মহামারীর মতো আপৎকালীন সময়ে মে দিবসে শ্রমিকের কন্ঠ


  • May 1, 2020
  • (0 Comments)
  • 336 Views

পয়লা মে। মে দিবস। শ্রমিকের অধিকারের দিন। আজকের ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে এই দিনের মানে, অর্থ সবকিছুই সম্ভবত নতুন করে অনুধাবনের সময়। বেঁচে থাকার সামনেই যেখানে প্রশ্নবোধক চিহ্ন, সেখানে অধিকারের লড়াই চালিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মহামারীর মতো আপৎকালীন সময়েও রাষ্ট্র যখন ব্যস্ত থাকে শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন করতে, তাঁর উপর শোষন তীব্রতর হয়, তাঁর কাজের, জীবনের অধিকারের উপরেই আঘাত হানে রাষ্ট্রযন্ত্র তখন নতুন করে লড়াইয়ের শপথ নিতে হয় বৈ কি। সেই লড়াই হ্যাশট্যাগ-এ আটকে থাকে না, তা ছড়িয়ে পড়ে এই দেশের প্রতিটি পথে-প্রান্তরে, যে পথে হয়তো ক্লান্ত শরীরটাকে বিছিয়ে শেষবারের মতো শুয়ে পড়েছেন কোনও সাথী পরিযায়ী শ্রমিক, বাড়ি ফিরতে গিয়ে। যে পথে হেঁটেছেন কৃষিশ্রমিক ফেটে যাওয়া পায়ের স্পষ্ট রক্তছাপ রেখে।

 

আমরা চেষ্টা করেছি কয়েক জন শ্রমিক মানুষের কন্ঠস্বর তুলে ধরতে। তাঁরা বিবিধ শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। কেউ মে দিবস সম্পর্কে পরিচিত, কেউ নন। তবু অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হওয়ায় মিল আছে প্রত্যেকের আর মিলিয়ে দিয়েছে এই মহামারী ও লকডাউন পরিস্থিতিও।

 

গৌরী বর (গৃহ পরিচারিকা), পশ্চিমবঙ্গ

 

(গৌরী মে দিবস’কে মেয়ে দিবস শুনেছিলেন ও বুঝেছিলেন। পরে সেই ভুল ভাঙলেও তাঁর শুরুর কথাটুকু এতটুকুও অপ্রাসঙ্গিক নয়।) এখন এই বিপদের দিনে মেয়েদের দাবিই তো সবচেয়ে বেশি। আমাদের তো ঘর, বাইরে সবদিক সামলাতে হয়। কিন্তু যেটা চাইছি, সেটা পাচ্ছি কোথায়? আমরা ‘বাবুর বাড়ি’ কাজ করি। এখন কেউ দাবি মানবে, কেউ মানবে না। আমি তিন বাড়ি কাজ করি। দু’বাড়ি রান্না, এক বাড়ি ঠিকে, মাসে ছ’হাজার টাকা রোজগার। এক বাড়ি থেকে বারবার ফোন করছে, জানতে চাইছে, এক বাড়ি থেকে আবার কোনও যোগাযোগই করছে না। এ মাসের টাকা পাব কি না কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার বর নাইটগার্ড-এর কাজ করে সামান্য আয় করেন। চার মেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। দুই মেয়ে বাড়িতে। এক মেয়ে ছোটখাটো কাজ করে, নিজের খরচ চালায়। কিন্তু এখন তো তা বন্ধ। আরেক মেয়ে একটু অসুস্থ, তার ওষুধপত্রের খরচ আছে। এই দুই মেয়েকে গ্র্যাজুয়েশন করিয়েছি। এই দুই মেয়ের বিয়ের চিন্তাও করছিলাম, সেটুকুই কোনও মতে জমানো আছে। নিজেদের জন্য কিছুই সঞ্চয় নেই। এখন যে কি হবে কিছুই আর ভাবতে পারছি না। এখন আমার ৫৪ বছর বয়স, সেই ১৪-১৫ বছর বয়স থেকে কাজ করছি, মা-বাবা ছিল না, লেখাপড়া শিখিনি। আমার তো ছেলে নেই, মেয়েরা তো বিয়ে করে চলে যাবে। কাজ তো আমাকে করে যেতেই হবে, নইলে চলবে কি করে! এখন এই অবস্থায় ‘বাবুদের’ অসুবিধাও বুঝছি, আমরাও তো সংসারী, তারাও সংসার করেন। আর আমাদের গরীবদের বেশি লোভ করতে নেই। যেটুকু পাচ্ছি, তাতেই সামলে নিতে হয়। তবে একটা কথা ঠিক, এই যে আমরা একজোট হয়ে দাবিদাওয়া জানাই তাতে বাবুরা এখন একটু হলেও আমাদের অসুবিধা বোঝেন। জানি না এইসব লকডাউন উঠলে আমাদের কাজের কি অবস্থা হবে!

 

শেফালী রায় (যৌনকর্মী), পশ্চিমবঙ্গ

 

এবছর আমরা আলাদা করে মে দিবস পালন করতে পারছি না লকডাউন-এর জন্য। করোনা আর লকডাউন-এর জন্য আমাদের যৌনকর্মীদের অবস্থা খুবই করুণ। আর এই অবস্থা তো সারা পৃথিবী জুড়ে। কীভাবে বেঁচে থাকব, কী খাব তাই নিয়েই চিন্তায় অস্থির আমরা। এরকম অবস্থায় আমাদের পেশা চলা তো অসম্ভব। আমরাও কাউকে আসার অনুমতি দিচ্ছি না। প্রাণে তো বাঁচতে হবে। খুবই সংকটের মধ্যে রয়েছি আমরা। শাঁখের করাতের দশা। ঘরে বন্দী হয়ে রয়েছি। আমাদের কী আর সঞ্চয় তেমন থাকে? চালডাল কীভাবে জুটবে সেটাই চিন্তা। আমাদের শ্রমিকের অধিকারের লড়াই একটু হলেও বাধা পেল। সবকিছু ঠিক হলেও জীবনে ছন্দ ফিরতে অনেক সময় লাগবে। আমরা আবার কবে কাজ শুরু করতে পারব কিছুই জানি না। শ্রমিকদের চিন্তাই তো সবচেয়ে বেশি। আর আমাদের মতো যৌনপেশায় যারা যুক্ত তারা এখন চরম অসহায়তায় রয়েছি। সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন, করোনা সব মিলিয়ে আমরা খুবই খারাপ রয়েছি।

 

শেখ সাহাবুদ্দিন (ঠিকা শ্রমিক, বিএসএনএল), পশ্চিমবঙ্গ

 

আমরা গত এক বছর মাইনে পাই না। অথচ আমরা নিয়মিত অফিস যাই ও কাজ করি। গত ২২শে এপ্রিল – ২০১৯ সালের মে মাসের মাইনে আমরা যাতে পাই সেইমতো ফান্ড এসেছে। আজ ১লা মে, মে দিবস – আজ পর্যন্ত আমাদের প্রায় ৪৫০০ জন ঠিকা শ্রমিকের একজনও এই বকেয়া বেতন পাইনি। আমাদের এক সহকর্মী, একজন অসহায় বাবা ফোন করে জানাচ্ছেন তার শিশুসন্তানের দুধ কেনার টাকা নেই। অথচ আমাদের উচ্চপদস্থ অফিসারেরা কয়েক লাখ টাকা বেতন পান। তারা সই করে দিলে দু’দিনের মধ্যে আমরা আমাদের এই প্রাপ্য বকেয়া বেতনের একটা কিস্তি পেতাম। এই জরুরি অবস্থায় তা আমাদের কতটা কাজে লাগত বলে বোঝাতে পারব না। চোখে জল এসে যায়, ভাবতে লজ্জা লাগে আমরা কী সমাজে থাকি! কর্তৃপক্ষের কেউ আমাদের ব্যক্তিগতভাবেও পাশে এসে দাঁড়াননি এই বিপদের দিনে। উপরন্তু আমরা ফোন করে হকের টাকা কবে পাব জানতে চাইলে শুনতে হচ্ছে ‘বারবার ফোন করে বিরক্ত করবে না’। কেন? কর্তৃপক্ষ এটা আমাদের সঙ্গে করতে পারেন না। তাদের শুধু জবাব দিতে হবে, তাই নয়, আমাদের প্রাপ্য অর্থ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দিয়ে দিতে হবে। শুধু আমরা নই, সব জায়গায় শ্রমিকেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কতজনের যে কাজ চলে গেল, তা লকডাউন উঠলে বুঝতে পারব। কিন্তু আমি বিশ্বাস রাখি আমাদের লড়াই থামবে না, আমাদের সাথীদের নিয়ে আমরা নিশ্চয় একদিন জিতব। আমাদের অধিকারের টাকা পাব।

 

প্রশান্ত ঘোষ (ঠিকা শ্রমিক, বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড), পশ্চিমবঙ্গ

 

দেশের পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে এ বছর মে দিবস পালন করা গেল না। নিশ্চয় আমাদের মতো শ্রমিকদের জন্য এই দিনটি তো আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ বটেই। আমাদের বিসিপিএল-এ গত আট মাস বেতন বন্ধ। শেষ আমরা ২৩৫ টাকা রোজের ভিত্তিতে বেতন পেয়েছিলাম। আমাদের দাবি, আমাদের ঠিকা শ্রমিকদের যে বেতনের স্ল্যাব রয়েছে তা ৮-১০,০০০ থেকে বাড়িয়ে ১৬,০০০ করতে হবে। বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলি বহুদিন ধরে এই দাবিতে লড়াই করছে। আমাদের আট মাস আগে নোটিস ছাড়াই বসিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের অধিকাংশেরই ৪০-এর কাছে বয়স, কারওর ৫০-ও। ১৬,১৭ বছর এখানেই কাজ করে ফেলেছি। আর এখন কোথাও নতুন চাকরি পাব না। আমরা একদমই মেনে নিচ্ছি না যে এভাবে আমাদের বসিয়ে দেওয়া হবে। আমাদের অবশ্যই নিতে হবে। কর্তৃপক্ষ বারবার আশ্বাস দিচ্ছেন বটে, কিন্তু এখনও কাজের কাজ করেননি। ভবিষ্যতে আমাদের লড়াই চলবে কাজে ফেরার জন্য। আমার বাড়িতে আমি, মা-বাবা। বাবাকে এখন ছোটখাটো কাজ করতে হচ্ছে, আমি বসে না থেকে ডেলিভারি বয়ের কাজ করছিলাম। এখন তো সেও বন্ধ। খুবই সমস্যাজনক অবস্থা। দেখা যাক কি হয়…।

 

শ্যামলাল দামাউ (রাজমিস্ত্রি), মধ্যপ্রদেশ  

 

আমি মধ্যপ্রদেশে থাকি। রাজমিস্ত্রির কাজ করি। ঠিকেদার কাজের খোঁজ দিয়েছিলেন। পুরো পরিবার নিয়ে ফৈজাবাদ এসেছিলাম। লকডাউন শুরু হওয়ার আগে সাত দিন কাজ করেছি। ব্যস্‌ তারপরেই সব বন্ধ হয়ে গেল। এখন এখানেই আটকে পড়েছি। আমরা লেবার, রাজমিস্ত্রি সবাই আটকে আছি। ১৩ জন বড় আর ৭ জন বাচ্চা। এখানে ৫/৬ দিন অন্তর এসে এনজিও থেকে সাহায্য করে যাচ্ছেন। ঠিকেদার ৭ দিনের যা অল্প টাকা হয় দিয়েছিলেন, সেও তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। কাজ হলে খরচাপানি বাদে হাতে ৪০০০/৫০০০ টাকা থাকে। এখন তো সব বন্ধ। দেশে অল্প জমি যা আছে, তাও তো অন্যকে দিয়ে এসেছি। এখানে তো একটু সব্জি-টব্জি কিনতে হয়, বাচ্চারা বিস্কুট কিনতেও পয়সা চায়। আর কিচ্ছু না, দেশে ফিরতে চাই। জন্মভূমিতে ফিরে গেলে, যা হবে দেখা যাবে।

 

আজিজ উলাহ্‌ (চটি তৈরি করেন), ফৈজাবাদ উত্তরপ্রদেশ

 

আমি জুতো তৈরির মিস্ত্রি। শীতকাল থেকে হোলি পর্যন্ত চার মাস আমাদের হাতে কাজ থাকে। বাকি আট মাস বা। এক জোড়া জুতো বানালে ৬ টাকা পাই। যত বেশি পরিশ্রম করব, তত টাকা রোজগার হবে। তাই খুব মেহনত করি। এভাবে মাসে ৬০০০ টাকা মতো রোজগার হয়। আমরা চার ভাই, সবাই কাজ করে কোনও মতে ১৪ জনের পরিবারটা চালাই। এখন কাজ নেই, হাতে টাকা নেই, খাবার নেই – দমবন্ধ করা অবস্থা। যিনি কাজ দেন, তিনি কখনও-সখনও ৪০০/৫০০ টাকা ‘উধার’ দিচ্ছেন। কিন্তু সে বেশি নিচ্ছি না, শোধ দিতে হবে তো। কোথা থেকে দেব? আমাদের রেশন কার্ড নেই। শুধু মায়ের আছে। যে সামান্য রেশন পাচ্ছি তাতে কি চলে? কিন্তু এখন কাঁদবই বা কার সামনে, সবার একই দশা। শুধু মনে হচ্ছে করোনা ছাড়াও ‘ভুখ’-এ (খিদেয়) মরবে অনেক মানুষ।

 

রঞ্জিৎ কুমার (গাড়িচালক), পাটনা

 

আমি একজন গাড়ি চালক আর গত ৮ই মার্চ থেকে আমি কোনও কাজ পাচ্ছি না। ৮ই মার্চ আমি হোলির ছুটি পাই, কিন্তু এক সপ্তাহ পরই ফিরে আসি। তারপর আমি দু’তিন দিন কাজ করার পরেই ওরা (যেখানে কাজ করতেন) আমাকে বিদায় জানান। আমি আমার পরিবার চালাব কীভাবে? আমি শুনেছি অনেক শ্রমিক যারা রেল লাইন ধরে হেঁটে ফিরছিলেন ট্রেন চাপা পড়েও মারা গেছেন। আমরা করোনা নয়, তারও আগে খিদেয় মরে যাব। অন্য গাড়ি চালকদেরও একই অবস্থা। আমাদের ভরসা দেওয়া হয়েছিল যে আমাদের কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হবে না, কিন্তু আমাদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। সরকার শ্রমিকদের জন্য কিছুই করছে না। আজ মে দিবস আর এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরাও মানুষ।

 

দীপক কুমার (নির্মাণ শ্রমিক), ভাগলপুর

 

আমাদের খুব অল্প টাকা মজুরি দেওয়া হয় আর পরিবার চালানো তাতে খুবই কঠিন। শ্রমিকরাই তো আপনারা চারপাশে যা দেখেন বাড়ি, রেইল, রাস্তা, কারখানা সবকিছু তৈরি করেন। আমরা দাবি তুলি যে অতিরিক্ত সময় কাজ করলে আমাদের ওভারটাইম দেওয়া হোক। আমাদের বলা হয়েছে সরকার কাজের সময় আট ঘন্টা থেকে বাড়িয়ে ১২ ঘন্টা করার পরিকল্পনা করছে। আট ঘন্টা পরে আমাদের শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়। যদি আমরা আরও বেশি সময় কাজ করি আমাদের আয়ুই কমে যাবে। আমি এমন শ্রমিক দেখেছি যারা ১২/১৫ ঘন্টা কাজ করেন, কিন্তু ৪০ বছর বয়সের পরেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ও মারাও গেছেন। এই করোনা-র দুঃসময়ে আমরা ভীষন সমস্যায় রয়েছি। এই মে দিবস আমাদের শিক্ষা দিল যে আমাদের সংগঠিত হতে হবে ও লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে, নাহলে আমাদের অধিকার অন্যে কেড়ে নেবে।

 

অনিল দাত্তা (ছাঁটাই হওয়া ডাইকিন কর্মী), নীমরানা রাজস্থান 

 

মে দিবসে শ্রমিকদের দাবি ছিল আট ঘণ্টার কাজ, আট ঘণ্টার বিশ্রাম, আট ঘণ্টা ইচ্ছেমতো সময় কাটানো। ১৮৮৬ সালের ৪ মে এক বিরাট আন্দোলন হয়। ঐসময় শ্রমিকদের দিয়ে ১২ ঘণ্টা-১৬ ঘণ্টা কাজ করানো হত। এখনও আমাদের এখানে একইরকম অবস্থা। আমাদের আমাদের অধিকার বুঝে নিতে হবে। আমরা নিজেরা না লড়লে আমাদের মরতে হবে। এখনো শ্রমিকদের উপর সরকার যখনতখন পুলিশ দিয়ে লাঠিচার্জ করে। আমাদের উপর হোসপাইপ দিয়ে জল আর গ্যাস ছাড়া হচ্ছে,। শ্রমিকদের লকডাউন চলাকালীন খাবার দেওয়া হচ্ছে না, বাড়ি যেতে দেওয়া হচ্ছে না, তারা রাস্তায় ঘুমোতে বাধ্য হচ্ছে। যে শ্রমিকরা রাতদিন এক করে খেটে সরকারের লাভ করায়, তাদের দশ দিনের খাবার অব্দি দেওয়া হচ্ছে না। শ্রমিকদের সাথে খুবই অন্যায় করা হচ্ছে। শ্রমিকরা লড়ছেন, কিন্তু পেরে উঠছেন না। তাঁদের নানান অধিকার, যেমন ইউনিয়ন বানাবার অধিকার দেওয়া হচ্ছে না। কোম্পানির মধ্যে নানা শ্রেণীভাগ, যেমন ঠিকেদারি প্রথা, পার্মানেন্ট, এফটিসি – এইসব শ্রেণীতে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। সরকার আর পুঁজিপতিরা এখানে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। শ্রমিকরা এক, তাঁদের কাজও এক, কিন্তু চালাকি করে কোম্পানি থেকে তাঁদের ভাগ করে দেওয়া হয়। যেসব কোম্পানিতে ইউনিয়ন আছেও, সেগুলো খালি পার্মানেন্ট ওয়র্কা‌রদের ইউনিয়ন, কন্ট্রাক্ট ওয়র্কা‌রদের না, যদিও কাজ সবাই একই করে। আর মাইনেতেও প্রচুর ফারাক রয়েছে। আমাদের এটা বুঝতে হবে যে আমাদের অধিকার কীভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পুঁজিপতিরা, কোম্পানি মালিকরা তো সব একজোট হয়ে থাকে। তো আমরা শ্রমিকরা একজোট হতে পারি না কেন? এইজন্য আমাদের লড়তে হবে। পার্মানেন্ট-কন্ট্রাক্ট ভাগ হয়ে থাকলে আমাদের চলবে না। আমাদের বুঝতে হবে, আমরা সবাই শ্রমিক। এগুলো না বুঝলে আমাদের সামনে খুবই খারাপ একটা সময় আসতে চলেছে। লড়তে না পারলে শিগগিরই আমাদের কেনা গোলামের মতো কাজ করতে হবে।

 

দীনেশ প্রসাদ (বস্ত্র শ্রমিক) কাপাসেরা, দিল্লী

 

আজ শ্রমিক দিবস। এই নিয়ে আগে অনেক সংঘর্ষ হয়েছিল। তারপর সংঘর্ষ করে আমরা আট ঘন্টা কাজের অধিকার পাই। কিন্তু এখন আমাদের থেকে সেই অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আমাদের (বস্ত্র শ্রমিকদের) ২০ ঘন্টা অব্দিও কাজ করতে হয়।

 

হাসান আলি (পরিযায়ী নির্মাণ শ্রমিক), বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনায়, আটকে আছেন চেন্নাইতে

 

মে দিবস কি সেইটা আমি ঠিক জানি না। মে দিবসে কি বাস চালু হবে? বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারে কি কোনও খবর আছে? শ্রমিকদের একসাথে হয়ে কিছু করা উচিৎ হতে পারে। ধরুন আমরা এখানে একসাথে পাঁচ জন আছি। কোম্পানি থেকে চাল দিয়েছে দু’বার আর কিছু টাকা। আমরা বাড়ি যেতে চাই।

 

নূর মহম্মদ (পরিযায়ী নির্মাণ শ্রমিক), বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, আটকে আছেন চেন্নাইতে

 

আমি মে দিবস কি জানি না। কিন্তু আমি সব মানি। আমি আমার ধর্মের কথা তাও মানি, মে দিবসও মানি। লোকে করে, আমরাও করি। নাকি আমি বোধহয় ২৬শে জানুয়ারি ভাবছি। আমি তাও মানি। স্কুলে পড়ার সময় থেকে আমরা ওটা করতাম তো। আমরা একসাথে কিছু করতে পারি কি না জানি না, তবে কোম্পানির উচিত আমাদের সাহায্য করা। ধরুন আমি সপ্তাহে ৪০০০ টাকা পাই। কোম্পানি হঠাৎ ২০,০০০ টাকা পাঠিয়ে দিল। এটা হলে তো ভালোই হয়। নয়তো চিকিৎসার জন্য খরচ করা মুশকিল হয়ে যায়। আর আমাদের তো কোনও জীবন নেই, খালি কাজ করা, কিছু বাঁচেও না।

 

সংকলন – সুদর্শনা চক্রবর্তী ও অনীশ অঙ্কুর

 

বিশেষ ধন্যবাদ – পরিচিতি, দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি, আফাক উল্লাহ (পিপলস্‌ অ্যালায়েন্স)

 

Share this
Leave a Comment