লকডাউন এবং শ্রমজীবী মেয়েরা (দুই)


  • May 1, 2020
  • (1 Comments)
  • 663 Views

করোনার জেরে বিপর্যস্ত ভারতের অর্থনীতি। সবচেয়ে বড় আঘাত যদি হেনে থাকে কোথাও তবে তা অসংগঠিত শ্রমিক মহল্লায়, কারিগর, প্রান্তিক চাষি, খেতমজুর, দিন আনা দিন খাওয়া জীবনে, জীবিকায়। শ্রমিক-মজুর-কারিগর বললেই সংসারের রোজগেরে পুরুষদের কথাই মনে হয় আমাদের। জিনাত রেহেনা ইসলাম সেখানেই মেয়েদের খোঁজ পেয়ে যান। মুর্শিদাবাদের এমনই  মেয়েদের কথা তাঁর ব্লগে লিখে চলেছেন জিনাত। ‘হ্যাশট্যাগ উইমেন ইন লকডাউন’ শিরোনামে। লকডাউনের জেরে যাঁদের অনেকেরই এখন আধপেটা, আটাগোলা, শাকপাতা সেদ্ধ জীবন। জিনাতের লেখার জেরে পেট ভরা খাবার জুটেছে কারো কারো। আজ ১ মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে সেই মেয়েদের কথা।

 

ফরজানা বিবি : লালখানদিয়ার, মুর্শিদাবাদ

 

বাচ্চা ক’টা জিজ্ঞাসা করতেই ফরজনা চমকে ওঠে। কোলের বাচ্চাকে দেখিয়ে বলে,”এই তো!” পাশে আরও তিনটে বাচ্চা কাড়াকাড়ি করছে একটি বাটি নিয়ে। কী খাচ্ছ? উত্তর দেয়, “চাল ভাজা।” এরা কারা? জিজ্ঞাসা করতেই  কেঁদে ফেলে ফরজনা। বলে, “জানেন বাচ্চাদের  খেতে দিতে পারি না কী বলব! সব ক’টাই আমার বাচ্চা।” চার সন্তানের মা ফরজনা। ছাতু আর চালভাজা মায়ের বাড়ি থেকে দিয়ে গিয়েছে বাচ্চাদের জন্য। খাবার কিছু নেই যে! বিড়ি বেঁধে চালায় বাচ্চাদের পেট ফরজনা। স্বামী বাইরে কাজে যায় বছরে একবার। যে ক’টা টাকা স্বামী নিয়ে এসেছিল তা দিয়ে চারদিক খোলা ঘর ঢেকেছিল ফরজনা শীতের সময়। চারটে বাচ্চা মাটিতে পড়ে  হু-হু ঠান্ডায় কাঁপে। দাঁত কপাটি লেগে যায়। গায়েও নেই সোয়েটার। হিম হয়ে যায় হাত-পা। তাই বাধ্য হয়েই ঘর মেরামতি করেছিল ফরজনা। স্বামীর কাজে যাওয়ার কথা ছিল মার্চ মাসে। বন্ধ হয়ে গেল। নিজের বিড়িও বন্ধ। কী করে কাটছে দিন? মাথায় কাপড় টেনে ফরজনা বলে, “কাল থেকে চুলা জ্বলেনি। মেয়ে মানুষ,কোথায় চাইতে যাব?” স্বামী আলমগীর লজ্জায় মাথা খেয়ে বলে, “চা করে দিতাম কিন্তু ঘরে  ক্যারাসিন শেষ।” তারপরে অন্যমনস্ক হয়ে বলে, “অভাবের সংসারে চারটি ছেলেমেয়ে হয়ে গেছে। স্বামী-স্ত্রীর না খেয়ে মরতে ভয় নেই। কিন্তু বাচ্চাগুলো নিয়ে এখন কী করি ! ভিক্ষা করতে যাব তারও উপায় নেই।”

 

ফরজনা বলে, “সরকার ঘরে থাকতে বলেছে। আমাদের  তো ঘর নেই, ত্রিপল দিয়ে ঘর বেঁধেছি। ঝড় আসছে,বৃষ্টি আসছে আবার ভাইরাসও আসছে এখন। গরিবের জান সব সহ্য করতে পারে। শুধু খিদেটাই বেশি অভাবের দিনে।”

 

ফরজানা বিবি : লালখানদিয়ার, মুর্শিদাবাদ

 

ছবি দেবেন একটা? হাসিমুখে ফরজনা বলে, “ও দিদি একটু  দাঁড়ান না গো! একটি  শাড়ি পড়ে আসি।” একদম রানির  মতো বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে পড়ল ফরজনা। স্বামীও যেন সুলতান! চোখের কোণে তখনও জল শুকায়নি ফরজনার। এরা ভোট দেয়। ভোটের পরে ফেলে দেওয়া প্ল্যাকার্ড দিয়ে  দেওয়াল ভাঙা ঘরে নিজেদের আব্রু বাঁচায়। ওরা বিশ্বাস করে অভাবের কপাল বদলাবার নয়। কিন্তু কোলের ছোট্ট মেয়েটি, সে কি জানে, খেতে না পাওয়াটাও জীবনের একটা ধর্ম? কিংবা ফরজনার ওই তিন বাচ্চা এক বাটি চাল ভাজা নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিল, ওরাও কি বোঝে কেন ওদের ভরপেট খাবারের অধিকার নেই? ওরাও তো দেশের ভবিষ্যৎ।

 

ছেতি হেমব্রম : নবগ্রাম, মুর্শিদাবাদ

 

“বিশ্বাস করুন, ছিতে হেমব্রম পাগলি নয়, ভিখারিও নয়।” বলতে বলতে কথা জড়িয়ে যায় ছেতি হেমব্রমের দাদা বদি হেমব্রমের। দেখে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, শুধু অভাব, অপুষ্টি ও অযত্নে এই বেহাল দশা ছেতির। দাদার অভাবের সংসারে এক কোনায় পড়ে থাকে ছিতে। এখন খাবার বলতে সারাদিন একমুঠো মুড়ি আর জল। আগের দিন রাতে জুটেছে শুঁটকি মাছের সামান্য গুঁড়ো আর লবণ। দিলে খায়। না দিলে খায় না। এদিকে দাদারও মাঠে চাষের মজুরি খাটা বন্ধ হয়েছে অনেকদিন। টানা লকডাউনে বাড়িতেই বসে। বদি হেমব্রম অসহায় হয়ে বলে, “ছেতি জলটাই খায় বেশি।” ডান হাতের চারটে আঙুল অর্ধেক আছে। বাঁ চোখেও সমস্যা। তাই নাকি  সরকারের ঘরে ছাপ পড়েনি। দুই বার গিয়েও আঙুলের ছাপ না ওঠায় আধার কার্ড হয়নি। কার্ড না থাকায় ছেতি সব সরকারি সুযোগ সুবিধার বাইরেই থেকে গেছে। বদি আফসোস করে বলে “বাপ লুদু হেমব্রমের মেয়েটার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। কিছুই পেল না জীবনে মেয়েটা।”

 

ছেতি হেমব্রম : নবগ্রাম, মুর্শিদাবাদ

 

ছেতির ছবি হবে শুনে তাড়াতাড়ি দুই পায়ে উঠে দাঁড়াল। হাতের পাশেই লাঠি রাখা ছিল। নিজের চেয়ে আধ হাত বড়। অন্য সময় দুই হাতে ভর দিয়েই চলে। মাটিতে হামাগুড়ি দিয়েই আজীবন কেটে গেছে। দাঁড়িয়ে হাঁটতেও পারে না। এত অসহায় যে মানুষের জীবন হতে পারে তা ছেতিদের না দেখলে বোঝা যায় না। শরীর চলে না,খাবার পেটে পড়ে না নিয়মিত। তবু মুখে হাসি থেমে যায়নি। ছেতির দাদা বদি খুব মর্মাহত হয়ে বলে, “আমার বোন অক্ষম। চলতি পারে না। আমি সারাবছর তার খাবার জোগাড় করতেও পারি না। এখন তো নিজেই খেতে পেছি  না । ওর মুখে কী তুলে দেব।” পরিবারের এক কোনায় নীরবে পড়ে থাকা নিস্তেজ ছেতিকে ‘আসছি’ বলতেই হাত বাড়িয়ে দেয়। ডান হাতটা বাড়িয়েই কী ভেবে সরিয়ে নেয়। পাশ থেকে বদি বলে ওঠে, “আসলে মাথার ঠিক নেই,পাগলি তো!” আমি কিন্তু নিশ্চিত সাদামাটা ছেতি হাত বাড়াবেই। ঠিক তাই হল। সবকটা আঙুল যে হাতে আছে সেটা বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে। তখনও মুখে হাসির রেশ।দেশ, সংবিধান, গণতন্ত্রের লেন্সে এই হাসি বুঝি ধরা পড়ে না। মাথাটার শুধু গুনতি হয়।

 

সূর্যের তির্যক কিরণ চার খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে থাকা মাটির ঘরটার উপরে পাতার ছাউনিতে পড়ছে। ঘরে শুধু জলের বোতল, বালতি আর জগ ছাড়া কিছুই নজরে পড়ছে না। সত্যি এই বিরাট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভরা দুনিয়ায় শুধু জলও মানুষকে কত ঘণ্টা বাঁচিয়ে রাখতে পারে! রান্না হয়নি একথা মুখ ফুটে বলার দরকার হয় না। দেখে বোঝা যায় আর সেটা বোঝার পর শিখে নিতে হয় এই পৃথিবী হয়ত ছেতি হেমব্রমদের জন্য নয়। এদের শরীরটাও মাটিকে কতটা ভারবাহী করে তুলছে। মানুষ ভয় পেয়ে পালাচ্ছে পাগল ভেবে! অভাব ও অনাদর মানুষের শরীরটাকেও কত বদলে দেয়। মানুষে মানুষে অবিশ্বাসের প্রাচীর তুলে দেয়।

 

ফেরার মুহূর্তে বদি হেমব্রম কে বললাম — লকডাউন উঠে গেলে একবার শহরে আসুন। ছিতের  চিকিৎসা দরকার। কার্ডটাও দেখা যাবে। ঘাড়ের গামছা দুই হাতে নামিয়ে এনে করজোরে ভাঙা গলায় বদি বলতে থাকলেন, “বাপ লুদুর মেয়ে ভাল হয়ে যাবে! মরা বাপটা আমার শান্তি পাবে এদ্দিনে!”

 

সহ-নাগরিক হিসেবে ছেতি হেমব্রমের  কাছে মাফ চাওয়ার কোনোও ভাষা আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কেমন বিস্বাদ হয়ে যাওয়া  মুখ নিয়ে গুলিয়ে যাচ্ছিল শরীর। গ্রাম পেরিয়ে সামনে জনশূন্য শহুরে  রাস্তা। পথ ছেড়ে ঘরে বসেছে মানুষ। আমরা সবাই বাঁচতে চাই। ছেতি হেমব্রমও।

 

সামিলা লাইলি : লালখানদিয়ার, জঙ্গীপুর, মুর্শিদাবাদ

 

লকডাউন শুধু সামাজিক দূরত্ব রক্ষার অগ্নিপরীক্ষা নয়। অসময়ে বন্ধুত্ব গড়ার দিশাও দেখাচ্ছে লকডাউন। সামিলা ও লাইলির ষাট পেরিয়ে গেছে। স্বামী নেই প্রায় দুই যুগ। একজনের বারো , অন্যজনের তেরোতেই বিয়ে। চল্লিশ হতে না হতেই স্বামী মরে গেল। তারপরে প্রায় আঠারো- কুড়ি বছর ধরে লড়াই। স্বামীর ভিটে-মাটি আগলে একা। অভাবের দিনে  চলছে দুইজনের খুদ, রুটি বিনিময়। আঁচলে বেঁধে সামিলা নিয়ে আসছে খুদ ও আটার নাড়ু লাইলির জন্য। লাইলিও সামিলাকে দিচ্ছে পরের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা ভাত-রুটি। লকডাউনের দিনে কেমন আছেন? জিজ্ঞাসা করতেই মাথা নিচু দুইজনের। ধরা গলায় বলে, “কাজ নাই , পায়সাও নাই।”

 

জীবনের নানা হারানোর দুঃখের সঙ্গে এখন কাজ হারানোর দুঃখ মিলেমিশে গেছে। বিড়ি বাঁধা বন্ধ হয়ে গিয়েছে অনেকদিন। ছেলেদের কাছে হাত পাততে মন চায় না ওদের। গর্ব করে বলছে, “ব্যাটারঘের কাছে হাত পাতি না। কাজ করেই খাই। বাতাসের অসুখটা চলে গেলে একটু হাড়ে হাওয়া লাগবে।”

 

সামিলা

 

সামিলাকে ব্যাটা খেতে দেয় না। মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল। জামাই আবার বিয়ে করেছে। ‘ছাড়ান’ হয়ে গেছে। বিটি এখন বাড়িতে বসে। বছর চল্লিশ হয়ে গেল। বিড়ি বেঁধেই পেট চলে। সামিলা চোখ মুছে বলে, “আমার স্বামী মরে গেল। তাই একলাই কাটনু। বিটির বিহার পর স্বামী ছেড়ে দিল। ও একলা হল ফের। কপালের দোষ কি কেউ খন্ডাতে পারে?”

 

লাইলির স্বামীর পরেই মারা গেল বাপ-ভাই এক এক করে। লাইলি স্বজন হারাতে হারাতে শেষমেশ একা হয়ে গেল। দুই ব্যাটা। মাঠে খাটে। মেয়ে জাহিরুন্নেশা তিরিশ পেরিয়েছে। আজন্ম মাথার অসুখ। পা-হাত নিয়ে পারে না চলতে। কানেও ভালো শুনতে পায় না। এখন বাড়িতে চুলা জ্বলে না। সকালেই বেরিয়ে পড়ছে জাহিরুন্নেশা। ঘুরে ঘুরে  খাবার চেয়ে বেড়ায়। যেদিন আনে, ভাগ করেই খায়। নইলে জলটাও চায় না মায়ের কাছে।  লাইলি বলে, “মেয়েটা খেপি। খেতে দিতে পারিনা। ও লকডাউনে চেহে চিনতে যা আনছে তাই খেছে। আমি তো মুখ পানে সাহস করে দেখি না।”

 

লাইলি

কোনও সাহায্য পেয়েছেন আপনারা? সামিলা মাটির ভাঙা জানালার দিকে তাকিয়ে বলে, “জীবন কেটে গেল আমাদের। কেউ কিছু তো দিলে না। এখন খেতে পেছি না। কেউ ভুলেও  জিজ্ঞাসা করে না।” লাইলি বলে, “হাঁড়িতে ভাত আছে কিনা, চুলা জ্বলছে কিনা কেউ ভুলেও হাঁক দেয় না একবার।”

 

দুই বিধবার এই বেঁধে বেঁধে থাকা জীবন লকডাউনকে যেন অন্য পথ দেখাচ্ছে । দূরত্ব  বলে কি সত্যিই কিছু হয়? অভাব যাদের স্বভাব নষ্ট করতে পারেনি সেই সামিলারা ঝরা পাতার মত উড়ে যাওয়ার সব সম্ভাবনাকে হার মানাচ্ছে। নিজের যা কিছু আছে তার আন্তরিক বিনিময় করে, বিলিয়ে দিয়ে বাঁচার নিত্যনতুন কৌশল রপ্ত করছে। ‘চোখের পুতুল’ নষ্ট হয়েছে সামিলার কিন্তু লাইলির মনের দৃষ্টি অনেকদূর দেখে আজও। বৈধব্য তো মনে লাগে! শরীর কি আর চিহ্ন বহন করে? ভাতার কাগজে কি লেখা থাকে লাইলি -সামিলাদের সত্যিকারের অভাবের কথা! স্বামী মরার পরদিন থেকেই তো এদের জীবনজুড়ে লকডাউনের ছায়া।  আজকের লকডাউন উঠে গেলেও লাইলিদের সঙ্গে  সমাজের  ‘দো গজ  দূরি’র লক্ষ্মণ রেখা মেটায় কার সাধ্য!

 

লেখক একজন শিক্ষকনারীবাদী সমাজকর্মীকলাম লেখক

https://jinatspeaks.blogspot.com/

 

পড়ুন: লকডাউন এবং শ্রমজীবী মেয়েরা (এক)

 

Share this
Recent Comments
1
Leave a Comment