করোনা ভাইরাস, ভারত জাতিরাষ্ট্র ও ‘বৈশ্বিক’ সঙ্কট


  • March 22, 2020
  • (0 Comments)
  • 1100 Views

কোভিড-১৯ সিরিজ

 

আইএমসিআর-এর রিপোর্ট অনুযায়ী সকালবেলার ৩৪১ জন করোনা আক্রান্তের হিসেবটা সন্ধ্যে ৬টা নাগাদ ৩৯৬-এ পৌঁছেছে। ভারতের ১৩৩ কোটির বিপুল জনসমুদ্রের মধ্যে কতজন ভাইরাসবাহক বা হোস্ট, কতজন প্রতিমুহূর্তে সংক্রমিত হচ্ছেন, জানা নেই। রোগ প্রতিরোধে যে সব সাধারণ ব্যবস্থা নেবার কথা বলা হচ্ছে, তা মেনে চলতে পারবেন কজন মানুষ? যে দেশের গরীব মানুষদের গরিষ্ঠাংশ দৈনন্দিন ব্যবহারের জল পান না, উপযুক্ত বাসস্থান নেই, পুষ্টি এবং চিকিৎসার ন্যূনতম সুযোগ থেকে যাঁরা বঞ্চিত, তাঁরা সবাই দিনরাত সাবান/স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোবেন এবং ভিটামিন খেয়ে ইমিউনিটি বাড়িয়ে ফেলবেন? করোনার পিছনে আসল হাত এই সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থার পিছনে যারা দায়ী, তাদের। লিখেছেন সৌমিত্র ঘোষ

 

১. সংখ্যামাদারি

ভারত সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অধীনস্থ সংস্থা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ(আই সি এম আর)-এর দেওয়া খবর অনুযায়ী, ২২শে মার্চ ২০২০, বেলা দশটা অবধি দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩৪১। বিভিন্ন তথ্য ও তথ্যসংকেত অনুযায়ী ভারতবর্ষের বর্তমান জনসংখ্যা ১৩০ কোটিরও বেশি। সে হিসাবে, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র .০০০০০২৬২৩০৮ শতাংশ (বস্তুত আরো কম, কেননা এই হিসেবে বেশ কিছু বিদেশি নাগরিক অন্তর্ভুক্ত, এবং দেশের জনসংখ্যা সম্ভবত ১৩৩ কোটির ওপরে), অর্থাৎ প্রায় আণুবীক্ষণিক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটা অংশ রোগগ্রস্ত। সব রাজ্য মিলিয়ে হয়তো কুল্লে লাখ-খানেক মানুষ বিভিন্ন হাসপাতালের ‘বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে’, মানে আইসোলেশন ওয়ার্ডে নজরবন্দী।

 

  • ষড়যন্ত্র?

এই তথ্য দেখে এরকমটা ভেবে নেওয়া অসমীচিন হবে না, করোনা নিয়ে যে ঘনঘোর নিরন্ধ্র আতঙ্কের দহে আমরা ইদানীং নিমগ্ন, সেটি নিতান্তই বায়বীয়, বেফালতু হুজুগ কিম্বা ধামাকাবাজি। অথবা, যেমন অনেকে লৌহদৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলছেন, করোনা-ফরোনা সব সাম্রাজ্যবাদী ও সিআইএ ইত্যাদির ঘুনচক্রান্ত, আমেরিকার কিংবা চীনের কোন গবেষণাগার থেকে কোভিড ১৯ তৈরি হয়ে কিভাবে সাঁই-সাঁই বাজারজাত হচ্ছে, বা শিশিবোতলবিকার ফেটে ছড়িয়ে পড়ছে, এ সব বদমতলবের অন্ধিসন্ধি তাঁদের নখদর্পণে, চাইলে দু’দশটা অকাট্য লিঙ্ক অবলীলায় হাজির করে দিতে পারেন। এবং, আরো যা মারাত্মক, দেশের ভিতরে মোদি-শা আম্বানি-আদানি সানসে মওজুদ, সিএএ-এনআরসি বিরোধী যে গণ-বিক্ষোভ তাদের মৌরসিপাট্টায় ধাক্কা দিচ্ছিলো, সেটিকে যেনতেন প্রকারেণ থামানো দরকার, সুতরাং লাগাও করোনা। অবিশ্যি গত কয়েকদিন যাবৎ করোনাভয় যেভাবে ভাইরাসগতিতে বিস্তৃত হচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে, ষড়যন্ত্রবাদী বুদ্ধিমানেরা ক্রমেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছেন। সেকারণে এবং আপাতত নানা কারণবশত লোকে ঘরে থাকতে বাধ্য হবে ও ঈষৎ চিন্তার ফুরসৎ/অবকাশ পাবে, এই বিবেচনায় দুচার কথা বলি। করোনা নিয়ে তো বটেই, অন্য ক’টি কূট প্রশ্ন নিয়েও।

 

  • ‘বৈশ্বিক’ সঙ্কট ও রুগী কে?

করোনা ভাইরাস কি, এই ভাইরাসের বর্তমান যে অবতার দুনিয়াজোড়া সন্ত্রাস চালাচ্ছে, তার উৎস ও চরিত্র সম্পর্কে বিস্তর তথ্য গত মাস দুয়েকের মধ্যে জনসমক্ষে এসেছে, সেগুলির অধিকাংশ সহজলভ্য, ইচ্ছা করলে পড়ে ফেলা যায়। কোভিড ১৯ কিভাবে দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়ে স্বাভাবিক জীবনপ্রণালিকে বিপর্যস্ত করছে সে খবর আসছে অহোরাত্র। বোঝা যাচ্ছে রোগ এবং সঙ্কটটি সর্বাথেই আন্তর্জাতিক (সাম্প্রতিকতম মোদিভাষণ যাঁরা শুনেছেন তাঁরা এই ‘বৈশ্বিক’ (গ্লোবালের হিন্দি) সঙ্কট সম্পর্কে অবগত)। সে প্রসঙ্গে অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ব্যাপারে ঢোকার আগে দেশের কথায় ফিরি।

 

করোনা সঙ্কটটি, মোদীজি যেমন বলছেন, বৈশ্বিক। সে তো বটেই। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যান মোতাবেক দেশের পিলপিলে জনসমষ্টির কুটিস্য কুটি, ন্যানোস্য ন্যানো এক অংশ  রোগাক্রান্ত; কি হিসেবে এটিকে সঙ্কট বলা যাবে? এখন, সঙ্কটই যদি না হয়, কেন ‘জনতা কার্ফু’, গাড়িঘোড়া-দোকানবাজার বন্ধ করে লোককে বাড়ি থাকতে বলা? মোদীজি এবং তাঁর সরকারের বক্তব্য, রোগ ছড়াতে দেওয়া যাবে না, সুতরাং স্তরে স্তরে জনতা কার্ফু কিম্বা লকডাউন, লোকে বাড়ি বসে থাকলে সংক্রামিত হবে না। ‘সংক্রামিত’ হবে না? হবে না? হবেই না?

 

মোদীজিভাষণে ও সরকারভাষ্যে যাঁদের আস্থা প্রবল তাঁরা ছাড়া বাকিদের মনে কিছু প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। প্রথম প্রশ্ন সরকারি পরিসংখ্যান নিয়ে। যে সরকার গত ছ’বছর ধরে যাবতীয় সরকারি তথ্যের জ্যয়সি কি ত্যয়সি করে ছেড়ে দিয়েছে তাদের তথ্যে বিশ্বাস করবো কেন? আইসিএমআর বলছে, ২২শে মার্চ সকাল ১০টা অবধি দেশে করোনা আক্রান্ত ৩৪১ জন, বিদেশি সমেত। কি করে জানা গ্যালো? স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে। সরকার বলছেন দেশে ৫২টা কেন্দ্রে স্বাস্থ্যপরীক্ষা হচ্ছে, দিনপ্রতি আপাতত ১০০০০ নমুনা পরীক্ষা করার মতো ব্যবস্থা রয়েছে, ইচ্ছা করলেই সেটা বাড়িয়ে ২০০০০ এ নিয়ে যাওয়া যায়। ভারতবর্ষে প্রথম করোনা রোগীর সন্ধান পাওয়া যায় কেরলে, ২৩শে জানুয়ারি। ২২শে মার্চ পর্যন্ত, অর্থাৎ দু মাসে, ৫৯ দিনে, মোট কত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে? কত জন রোগীর? ৫৯ x ১০০০০ অর্থাৎ প্রায় ছ’লাখের? নিদেন পাঁচ? তিন? তাও নয়, এক? একও নয়, হাজার পঞ্চাশ? হয়নি হয়নি ফেল। আইসিএমআর জানাচ্ছে, মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৬,৯১১। কতজন রোগীর? ১৬৯১১ জনের। ঠিক শুনছি তো? চীন থেকে শুরু করে কোরিয়া, জাপান, ইরান হয়ে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে য়ুরোপে আমেরিকায়, তথাকথিত শিল্পোন্নত দেশগুলো পর্যুদস্ত, প্রতিদিন রাশি রাশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন, হু মানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিয়মিত চেতাবনী দিয়ে যাচ্ছে, টেস্ট টেস্ট টেস্ট, অর্থাৎ পরীক্ষা করো পরীক্ষা করো করতে থাকো, আর ভারতবর্ষের মতো জনবহুল একটা দেশ দু’মাসে সাকুল্যে ১৬০০০ রোগীর থেকে নমুনাসংগ্ৰহ করছে? ৫৯ দিনে মোট জনসংখ্যার .০০০১২৩০৭৬৯২ শতাংশকে পরীক্ষার আওতায় আনলে মোট রোগীর সংখ্যা যে .০০০০০২৬২৩০৮ ছাড়াবে না, সে বিষয়ে সন্দেহ কি? কম নমুনা পরীক্ষার কারণ কি? আইসিএমআর কর্তারা বিভিন্ন রকম বলছেন; মোদ্দায় যার নিগলিতার্থ, স্বীকৃত গাইডলাইন বা নির্দেশিকা অনুযায়ী তাঁরা নমুনাপরীক্ষার রীতিনীতি তৈরি করেছেন, কোনো অসচ্ছতা বা তথ্য চাপার চক্কর নেই। বটে? কাদের আনা হচ্ছে পরীক্ষার আওতায়? প্রথমে বলা হলো, রোগাক্রান্ত দেশ থেকে এদেশে আসছেন এমন মানুষদের মধ্যে যাঁদের শরীরে ‘নির্দিষ্ট’ রোগলক্ষণ বা ক্লিনিক্যাল সিম্পটম দেখা দিচ্ছে তাঁদের। কে ঠিক করবেন রোগলক্ষণ আছে কি নেই? অন্যদিকে রোগাক্রান্ত দেশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, জানুয়ারির শেষ এমনকি ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি যে সব দেশে করোনা ধরেনি কিম্বা সবে ধরেছে, এখন অর্থাৎ মার্চের শেষদিকে সেখানে হা হা করছে রোগ। ফলত, যাঁরা বাইরে থেকে আসছেন, তাঁদের শরীরে রোগ আছে কি নেই, বিনা পরীক্ষায় তা কি করে বোঝা যাবে? রোগলক্ষণের কথা যদি ধরি, কোভিড ১৯-এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে কারুর শরীরে ভাইরাস ঢোকার পর থেকে একটা অনির্দিষ্ট অনিশ্চিত সময় ধরে রোগলক্ষণ দেখা দিতে পারে (অথবা পারে না – সেভাবে দেখা দেয়ই না)। সরকার বিমানবন্দরে জ্বর মাপার যন্ত্রছাঁকনি বা থার্মাল স্ক্রিনিং-এর ব্যবস্থা করলেন, কিন্তু যেসব রোগীর শরীরে রোগ আছে কিন্তু লক্ষণ নেই, যথা জ্বর, তাঁরা যে ছড়িয়ে পড়লেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে? ঠিক কতজনকে সংক্রামিত করলেন তাঁরা? বাইরে থেকে আসা অথচ অপরীক্ষিত অচিহ্নিত যে রোগীরা সংক্রামিত করলেন যাঁদের, তাঁরা আবার কতজনের শরীরে সংক্রমন ঘটালেন? ক্রমাগত পরীক্ষা ভিন্ন কিকরে ধরা পড়বে তা? বিশেষত যখন এই রোগের লক্ষণের সঙ্গে সাধারণ সর্দিকাশি-জ্বরজ্বারির লক্ষণ প্রায়ই মিলে যায়?

 

২. না-তথ্যের রাজনীতি

এসব প্রশ্নের সরকারি উত্তর নেই। গত হপ্তাখানেক ধরে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, বিজ্ঞানী ও বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে প্রধান মিডিয়ার কিয়দংশ হল্লাচিল্লা করায় আইসিএমআর তাঁদের টেস্টিং গাইডলাইন অর্থাৎ নমুনাপরীক্ষা সম্পর্কিত নির্দেশিকা বদলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, দিনপ্রতি এখন ৫০০ থেকে ১০০০ অস্থির বা র‍্যান্ডম নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। কি হচ্ছে তা বোঝার উপায় নেই। এই রাজ্যের কথা ধরি। রোজ বাইরের দেশ ও ভিনরাজ্য থেকে মানুষ আসছেন, দেশে কি ঘরে ফিরছেন, কি অন্য কাজে। কলকাতার দুটি কেন্দ্র বাদ দিলে আজ পর্যন্ত রাজ্যের অন্যত্র একটি পরীক্ষাকেন্দ্র নেই। কাল অর্থাৎ ২১শে মার্চ রাত অবধি রাজ্য সরকারের হাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা টেস্টিং কিট এসে পৌঁছয়নি।

 

ভারতের বিপুল জনসমুদ্রের মধ্যে কতজন ভাইরাসবাহক বা হোস্ট, জানা নেই। কতজন প্রতিমুহূর্তে সংক্রমিত হচ্ছেন, তাও জানা নেই। রোগ প্রতিরোধে যে সব সাধারণ ব্যবস্থা নেবার কথা বলা হচ্ছে, যথা সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, বেশি কোহলযুক্ত স্যানিটাইজার ব্যবহার, সংক্রামিত ব্যক্তি থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি, তা নিয়মিত মেনে চলতে পারবেন দেশের কজন মানুষ? গ্রামশহর নির্বিশেষে যে দেশের গরীব মানুষদের গরিষ্ঠাংশ দৈনন্দিন ব্যবহারের জল পান না, যাঁদের উপযুক্ত বাসস্থান নেই, পুষ্টিকর খাবার এবং চিকিৎসার ন্যূনতম সুযোগ থেকে যাঁরা বঞ্চিত, তাঁরা সবাই দিনরাত সাবান/স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোবেন এবং ভিটামিন ইত্যাদি খেয়ে শরীরের রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা অর্থাৎ ইমিউনিটি বাড়িয়ে ফেলবেন, এসব বললে ঘোড়ায় না, খচ্চরে হাসবো। অথচ ব্যাপারটা হাসির না, অথবা হাসির হলেও বেয়াদব, বদ হাসির বা ডার্ক হিউমারের।

 

৩. রাষ্ট্র কি করে

হাসির কথা বলতে গেলে মোদীজির কথায় ফিরতে হয়। দেশের প্রধান হিসেবে জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণটি দিন তিনেক আগে তিনি দিলেন, তাতে একটাও নতুন কথা ছিলো না। আতঙ্ক ছড়ানো যাবে না, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি সহমর্মিতায় তালি ও থালি বাজাতে হবে, জনতা কার্ফু পালন করতে হবে। সবাই মিলে এই সঙ্কট বৈতরণী পার হবই, সংকল্প করতে হবে। জয় হবেই, যেন আরেকটি বালাকোট আসন্ন, নেহাত শত্রুটি বৈশ্বিক, তাই ঘরমে ঘুসকে মারা যাবে না। মোদীভাষণ, বিজেপি নেতাদের গোমূত্র পান ও দিলীপ ঘোষ মশাইয়ের অমৃতবচন শুনে অনেকের দিব্য মজা লাগছে। শোনা গেলো ফেসবুক জুড়ে মিম ও খিল্লিলহরা চলছে। তা চলুক। বিষয়টা কিন্তু হাসিমস্করার নয়।

 

  • ষড়যন্ত্র ২

করোনা নিয়ে ভারত সরকারের সংখ্যামাদারির কারবারের পিছনে সত্যি সত্যিই গোদা রকমের ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে। ষড়যন্ত্রটা এটা নয় যে করোনার বিপদটাকে বড় করে দেখানো হচ্ছে। আসলে বিপদটা কি এবং কেন, সে বিষয়ে ভারত সরকার নিয়ম করে, পরিকল্পনামাফিক তথ্য চাপছেন। কেন চাপছেন? যে কারণে ট্রাম্প বলেছিলেন আমেরিকায় করোনা আসবে না, এলেও সামলে নেবো। যে কারণে চীন সরকার ডিসেম্বর জানুয়ারি ধরে কোভিড ১৯ বিষয়ে এলোমেলো ভুল খবর বাজারে ছেড়েছিলো। যে কারণে, সবাই সব কিছু জানলেও, পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য থাকলেও, জলবায়ু বদল বিষয়ে পৃথিবীর বড় জাতিরাষ্ট্রগুলো কোনরকম কার্যকরী ব্যবস্থা নেয় না। তথ্য চাপা হয়, ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কেননা সে ব্যবস্থা নিতে গেলে বিশ্বজোড়া বড়, প্রাতিষ্ঠানিক যে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে আমরা সবাই আছি, তা ধসে পড়বে। সেই ধস বাইরে থেকে ট্রিলিয়ন ডলার পুঁজি ঢেলেও সামাল দেওয়া যাবে না। গত বিশ-তিরিশ বছরে নিওলিবারল পুঁজিতন্ত্র যে সর্বগ্রাসী মুনাফাখোর কল বানিয়েছে, তাতে যেটুকু অ-পুঁজি প্রকৃতি ছড়িয়েছিটিয়ে টিঁকে ছিলো, তার শিকড়শুদ্ধ উপড়ে আসার উপক্রম। কাল বা সময় দিয়ে স্থান অর্থাৎ স্পেসকে নিশ্চিহ্ন করে পুঁজি – মার্ক্স বলেছিলেন। দেশ থেকে দেশে, মহাদেশ থেকে মহাদেশে, পুঁজি, শ্রম ও পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন যোগান দেবার জন্য গড়ে উঠছে করিডর বা মহাসড়ক। করোনা ভাইরাস জন্মেছে সম্ভবত বন্য পরিসরে, চীনের গবেষকদের কাজ ও অন্য গবেষণাকর্ম থেকে যা জানা যাচ্ছে, বন্য বাদুড়দের থেকে কোভিড ১৯ মানুষের শরীরে ঢুকেছে। কিন্তু, পুঁজিতন্ত্রের কালে, বন ও বন্যকে শিকড় উপড়ে নিয়ে আসা হচ্ছে বাজারে। দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণী ও তাদের দেহাংশ নিয়ে রমরমা বাণিজ্য চলছে চীনে, কোরিয়ায়, ভিয়েতনামে, থাইল্যান্ডে, মধ্যপ্রাচ্যে ও অন্যত্র। চীনের উহান এলাকায় এই ব্যবসা চলতো প্রকাশ্যে। চীনের অমিত পরাক্রমশালী রাষ্ট্র তা থামানোর বিশেষ চেষ্টা করেনি। অন্যদের কথা না বলাই ভালো।

 

উহানে রোগ ছড়িয়ে পড়ার পরেও, প্রায় মাস খানেক ধরে, সেখানে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছিলো। চীনা নববর্ষ উপলক্ষে উহান ছেড়ে ওইসময় প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ বাইরে গেছেন, বাইরের মানুষ উহানে এসেছেন। বিশ্বজোড়া করিডর ধরে, যথা প্লেনে চেপে, করোনা ভাইরাসের বর্তমান অবতার অন্য অঞ্চলে, অন্য দেশে পৌঁছেছে। যাত্রীবাহী প্লেন এবং অন্য যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা তার পরেও চালু রাখা হয়েছে, শুধু চীনে নয়, পৃথিবীর সর্বত্র। একারণে নয় যে সাধারণ মানুষ বিপদে পড়বেন। প্লেন বন্ধ না করার মুখ্য কারণ, যাত্রীবাহী বিমান শিল্পের অবস্থা কোথাও ভালো না, বন্ধ হয়ে গেলে মুনাফায় বড় টান পড়বেই। বাজারদোকান-যোগাযোগব্যবস্থা-শেয়ারবাজার, মানে স্বাভাবিক জীবন বলতে আমরা যা বুঝি, তার সবটা দাঁড়িয়ে আছে মুনাফা বাড়ানোর এক প্রাণঘাতী প্রক্রিয়ার ওপর। জলবায়ু বদলের বিপদ বা করোনা ভাইরাসের মতো রোগজীবাণু চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, পুঁজিতন্ত্রের স্বাভাবিকতা আসলে অপ্রাকৃতিক, অমানবিক এক অস্বাভাবিকতা। করোনার ‘বৈশ্বিক’ সঙ্কট সমস্ত অর্থেই পুঁজিতন্ত্রের, পুঁজিতন্ত্রে লীন জাতিরাষ্ট্রব্যবস্থার সার্বিক সঙ্কট।

 

চীনে করোনার প্রকোপ কমের দিকে, অন্য দেশেও কালক্রমে কমবে, ধরা যায়। ভারতবর্ষে কত মানুষ আক্রান্ত হবেন, বিনা চিকিৎসায় মরবেন, জানা নেই। তার একটা কারণ, ভাইরাস অর্থাৎ রোগটা নতুন, তার চালচলন নিয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। অন্য দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হারের ওপর নির্ভর করে যে সব গাণিতিক ভবিষ্যৎবাণী করা হচ্ছে, তা দেখলে রক্ত ঠান্ডা হয়ে যায়। দীর্ঘস্থায়ী লকডাউন হবে কিনা, হলেও তাতে করোনা ঠেকানো যাবে না, লকডাউনের ফলে যে সব দিনমজুর ছোট ব্যবসায়ী হকার ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ বিপন্ন হয়ে পড়বেন, তাদের খাবার যোগান কে দেবেন, করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে তাঁদের চিকিৎসার কি হবে, এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। দেশে যাঁরা সরকার চালাচ্ছেন, তাঁদের ভরসা করা যায় না, নির্ভেজাল মিথ্যাচারণ ও নৌটঙ্কিতে তাঁরা সিদ্ধকর্মা; তার বাইরে তাঁরা কিছু করবেন, সে আশা নেই। কিন্তু একটা কথা জোর দিয়ে বলা যায়, বলা উচিত। করোনাকান্ড যতদূর পর্যন্তই গড়াক, যেখানে গিয়েই থামুক, পুঁজিতন্ত্রের স্বাভাবিকতায় পৃথিবী আর ফিরে যাবে না।

Share this
Leave a Comment