আরোগ্য সেতু কি নাগরিকদের নজরবন্দি রাখার নয়া ছক?


  • May 6, 2020
  • (1 Comments)
  • 713 Views

ভারত ক্রমে ক্রমে এক নজরদার রাষ্ট্র হয়ে উঠছেযেমন আধারএকজন নাগরিকের তাবড় ব্যক্তিগত তথ্য একরকম ভাবে রাষ্ট্রের মুঠোয় চলে গিয়েছেএবার করোনা আক্রান্তকে নজরবন্দি করার অজুহাতে একজন মানুষের দৈনন্দিন গতিপথ, মেলামেশায় নজরদারি করার অভিযোগ উঠলবিনা প্রশ্নে, বিনা আলোচনায় চাপিয়ে দেওয়া হল ‘আরোগ্য সেতু’ অ্যাপএই অ্যাপের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুললেন সুমন সেনগুপ্ত। 

 

এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে একমাত্র আলোচ্য বিষয় করোনা। একদিকে যেমন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা চেষ্টা করছেন করোনায় আক্রান্ত মানুষদের সারিয়ে তুলতে অন্যদিকে তেমনি বিজ্ঞানীরাও চেষ্টা করছেন কী করে প্রতিষেধক তৈরি করা যায়। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিবিদেরাও নিজেদের মতো করে ভাবছেন কেমন ভাবে কোনও প্রযুক্তির উদ্ভাবন করা যায় যা দিয়ে চিহ্নিত করা যাবে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে কিছুদিন আগে বলা হয়েছে যে নাগরিকদের একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তাঁদের ফোনে ডাউনলোড করতে হবে তাহলে নাকি বোঝা যাবে কোথায় কোথায় করোনা সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বিশেষ করে উল্লেখ করলেন এই মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন সম্পর্কে যার নাম রাখা হয়েছে — আরোগ্য সেতু। এই সেতু বন্ধনের মধ্যে দিয়ে নাকি করোনা সংক্রমণ রোখা যাবে।

 

তৃতীয় দফায় যে লকডাউন ঘোষিত হয়েছে তাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তরফ থেকে বলা হয়েছে, শুধু কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী নয়, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কর্মীদেরও বাধ্যতামূলক ভাবে নিজেদের ফোনে আরোগ্য সেতু নিতে হবে। বিরোধী দলেরা স্বভাবতই এর বিরোধিতা করেছেন। বিভিন্ন সংগঠন এবং ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই বিষয়ে চিঠিও গেছে। একদল বলা শুরু করেছেন, সেই একই যুক্তি দেখিয়ে যে, কারো যদি লুকোনোর মতো কিছু না থাকে তাহলে আপত্তি কোথায়? এই একই যুক্তি দেখানো হয়েছিল আধারের সময়ে, একই যুক্তি দেখানো হয়েছিল নোটবন্দির সময়ে, কিন্তু সবকটি ক্ষেত্রেই কি এটা প্রমাণিত হয়নি যে আসলে ওগুলো দিয়ে দুর্নীতি কমে না। আরোগ্য সেতুর ক্ষেত্রেও যখন ওই যুক্তিই দাঁড় করানো হচ্ছে তখন কি এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলাটা সময়ের দাবি হয়ে উঠছে না?

 

বিতর্কটি বুঝতে গেলে প্রথমে বুঝতে হবে কীভাবে আরোগ্য সেতু কাজ করবে সেই বিষয়টিকে। বলা হয়েছে যে, এই অ্যাপ্লিকেশন যাঁদের ফোনে থাকবে তাঁরা যদি কোনও করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসেন তাহলে সরকার বুঝতে পারবে দেশের কোন কোন জায়গায় কারা সংক্রামিত। কীভাবে বোঝা যাবে?  যারা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন তাঁদের মোবাইলে অনেক ধরনের মোবাইল অ্যাপলিকেশন থাকে, দিনে কত ক্যালরি খাবার খাওয়া জরুরি, কত ক্যালরি হেঁটে বা দৌড়িয়ে পোড়ানো উচিত, কত ব্লাড প্রেশার বা কত সুগার — এরকম হাজারো রয়েছে। এগুলো ব্যবহার করলে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও অনেকেই এইগুলো ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, মোবাইলের ব্লুটুথ ও জিপিএস চালু রাখতে হবে, তার মধ্যে দিয়ে বোঝা যাবে আশেপাশে কোনও করোনা আক্রান্ত মানুষ আছেন কিনা? সঙ্গে সঙ্গে সরকারের কাছে তথ্য পৌঁছে যাবে যে অমুক অঞ্চলে একজন বা একাধিক করোনা আক্রান্ত মানুষ আছেন। এর পাশাপাশি কী করা হল? স্কুলে স্কুলে নির্দেশ পাঠানো হল যে, অভিভাবকেরা যেন তাঁদের মোবাইলে এই অ্যাপটি ইন্সটল করে নেন। তারপর তো বিভিন্ন সংস্থা থেকে অনবরত মেসেজ — অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে নিন।

 

যদিও দক্ষিণ কোরিয়া এই জাতীয় একটি পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। দাবি করা হচ্ছে, এর ফলে কিছুটা সংক্রমণ প্রশমিত হয়েছে। কিন্তু, ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে এই পদ্ধতি কি খুব কার্যকর হবে? নাগরিকেরা কেন এই প্রশ্নটা করছেন না — এই অ্যাপ্লিকেশন কি করোনা পরীক্ষার বিকল্প হতে পারে? এটা কি আসলে বিতর্কটিকে অন্য দিকে চালনা করার জন্য কোনও পদ্ধতি? যেই দেশে স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা সারা দেশের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশের কাছাকাছি সেখানে এই ধরনের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন কতটা ভালো কাজ করবে সেটা কি প্রশ্নাতীত?

 

যারা এই অ্যাপটি নিজেদের মোবাইলে স্থাপন করবেন, তাঁদের নাম, বয়স, লিঙ্গ এবং ফোন নম্বর দিয়ে নিজেকে নথিভুক্ত করতে হবে। সেই মানুষটির যদি কোনও শারীরিক অসুবিধা থাকে, ধরা যাক তিনি হার্টের রোগী বা ডায়াবেটিক বা অন্য কোনও সমস্যা আছে, সেগুলোও জানাতে হবে। তারপর বলা হবে যে তাঁর ফোনকে চালু রাখতে হবে সারাক্ষণ, যাতে এটা বোঝা সম্ভব হয় যে, সেই মানুষটি কোথায় কোথায় যাতায়াত করছেন। এছাড়াও আরও একটি বিশেষ প্রযুক্তি এর মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকবে যা কিনা সেই মানুষটিকেও এই করোনা  আক্রান্ত সংস্পর্শের মানুষের বিষয়ে সচেতন করবে। প্রাথমিক ভাবে বলা হচ্ছিল যে এটি স্বেচ্ছামূলক, কিন্তু অচিরেই এটিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, ঠিক যেভাবে আধারকে করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এবং নীতি আয়োগ থেকে এটি করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। তাতে অন্য কিছু কি মনে হতে পারে? যেহেতু জিপিএস এবং ব্লুটুথ লাগে, তাই সাধারণ ফোনে এই অ্যাপ কাজ করবে না, তাই এরপরেই হয়তো শোনা যাবে সাধারণ ফোনের জন্যেও নতুন কোনও প্রযুক্তি আনা হবে, ঠিক যেভাবে ইউপিআই বা পেমেন্ট সিস্টেমের জন্য ওটিপি আসবে, ইত্যাদি প্রভৃতি।

 

বলা হয়েছে যে আপাতত প্রত্যেকটি মানুষের তথ্য সেই মোবাইলেই জমা থাকবে, যদি কোনও মানুষ করোনা আক্রান্ত হন তখন সেই তথ্য সরকারের কাছে দেওয়া যেতে পারে। আরও মারাত্মক অভিযোগ, এই তথ্য একটি বেসরকারি সংস্থা ‘আমাজন ওয়েব সারভিসেস’ এর কাছে রাখা থাকবে। ঘটনাচক্রে, এই সংস্থার কাছেই ভারতের বহু নাগরিকের আধারের তথ্য রাখা আছে এবং বিভিন্ন সময়ে যা আরও অন্যান্য সংস্থার কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে বহু অভিযোগ উঠেছে।

 

কিন্তু যেভাবে বেশিরভাগ মানুষ এই আরোগ্য সেতু নিজেদের ফোনে ডাউনলোড করছেন তাতে কি আদৌ মনে হচ্ছে যে মানুষেরা নজরদারি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত? কিংবা কেউ যদি নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য জেনে নেয় তাহলে কি কোনও সমস্যা আছে? অবশ্যই আছে। ধরা যাক কোনও একজন মানুষ আরোগ্য সেতু ডাউনলোড করার সময়ে জানালেন যে তিনি বিভিন্ন রোগে এমনিতেই আক্রান্ত। কিংবা ধরা যাক কিছুদিন পরে আক্রান্ত হলেন তাহলে এই আরোগ্য সেতু দিয়ে সরকারের কাছে কিংবা ওই বেসরকারি সংস্থা যদি সেই তথ্য হেলথ ইনসিওরেন্স কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয় তাহলে সেই কোম্পানি নাগরিকদের কাছ থেকে কম প্রিমিয়াম নেবে না, বেশি নেবে? এখনকার সময়ে কোনও নাগরিক সাধারণভাবে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সুস্থ হয়ে বাইরে আসার পর দেখলেন তাঁর শরীরে মধুমেহ বেড়েছে, এবং এর পর থেকে তাঁকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। তাহলে কি ইনসিওরেন্স কোম্পানি তার পরের বছরের প্রিমিয়াম সেই ব্যক্তির থেকে বেশি নেবে? এখনকার সময় হলে,  না। কিন্তু আরোগ্য সেতু থাকা অবস্থায় সমস্ত তথ্য তো ওদের হাতে তখন কি তাঁরা সুযোগ ছেড়ে দেবেন? কিংবা ধরা যাক, একজন নাগরিক কী কী ওষুধ নিয়মিত খান সেটা যদি এই আরোগ্য সেতুর মাধ্যমে জানা যায় তাহলে কি সেই মানুষটি কোন রোগে আক্রান্ত সেটা বোঝা খুব কঠিন ব্যাপার? এবং সেই তথ্য প্রকাশ হয়ে গেলে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কি তা ব্যবহার করবে না?

 

প্যারিসের একটি সাইবার সুরক্ষা সংস্থা এই বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন, এই অ্যাপ্লিকেশনটি ব্যবহারকারীর পরিচয় থেকে শুরু করে, যে কোনও সময়ে ব্যবহারকারী কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে দেখা করছেন এবং অন্যান্য আশেপাশের মানুষজনের মোবাইলে এটি আছে কিনা সেটা অবধি বুঝতে পারে। তার মানে কী দাঁড়াল? একজন ব্যবহারকারীর যদি সামাজিক চলাফেরাকে নজরে রাখা যায় তাহলে খুব সুনির্দিষ্ট একটি রেখাচিত্র আঁকা খুব কি কঠিন কাজ? যেমন, মানুষটি কোথায় কোথায় যাতায়াত করছেন, কার সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা হচ্ছে, ইত্যাদি। আরও একটি কথা বলা আছে এই আরোগ্য সেতুর শর্তাবলীতে যা হয়তো অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে যে ভবিষ্যতে শুধু করোনা নয়, যদি সরকার মনে করে তাহলে এই তথ্য তাঁরা অন্য কোনও কারণেও ব্যবহার করতে পারেন।  এটাকেই বলে ‘আন্ডার দি স্কিন সার্ভেইলেন্স’ যা আরোগ্য সেতুর মধ্যে দিয়ে হতে পারে।

 

আরও একটি বিষয় বলা খুব জরুরি যা নিয়ে অনেকেই কথা বলেননি, তা হল এই অ্যাপটি একটি সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি। আমাদের মতো দেশে যেখানে শুধু করোনা আক্রান্ত এই সন্দেহে একেক জন মানুষকে গ্রাম ছাড়া করা হয়, বা অবসাদে কোনও কোনও মানুষ আত্মহত্যাও করেছেন এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে সেখানে এই আরোগ্য সেতু অ্যাপটি কি মানুষে মানুষে আরও দূরত্ব বাড়াবে না? একজন মানুষ যদি জানতে পারেন তাঁর পাশের মানুষটি করোনা আক্রান্ত তাহলে কি মব লিঞ্চিং বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটবে না সেই নিশ্চয়তা দেওয়া যায়? যে দেশে শুধু খাদ্যাভাসের কারণে একের পর এক গণহত্যা ঘটে, তবলিঘ জামাত নিয়ে ভয়াবহ মুসলিম।বিদ্বেষ ছড়ানো হল, সেখানে কে করোনায় আক্রান্ত, কে সংখ্যালঘুদের কোন সমাবেশে হাজির ছিল সেটাও যদি বোঝা যায় তাহলে একজন নাগরিকের জীবন কি চরম অসুবিধার মধ্যে পড়তে পারে না? আসলে রাষ্ট্র চাইছে প্রতিটি নাগরিক যাতে রাষ্ট্রের চোখ হয়ে ওঠুক। প্রতিটি নাগরিক তাঁর সহনাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে তবে রাষ্ট্র জিতে যায়। তাহলেই দু’জন সহনাগরিক একজোট হয়ে আর প্রশ্ন করতে পারবেন না — করোনার লকডাউনে কেন সাধারণ নাগরিকেরা, পরিযায়ী শ্রমিকেরা  খেতে পাচ্ছেন না। মজুরি পাচ্ছেন না। কেন সঠিক এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে করোনার পরীক্ষা হচ্ছে না। গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী একটি টুইট করে বিজেপি কর্মীদের এই অ্যাপ্লিকেশনটি ডাউনলোড করতে বলেছেন, তাহলে তার উদ্দেশ্য কী? অঞ্চলে অঞ্চলে বিজেপি কর্মীরা এই আরোগ্য সেতু অ্যাপ্লিকেশনটি মোবাইলে নিয়ে যদি বলেন কোনও নাগরিককে — আপনি করোনা আক্রান্ত, আপনার কি প্রমাণ করবার কোনও সুযোগ থাকবে যে আপনি আক্রান্ত নন, এটা কি আর একধরনের চাপ সৃষ্টি করার কৌশল নয়?

 

এবার আসা যাক আধারের প্রশ্নে। যখন সর্বোচ্চ আদালতে আধার নিয়ে মামলা হয়েছিল তখন অনেকেই এই মামলাটিকে দেখেছিলেন নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বাইরে যাওয়া বা গোপনীয়তা দিয়ে, কিন্তু আদপে এই মামলাটিকে যদি লড়া যেত পরিচয় দিয়ে, মানে আদৌ আধার কোনও অভিন্ন পরিচয়পত্র নয়, তাহলে হয়তো লড়াইটা জেতা যেত, কিন্তু তা না করে যারা এটার বিরুদ্ধে লড়লেন তাঁরা নিয়ে গেলেন এটিকে গোপনীয়তার দিকে, ফলে সরকারের বিরোধিতা করতেও সুবিধা হল। তাঁরা বললেন, এই গোপনীয়তার বিষয়টি শুধুমাত্র সমাজের ওপরের স্তরের মানুষদের মাথা ব্যথা। ফলত এটা নিয়ে সমাজে যাঁদের সত্যি কোনও পরিচয়পত্র নেই তাঁদের এটি প্রয়োজন। কিন্তু সত্যিটা কি তাই? যখন আধার আনা হয়েছিল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তখন মাত্র দশমিক ০৩ শতাংশ মানুষের কোনও  পরিচয়পত্র ছিল না, আর সকলের কোনও না কোনও পরিচয়পত্র ছিল। আদালতে তাই গোপনীয়তার বিষয়টি দাঁড় করানো যায়নি। ওদিকে সরকার থেকে বলা হয়, গোপনীয়তার বিষয়টি পরে দেখা যাবে। তারপর যখন একে একে রেশন, থেকে ব্যাঙ্ক হয়ে মোবাইল ফোনে আধার সংযোগের কথা সামনে আসে তখনও একই যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, যদি কোনও কিছু লুকোনোর নাই থাকে তাহলে এতো ভয় কিসের? সেদিনও যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল আজো একই যুক্তি দেওয়া জরুরি যে ‘আধার কোনও ভাবেই অভিন্ন পরিচয়পত্র নয়, আধার নকল করা সম্ভব সুতরাং কোনোভাবেই কোনও কেন্দ্রীভূত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে আমি একজন ব্যক্তি নাগরিক সাহায্য করব না। যা দিয়ে আমাকে ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।’ আরোগ্য সেতুর ক্ষেত্রেও একই উত্তর দেওয়া জরুরি।

 

আসলে ভয় দেখানোটা খুব জরুরি। মানুষ এমনিতেই আতঙ্কিত। করোনা নিয়ে সে ভীত, সন্ত্রস্ত হয়ে আছে। তাঁর চাকরিবাকরি অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। এখন যদি ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট আইনের ভয় দেখিয়ে বেশিরভাগ মানুষকে এই আরোগ্য সেতু ডাউনলোড করিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে এই সরকারের কাছে একটা তথ্য ভাণ্ডার তৈরি হয়ে যাবে যেটার সঙ্গে যদি আধারের তথ্য মিলিয়ে একটা তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা যায়, তাহলে যে বা যারা ওই তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তাঁরা কতটা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠবে সেটা কি সহজেই অনুমেয় নয়? যদি খেয়াল করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে প্যান কার্ডের সঙ্গে আধার সংযোগ না করালে প্যান বাতিল হয়ে যাবে, এই ভয় দেখিয়ে বহু মানুষকে আধার করিয়েছে এই সরকার। ঠিক একই রকম ভাবে চাকরি চলে যেতে পারে এই ভয় দেখিয়ে আরোগ্য সেতু মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নেওয়াবে। অথচ কোনও নাগরিক কি প্রশ্ন করবেন না যে এই সরকার হোয়াটস অ্যাপে একটি সফটওয়ার যার নাম পেগাসাস ঢুকিয়েছিল, এই সরকার বিভিন্ন মানুষের ই- মেল হ্যাক করেছিল, এই সরকার কি করে বলে যে এই আরোগ্য সেতু নজরদারির জন্য নয়?

 

অনেকে বলছেন, সরকার যদি প্রত্যেক নাগরিককে স্মার্ট ফোন দেয় তাহলে আরোগ্য সেতু নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু এই সরকার খাবার দিতে পারুক ছাই না পারুক, সকলের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করতে পারুক ছাই না পারুক, এই স্মার্ট ফোন দিয়েও দিতে পারে, এবং তারপর যদি আরোগ্য সেতু নেওয়ার পাশাপাশি সকলের মোবাইলের হোয়াটস অ্যাপে অনবরত মিথ্যা খবর আসতে থাকে তখন সেটা মোকাবিলা করার ক্ষমতা আমাদের আছে তো? আসলে এই মাঠটাও ওদের, খেলার নিয়মটাও ওদের, ওদের মাঠে ওদের নিয়ম দিয়ে কি ওদেরকে হারানো সম্ভব?

 

তাহলে কী করণীয়? 

 

ধরা যাক এই মোবাইলে যদি কেউ আরোগ্য সেতু নিয়ে মোবাইলটি বাড়িতে রেখে বাড়ির বাইরে বেরোয়, তাহলে কি সরকার নজরদারি করতে পারবে? ধরা যাক কেউ অন্য একটি ছোট ফোন নিয়ে বাইরে বেরোলেন তখন কীভাবে তাঁর গতিবিধি নজরে রাখা সম্ভব হবে? রাষ্ট্র যখন চাইবে নজরদারি করতে তখন যারা নজরদারিকে শৃঙ্খল মনে করবেন তাঁরাও তো নিজের মতো কোনও উপায় নিশ্চিত বার করবেন।

 

মানবজাতি এই মুহূর্তে একটা সঙ্কটময় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলছে। হয়তো বা এই শতকের সবচেয়ে বড় সঙ্কট। শুধু এই দেশের মানুষ নন, বিভিন্ন দেশের মানুষেরা এবং সরকারেরা যে সিদ্ধান্ত নেবেন এই মুহূর্তে তা আগামী দিনে তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে। শুধুমাত্র আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নয়, আগামী দিনে আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি কী হতে চলেছে তা হয়তো এই সময়ে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকবে। একদিন হয়তো এই ‘ঝড় থেমে যাবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে’, কিন্তু এখন যে বিকল্পগুলো আমরা বেছে নেব তার ওপরেই নির্ভর করবে আগামীর সকাল কেমন হবে? বহু আপৎকালীন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা হয়তো অন্যান্য সময়ে নিতে যথেষ্ট আলাপ আলোচনার প্রয়োজন হতো। অপরিণত ও ভয়ঙ্কর কিছু প্রযুক্তিকে হয়তো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হবে। প্রতিটি মানুষ যেন পরীক্ষার জন্য বলি প্রদত্ত গিনিপিগ কিংবা ইঁদুর। এটা কি কেউ কল্পনা করেছিলেন আজ থেকে কিছুদিন আগেও যে, বহু বহু মানুষকে ঘরে থেকে কাজ করতে হবে, বা স্কুল- কলেজ অনলাইন হয়ে যাবে? কিন্তু এটাই আপাতত সত্যি।

 

এই মুহূর্তে মানুষের কাছে অন্তত দুটি বিকল্প সামনে আছে।

 

১। সর্বগ্রাসী নজরদারি বনাম নাগরিকদের আরও ক্ষমতায়ন।

২। প্রত্যেকটি দেশ নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করবে না এবং সারা বিশ্বব্যাপী একটা সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলবে।

 

লেখক একজন সামাজিক কর্মী প্রাবন্ধিক। 

Share this
Recent Comments
1
  • comments
    By: Kajal halder on May 6, 2020

    ধরে নিলাম আপনি প্রবন্ধে ঠিক কথা বলেছেন ।কিন্তু কেউ যদি করোনা পরবর্তী সময়ে জিপিএস বা ব্লুটুথ বন্ধ রাখে তাহলে সরকার কি ভাবে তথ্য জানতে পারবে।

Leave a Comment