মহামারীর দিন-রাত – বিপর্যস্ত সময়েই রুখতে হবে নৈরাজ্য


  • March 24, 2020
  • (0 Comments)
  • 237 Views

কোভিড-১৯ সিরিজ

 

সেন্ট্রাল জেলে বন্দী অসন্তোষ ও তা নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে বন্দীহত্যার একটি আলাদা দিক রয়েছে। এবং এ বিষয়ে সঠিক তথ্য এখনও সংশোধনাগার বা জেল কর্তৃপক্ষের থেকে বাইরে আসেনি। সংবাদমাধ্যমে যেটুকু জানা যাচ্ছে, তার বাইরেও রয়ে যাচ্ছে বহু অপ্রকাশিত তথ্য যা হয়তো কখনওই সরকারিভাবে প্রকাশ্যে আসবে না। পুলিসের গুলিতে এই হত্যার দায় এরকম মহামারীগ্রস্ত সময়ে কি আদৌ নেবে রাষ্ট্র? সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন।

 

 

আতঙ্কের দিন-রাতে আপাতত বেঁচে আছি আমরা সবাই। বিজ্ঞান আর চিকিৎসায় ভরসা রাখাই এই মুহূর্তে একমাত্র উপায়। কোনও থালা-বাটি বাজানো কিংবা অবৈজ্ঞানিক হোয়াট’সঅ্যাপ মেসেজ চালাচালিতেই এহেন বিপদ কাটে না। মানুষের শুভবুদ্ধি এবং শুধু ও শুধুমাত্র বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতেই কোভেড ১৯-এর মতো সংক্রামক রোগের মোকাবিলা করে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে এই পৃথিবীর মানুষ নামের প্রাণীরা। যারা এই বিপর্যয়ের আগে সম্ভবত ভুলতে বসেছিল তারা মোটেই অপরাজেয় নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ স্থান-কাল-পাত্র বিশেষ বহু মানুষকে মারাত্মক বিপদের দিকে ঠেলে দিলেও তা কোনওভাবে কাটিয়ে ওঠা গেছে। কিন্তু এই বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ে আজ সত্যিই তারা কার্যত দিশাহীন। শান্ত মস্তিষ্কে মহামারী-আতঙ্কের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া আর কিচ্ছু করার নেই।

 

তবু এরই মাঝে ভুলে গেলে চলবে না এইরকম মহামারী, আতঙ্ক, জীবন-মৃত্যুর দোটানার সামনে দাঁড়িয়েই নৈরাজ্যবাদ প্রবল হয়ে ওঠে। মৃত্যুভয় যত বাড়তে থাকে ততই যেন নৈরাজ্যের প্রতিনিধিরা লাগামছাড়া হয়ে ওঠে। ইতিহাস সাক্ষী। যখন বেঁচে থাকার সামনে, সুস্থ থাকার সামনে, সুরক্ষিত থাকার সামনে প্রশ্নচিহ্ন পড়ে যায়, তখন যে স্থিতিশীল পরিকাঠামো, আইন-কানুন, প্রশাসন ইত্যাদিতে যে রাশ থাকার কথা, তা অনেক সময়েই আলগা হয়ে যায়, শুধু তাই নয়, বেলাগাম হয়ে যায় পরিস্থিতি। মহামারী, অসুস্থতা সব ছাপিয়েও তখন কেমন করে যেন প্রবল হয়ে ওঠে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেওয়া, এক ধরনের তুমুল অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি করে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়ার ইচ্ছা, যা সামালানো মুশকিল হয়ে যায়।

 

কেন এই প্রসঙ্গ উত্থাপন? কারণ পশ্চিমবঙ্গে কলকাতায় কোভিড ১৯-এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার খবরের পাশাপাশি গত দু’দিনে আর যে খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, তা হল – দমদম সেন্ট্রাল জেলে বন্দী অসন্তোষের জেরে পুলিসের গুলি চালনায় বন্দীমৃত্যু ও বন্দীদের আহত হওয়া। মাত্র কিছুদিন আগেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর সংশোধনাগারেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, কিন্তু সে সময়ে করোনা-র প্রকোপ ছিল না আর তা খবরে উঠে আসার পরেই দ্রুত চাপাও পড়ে যায়। কিন্তু এবারে শুধু দমদম সেন্ট্রাল জেলে ব্যপক বন্দী অসন্তোষই নয়, তা প্রেসিডেন্সী সংশোধনাগারেও এর আঁচ ছড়িয়ে পড়া ঘটনাকে অন্য মোড় দেয়। বিশেষত এভাবে বন্দীমৃত্যুতেও অবাক হওয়া ছাড়া আর কি-ই বা করার থাকতে পারে!

 

পুলিসি হেফাজতে বন্দীমৃত্যু নতুন ঘটনা নয়। সাধারণ মানুষ থেকে মানবাধিকার কর্মী তথা সংগঠন যখনই যেখানে এধরনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছেন তার বিরূদ্ধে প্রতিবাদে ও নিন্দায় সরব হয়েছেন। আমাদের রাজ্য, আমাদের শহরও এমন মৃত্যুর সাক্ষী থেকেছে বারেবারে, মাত্র কিছুদিন আগেও এরকম ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এবারে সেন্ট্রাল জেলে বন্দী অসন্তোষ ও তা নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে বন্দীহত্যার একটি আলাদা দিক রয়েছে। এবং এ বিষয়ে সঠিক তথ্য এখনও সংশোধনাগার বা জেল কর্তৃপক্ষের থেকে বাইরে আসেনি। সংবাদমাধ্যমে যেটুকু জানা যাচ্ছে, তার বাইরেও রয়ে যাচ্ছে বহু অপ্রকাশিত তথ্য যা হয়তো কখনওই সরকারিভাবে প্রকাশ্যে আসবে না। পুলিসের গুলিতে এই হত্যার দায় এরকম মহামারীগ্রস্ত সময়ে কি আদৌ নেবে রাষ্ট্র?

 

যে তথ্যটুকু বাইরে এসেছে তা হল করোনা-র মোকাবিলায় কয়েক জন বাছাই করা সাজাপ্রাপ্ত বন্দীকে জেল কর্তৃপক্ষ জামিনে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিচারাধীন বন্দীরা। তারা প্যারোল-এ মুক্তির দাবী জানাতে থাকেন যা একসময়ে রক্তক্ষয়ী অশান্তিতে পরিণত হয়। ছিল আরও একটি বিষয় – জেল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল যাতে করোনা-র সংক্রমণ ছড়াতে না পারে, তারজন্য বন্দীদের সঙ্গে তাদের পরিবারের মানুষদের দেখাসাক্ষাৎ ৩১শে মার্চ পর্যন্ত বন্ধ রাখা হবে। এই ঘোষণার জন্যও বন্দীদের মধ্যে সাঙ্ঘতিক ক্ষোভ দেখা দেয় যা এরকম হিংসাত্মক ঘটনার বহিঃপ্রকাশের আরও একটি কারণ ছিল। যদিও এর যুক্তিপূর্ণ সমাধান কি হতে পারত সে বিষয়ে কোনও দিশা কোনও তরফেই পাওয়া যায়নি। যেসব ছবি বাইরে এসেছে তাতেও দেখা যাচ্ছে পুলিস ও বন্দী যুযুধান দুই পক্ষ। সংশোধনাগারের ভেতরে বন্দীরা কার্যত প্রচন্ড ভাঙচুর চালানো, আগুন জ্বালানো, দরজা ভেঙে ফেলা, এমনকি গ্যাস সিলিন্ডার জ্বালানোর চেষ্টাও করেন। দৃশ্যতই অবস্থা রীতিমতো হাতের বাইরে চলে যাচ্ছিল। এমন ছবিও বাইরে এসেছে যে বন্দীরা সংশোধনাগারের দেওয়াল টপকে পালানোর চেষ্টা কর‍ছেন। ঘটনার আকস্মিকতা ও গুরুত্বের বিচারে জেল কর্তৃপক্ষ নিজেদের কাজকে যথাযথ প্রমাণের চেষ্টা চালাতেই পারেন। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে তারা কি এভাবে মানুষ মারতে পারে?

 

অন্যদিকে আরেকটি দিকেও নজর দেওয়া দরকার এই পরিস্থিতিতে, যা আদপেই আর স্বাভাবিক নেই এবং আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে তাকে চিকিৎসা ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে স্বাভাবিক করার। এরকম পরিস্থিতিতে আচমকা কেনই বা বন্দীদের মধ্যে এরকম চরম অসন্তোষ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল তা ভেবে দেখা প্রয়োজন বৈ কি। পাশাপাশি এ কথাও সত্যি যে সংশোধনাগারের ভেতরেই বিচারাধীন বন্দীরা কারারক্ষীদের উপস্থিতিতেই এরকম লাগামহীন দৌরাত্ম্য চালিয়ে যেতে পারলেন কীভাবে, তাদের কাছে এতটা একজোট হয়ে তান্ডব চালানো সম্ভব হল কীভাবে সে বিষয়েও তদন্ত করা প্রয়োজন। কোথাও যদি জেল কর্তৃপক্ষের রাশ আলগা না থাকে, তাহলে মাত্র একদিন বা কয়েক দিনের অসন্তোষ কি এরকম চরম অশান্তি তৈরি করতে পারে? মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, আরও বড় কোনও ইস্যু থেকে চোখ ঘুরিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস ঘিরে যে আতঙ্ক-উত্তেজনা দানা বেঁধে রয়েছে, তাকেই আরও উসকে দিয়ে বিষয়টিকে শুধুই এই মহামারীর সময়ে বন্দীদের প্যারোল-এ মুক্তির দাবিকেই সামনে নিয়ে আসা হল। জেল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে মৃত ও আহতের সংখ্যা যা বলা হচ্ছে, আশঙ্কা সেই সংখ্যাটি অনেক বেশি। তাছাড়া বন্দীদের কাছ থেকে না কি এমন সামগ্রীও বাজেয়াপ্ত হয়েছে যা কীভাবে তাদের কাছে পৌঁছল তা বড় প্রশ্ন।

 

এমন বিপর্যয়ের সময়েই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের মধ্যে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা বাদ দিয়ে মানবাধিকারের প্রশ্নের পরিসরটি ক্রমশ ছোট হয়ে আসে। এই ঘটনার পর থেকে মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষ বাদে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ধরনের মন্তব্য ভেসে বেড়াচ্ছে তাতে স্পষ্ট যে আইন বা বিচারের পরোয়া না করে বন্দীদের উপর পুলিসের গুলিচালনাকে এক বড় অংশের মানুষ সমর্থন করেছেন। এ কেমন মানবিকতা! সুযোগ পেলে এরা নিজেরাও যে আইন হাতে তুলে নেবেন না বা এ ধরনের ‘লিঞ্চিং’ সমর্থন করবেন না তাতে বোধহয় আর কোনও সন্দেহ রইল না। এই বিষয়টি তারা সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাচ্ছেন – আইনের রক্ষকদের সহায়তা না থাকলে এক বড় সংখ্যক জেলবন্দীর পক্ষে এরকম বেপরোয়া হয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না। মহামারীর আতঙ্ক হয়তো বা ধিকিধিকি জ্বলা কোনও আগুনে ঘৃতাহুতির কাজটুকু করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলিরও আরও দায়িত্ব সহকারে বিচারাধীন ও সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের নিরাপত্তা দিতে সংশোধনাগারে রোগ প্রতিরোধের সঠিক উপায় মেনে কীভাবে চলা যায়, সে বিষয়ে জনমত তৈরি করা দরকার ছিল। বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে আচমকা কোনও দাবি তুললে তার পরবর্তী ঘটনাক্রমের বিষয়েও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বিশেষত বিষয়টি যদি স্পর্শকাতর হয়।

 

মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমে এক, দু’দিন শিরোনাম তৈরি করবে এই ঘটনা। তারপরেই তার জায়গা হবে ভেতরের পাতায়। মহামারীর সময়ে মানুষ ধীরে ধীরে ভুলে যাবে আইনের হাতে মানবাধিকারের বিপর্যস্ত হওয়ার ঘটনা। আরও একবার। এর বিচারবিভাগীয় তদন্ত হবে কি না তাও জানা নেই। কারণ আমরা এখন চরম অনিশ্চিত সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে কেবলই বিপদ কেটে যাওয়ার অপেক্ষা করছি। তাই এই প্রশ্ন আমাদের ভাবাচ্ছে না, পুলিস পা লক্ষ্য করে গুলি চালালো না কেন? ঠিক কেন গুলি চালাতেই বাধ্য হল? আত্মরক্ষার জন্য বন্দীহত্যা কি সত্যিই একমাত্র পথ ছিল সেদিন পুলিসের কাছে? কি এমন আঁতাত ছিল যাতে আঘাত লাগায় দু’পক্ষই মরিয়া হয়ে উঠল? আহত ও নিহতের সঠিক সংখ্যা কত? বন্দী মানুষগুলির পরিবার এই মুহূর্তে আপনার-আমার মতোই দারুণ আশঙ্কা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। রোগ-মহামারীর সঙ্গেই জুড়ে গেল বন্দী মানুষটির নিরাপত্তার প্রশ্নও।

 

স্বাভাবিক, এরকম অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তা, বিপর্যয়, মহামারীর সময়ে মানুষ নিজের বহু কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। আইনের কাজ তো সেই নিয়ন্ত্রণ জারি রাখা, বিশেষত তা যদি তার আওতার মধ্যে হয়। সংশোধনাগারে পুলিসের গুলিতে বন্দীমৃত্যু তাই মনে রাখতে হবে। কারণ এই বিপর্যয়কালীন সময়েও আমরা এরকম ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। এক অদ্ভূত নৈরাজ্য দরজায় কড়া নাড়ছে। শুভবুদ্ধি দিয়ে তা আটকাতে হবে আর পরিস্থিতি যতই ধূসরতর হয়ে উঠুক না কেন – প্রশ্ন করা থামালে চলবে না।

 

পুনশ্চ: শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ পর্যায়ের প্যানেল তৈরির জন্য যারা সাত বছরের বেশি সময় সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের প্যারোল-এ মুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, বিচারাধীন বন্দীদের কিছু ক্ষেত্রেও এই মুক্তি বিবেচনাযোগ্য হতে পারে। এই সবটাই সংশোধনাগারগুলিতে বন্দীদের অতিরিক্ত ভিড় এড়ানোর জন্য সিদ্ধান্ত। এই বেঞ্চকে এমন নির্দেশও দেওয়া হয়েছে যে, রোগ সংক্রমণ রুখতে বিচারাধীন বন্দীদের আদালতে হাজিরা দিতে হবে না ও সবক্ষেত্রেই ভিডিও কনফারেন্সিং-এর মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া চলবে। এক সংশোধনাগার থেকে অন্য সংশোধনাগারে বন্দী স্থানান্তর বন্ধেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ব্যতিক্রম – ভিড় এড়ানো, সামাজিক দূরত্ব তৈরি ও চিকিৎসায় সহায়তা। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, চিকিৎসা, প্রয়োজনে সঙ্গ-নিরোধ এরকম যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাতে সংশোধনাগারে বন্দী মানুষদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয় সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশিকায় তাও উল্লেখ করেছে। এখন দেখার প্রশাসন ও জেল কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকরীভাবে এগুলি প্রয়োগ করতে পারে।

 

প্রতিবেদক ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং স্বতন্ত্র সাংবাদিক 

 

Share this
Leave a Comment