পশ্চিমবঙ্গে বরিষ্ঠ স্বাস্থ্য প্রশাসকের মৃত্যু: স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা প্রশ্নের মুখে


  • April 26, 2020
  • (0 Comments)
  • 478 Views

একজন বরিষ্ঠ স্বাস্থ্য প্রশাসকের করোনা সংক্রমণে মৃত্যু, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল রাজ্যের করোনা প্রতিরোধে সচেতনতা, পরিকল্পনার অভাব রয়েছে এবং সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েও সমস্যা রয়েছে। সুদর্শনা চক্রবর্তীর রিপোর্ট।

 

পশ্চিমবঙ্গে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের মৃত্যুর প্রথম ঘটনা ঘটল কলকাতায়। মারা গেলেন কলকাতার মৌলালিতে অবস্থিত সেন্ট্রাল মেডিকাল স্টোর (সিএমএস)-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর অফ হেলথ্ সার্ভিস (ইক্যুইপমেন্ট অ্যান্ড স্টোর) ডাঃ বিপ্লবকান্তি দাশগুপ্ত। গত ১৭ই এপ্রিল তিনি করোনা সংক্রমণ নিয়ে সল্টলেক-এর একটি করোনা চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট নার্সিংহোম-এ ভর্তি হন। গত কয়েক দিনে তাঁর অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ভেন্টিলেটর-এ দিতে হয়। চিকিৎসক দলের যাবতীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে হৃদ্‌যন্ত্র বিকল হয়ে মৃত্যু হল তাঁর। সুদক্ষ প্রশাসক ও অত্যন্ত দক্ষ ও আন্তরিক চিকিৎসা কর্মী হিসাবে ডাঃ বিপ্লবকান্তি দাশগুপ্ত চিকিৎসক মহলে জনপ্রিয় ছিলেন।

 

তিনি যে বিভাগে কর্মরত ছিলেন বর্তমানে সেই বিভাগের দায়িত্ব হল – রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম, যেমন পিপিই, মাস্ক, গ্লাভস, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট ইত্যাদি পাঠানো। ডাঃ দাশগুপ্ত এই বিভাগেরই প্রশাসক হিসাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তাঁর তদারকি ও তত্ত্বাবধানেই রাজ্যের সমস্ত জেলায় সরাসরি করোনা চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত যে স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকেরা রয়েছেন তাঁদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল এই অত্যাবশকীয় সামগ্রীগুলি। বিভিন্ন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, তিনি শুধুই প্রশাসকের দায়িত্বই পালন করতেন না, নিজে হাতে প্রতিটি কাজে অংশগ্রহণ করতেন। ট্রাকে যখন এইসব সামগ্রী তোলা হত তখন তদারকির পাশাপাশি তিনি নিজেই অনেক সময়ে হাত লাগাতেন এই কাজে। প্রথম থেকেই একজন দক্ষ স্বাস্থ্য প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব সামলে শেষ পর্যন্তও নিজের সহকর্মীদের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কাজেই নিয়োজিত রয়ে গেলেন ডাঃ দাশগুপ্ত।

 

কিন্তু কীভাবে কোভিড ১৯-এ সংক্রামিত হলেন তিনি? আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোর-এ এই যে রাজ্যের সব জায়গা থেকে ট্রাক নিয়ে ড্রাইভার, খালাসি, লোডার-রা আসতেন, সম্ভবত তাদের থেকেই ছড়িয়েছে সংক্রমণ। এই সংক্রমণ আটকানোর কোনও উপায় ছিল কি? ডাঃ সিদ্ধার্থ গুপ্ত যেমন বলছেন, “নিশ্চিতভাবেই প্রোটেকশন-এর অভাব ছিল। মাত্রই কিছু দিন আগে প্রয়োজনে আমার সহকর্মীরা সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোর-এ গেছিলেন। তাঁরা জানান সেখানে বহিরাগতদের এই সময়ে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে না। অবশ্যই উচিৎ ছিল এই যে ট্রাক নিয়ে যারা আসছেন বা বাইরে থেকে যিনিই আসছেন তাদের থার্মাল স্ক্যানিং করে দেহের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে নেওয়া, পর্যাপ্ত পরিমাণ স্যানিটাইজার দেওয়া, প্রত্যেকের মাস্ক ও গ্লাভ্‌স-এর ব্যবস্থা করা, যে কাউকেই ভেতরে ঢোকার অনুমতি না দেওয়া এবং যাঁরা ভেতরে কর্মরত তাঁদেরও নিয়মিত সময় অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে করোনা-র সংক্রমণ ঠেকানো সহজ নয়, বিশেষ করে এখন যখন তার লক্ষণও প্রকাশ পাচ্ছে না বহু ক্ষেত্রে। কিন্তু এই নিয়মগুলি মানলে অন্তত ৮০% সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।”

 

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি চিকিৎসকদের অন্যতম প্রাচীন সংগঠন হেল্থ সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন, ওয়েস্ট বেঙ্গল-এর প্রাক্তন সম্পাদক ডাঃ হীরালাল কোনার আবার মনে করছেন, যেহেতু ডাঃ দাশগুপ্ত সরাসরি করোনা আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে কাজ করছিলেন না, তাই তাঁর পিপিই পড়ার প্রয়োজন ছিল না এবং তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে জানালেন যে এই সংক্রমণ আটকানোরও কোনও উপায় সম্ভবত নেই, “কারণ, এই ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে গোষ্ঠী সংক্রমণের সম্ভাবনা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সঠিক পরীক্ষা না করলে এই সংক্রমণ আটকানো মুশকিল। যেমন সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোর-এ যারা বাইরে থেকে এসেছেন তাদের মধ্যে কে যে করোনা বাহক তা বিনা পরীক্ষায় বোঝা অসম্ভব এবং সেই মতো পদক্ষেপ নেওয়াও সম্ভব নয়।”

 

প্রায় একই বক্তব্য ডাঃ পূণ্যব্রত গুণ-এরও – “মনে করা হচ্ছে ট্রাক চালক, খালাসি, লোডার তাদের থেকেই সংক্রামিত হয়েছিলেন ডাঃ দাশগুপ্ত। কিন্তু কে আক্রান্ত, কে নয় তা জানা যাবে কীভাবে! যদি তাদের মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদি পড়ানো যেত, তাহলে হয়তো সংক্রমণ আটকানো যেত। আইসিএমআর-এর গাইডলাইন অনুযায়ী করোনা প্রতিরোধ করতে এগুলি অবশ্যই পরা উচিত।” ডাঃ গুণ আরেকটা বিষয়ের উপরেও জোর দিলেন, যেভাবে রাজ্য ও দেশে লকডাউন চলছে তা করোনা সংক্রমণ আটকানোর আদৌ কোনও উপায় নয়। মহামারীবিদরা এ সম্পর্কে যে পরামর্শ দিয়ে থাকেন তা হল যতটা বেশি সম্ভব পরীক্ষা করতে হবে, যাতে যাদের সংক্রমণ আছে তারা ধরা পড়বে ও তাদের ‘আইসোলেশন’-এ রেখে চিকিৎসার মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট লকডাউন করে সংক্রমণ চিহ্নিত-আইসোলেশন-চিকিৎসা করে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে এরকম পরিকল্পনাহীন লকডাউন-এর ফলে মানুষ অনাহারে ও অ-কোভিড নানা রোগেই মারা যাবেন অনেক বেশি।

 

তথ্য সূত্রে প্রকাশ ডাঃ দাশগুপ্তর প্রেশার, সুগার জাতীয় ‘কো-মরবিডিটি’ ছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ সংক্রমণ তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল। একজন বরিষ্ঠ স্বাস্থ্য প্রশাসকের করোনা সংক্রমণে মৃত্যু, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল রাজ্যের করোনা প্রতিরোধে সচেতনতা, পরিকল্পনার অভাব রয়েছে এবং সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েও সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন ধাপে স্বাস্থ্য পরীক্ষা যত সংখ্যক হওয়া প্রয়োজন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে সেখানেই। একজন স্বাস্থ্য প্রশাসক যদি এভাবে মারা যেতে পারেন, তাহলে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় সরাসরি যুক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের সুরক্ষার জন্য কতটা সচেতনতা ও উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন তা এই মৃত্যই বুঝিয়ে দিয়ে গেল।

 

Share this
Leave a Comment