‘মানুষ এমনি করে ভেসত না।’ অন্য এলাকা, মায় কলকাতা বা ভিন্ন জেলা থেকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ক্লাব সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। খাবার দিচ্ছে, হেলথ ক্যাম্প করছে কিন্তু স্থানীয় ক্লাবগুলিতে তেমন উদ্যোগের দেখা মেলেনি। হয়তো এর অনেকটাই রাগের কথা, হয়তো এ অভিযোগ অনেকাংশেই সত্যি, না আঁচিয়ে নির্দিষ্ট ভাবে বলা যায় না। সমীক্ষা চালিয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি দুর্গতদের জন্য হিসেব কষে নিয়ে যাওয়া খাদ্যসামগ্রী বণ্টন হয়ে যাওয়ার পরও কিছু মানুষের চাহিদা মেটাতে বণ্টন করতে হয়েছে ছাতু, বিস্কুটের মতো শুকনো খাবারের কিট। পাতা হাতে, কপালের ভাঁজে হাহাকারের রেখা যে স্পষ্ট পড়া যায়।

 

মেলেনি খাবার

 

হজরত গাজি (৪০)

 

পথের ধারে রান্না চেপেছে। দুপুর তখন প্রায় দুটো। চারটে খুঁটির উপর তারপলিন টাঙানো রান্নাঘর। গ্যাসের উনুনে সাঁতলানো হচ্ছে আলু, ধুয়ে রাখা আছে সয়াবিন একঝুড়ি। রোজ এমনই চলছে হাসনাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের মনোহরপুর মাঠপাড়ায়। রান্নার হেল্পার দুজন। দুই মহিলা দুধের শিশু কাঁখে দাঁড়িয়ে। আগের দিনের রান্নায় নুনের অভাব কিংবা স্বাদের বেশকম নিয়ে হালকা কথা ছোঁড়াছুড়ি বাদ যাচ্ছে না। জানা গেল ১৫০ মানুষের রান্না হচ্ছে রোজ। পরিমাণ দেখে মনে হল জনা পঁচিশের রান্না বসেছে। হয়তো প্রথম দিকে দেড়শো মানুষের রান্না হয়েছিল, সেই হিসেবটাই বলে ফেলেছেন। হজরতের হেল্পার জানাল, মেম্বার বাপ্পা গাজি চাল, আলু দিয়ে সাহায্য করছেন। আরও কিছু চেয়েচিন্তে জোগাড় হচ্ছে।

 

হজরত গাজিদের গণ-রসুইঘর

 

এর চেয়ে বেশি সাহায্য মেলেনি হজরতদের। সেই যে ‘মুদি কী একটা করল, কী বলল।’ সেই থেকেই কাজ বন্ধ হজরতের। ইট ভাটায় ইটকাটার কাজ। কী করল? কী বলল মানে? সেই ১৯ মার্চের রাত আটটার ভাষণ? ২২ তারিখে দিনভর ‘জনতা কার্ফু’.আর বিকেলে ‘থালা বাজাও’ কর্মসূচি? বোঝা গেল না। তবে যেটুকু বোঝা গেল লকডাউনের বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ইটভাটা। হাজার ইট কাটলে সাড়ে তিনশো টাকা। দিনে ৫০০-৭০০ ইট কাটতে পারেন হজরত। বছর তিনেক এই কাজ করছেন। মাঝে লকডাউন শিথিল করে ইটভাটা খোলার ছাড়পত্র মিলেছিল। কিন্তু ভাটা মালিকরা খোলেননি। বর্ষার মুখে মুখে খুলেই-বা হবেটা কী? এখন তো ভূতের মতো একঠ্যাঙে দাঁড়িয়ে রয়েছে সার সার চিমনি। শ্রমিকদের ইটের খুপড়িগুলোও যেন প্রেতপুরী। শত শত ভিন জেলার আদিবাসী শ্রমিক ছিলেন ভাটায়। কোথায় ফিরলেন তাঁরা? কবে ফিরলেন? সে যদিও অন্য খোঁজ। ভাটা বন্ধের সময় বিড়ি বাঁধেন হজরত। সেওতো অনিয়মিত হয়ে পড়েছে লকডাউনে। হজরত রান্নায় মন দেন।

 

ভিন্ন দৃশ্যে মন টানে কলমচির। রাস্তার অপর পাড়ে জলে সিকি ডোবা কিংবা সদ্য জেগে ওঠা সার দেওয়া ঘরবাড়ি। উঠোনে কোনো এক মাটির ঘর কাদার স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। রাস্তার ধারেই প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা চৌকিতে ন্যাংটো শিশু দেশি খেজুরের ভাগের জন্য ছোট্ট দাদার কাছে বায়না ধরেছে। একটা জলে ভাসা পাকা বাড়ি। উঠোন জলমগ্ন। বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে তিনটে হাঁস ভেসে ভেসে বাড়িটির জেগে থাকা সিঁড়িটির পাশে কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ভিনদেশির দিকে আড়ে আড়ে চায়। মাপজোখ করে। একটা সাহস করে সিঁড়ির একধাপ উঠে গলা তুলে তুলে কিছু খুঁজল বোধহয়। খাবার? আবার নেমে এসে উঠোনের জলে সাঁতরাতে শুরু করল।

 

বানভাসি উঠোন

 

জগদীশ বসাক (৪৫)

 

বছর তিনেক হল বাড়ির কাছেই দু’-দুটো মুরগির খামার গড়েছিলেন হিঙ্গলগঞ্জ পঞ্চায়েতের বোলতলার জগদীশবাবু। একটি ১৮ ফুট x ২৬ ফুট অন্যটি ১৩৭ ফুট x ২৫ ফুট। দোতলা ভিতের এই খামার গড়তে ব্যয় করতে হয়েছে ৮ লাখ টাকা। তিন হাজার মুরগি ছিল দুটো খাঁচায় কিছু বাঁচানো গিয়েছে, কিছু মরেছে। এখন একটিও পাখি নেই। ক্ষতি প্রায় তিন লক্ষ টাকার। বোলতলাতেই এমন খামার রয়েছে প্রায় দেড় ডজন। প্রায় সবারই একদশা। ঘুরে ঘুরে নিজের খামার, গ্রামের অন্য খামার, উদ্ধার করা মুরগিদের জড়ো করে রাখা খামার দেখাতে দেখাতে জগদীশবাবুর একটাই প্রশ্ন – এই যে হিসেব নিচ্ছেন ক্ষতিপূরণ মিলবে কিছু?

 

জগদীশ বসাকের মুরগির খামার

 

আমপান সতর্কতা উদ্ধার

 

আমপান আছড়ে পড়ার অনেক আগেই কি দুর্গত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন শিবিরে?  তাঁরা কি বুঝতে পেরেছিলেন কী ভয়ংকর ঝড় আসতে চলেছে? ভেঙে পড়তে পারে বাঁধ, মহাবিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে তাঁদের গ্রাম। এককথায় বলতে গেলে এর উত্তর, না। ঘুনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ত্রাণ শিবিরে ঠাঁই হয়েছে ১৫০ জন আবালবৃদ্ধবনিতার। প্রায় সকলেই এক কাপড়ে এসে উঠেছেন। বাঁধ ভাঙা জল আর ঝড়ের দাপটে। গরু, বাছুরগুলো সাঁতরে এসেছে।

 

– আগে আসেননি কেন?
– বুঝিনি বাবা।
– খবরে বলছে। সরকার বলছে তবু মানলেন না?
– ওই যে বলল, অন্যদিকে ঘুরে যাবে।
– কে বলল?
– বলাবলি করছিল।
– খবর দেখাচ্ছে। আকাশ থেকে তোলা ঝড়ের ম্যাপ দেখাচ্ছে, তবু বিশ্বাস করলেন না?
– বলল যে, খবরে অমন বলে।

 

দক্ষিণ মহিষপুরের মানুষ, বেলিয়াডাঙা, মধ্য কিংবা পশ্চিম ঘুনির মানুষ, দক্ষিণ বেনা, ঠাকুরানি আবাদের ভেসে যাওয়া মানুষ — না-কেউ আগাম সতর্কতা মেনে যথাসময়ে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়েছেন, না-তাঁদের কেউ বুঝিয়ে কিংবা প্রশাসনিক তৎপরতায় তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মাঝখান দিয়ে মাতব্বর কিছু লোক ভুলও বুঝিয়েছে।

 

দক্ষিণ মহিষপুরে বাঁধভাঙা জল

 

 

নোটস

১। ২৮ মে হিঙ্গলগঞ্জের স্বপ্নপূরণ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গুঞ্জ ও আমপান সলিডারিটি রেসপন্স, হাসনাবাদ ব্লকের পাটলিখানপুর পঞ্চায়েতে ত্রাণ সামগ্রী বণ্টন করে। গুঞ্জ ওইদিন ৩০০টি পরিবারের মধ্যে ১৫ কেজি চাল, ২ কেজি ডাল, ১ কেজি সয়াবিন, ১ কেজি নুন, লঙ্কা-হলুদ ও সাবান ত্রাণ হিসেবে দেয়। ১০০টি পরিবারকে ছাতু, বিস্কুট, মুড়কি, গুঁড়ো দুধ, সাবানের কিট দেয় GroundXero Amphan সলিডারিটি রেসপন্স। দুর্যোগের প্রথম এক সপ্তাহেই স্বপ্নপূরণ হিঙ্গলগঞ্জ ও হাসনাবাদ ব্লকের প্রায় ৩০০০ মানুষের কাছে পৌঁছেছে। দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে আমপান রিলিফ নেটওয়ার্কের সহায়তায় GroundXero Amphan সলিডারিটি রেসপন্সের এটি চতুর্থ প্রয়াস।

 

 

ছবি – রক্তিম মণ্ডল, দেবাশিস আইচ

Share this
Recent Comments
1
Leave a Comment