করোনা ভাইরাস পেরিয়ে: সূত্রপাত, জৈব-রাজনীতি ও জরুরি অবস্থা 


  • April 4, 2020
  • (0 Comments)
  • 463 Views

সংক্রমণ রুখতে সামাজিক বন্দিদশা, ফাঁকা কিংবা প্রায়জনশূন্য রাস্তা, বাজারের ডানাছাঁটা দশা, সমাজের দরিদ্রতম মানুষদের বিচিত্র এক মন্থর সামাজিকঅর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বন্দি করে ফেলা, এই সবই আমাদের সামনে অন্য এক সময়ের, অন্য ছন্দের, ভিন্ন সামাজিকতার, ভিন্ন উপলব্ধি সংবেদনশীলতার দরজা হাট করে খুলে দিচ্ছে। অপরত্বের ভাঁজ খোলার, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যুক্তি ছন্দের থেকে আলাদা এইসব যুক্তি ছন্দের উন্মোচন ঘটানোর সুযোগ এর আগে কখনও এতটা হাতের কাছে আসেনি। এমিলিয়ানো তেরান মান্তোভানি-এর লেখা। 

 

২৩ মার্চ, ২০২০

দুনিয়া জুড়ে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) নামক বিশ্বমহামারিতে আক্রান্তের সংখ্যা চার লক্ষ (৩৬৭,৪৫৭) ছোঁয়ার দিকে এগোচ্ছে, মৃতের সংখ্যা ১৬,১১৩, অর্থাৎ মোট আক্রান্তের সংখ্যার ৪.৩৮%। (এই লেখা অনুবাদ করার সময় পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের মোট সংখ্যা ১,০০৯,৪৫২; মৃতের সংখ্যা ৫২,৮৫৩, অর্থাৎ মোট আক্রান্তের ৫.২৩%। জানা কথা যে এই খতিয়ান প্রায় প্রতি মুহূর্তেই বদলাচ্ছে।) কোভিড-১৯-এর আসল বিপদের দিকটা কিন্তু রোগজনিত মৃত্যুহার নয়, রোগের সংক্রমণবৃদ্ধির চড়া হার (ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে এটা সহজেই ছড়িয়ে পড়ে)। হালফিলের বিশ্বায়িত ও সদা-সংযুক্ত দুনিয়ায় বিষয়টা বেশ ঝামেলার। ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, পৃথিবীগ্রহ জুড়ে হইহই করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে (গোটা দুনিয়ায় আরও কতজন সংক্রমণের শিকার হবেন?)। এর ফলে একদিকে মানুষকে (বিশেষত বয়স্কদের জীবনের) চড়া মূল্য চোকাতে হতে পারে, অন্যদিকে এ ঘটনা হাল আমলের ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বায়নের জমানায় প্রাত্যহিক জীবনের অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

 

শুধু যে বিশ্বের সবথেকে উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে তা নয়, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাণিজ্যের একটা বড় অংশ স্রেফ থমকে আছে (কারণ বিশ্বমহামারিকে ঠেকানোর জন্য জারি হওয়া বিধিনিষেধ), যার ফলে কলকারখানা আর কোম্পানিগুলো ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়েছে, কর্মী ছাঁটাই বাড়ছে, বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার হিসেবনিকেশ উলটে গেছে, এছাড়া আরও পাঁচটা ফলাফল তো আছেই। এই পরিস্থিতির ফলাফলগুলো যে পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত সেটা কতগুলো ঘটনা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, যেমন – বিভিন্ন দেশের মুদ্রার দাম পড়ে যাওয়া, তেলের চাহিদা কমে যাওয়া (অভূতপূর্ব ঘটনা) ও দামের পতন; কিংবা আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারে ধস (গত মার্চের মাঝামাঝি নাগাদ ডাও জোনস সূচকের ইতিহাসে দ্বিতীয় নিম্নতম পতন দেখা গিয়েছে)।

 

সাম্প্রতিক এই বিশ্বমহামারি আরও ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে, কিংবা হয়তো একে অতিক্রম করাও সম্ভব হতে পারে। কী ঘটবে তা এখনও পর্যন্ত আমাদের জানা নেই। কিন্তু যা ঘটে চলেছে সে সব আমাদের আরও অনেক কথাই বলছে। কাজেই এই বিশ্বমহামারি  নিজেকে ছাপিয়ে গিয়ে আর ঠিক কী প্রকাশ করছে সেটা ব্যখ্যা করার চেষ্টা করা দরকার; আজকের এই (ভূ-)রাজনৈতিক সময়ে এর তাৎপর্যটা ঠিক কী; আর আজ আমরা যে বিশেষ জগতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি তার ব্যাপারেই বা এটা আমাদের কী জানাচ্ছে।

 

খাদের ধার: করোনা ভাইরাস রোগের লক্ষণ এবং একটা সন্ধিক্ষণ

 

আজ, প্রত্যেক চাউনি, কথোপকথন, মনোবেদনা ও বিতর্কের বিষয়বস্তু কোভিড-১৯ নামের বিশ্বমহামারি। কিন্তু এই নামটার সঙ্গে যা কিছু উচ্চারিত হচ্ছে সেগুলো ছাড়াও আরও অনেক কিছু নিয়ে আমাদের কথা বলতে হবে। এই বিশ্বমহামারি সমসাময়িক পুঁজিবাদের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশবিশেষ: আমরা আসলে নয়া-উদারনৈতিক বিশ্বায়নের বিশ্বমহামারির সম্মুখীন, সেই ’৮০-’৯০-এর দশক থেকেই যার প্রকোপ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। কোভিড-১৯ সেই বিশেষ তালিকায় আরও একটা বিশ্বমহামারি মাত্র, যে তালিকা মনুষ্যসমাজকে শুধু ঝুঁকির মুখেই ফেলছে না, কোনও-না-কোনওভাবে সতর্কবার্তাও শোনাচ্ছে। ২০০২ সালে সার্স-কোভি, ২০০৩ সালে তথাকথিত বার্ড ফ্লু (এইচফাইভ-এনওয়ান), ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু (এইচওয়ান-এনওয়ান), ২০১২ সালে মিড্ল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম (মার্স-কোভি), ২০১৩ সালে ইবোলা কিংবা ২০১৫ সালে জিকা (জেডআইকেভি)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু-এর স্বাস্থ্য-নিরাপত্তার ভারপ্রাপ্ত প্রাক্তন ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল কেইজি ফুকুদা-র মতে, এই বিশ্বমহামারিগুলো এড়িয়ে যেতে পারলে “মনে হয় যেন বন্দুকের গুলির পাশ কাটিয়ে যেতে পেরেছি”। কিন্তু কিছু কি বদলেছে? আজও তো আমরা ভাগ্য বাজি রেখে সেই এক খেলাই খেলে চলেছি।

 

কিন্তু বিশ্বায়নজনিত এই সমস্ত বিশ্বমহামারি আদপেই এমন কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা আকস্মিক দুর্বিপাক নয় যা আজ নয়তো কাল ঘটতই। বরং এগুলো সাম্প্রতিক কয়েক দশকে নয়া-উদারনৈতিক জমানায় জীবনের পণ্যায়নের বাড়বাড়ন্ত এবং বাস্তুতন্ত্রের নতুন নতুন সীমানার উপর দখলদারির ফলাফল: পুঁজিনিবিড়, বাণিজ্যায়িত ও শিল্পভিত্তিক চাষবাস ও হাঁস-মুরগি পালন (যা বার্ড ফ্লু-র কারণ), বন্য ও বিরল বা এক্সটিক জীবজন্তু কেনাবেচা (যেটা চিনে ঘটে), বিভিন্ন উদ্দেশ্যে উদ্ভিদ ও প্রাণীর জিনকে কাজে লাগানো, লুঠতরাজের পর্যটনের বাড়বাড়ন্ত, জঙ্গল সাফ, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এই প্রবণতার কয়েকটা উদাহরণ মাত্র। এসবের বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে আন্তর্জাতিক স্তরে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশ ও এক ভূগোলের সঙ্গে অন্য ভূগোলের যোগাযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে। এই যোগাযোগকে সম্ভব করে তুলেছে মানুষ ও পণ্যদ্রব্যের সচলতা, শহরগুলোর অসম্ভব অনিয়ন্ত্রিত বাড়বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাঁড়ির হাল এবং আরও বহুবিধ বিষয়।

 

গত কয়েক দশক ধরে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এহেন মূলভূত অধোগতি এবং জীবনের সীমানার উপরে – এই গ্রহের সীমানার উপরে, সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উপরেও বটে – হানাদারির বাড়বাড়ন্ত শুধু যে বিশ্বমহামারি জাতীয় ঘটনার মধ্যে দিয়েই প্রকাশ পাচ্ছে তা নয়। হালের এই বিশ্বায়িত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা যে যাবে না, সে সম্ভাবনার মধ্যেও তা ধরা পড়ছে। এর একটা সুস্পষ্ট উদাহরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাচীন হিমবাহগুলো গলে যেতে থাকায় ১৫,০০০ বছরের পুরনো সব ভাইরাস বেরিয়ে আসতে পারে। বিজ্ঞান এদের সম্পর্কে অজ্ঞ এবং এদের ভয়াবহতার মাত্রাও অজানা।

 

যে বিশেষ সময়ে কোভিড-১৯ বিশ্বমহামারি দেখা দিয়েছে তা নানান ইঙ্গিতে ভরা। এই সময় আমাদের একগুচ্ছ চূড়ান্ত, এসপার না-হয় ওসপার, ঘটনার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ঘটনাগুলো আদতে এক সূত্রে গাঁথা। যেমন অ্যামাজনের জঙ্গলে অগ্নিকাণ্ড বা অস্ট্রেলিয়ার অরণ্যে দাবানল, কিংবা এই তথ্য যে ২০১৯ সালটা বিশ্বের ইতিহাসে উষ্ণতম বছর। যাবতীয় বাস্তুতন্ত্র খাদের কিনারায় পৌঁছে গেছে, পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন ক্ষতিকারক লক্ষণ/বৈশিষ্ট্য। আকস্মিক এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন নানান পরিবর্তন  আমাদের চেনাজানা সামাজিক-বাস্তুতান্ত্রিক চলনকে পালটে দিতে চলেছে। ২০১৯-২০২০ এটুকু অন্তত আমাদের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরছে।

 

বাস্তুতন্ত্রই যে শুধু খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তা কিন্তু নয়। যে গোটা ব্যবস্থাটার মধ্যে দিয়ে নানান অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক চলন একযোগে প্রকাশ পায় তার মধ্যেই, একদম ভেতর থেকে কাঁপুনি ধরে গিয়েছে। সেই কারণেই কোভিড-১৯ বিশ্বমহামারি দুনিয়াজোড়া আসন্ন (খুব সম্ভবত) অর্থনৈতিক মন্দার প্রধান মূলভূত ইন্ধন হিসেবে উঠে আসছে। এই মন্দা ২০০৮-২০০৯ সালের অর্থনৈতিক মন্দার (যা আমাদের সাম্প্রতিক সময়কে সূচিত করে) সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত তো বটেই, তার পাশাপাশি বিশ শতকের সত্তরের দশক থেকে গড়ে উঠতে থাকা সঙ্কটের সঙ্গে এবং আধুনিক-পশ্চিমি সভ্যতার সঙ্কটের সঙ্গেও যুক্ত। সভ্যতার যে সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি, করোনা ভাইরাসের এই নতুন বিশ্বমহামারি তার অন্যতম লক্ষণ।

 

সুতরাং কোভিড-১৯ এবং তার ছড়ানো বিশ্বমহামারির মধ্যে এমন কোনও বিশেষত্ব আছে কি যা তাকে আগেকার বিশ্বায়নজনিত বিশ্বমহামারিগুলোর থেকে আলাদা করে? হ্যাঁ, একথা সত্যি যে ভাইরাল হেপাটাইটিসে যে বিশ্বজুড়ে বছরে ১৩ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় সে ব্যাপারে অনেক কম বাক্যব্যয় করা হয়; কিংবা আরও নাটকীয় উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, পথ দুর্ঘটনা (হ্যাঁ, গাড়ি প্রাণ নেয় বইকি!) বা ডায়রিয়া জাতীয় অসুখে মৃত্যুর খতিয়ানও ওরকমই। কিন্তু এখানে আমরা সংক্রমণ ও ‘ভাইরালিটি’-র সম্পূর্ণ অন্য এক ছন্দের মুখোমুখি। যদিও এই ভাইরাস সমাজের বিশেষ বিশেষ অংশের (যেমন বয়স্কদের) প্রাণ নেয়, কিন্তু কেউই এবং কিছুই আসলে এর আওতার বাইরে নয়। মানুষের পা পড়েছে এমন যে কোনও পথ দিয়ে এটা ঢুকতে পারে। কাজেই সবকিছুই এর গতিপথের আওতাভুক্ত। এর সম্ভাব্য বিশালতার মাত্রা (আজ প্রায় ৪০০,০০ মানুষ সংক্রামিত হওয়ার পর এটা অতিকায় হয়ে উঠেছে তো বটেই) সমস্ত কিছুর সীমাকে ছাপিয়ে যায়: ছাপিয়ে যায় চিকিৎসা-ব্যবস্থা ও তার প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাকে, রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমের সীমাকে, বিপদের ঝুঁকি ও মৃত্যু সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির সীমাকে, সামাজিক সচলতা ও আদান-প্রদানের সীমাকে, ছাপিয়ে যায় রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সীমাকেও।

 

এই বিশ্বমহামারির জেরে কাকে সবথেকে বেশি এবং সবার আগে ভুগতে হবে তা অবশ্যই ঠিক করে দেয় শ্রেণিগত, লিঙ্গভিত্তিক ও জাতিগত অসাম্য। কিন্তু ক্ষমতা ও সুবিধার অসম বিলিব্যবস্থা যতদূর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এর বিস্তার তাকে পেরিয়ে যায়; এই বিশ্বমহামারি ক্ষমতার ছদ্মবেশ টান মেরে খুলে দেয়। একে “বাইরে থেকে দেখা” এখন আর কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়, কাজেই এটা আমাদের যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করায় সেটা সর্বোচ্চ মাত্রার। স্ব-বিরোধটা এখানেই যে পুঁজিবাদ তার লুঠতরাজ, শোষণ আর পণ্যায়নের গতির মাধ্যমে তার নিজস্ব বাণিজ্যের পথ, বাজার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেই সংক্রমণের মুখে ফেলে দেয়। তা নিজেই পুঁজির ‘প্রয়োজনীয়’ সম্প্রসারণের গতিকে ব্যাহত করে। কাজেই স্ববিরোধের মাত্রাটাও এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ।

 

শ’খানেক বছর আগেও ‘স্প্যানিশ ফ্লু’-তে প্রায় ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ যে বিশ্ব-ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে সেটা আগের থেকে অনেক বেশি ভঙ্গুর। আজ আমরা ইতিপূর্বের সমস্ত কালের তুলনায় বেশি বিপন্ন। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে একটা দরজা খুলে গেছে এবং সে দরজা আমাদের বলে দিচ্ছে যে কোনও কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। এর মধ্যে দিয়ে এটাও প্রকাশিত হচ্ছে বলে মনে হয় যে আমরা সামগ্রিক বিশ্বব্যবস্থার একটা নতুন ধরনের পরিচালনা ও সংগঠনের দিকে এগোচ্ছি। তাহলে কি এটা বিশ্বায়নের শেষ?


কোভিড১৯: জরুরি অবস্থার জৈবরাজনীতি তার স্ববিরোধ

 

কোভিড-১৯ বিশ্বমহামারি যে সর্বোচ্চ, চূড়ান্ত সীমা বা পরীক্ষার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছে তার জেরে রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সাড়া মিলেছে, প্রত্যেকটারই ফলাফল আলাদা (চিন, কোরিয়া, ইতালি কিংবা স্পেনের কথা ভেবে দেখা যেতে পারে)। সাধারণভাবে যা উঠে আসছে সেটা হল গোটা দুনিয়া জুড়ে রাষ্ট্রগুলো সংক্রমণ ঠেকানোর খাতিরে ক্রমেই আরও বেশি করে মানুষকে আটক রাখার জন্য বিভিন্ন কড়া পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে। আর সেই আটক-ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছে বিশেষজ্ঞ ও বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টাদের সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তার মোদ্দা কথা হল, ভাইরাসটা সারা বিশ্বজুড়ে একটা বড় অংশের মানুষকে সংক্রামিত করবে এবং গোটা জগতের সামাজিক জীবন আগামী বহু মাস ধরে লক্ষণীয়ভাবে ব্যাহত হবে।

 

এর ফলে, স্পষ্টতই একটা অস্বাভাবিক/জরুরি পরিস্থিতির পক্ষে রাষ্ট্রীয় যুক্তি সংহত করে ফেলার রাস্তা পরিষ্কার হয়। যে যুক্তি গণতন্ত্রকে মুলতুবি রাখার অনুমোদন দেয় এবং ব্যতিক্রমী শাসনতন্ত্রকেই স্বাভাবিক ও স্থায়ী করে তোলার ভিত গড়ে দেয়। এটা জৈব-রাজনীতির চূড়ান্ত অভিব্যক্তি, যার পূর্বসুরি বিভিন্ন আপৎকালীন বিধিনিষেধ ও জাতীয় নিরাপত্তার নতুন সব নীতি, সমাজ ও ভৌগোলিক ভূখণ্ডের সামরিকীকরণের বিভিন্ন ধরন। এই সবই কিন্তু সাধারণভাবে সমগ্র জনগণের কাছে চালানো হয়েছে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর নামে, মাদক পাচার, সংগঠিত অপরাধ আর বেআইনি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে, অভিবাসীদের স্রোতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে, আর প্রতিবাদী কর্মসূচিতে গুন্ডামির বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামেও বটে (গত বছর লাতিন আমেরিকাতে প্রতিবাদের সঙ্গে জরুরি অবস্থা জারি করার যোগাযোগের কথা ভেবে দেখুন)। আরেকটা কথাও এখানে যোগ করা দরকার: এই জাতীয় যুক্তি বিশ্বের নানা প্রান্তে চূড়ান্ত দক্ষিণপন্থীদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই দক্ষিণপন্থীরা তাদের জাতিবিদ্বেষী ও জাতীয়তাবাদী অবস্থান থেকে এই পরিস্থিতির জন্য কাঠগড়ায় তুলতে পারে ‘বিদেশি সংক্রমণ’-কে, সহনশীল অভিবাসন নীতিকে, কিংবা দাবি তুলতে পারে যে এই মুহূর্তে দরকার স্বয়ম্ভর অর্থনীতি (বিশ্বায়নকে বিদায় জানানোর পক্ষে আরও একটা যুক্তি কি?)।

 

চিন, তাইওয়ান, জাপান, কোরিয়া এবং তারপর – কিছুটা কম মাত্রায় হলেও – ইতালি ও স্পেনে কড়া হাতে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে, যেমন বাড়ি থেকে বেরোনোর উপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা; প্রতিটি ব্যক্তির বিবরণ (নাম, শরীরের তাপমাত্রা, গতিবিধি ও ভ্রমণের খতিয়ান, অন্য মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ ইত্যাদি) এবং তারপর সেই বিবরণ ‘বিগ ডেটা’র আকারে প্রণালীবদ্ধ হওয়া; খোলাখুলি শারীরিক পরীক্ষা, কোরিয়ার ক্ষেত্রে যার অংশ কোনও ব্যক্তি সংক্রমণের শিকার হয়েছেন কিনা তা বোঝার জন্য তাঁর নাকের ভেতরের অংশ পরীক্ষা; অন্যান্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সেনাকেও ব্যবহার করা হয়েছে, যেমনটা ঘটেছে চিনে।

 

কিন্তু কোভিড-১৯-এর জেরে দেখা দেওয়া বর্তমান চূড়ান্ত পরিস্থিতির ফলেই এর মধ্যে নিহিত প্রথম স্ব-বিরোধটাকে তুলে ধরা দরকার: এই বিশ্বমহামারি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে চিন যে সাফল্য পেয়েছে তা আসলে আরো শক্তিধর এক জৈব-রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়ার রাস্তা খুলে দিয়েছে (“চিনের উদাহরণের দিকে তাকিয়ে দেখি চলুন!”)। মহামারি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়েছে তাতে নিছক জৈব নিরাপত্তার (biological security) দোহাই দিয়ে পুরোপুরি রাষ্ট্রনিয়ন্ন্ত্রিত একটা সমাজকে একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে। কাজেই আমরা এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে পড়তে পারি যা শুধু রাজনৈতিকভাবে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়াই নয়, বরং তাতে সমাজের একটা গরিষ্ঠ অংশের সায় আছে। কিন্তু এই মহামারির প্রেক্ষিতে এই ধরনের জৈব-রাজনৈতিক প্রশাসনের আর কী বিকল্প আমাদের হাতে আছে?

 

সভ্যতার সঙ্কট যদি আমাদের খাদের কিনারায় নিয়ে এসে থাকে, চরম ঘটনাবলী ও স্থায়ী জরুরি অবস্থার (“জলবায়ুগত” জরুরি অবস্থার কথা মনে করুন) এই সময়ে এনে দাঁড় করিয়ে থাকে, তাহলে কি আমরা এমন এক পুঁজিবাদের দিকে এগিয়ে চলেছি যাকে স্থায়ী ভিত্তিতে “বিপর্যয়কালীন পুঁজিবাদ” হিসেবেই চালানো হবে? এমন শাসনতন্ত্রের আওতায় গণতন্ত্রের (বা তার সম্ভাবনার) পক্ষে কাজ করা কীভাবে সম্ভব?

 

দ্বিতীয় একটা স্ব-বিরোধ বা টানাপোড়েনের কথাও বলা দরকার: বাজারের যে সচলতা ও গতিশীলতা প্রয়োজন, সংক্রমণ রুখতে কড়া হাতে মানুষকে আটক রাখার নীতি তার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে যায়। সামাজিক বন্দিদশা প্রয়োজনীয় বটে, কিন্তু একইসঙ্গে তা পুঁজিবাদের পক্ষে অর্থনৈতিক আত্মহত্যার সামিল। সারা দুনিয়ার সরকারগুলো বিশ্বমহামারিজাত বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দোটানায় ভুগছে। এখানে লক্ষ করার মতো বিষয়, দিন কয়েক আগে পর্যন্তও কোভিড-১৯ বিশ্বমহামারির ক্ষেত্রে বরিস জনসনের নেতৃত্বাধীন ব্রিটেন সরকারের নীতি ছিল: এক ধরনের জৈব উদারনীতি, ‘যা হয় হোক, মরলে মরুক’। সরকারের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টাদের প্রধান স্যার প্যাট্রিক ভ্যালেন্স ১৩ মার্চ স্কাই নিউজ নেটওয়ার্ক-এ ঘোষণা করেন যে, মানুষের যাতায়াত ও কাজকর্মের উপর সামাজিক বিধিনিষেধ জারি না-করে বরং ব্রিটেনের ৬০% মানুষকে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণের শিকার হতে দিতে হবে, যাতে সমষ্টিগত প্রতিরোধ ক্ষমতা(হার্ড ইমিউনিটি) আনা যায়। এর অর্থ হল এই লক্ষ্য পূরণ করার জন্য কালক্রমে প্রায় ৪ কোটির মতো মানুষ এর দ্বারা আক্রান্ত হবেন, আর সরকারি হিসেবই বলে দিচ্ছে যে তার মধ্যে অন্তত ১% মানুষের (প্রায় ৪০০,০০০ মানুষ) মৃত্যু হবে।

 

এই হাড়হিম করে দেওয়া নীতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে প্রাণ বাঁচানো আর জিডিপি বৃদ্ধির মধ্যে জনসন সরকারের আদতে দ্বিতীয় বিকল্পটাই পছন্দ – আর  হালে এই সরকারের পক্ষ থেকে এ-ও জানানো হয়েছে যে করোনা ভাইরাসের হাত থেকে অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য তারা যথাসাধ্য করবে। কিন্তু সর্বোপরি এর থেকে উঠে আসে কোটি কোটি মানুষের জীবনকে নিছক যান্ত্রিকভাবে দেখানোর, ‘জনসংখ্যা’ নামক পরিমাণগত বর্গের খাঁচায় পুরে দেখানোর একটা ধরন। এই কড়া নিয়ন্ত্রণের শাসনতন্ত্র এবং জৈব-উদারনীতি দুটোই মানুষের জীবনকে নিছক কার্যসিদ্ধির যন্ত্র হিসেবেই দেখে, যেখানে ‘জীবন’ প্রকাশ করার মাধ্যম নেহাত কেজো কিছু সংখ্যা: ৫০,০০০; ৫০০,০০০ কিংবা ৫,০০০,০০০ মানুষ; ০.৫%; ৫% কিংবা ১৫%। সবটাই নির্ভর করে কে কাজে লাগবে আর কে অকেজো তার উপরে: ‘জনসংখ্যা’ শব্দটাই ধুয়েমুছে সাফ করে দেয় সমস্ত মুখ, ব্যক্তিগত গল্প, বৈচিত্র্য। সবকিছু হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের কেজো হিসেবের বিষয়। এক্ষেত্রে যা  লক্ষ্যণীয়, বাঁচার জন্য মরতে দেওয়ার যে ফুকোবাদী জৈব রাজনীতির সূত্র, সেটা এখন চরম ঘটনাসঙ্কুল এই ঝোড়ো সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর হচ্ছে। এই জৈব উদারনীতি থেকে প্রকাশ পাচ্ছে সামাজিক ডারউনপন্থার যুক্তি – সমাজের একটা অংশকে (নিঃসন্দেহে যারা সবথেকে বয়স্ক আর অসুস্থ) মৃত্যুর মুখে ছেড়ে দেওয়া।

 

এখান থেকেই আমরা তৃতীয় এবং শেষ স্ব-বিরোধের মুখোমুখি এসে উপস্থিত হই: এই চূড়ান্ত সীমায় এসে দাঁড়ানোর সময় কে গৃহবন্দি থাকবে, কে কাজ করবে, কে বেঁচে থাকবে, আর কে-ই বা মরবে, সে ব্যাপারে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত স্পষ্টতই তলা থেকে উঠে আসা জীবনের স্পন্দনের বিরোধী। আমরা যদি একথা বলি যে গৃহবন্দিত্ব অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তাহলে একইসঙ্গে এটাও বলতে হবে যে দীর্ঘ মেয়াদে একে সামাজিকভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। গোটা দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের পক্ষে এটা অসম্ভব। আবার অনেকের কাছে এটা যাবতীয় আকাঙ্ক্ষা, সামাজিকতা, অসন্তোষ আর প্রকল্প থমকে যাওয়ার বার্তাবহ। আর সেটা ঘটছে এমন একটা সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাদের নিজের নিজের দেশের পরিস্থিতির কারণে গড়ে ওঠা বিক্ষোভে জমায়েত হচ্ছেন (মনে করুন চিলি, ইরাক, লেবানন, হংকং, ইকুয়েডর, ক্যাটালুনিয়া-র কথা)। কিন্তু তাছাড়াও, সেই তাদের কী হবে যারা ‘বাড়তি ক্ষয়ক্ষতি’-র খতিয়ানভুক্ত হতে রাজি নয়, রাজি নয় এই ‘জরুরি অবস্থা’-র জৈব রাজনীতির নতুন হতাহতের পরিসংখ্যানের অংশ হয়ে উঠতে (তাঁরা হতে পারেন আমাদেরই দাদু-ঠাকুমা, বিজ্ঞ নারী-পুরুষ, কৌম সমাজের প্রধান ব্যক্তি; কিংবা আমাদের কোনও না-কোনও রোগে আক্রান্ত ভাইবোন বা সহকর্মী)।

 

বর্তমান ব্যবস্থার অবক্ষয়ের অন্যতম লক্ষণ হিসেবে যে সামাজিক অসন্তোষের উদ্ভব ঘটেছে এবং ঘটেই চলেছে, সবকিছু থামিয়ে দিয়ে আর মানুষকে গৃহবন্দি রেখে তাকে মুছে ফেলা যাবে না। এই জরুরি অবস্থার জৈব রাজনীতির মহান প্রশাসকরা সেকথা ভালোই জানেন। সেই কারণেই জনসনের সরকারও তার সমষ্টিগত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির নীতি থেকে পিছু হটেছে; সেই কারণেই নয়া-উদারনীতিবাদী ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইম্যানুয়েল ম্যাক্রঁ এই বিশ্বমহামারির মুখে আগের অবস্থান থেকে সরে এসে তাঁর বক্তৃতায় ঘোষণা করেছেন যে জনস্বাস্থ্য মূল্যবান সম্পদ এবং তাকে বাজারের আইন-কানুনের আওতার বাইরে রাখতে হবে; সেই কারণেই আর পাঁচটা দেশের সরকারও সামাজিক বরাদ্দ কাটছাঁট করার নীতি থেকে পিছু হটেছে।

 

উপরোক্ত তিনটে স্ব-বিরোধ আসলে একটা বৃহত্তর স্ব-বিরোধের অংশবিশেষ: কোনও কিছুরই আর নিশ্চয়তা নেই, পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার নিশ্চয়তা কারুর পক্ষেই আর দেওয়া সম্ভব নয়। পুঁজিবাদের নিজের শরীরেই ভাঙন ধরেছে। ইতিহাসে আর কখনও পুঁজিবাদের মধ্যে এতগুলো ফাটল দেখা যায়নি।

 

আমরা কী করব?

 

সংক্রমণ রুখতে সামাজিক বন্দিদশা, ফাঁকা কিংবা প্রায়-জনশূন্য রাস্তা, বাজারের ডানাছাঁটা দশা, সমাজের দরিদ্রতম মানুষদের বিচিত্র এক মন্থর সামাজিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বন্দি করে ফেলা, এই সবই আমাদের সামনে অন্য এক সময়ের, অন্য ছন্দের, ভিন্ন সামাজিকতার, ভিন্ন উপলব্ধি ও সংবেদনশীলতার দরজা হাট করে খুলে দিচ্ছে। অপরত্বের ভাঁজ খোলার, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যুক্তি ও ছন্দের থেকে আলাদা এইসব যুক্তি ও ছন্দের উন্মোচন ঘটানোর সুযোগ এর আগে কখনও এতটা হাতের কাছে আসেনি। এই ভাঙন আর সুযোগের স্ব-বিরোধ যে সমস্ত চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরছে তার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় মূল বিষয়টা নিহিত আছে জনগণের রাজনীতির মধ্যে, পরিচর্যার রাজনীতির মধ্যে, জীবনের জন্ম দেওয়ার রাজনীতির মধ্যে। রাস্তা আমাদের সামনে খুলে গিয়েছে, তবে সে রাস্তায় সাফল্যের কোনও নিশ্চয়তা না-ও থাকতে পারে।

 

তবে এই বিশেষ পরিসরের বাইরে, অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিসরে কিন্তু পুঁজির সময়ের, বিশ্বমহামারির সময়ের, জরুরি অবস্থার জৈব রাজনীতির সময়ের, জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ের আধিপত্য চলছেই। পরিবার বা কৌমের আশ্রয়কে, কিংবা এই “সামাজিক দূরত্ব”-কে পুনর্মিলনের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে, ক্ষমতার দাবির সঙ্গে, ক্ষমতা দখলের দাবির সঙ্গে কীভাবে মেলানো যেতে পারে? সেই বিশেষ পরিসরে জীবনের যত্ন তো নিতেই হবে, কিন্তু তার পাশাপাশি দাবি জানানোটাও চালিয়ে যেতে হবে। দাবি করতে হবে বর্তমান সম্পদের আমূল পুনর্বণ্টন, যাতে সেই সম্পদকে জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সর্বজনীন সহায়তার কাজে লাগানো যেতে পারে, দাবি তুলতে হবে তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণ বাতিলের, গরিবগুর্বোদের উপর কর বাতিল করে সেই কর সমাজের বিত্তশালী অংশগুলোর থেকে উশুল করার; দাবি করতে হবে যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সামাজিকীকরণ ঘটাতে হবে, প্রকৃতিকে শ্রদ্ধা করতে হবে, পণ্যায়নের জয়যাত্রা থামাতে হবে, এই গ্রহের বুকে অবশিষ্ট জীবনের শেষ সীমানার দিকে পুঁজিবাদের অগ্রগতি থামাতে হবে, ইত্যাদির তালিকা দীর্ঘ।

 

এই দুনিয়া জোড়া আপৎকালীন পরিস্থিতির মধ্যে থেকে অন্য এক ব্যবস্থাকে তুলে আনতেই হবে, সেই ব্যবস্থার মুখ জীবনের দিকে, মানুষের দিকে। এই গঠন/ব্যবস্থাগত ভাঙন যদি আমাদের অকল্পনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, তাহলে ১৯৬৮-র মে মাসের ছাত্র আন্দোলনের সেই বিখ্যাত স্লোগান মেনে বাস্তববাদী হওয়াটা জরুরি, দরকার, অসম্ভবের দাবি তোলা। এ পৃথিবীর থেকে আলাদা আরেকটা পৃথিবী, এক্ষুনি।

 

অনুবাদ: প্রসিত দাস।

 

মুল লেখাটি পড়ার জন্য দেখুন:

http://www.ecopoliticavenezuela.org/2020/03/24/coronavirus-beyond-coronavirus-thresholds-biopolitics-and-emergencies/

 

Emiliano Terán Mantovani: Sociologist from the Central University of Venezuela. Member of the Observatory of Political Ecology of Venezuela.

 

Share this
Leave a Comment