শ্রমিকদের প্রতি খোলাচিঠি: #MigrantLivesMatter


  • April 22, 2020
  • (2 Comments)
  • 1104 Views

মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটির তরফ থেকে কোভিড-১৯ লকডাউনে চলাকালীন ভিনরাজ্যে অবরুদ্ধ পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর নেমে আসা পুঁজিবাদী ও রাষ্ট্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে একটি বার্তা। মাইগ্র্যাণ্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি একটি পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য তৈরী করা নেটওয়ার্ক। বর্তমানে তাঁরা ভিনরাজ্যে আটকে পড়া শ্রমিকদের ত্রাণ ও সেই সংক্রান্ত খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন। লেখাটি হিন্দিতে কাফিলায় এবং ইংরিজিতে কাউন্টার কারেন্টসে প্রকাশিত হয়েছে।

 

কমরেড ও বন্ধুগণ,

 

আটকে পড়া শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভিতরে যাতায়াত চালু করার নাম করে কেন্দ্রীয় সরকার যে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোটোকল(এস.ও.পি.) নিয়ে এসেছে, তা আসলে শ্রমিকদের অধিকারের জন্য মরণঘণ্টার সমান।

 

কোভিড-১৯ অতিমারীর সুযোগে শ্রমিকদের মৃত্যুফাঁদে আটকে রাখার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে রুখে দাঁড়ান!

 

  • সার্কুলারটি ঠিক কী?

 

১৯শে এপ্রিল ২০২০ এই সার্কুলারটি জারি করা হয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের (এম.এইচ.এ) তরফ থেকে। এর মাধ্যমে, আমরা শ্রমিকরা যারা কোনো একটি রাজ্যে আটকে আছি, সেই রাজ্যের ভিতরে আমাদের চলাচলকে আইনত স্বীকৃতি দেওয়া হল। এটা আসলে করা হল একটাই কারণে – উৎপাদন যাতে চালু থাকে। এই সার্কুলার এটাই বলে, যে সরকারী নির্দেশ পালন করা ছাড়া শ্রমিকদের আর কোনো উপায় নেই। মালিকরা স্থানীয় প্রশাসন আর পুলিশের লাঠির জোরে আমাদের দিয়ে, দরকার হলে আমাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও বাধ্যতামূলক ভাবে কাজ করাবে – এর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। হয়তো এই সার্কুলারের হাত ধরেই ভারতে দাস-শ্রমের (স্লেভ লেবার) সূচনা হল।

 

আজ এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াত বন্ধ – সে মুম্বই থেকে পুনে হোক, কিম্বা লুধিয়ানা থেকে জলন্ধর, বা কোয়েম্বাটুর থেকে চেন্নাই। কিন্তু উৎপাদন আর লাভের জন্য শ্রমিকদের জোর করে চলাচল করানোতে কোনো বাধা নেই!

 

সার্কুলারে বলা ‘স্কিল ম্যাপিং’ পদ্ধতি অনুযায়ী আমাদের বেতন আরো কমিয়ে দেওয়া হবে, এমনকি আমাদের কাজের অযোগ্য বলে দাগিয়েও দেওয়া হতে পারে। এখানে এমন কোন ব্যাবস্থা নেই যার মাধ্যমে আমরা শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে পারি। এটা কিন্তু সরাসরি সংবিধানের ২৩এ ধারা অমান্য করার সমান। পরিযায়ী শ্রমিকদের দিয়ে ‘স্কিল ম্যাপিং’-এর ভিত্তিতে কাজ করানোর এই প্রস্তাবে এটাই প্রকাশ পায়, যে সরকার আমাদের জেলের বন্দীদের মতো মনে করে।

 

 

সরকার তো কাজ দেওয়ার দাবি করছে। কিন্তু এতে মজুরি ও বাকি সুরক্ষার ব্যাপারে কি বলা আছে? সার্কুলারে এমনও বলা হচ্ছে যে আমাদের, মানে শ্রমিকদের কারখানার ভিতরেই থাকতে হতে পারে। তা আমাদের সন্তান আর পরিবারকে কি আমরা রিলিফ ক্যাম্পে ছেড়ে চলে আসব না খেতে পেয়ে মরবার জন্য? করোনাভাইরাসের কারণে আমরা কেউই বেশি যাতায়াত করতে পারব না, ফলে আমরা বা আমাদের পরিবার – কেউই কাজের জায়গা বা ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারব না। এইভাবে মালিকরা তাদের উৎপাদন চালিয়ে যাবার জন্য আমাদের জেলখানায় ঠেলে দিচ্ছে!

 

আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষদের ঘর-পরিবার থেকে দূরে ঠেলে রেখে কাজ করাতে বাধ্য করা যাবে না! লকডাউন চলার সময় পুঁজি আর রাষ্ট্র হাতে-হাত মিলিয়ে শ্রমের উপর তাদের একচেটিয়া মালিকিয়ানা কায়েম রাখতে আর নিজেদের মসিহা বলে চালাতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা এটা ভালোই জানে, যে আমাদের মতো পরিযায়ী শ্রমিকদের সস্তায় কেনা যায় আর সহজেই ইচ্ছেমতো ব্যবহার করা যায়।

 

  • শ্রমিকদের হাতে তাহলে কি উপায় বেঁচে রইল? সেটা এবার শ্রমিকরাই বুঝে নেবেন!

 

সাথী, এর মধ্যেই বাধ্যতামূলকভাবে দিনে ১২ ঘন্টার কাজ ঘোষণা করা হয়ে গেছে। আমরা দেখেছি নিয়োগ-বিহীন বৃদ্ধির (জিরো-এমপ্লয়মেন্ট গ্রোথ, মানে কোনো নতুন চাকরি তৈরিই হচ্ছে না) জমানা চলছে গত তিরিশ বছর ধরে। নির্মাণ ও কৃষিসহ সব ক্ষেত্রেই বাড়তে দেখছি মেশিন আর অটোমেশনের ব্যবহার। কোভিড-১৯ ক্রাইসিসের ঠিক আগে দেশে বেকারত্বের হার গত ৪৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল লাগাতার লকডাউন ও বিশ্ব জুড়ে অনিশ্চয়তার কারণে এই হার আজ আরো বেড়ে গেছে। এর বদলে আমাদের দাবি, ৬ ঘন্টার কাজ আর তিনটে শিফটে কাজ লাগু করা হোক, যাতে বহু মানুষ নিশ্চিত ভাবে কাজ পান।

 

 

সি.এম.আই.ই. (সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি) জানাচ্ছে, যে বেকারত্বের হার এই মুহূর্তে ২৩.৪ %। তাই অর্থনীতির সুরাহার কারণেই আজ নানান ক্ষেত্রে প্রচুর লোককে চাকরি দেওয়া দরকার। খাদ্য, জল, জনস্বাস্থ্য, জনশিক্ষা, গণপরিবহন – এই ক্ষেত্রগুলিতে এই ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজন। এতে বেকারত্বের হার কমবে, জনসেবার আরও সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে।

 

সরকার মালিকপক্ষের কাছে শ্রমিকদের ছাঁটাই না করার আবেদন জানিয়েছে! এটা একেবারেই যথেষ্ট না। সরকারকে এক্ষেত্রে ভর্তুকি এবং পার্ট-পেমেন্টের ব্যাবস্থা করতে হবে। যারা এই নিয়ম মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থাও নিতে হবে।

 

আরো দরকারি বিষয় হল লকডাউনের ফলে আমাদের মতো যাঁদের এত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, তাঁদের হাতে টাকার জোগান দেওয়া। শুধু ন্যায়-বিচারের দিক দিয়ে নয়, অর্থনীতি ও বাজারের দিক দিয়েও এটা ভীষণ দরকার। অর্থনীতিবিদেরা এই অতিমারীর আগেও জানিয়েছেন যে, গরীব-মানুষ এবং শ্রমিকদের কেনার ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে।

 

  • টাকা কোথা থেকে আসবে?

 

প্রপার্টি ট্যাক্স, ওয়েলথ ট্যাক্স, বর্ধিত কর্পোরেট ট্যাক্স, এনভায়রনমেন্ট ট্যাক্সের মাধ্যমে ধনী মানুষদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা জোগাড় করা যেতে পারে। এছাড়া সিগারেট, মদের মতো ভোগ্যপণ্যের ওপর ট্যাক্স বসিয়েও টাকার জোগাড় করা যেতে পারে। এছাড়া, ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া লোকেদের কাছ থেকে সরকার চাইলেই টাকা আদায় করে নিতে পারে। যাঁদের কাছে দরকারের চাইতে বেশি টাকা আছে, অন্তত এই বিপদের দিনে তাঁদের কাছ থেকেই রেভিনিউ তোলা হোক না কেন?

 

 

পরিযায়ী শ্রমিকদের কোনো একটি রাজ্যে আটকে রেখে দেওয়ার কারণ এই নয়, যে সরকার তাঁদের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করছে। কারণ সরকার এর মধ্যেই তীর্থযাত্রী ও ছাত্রদের বাড়ি ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। সরকার স্পষ্টই এই সঙ্কটকালের সু্যোগ নিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের ব্যবহার করতে চাইছে

 

পরিযায়ী শ্রমিকদের সাথে এই ব্যবহার, দিনে ১২ ঘন্টার কাজ লাগু করার প্রস্তাব, তিনটি শ্রম-কোড তড়িঘড়ি পার্লামেন্টে পাশ করানোর অর্ডিনান্স জারি করা, এক বছরের জন্য সমস্ত শ্রমিক ইউনিয়ন বাতিল করতে জি.সি.সি.আই.(গুজরাট চেম্বার অফ কমার্স)-এর প্রস্তাব, মজুরি না দেওয়া বা মজুরি কমানো এবং যেমন ইচ্ছে হায়ার-এন্ড-ফায়ার নীতি – এ জাতীয় শ্রম-বিরোধী আচরণই এখন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

 

  • আমাদের অধিকার

 

সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিক অধিকার নিয়ে পরোয়া করে না। এস.ও.পি.-তে লেখা আছে যে, ক্যাম্পের বাসিন্দাদের (শ্রমিকদের) স্কিল ম্যাপ করে তাদের কাজে লাগানো হবে। তারপরে স্ক্রিনিং করে রোগের উপসর্গ পাওয়া না গেলে তাদের বিভিন্ন কাজের জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে। আমরা শ্রমিকরা কি গরু-ভেড়ার মত বাসে করে সরকারের আজ্ঞা পালন করতে যাব? এটা আমাদের দিয়ে জোর খাটিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া নয়?

 

 

ওরা এমন ব্যবস্থা করেছে, যাতে আমাদের বেশিরভাগের কাছে এরকম কোনো প্রমাণই না থাকে, যে আমরা অমুক ঠিকেদার বা মালিকের কাছে কাজ করি। সরকারকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শ্রমিক-মালিকের মধ্যেও লিখিত চুক্তি থাকে। সরকারকে নথিভুক্ত করতে হবে কারা কাজ করতে ইচ্ছুক। কাজের জায়গায় শ্রম আইন পালন করা হচ্ছে কিনা, সরকারকে নজর রাখতে হবে। আবার এইসব তথ্য যাতে দরকারমতো শ্রমিক ইউনিয়নগুলি পেতে পারে, তার ব্যবস্থাও করতে হবে। যেকোনো বিবাদ/অভিযোগ/প্রশ্নের সমাধান দ্রুত করার জন্য সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।

 

পরিশেষে বলি, সমস্ত বাড়ির বাইরে আটকে পড়া শ্রমিকদের নিজেদের গ্রাম বা শহরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তাঁদের ফেরত নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও সরকারকেই করতে হবে, যাতে তাঁদের মানসিক চাপ কিছুটা লাঘব হয়। শ্রমিকদের ঘরে ফিরে যাওয়ার এই দাবি এই মুহূর্তে গোটা শ্রমিক-শ্রেণীর দাবিতে পরিণত হয়েছে। যেভাবে আমাদের কাজে পাঠানোর আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, সেভাবেই বাড়ি পাঠানোর আগেও আমদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো যেতে পারে।

 

শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য দীর্ঘজীবী হোক!

অতিমারীর নামে বাধ্যতামূলক শ্রম বন্ধ করা হোক!

শ্রমিকদের সম্মতি ও অধিকারের দাবিতে সরব হন!

 

 

যোগাযোগ – migrantworkersolidarity@gmail.com, http://fb.com/MigrantSolidarity, http://twitter.com/migrant_IN, Sourya (8879215570), Soumya (9474866737)

 

ছবি – প্রতীপ চক্রবর্তী ও ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত (শুরুতে বিহারে গেটবন্দী পরিযায়ী শ্রমিকরা এবং শেষে ২০১৬ সালে ঈজিপ্টের শিল্পী মুস্তফা জেকবের তৈরি ছবিটি)

Share this
Recent Comments
2
Leave a Comment