সহসা শুনি ভূতের কড়া নাড়া


  • March 27, 2020
  • (0 Comments)
  • 745 Views

বিগ ফার্মার মুনাফার তুলনায় গরিব মানুষের বেঁচে থাকাকে সব সময়েই অনেক বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। লিখেছেন মাইক ডেভিস।

 

কোভিড-১৯ নামক ভূতটি অবশেষে দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। গবেষকরা দিবারাত্র এই মহামারীর চরিত্র নির্ধারণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বটে, কিন্তু তাঁদের সামনে বাধা-বিপত্তি অনেক।

 

প্রথমত টেস্ট কিটের ঘাটতি কিংবা সম্পূর্ণ দুষ্প্রাপ্যতা এই মহামারীতে বেঁধে রাখার যাবতীয় আশায় স্রেফ জল ঢেলে দিয়েছে। উপরন্তু তার ফলে প্রজননের হার, সংক্রামিত জনসংখ্যার বহর, মৃদু সংক্রমণের সংখ্যা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠিগুলোর সঠিক হিসেব কষা সম্ভব হচ্ছে না। মোট ফল সংখ্যার বিশৃঙ্খলা।

 

তবে কোনও কোনও দেশের বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে অবশ্য এই ভাইরাসের প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরশীল তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এবং সেই তথ্য রীতিমতো ভয়ের। যেমন ইতালি ও ব্রিটেন থেকে ৬৫-র বেশি বয়সী মানুষজনের মধ্যে মৃত্যুর হার অনেক বেশি বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। ট্রাম্প যে ‘করোনা ফ্লু’-কে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন তা বার্ধক্যগ্রস্ত মানুষদের সামনে অভূতপূর্ব বিপদ হিসেবে দেখা গিয়েছে এবং সেখানে সম্ভাব্য মৃতের সংখ্যা কোটিতে গোনা হবে।

 

দ্বিতীয়ত, মরশুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার মতোই এই ভাইরাসও বিভিন্ন বয়সী ও বিভিন্ন মাত্রার রোগপ্রতিরোধক্ষমতা-বিশিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ছুঁয়ে যাওয়ার সময় নিজের জিনের গঠন পরিবর্তন করে। মার্কিনরা খুব সম্ভবত যে প্রকারভেদটির স্বাদ পেতে চলেছেন তা ইতিমধ্যেই ইউহানের আদি মহামারীর থেকে কিঞ্চিৎ আলাদা। আরও পরিবর্তনের ফলাফল হয়তো নগণ্য হতে পারে, কিংবা এমনও হতে পারে যে তা তীব্রতা ও ক্ষতির বর্তমান বিন্যাসকে একেবারে পালটে দিল। বর্তমানে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তীব্রতা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে, নেহাত শিশু এবং ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তেমন মারাত্মক সংক্রমণের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে, আবার অশীতিপরদের ক্ষেত্রে ভাইরাল নিউমোনিয়া প্রাণঘাতীও হতে পারে।

 

তৃতীয়ত, এই ভাইরাস যদি স্থিতিশীল অবস্থাতেও থাকে এবং নিজের গঠনে তেমন কোনও পরিবর্তন না-ও ঘটায়, সেক্ষেত্রেও অনুর্ধ্ব-৬৫ বয়সের জনগোষ্ঠীগুলোর উপর এর প্রভাব অপেক্ষাকৃত গরিব দেশগুলোতে এবং গরিব জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সম্পূর্ণ অন্যরকম হতে পারে। এ বিষয়ে মনে করা যেতে পারে ১৯১৮-১৯ সালের স্প্যানিশ ফ্লু-র বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতার কথা। হিসেব করে দেখা গেছে যে এই ফ্লু-তে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১ থেকে ২শতাংশের মৃত্যু হয়েছিল। করোনা ভাইরাসের সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটা এই স্প্যানিশ ফ্লু-র সবথেকে মারাত্মক প্রভাব পড়েছিল কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীদের মধ্যে। এর চলতি ব্যাখ্যা হল, এই বয়সীদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা অপেক্ষকৃত জোরালো হওয়ার ফলে তা এই সংক্রমণের প্রতি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল এবং তার ফলে ফুসফুসের কোষগুলোতে ‘সিটোকাইন ঝটিকা’-র আক্রমণ ছড়িয়ে গিয়েছিল। আদি এইচ-ওয়ানএন-ওয়ান ভাইরাস উপযুক্ত আস্তানার সন্ধান পেয়েছিল সেনা শিবিরে আর যুদ্ধক্ষেত্রের ট্রেঞ্চে এবং হাজার হাজার তরুণ সৈনিকের নিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছিল। ১৯১৮ সালের জার্মানির বসন্তকালীন আক্রমণের ভরাডুবি এবং বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ফলাফলের ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়েছে যে, মিত্রশক্তি তার অসুস্থ সৈন্যবাহিনীর শূন্যস্থান ভরাট করতে পেরেছিল নবাগত মার্কিন সৈনিকদের সাহায্যে, তার শত্রুপক্ষের ভাগ্যে তেমন কোনও সুযোগ জোটেনি।

 

তবে যে ব্যাপারটা কদাচিৎ উপলব্ধি করা হয় সেটা হল, বিশ্বজোড়া মোট মৃত্যুর হারের ৬০ শতাংশরই অকুস্থল ছিল পশ্চিম ভারত। এই অঞ্চলে সেই সময় ব্রিটেনে শস্য রপ্তানি ও জোর করে সেনায় ভরতি করানোর বর্বর রেওয়াজের ফলে প্রবল খরা দেখা দিয়েছিল। এরই ফলাফলজাত খাদ্যের ঘাটতি লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনাহারের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁরা অপুষ্টি (যা তাঁদের সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষমতাকে দুরমুশ করে দিয়েছিল) এবং অবাধ ব্যাকটিরিয়া ও ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ার এক দুষ্টচক্রের শিকার হয়েছিলেন। আবার ব্রিটেন-অধিকৃত ইরানের ক্ষেত্রে বেশ কয়েক বছরব্যাপী খরা, কলেরা, খাদ্যের ঘাটতি এবং তারপর ম্যালেরিয়ার ব্যাপক আক্রমণ মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।

 

এই ইতিহাস – বিশেষ করে অপুষ্টির সঙ্গে সমসাময়িক সংক্রমণের পারস্পরিক ক্রিয়ার অজানা ফলাফলের বিষয়টা – আমাদের কাছে একটা বিশেষ সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে – আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বস্তিগুলোতে কোভিড-১৯-এর যাত্রাপথ অনেক বেশি ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক হতে পারে। সাংবাদিককুল ও পশ্চিমি দুনিয়ার সরকারগুলো দুনিয়ার গরিব মানুষদের এই বিপদের বিষয়টা প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেছে। এ বিষয়ে আমার দেখা একমাত্র প্রকাশিত লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে যে, যেহেতু পশ্চিম আফ্রিকার শহুরে জনগণের গড় বয়স বিশ্বের মধ্যে সবথেকে কম তাই এই বিশ্ব-মহামারীর তেমন কোনও প্রভাব সেখানে পড়বে না। ১৯১৮ সালের অভিজ্ঞতার নিরিখে এটাকে নির্বোধের ভবিষ্যৎবাণী বলেই মনে হয়। লাগোস, নাইরোবি, করাচি কি কলকাতায় আগামী সপ্তাহগুলোতে কী ঘটতে চলেছে সে কথা কেউ জানে না। একমাত্র এটুকুই নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বড়লোক দেশগুলো এবং ধনী শ্রেণিগুলো আন্তর্জাতিক সংহতি ও ডাক্তারি সহায়তাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠবে।

 

আজ থেকে বছর খানেক বাদে হয়তো আমাদের ঘুরে তাকিয়ে এই বিশ্ব-মহামারীকে আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে চিনের সাফল্যে মুগ্ধতা জানাতে হবে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতায় আতঙ্কও প্রকাশ করতে হবে। (আমি এখানে বীরের মতোই ঝুঁকি নিয়ে ধরে নিচ্ছি যে সংক্রমণ কমে আসা সম্পর্কে চিনের ঘোষণা মোটামুটি সঠিক।) প্যান্ডোরার বাক্সটিকে বন্ধ করে রাখার ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর এহেন ব্যর্থতা অবশ্যই একেবারেই বিস্ময়কর নয়। সেই ২০০০ সাল থেকেই বুনিয়াদি স্বাস্থ্য-পরিষেবা ক্ষেত্রে এ জাতীয় ধসে-পড়া-অবস্থা বারবার দেখা যাচ্ছে।

 

যেমন ২০১৮ সালের ফ্লু-এর মরশুমে গোটা দেশের হাসপাতালগুলোয় রোগীর ভিড় উপচে পড়েছিল এবং তার ফলে মুনাফার খাতিরে রোগী ভরতির ক্ষমতা কুড়ি বছর ধরে কাটছাঁট করার (শিল্পক্ষেত্রের ভাষায় সঠিক সময়ে রোগীর তালিকা প্রস্তুত করা) পরেও হাসপাতালে বেডের ঘাটতির বিষয়টা সামনে এসেছিল। বাজারের যুক্তিতেই ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ও দাতব্য হাসপাতাগুলোর ঝাঁপ বন্ধ হওয়া এবং নার্সিং কর্মীদের ঘাটতির ফলস্বরূপ দরিদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এবং গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য-পরিষেবার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। তার ফলে রোগীর বোঝার পুরোটাই গিয়ে পড়ছে কম অর্থসাহায্যপ্রাপ্ত হাসপাতাল এবং বয়স্কদের জন্য নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য-পরিষেবাগুলোর ঘাড়ে। এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আপৎকালীন বিভাগ মরশুমি সংক্রমণের ধাক্কা সামলাতেই ব্যর্থ হয়েছে, কাজেই সঙ্কটাপন্ন রোগীদের যে বাড়তি বোঝা আসতে চলেছে তাকে তারা কী করে সামাল দেবে?

 

চিকিৎসা ক্ষেত্রে আমরা এক ক্যাটরিনা ঘূর্ণির গোড়ার পর্যায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এভিয়ান ফ্লু ও অন্যান্য বিশ্ব-মহামারী সম্পর্কে বহু বছরের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও সঙ্কটাপন্ন রোগীদের যে ঢল নামতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে তাকে সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত রেস্পিরেটর বা বায়ুশোধক মুখোশ ও আর আর পাঁচটা আপৎকালীন যন্ত্রপাতি মজুত নেই। আমরা সকলেই যাতে এন-৯৫ মাস্কের মতো অত্যাবশক সুরক্ষার জিনিসপত্রের অপ্রতুলতার বিপদটা টের পাই সে জন্য ক্যালিফোর্নিয়া ও অন্যান্য মার্কিন রাজ্যগুলোয় নার্সদের বিভিন্ন জঙ্গি ইউনিয়ন যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলেছে। কম মজুরিতে বেশি-খাটা হাজার হাজার গৃহ-পরিচর্যা কর্মী ও নার্সিং হোম কর্মীদের অবস্থাটা আরও বিপন্ন, কারণ তাঁরা যাবতীয় আলোচনা থেকে প্রায় অদৃশ্য।

 

নার্সিং হোম ও তার সহায়ক স্বাস্থ্য-পরিষেবা শিল্প প্রায় ২৫ লক্ষ বয়স্ক আমেরিকানের আশ্রয়স্থল – তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই মেডিকেয়ার পরিষেবার উপর আছেন। এই শিল্পক্ষেত্রের হাল দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় স্তরের কেলেঙ্কারির বিষয়বস্তু। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতে, প্রাথমিক স্তরের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গাফিলতির ফলে প্রতি বছর এই নার্সিং হোমগুলোতে ৩৮০,০০০ রোগীর মৃত্যু হয়; সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বহু নার্সিং হোমই মনে করে, বাড়তি কর্মী নিয়োগ করে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার বদলে স্বাস্থ্যবিধি লংঘনের জন্য কিছু জরিমানা দিয়ে দিলে অনেক কম খরচে ল্যাটা চুকে যায়। বর্তমানে সিয়াট্‌লের উদাহরণ থেকেই পরিষ্কার যে সম্ভবত শয়ে শয়ে নার্সিং হোম করোনা ভাইরাসের ঘাঁটি হয়ে উঠতে চলেছে এবং তাদের ন্যূনতম মজুরিপ্রাপ্ত কর্মীরা যুক্তিসঙ্গতভাবেই বাড়িতে থেকে নিজেদের পরিবারকে বাঁচানোর বিকল্পটাই বেছে নেবেন। এরকম অবস্থায় গোটা ব্যবস্থাটা সম্পূর্ণ ধসে পড়তে পারে। আর তেমনটা ঘটলে ভুলেও আশা করবেন না যে ন্যাশনাল গার্ড রোগীদের বেডপ্যান পরিষ্কার করার দায়িত্ব নেবে।

 

এই মহামারী নিমেষের মধ্যে স্বাস্থ্য-পরিষেবা ক্ষেত্রে আঁকাড়া শ্রেণি-বিভাজনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে : ভালো দামের স্বাস্থ্যবিমা পরিকল্পনা যাঁদের আছে এবং যাঁরা বাড়িতে বসে কাজ করতে বা পড়াতে সক্ষম তাঁরা যদি বুদ্ধিমানের মতো কিছু নিরাপত্তার শর্ত মেনে চলেন তাহলে তাঁরা বেশ সুখেই জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় দিন কাটাতে পারবেন। ভদ্রস্থ বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও অন্যান্য ইউনিয়নবদ্ধ কর্মীদের আয় ও জীবনের নিরাপত্তার মধ্যে কোনও একটাকে বেছে নেওয়ার কঠিন কাজটা করতে হবে। আর এসবের মধ্যে লক্ষ লক্ষ ন্যূনতম মজুরিপ্রাপ্ত পরিষেবা ক্ষেত্রের কর্মী, কৃষিখামার কর্মী, বিমাহীন অস্থায়ী কর্মী, বেকার আর গৃহহীনদের স্রেফ মৃত্যুর মুখে ছেড়ে দেওয়া হবে। ওয়াশিংটন যদি শেষমেশ সংক্রমণ পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠে পর্যাপ্ত পরিমাণ কিটের জোগান দিতেও পারে তাহলেও বিমাহীন মানুষদের পরীক্ষা করানোর জন্য ডাক্তার বা হাসপাতালের পেছনে গাঁটের কড়ি গুনতেই হবে। যে সময়ে লক্ষ লক্ষ কর্মীরা তাঁদের চাকরি এবং নিয়োগকর্তার দেওয়া বিমাটি হারাচ্ছেন সেই সময়েই স্বাস্থ্যখাতে পরিবারের মোট বিলের অঙ্কও ফুলেফেঁপে উঠবে। সকলের জন্য চিকিৎসা পরিষেবার পক্ষে এর থেকে জোরালো এবং জরুরি আর কোনও যুক্তি থাকতে পারে কি?

 

কিন্তু সার্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা এর প্রথম ধাপ মাত্র। বিগ ফার্মা যে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিভাইরাল সংক্রান্ত গবেষণার পথ সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছে সেই বিষয়টা প্রাথমিক বিতর্কে স্যান্ডার্স বা ওয়ারেন কারুর বক্তব্যেই উঠে আসেনি; ব্যাপারটা হতাশাজনক বললেও কম বলা হয়। ১৮টা বৃহত্তম ওষুধ কোম্পানির মধ্যে ১৫টাই গবেষণার পথ থেকে সম্পূর্ণ সরে এসেছে। মুনাফার উৎস হৃদরোগের ওষুধ, আসক্তিদায়ক স্নায়ুর ওষুধ, আর পুরুষদের যৌন-অক্ষমতা কাটানোর চিকিৎসা; হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা, বিভিন্ন নতুন রোগ আর বিভিন্ন চিরাচরিত প্রাণঘাতী ক্রান্তীয় রোগের চিকিৎসায় সে জাতীয় মুনাফা হয় না। ইনফ্লুয়েঞ্জার সার্বজনীন টীকা – অর্থাৎ এমন টীকা যা এই ভাইরাসের উপরিতলের প্রোটিনের অপরিবর্তনীয় অংশগুলোকে আঘাত করবে – ব্যাপারটা বহু দশক ধরেই সম্ভাবনা হিসেবে রয়ে গিয়েছে, কিন্তু কখনওই মুনাফার হিসেবে অগ্রাধিকার পায়নি।

 

অ্যান্টিবায়োটিক বিপ্লবের চাকা পেছনের দিকে ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে নতুন সব সংক্রমণের পাশাপাশি পুরনো রোগগুলোও আবার ফিরে আসবে এবং হাসপাতালগুলো মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে। ওষুধের অবিশ্বাস্য খরচের বিরুদ্ধে ট্রাম্পও সুযোগ বুঝে কথা বলতেই পারেন, কিন্তু আমাদের প্রয়োজন একটা স্পষ্টতর ও সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি – যা ওষুধ ব্যবসার ক্ষেত্রে একচেটিয়া পুঁজির আধিপত্য ভেঙে দেওয়ার কথা বলবে এবং জীবনদায়ী ওষুধের সরকারি উৎপাদনের উপর জোর দেবে। (সেটাই এককালে ঘটত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্লু-এর সর্বপ্রথম টীকা আবিষ্কারের জন্য সেনা জোনাস সাল্ক এবং অন্যান্য গবেষকদের নিয়োগ করে।) বছর পনেরো আগে আমি আমার বই দ্য মনস্টার অ্যাট আওয়ার ডোর – দ্য গ্লোবাল থ্রেট অফ অ্যাভিয়ান ফ্লু-তে লিখেছিলাম:

 

বিনামূল্যে সর্বত্র টীকা,অ্যান্টিবায়োটিক,অ্যান্টিভাইরাল সহ সব ধরনের জীবনদায়ী ওষুধ পাওয়ার সুযোগকে মানবাধিকার হিসেবে গণ্য করা উচিত। বাজার যদি এই ধরনের ওষুধ সস্তায় উৎপাদন করার উৎসাহ জোগাতে না পারে, সেক্ষেত্রে সরকার ও অলাভজনক সংস্থাগুলোর এই সমস্ত ওষুধ উৎপাদন ও বন্টনের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। বিগ ফার্মার মুনাফার তুলনায় গরিব মানুষের বেঁচে থাকাকে সব সময়েই অনেক বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে।

 

হালের এই বিশ্বমহামারী এই যুক্তির বিস্তারকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে : সত্যিকারের আন্তর্জাতিক গণস্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো বলে কিছু না-থাকায় পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন জৈবিক দিক থেকেই টিকে থাকার অযোগ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু গণ-আন্দোলন যতদিন না বিগ ফার্মা ও মুনাফার জন্য পরিচালিত স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষমতাকে ধসিয়ে দিতে পারছে ততদিন সেই পরিকাঠামোর টিকির দেখাও মিলবে না।

 

আজকের পৃথিবীতে জনস্বাস্থ্য সাধারণভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবার ওপর নিওলিবরল পুঁজির আক্রমণ নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন, মাইক ডেভিস তাঁদের পুরোধা১২ মার্চ, ২০২০, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ সোশালিস্ট রিভিউ-এ এই লেখাটি প্রকাশিত হয়।

http://links.org.au/mike-davis-covid-19-monster-finally-at-the-door

 

অনুবাদঃ প্রসিত দাস  

 

Share this
Leave a Comment